সময়ের আয়নায় আমিরুল ইসলামের জীবন্ত-স্মৃতি
কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাদের চলে যাওয়া মানে আসলে কোনো একটি মানুষের অনুপস্থিতি নয়। তাদের সঙ্গে চলে যায় একটি সময়, একটি আবহ, একটি প্রিয় সম্পর্কের উষ্ণতা। আবার কিছু মানুষ তাদের সৃষ্টির ভেতর এমনভাবে ছড়িয়ে থাকেন যে, তাদের খুঁজতে খুব দূরে যেতে হয় না। একটি পুরোনো পত্রিকার পাতা উল্টালেই, একটি পুরোনো লেখা হাতে নিলেই, হঠাৎ মনে হয়, মানুষটি এই তো পাশে আছেন। বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের পুরোধাপুরুষ আমীরুল ইসলাম তেমনই একজন।
আমীরুল ভাই আর নেই। আমাদের প্রিয় টুলু ভাই। অতীতের দিকে তাকিয়ে আজ মনে পড়ছে কত স্মৃতি, কত যে কথা! সেই ছোটবেলায় লেখালেখির সূত্রে তার সঙ্গে আমার পরিচয়। তিনি আমাদের অগ্রজ লেখক। বয়সে, অভিজ্ঞতায়, সাহিত্যজীবনে আমাদের থেকে আগে পথ চলা একজন মানুষ। কিন্তু তার সেই অগ্রজত্ব কখনো আমাদের ওপর দূরত্ব তৈরি করেনি। বরং তার অগাধ স্নেহ আমাকে বারবার আপন করে নিয়েছে।
আজ সময়ের আয়নায় ভেসে ওঠে অতীতের অনেক প্রিয় স্মৃতি। আমার বয়স তখন বড়জোড় আট থেকে দশ আমার আম্মা আমাদের দুবোনকে বাংলামোটর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে রেখে যেতেন আমীরুল ভাইয়ের কাছে। ছুটির দিন বিকেলটা তার সাথে আমার আর আমার ছোট বোন নিপুর চমৎকার সময় কাটতো। আমীরুল ভাই আমাদের নানা রকম গল্প করে মাতিয়ে রাখতেন। কত রকম বই পড়তে দিতেন। কত দেশ-বিদেশের লেখা আর লেখকের গল্প বলতেন। তার শেষ নেই! আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম তার কথা। চমৎকার ভঙ্গিতে কথা বলতেন তিনি। সন্ধ্যায় নানা রকম বই-পত্রপত্রিকা হাতে নিয়ে আম্মার সাথে আমরা ঘরে ফিরতাম। পরের সপ্তাহে আবার যেতাম। এভাবেই কেটে যায় বেশ কয়েক বছর। আমরা দুবোনও আস্তে আস্তে বড় হতে থাকি। পরে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত ‘আসন্ন’ পত্রিকার সম্পাদক হন তিনি। দশ বছর তিনি এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। এ সময় আমার বেশ কিছু ছড়া-গল্প ছেপেছেন আমীরুল ভাই।
‘কিশোর লেখা’র সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা যখন মনে পড়ে, তখন আমার কাছে সবচেয়ে আগে ভেসে ওঠে একটি দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রার ছবি। কিশোর লেখার প্রথম সংখ্যা থেকেই তিনি লিখেছেন। ‘কিশোর লেখা’র প্রথম সংখ্যার উল্লেখযোগ্য লেখক তালিকায় ছিলেন আমীরুল ইসলাম। তার লেখা ছড়ার নাম ছিলো ‘কুচ পরোয়া নেহী’। এ তো সেই ৪০ বছর আগের কথা!
প্রথম সংখ্যায় শুধু লেখা দিয়েই থেমে যাননি, পত্রিকাটির সঙ্গে দীর্ঘদিনের এক আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তার। আমরা কয়েকজন শিশু-কিশোর মহাগ্রহে কাজ করছি। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে আমরা তখন নিয়মিত যাই। আমীরুল ভাইয়ের স্নেহের ছায়ায় কাটে আমাদের ছুটির দিনের বিকেলগুলো। ১৯৮৯ সালে কিশোর লেখার একটি বিশেষ গল্প সংখ্যা হবে। আমীরুল ভাই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দাঁড়ালেন আমাদের দিকে। এ সংখ্যায় একটি চমৎকার গল্প লিখেছিলেন তিনি। সেই সময়ের জনপ্রিয় চিত্রশিল্পী সৈয়দ এনায়েত হোসেনের কাছে আমীরুল ভাই-ই আমাকে পাঠিয়েছিলেন একটি প্রচ্ছদের জন্য। সম্পূর্ণ বিনা পয়সায় একটি চমৎকার প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছিলেন এনায়েত হোসেন। শুধু এঁকে দিয়েই তিনি খান্ত হননি। নিজ খরচে প্রচ্ছদটির একটি ব্লক তৈরি করে কিভাবে তা ছাপতে হবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। এক বিকেলে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে বসে আমীরুল ভাই তাৎক্ষণিক কিশোর লেখার এই সংখ্যার জন্য একটি নামলিপি নিজ হাতে ডিজাইন করে দিয়েছিলেন। সেই নামলিপি আমরা বহু বছর ব্যবহার করেছি। আকর্ষনীয় প্রচ্ছদ আর দারুণ সব গল্পে সমৃদ্ধ কিশোর লেখার সেই সংখ্যাটি সে সময় বেশ আলোড়ন তুলেছিলো তরুণ শিশু সাহিত্যিকদের মধ্যে।
আমীরুল ভাই কিশোর লেখায় নিয়মিত লিখেছেন, ছোটদের জন্য লিখেছেন, পাঠকের কথা ভেবে লিখেছেন। ফলে ‘কিশোর লেখা’র পুরোনো পাতাগুলো খুললে তার লেখার উপস্থিতি যেন পত্রিকাটিরই একটি পরিচিত স্বর হয়ে ওঠে। আমি লেখা চেয়েছি, কিন্তু তিনি দেননি! এমন স্মৃতি আমার বা কিশোর লেখার ইতিহাসে নেই। এই তো এ বছর কিশোর লেখার ৪০ বছর। চার দশক উপলক্ষে এ বছরের শুরুতে আমরা ডাউস সাইজের একটি সংখ্যা করেছি। অসুস্থ শরীরেও তিনি কিশোর লেখার সাথে তার নানা স্মৃতিচারণ করে একটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা দিয়েছেন। লেখাটি আমরা লিড ফিচার হিসেবে ছেপেছি।
আমাদের মতো যারা একটি কিশোর পত্রিকা নিয়ে পথ চলি, তাদের কাছে একজন প্রতিষ্ঠিত লেখকের নিয়মিত লেখা পাওয়া শুধু আনন্দের বিষয় নয়, এক ধরনের সাহসও। কারণ একটি পত্রিকার মান, তার গ্রহণযোগ্যতা এবং তার সাহিত্যিক পরিসর তৈরি হয় লেখক-পাঠকের আন্তরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। আমীরুল ভাইয়ের মতো অগ্রজ শিশুসাহিত্যিকের উপস্থিতি ‘কিশোর লেখা’র সেই পরিসরকে নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ করেছে।
তিনি ছিলেন এমন একজন লেখক, যিনি শিশু-কিশোর সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই সপ্রান ও সচল ছিলেন। ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, বিজ্ঞান, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, রূপকথা—কত বিচিত্র বিষয়েই না লিখেছেন। তার লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল শিশুমনের কাছে পৌঁছে যাওয়ার ক্ষমতা। তার ভাষা ছিল সহজ, কিন্তু ভাবনা ছিল গভীর; আনন্দের আড়ালেও থাকত জীবনবোধ, কৌতূহল, দেশ ও সমাজ সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আহ্বান।
‘কিশোর লেখা’র পাতায় তার লেখা প্রকাশিত হওয়ার বিষয়টি তাই আমাদের কাছে নিছক একজন লেখকের লেখা ছাপা হওয়া ছিল না। এর মধ্যে ছিল একটি প্রজন্মের শিশুসাহিত্যের সঙ্গে আরেক প্রজন্মের সেতুবন্ধন। তাকে কখনো শুধু একজন লেখক হিসেবে দেখিনি। তার সঙ্গে আমার সম্পর্কের সবচেয়ে বড় জায়গাটি ছিল তার স্নেহ। আমি তার অগাধ স্নেহ পেয়েছি। সেই স্নেহের কথা মনে পড়লে আজও মনে হয়, লেখালেখির জগতে সম্পর্কগুলো কেবল কাগজে-কলমে তৈরি হয় না; মানুষের মমতা, উৎসাহ আর আন্তরিকতায়ও তৈরি হয়।
‘কিশোর লেখা’র জন্য লেখা চাইতে গিয়ে, লেখা হাতে পেয়ে, তার লেখা পড়তে গিয়ে, কতবার যে মনে হয়েছে, আমাদের এই ছোট্ট পত্রিকাটিকে তিনি আপন করে নিয়েছেন। একজন প্রতিষ্ঠিত শিশু সাহিত্যিকের কাছে একটি কিশোর পত্রিকার জন্য নিয়মিত লেখা দেওয়া ছিল আমাদের প্রতি তার এক ধরনের দায়বোধও। ছোটদের জন্য ভালো কিছু করার যে দায় তিনি সারাজীবন নিজের কাঁধে নিয়েছিলেন, ‘কিশোর লেখা’র ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
পেছনে ফিরে তাকালে আজ বুঝতে পারি, একটি পত্রিকার ইতিহাস শুধু সম্পাদকীয় লেখা, প্রচ্ছদ, সংখ্যা বা প্রকাশনার তারিখ দিয়ে তৈরি হয় না। সেই ইতিহাস তৈরি হয় লেখকদের ভালোবাসা দিয়ে। তাদের লেখা দিয়ে। তাদের বিশ্বাস দিয়ে। তাদের দেওয়া সময় ও শ্রম দিয়ে।
আমীরুল ভাই ‘কিশোর লেখা’র সেই ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। ২০২২ সালে আমীরুল ভাইয়ের অসুস্থতার খবরটি যখন পেলাম, তখন আমি নিউইয়র্কে বোনের কাছে। হঠাৎ ফেসবুকে খবরটি দেখে বুকটা কেমন করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে দেশে কয়েকজন লেখককে ফোন করলাম। কিছুদিন পর দেশে ফিরে প্রথম কাজগুলোর একটি ছিল আমীরুল ভাইকে নিয়ে ‘কিশোর লেখা’র একটি বিশেষ সংখ্যা করার উদ্যোগ নেওয়া। ধ্রুব এষ দা ভালোবাসা আর আগ্রহ নিয়ে করে দিলেন অসাধারণ একটি প্রচ্ছদ। সারা দেশ থেকে নবীন-প্রবীণ লেখকেরা কলম ধরলেন তাদের প্রিয় শিশুসাহিত্যিককে নিয়ে। প্রায় ১১ ফর্মার সেই সংখ্যাটি হয়ে উঠল ভালোবাসায় ভরা এক স্মারক।
২০২২ সালের ৭ এপ্রিল তার জন্মদিনে এই বিশেষ সংখ্যাটি হাতে তুলে দেওয়ার মুহূর্তটি আজও চোখের সামনে ভাসে। আমীরুল ভাই যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না—এত মানুষ তাকে এত ভালোবাসেন! শিশুর মতো সরল বিস্ময় আর আবেগে তিনি পাতা উল্টাচ্ছিলেন। চ্যানেল আইয়ে তার রুমে বসে হঠাৎ দেখলাম, তার চোখে পানি। আমীরুল ভাইয়ের চোখে সেই প্রথম জল দেখেছিলাম। কিছুক্ষণ পরপর আমার দিকে তাকিয়ে বলছিলেন, ‘ধন্যবাদ।’ সেই ধন্যবাদে কৃতজ্ঞতার চেয়ে ভালোবাসাই ছিল বেশি। মনে হয়েছিল, একটি পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা সেদিন আসলে একজন প্রিয় মানুষকে ঘিরে ভালোবাসার এক বিশাল আলিঙ্গন হয়ে উঠেছিল। আর সেই মুহূর্তটি আমার স্মৃতিতে আমীরুল ভাইয়ের সবচেয়ে কোমল, সবচেয়ে উজ্জ্বল ছবিগুলোর একটি হয়ে রয়ে গেছে।
তিনি ইহকাল ত্যাগ করেছেন ঠিক, কিন্তু তার লেখা আছে। ‘কিশোর লেখা’র পুরোনো সংখ্যাগুলোতে তার অক্ষর আছে। আছে তার সৃষ্টির স্মৃতি। কোনো পুরোনো সংখ্যা খুললে হয়তো আবার চোখে পড়বে তার নাম। তখন বুকের ভেতর হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস উঠবে—আহা, আমীরুল ভাই!
মনে হবে, এই তো সেদিনও তিনি ছিলেন আমাদের সঙ্গে। আমাদের পত্রিকার পাতায়, আমাদের সাহিত্যজগতের আড্ডায়, আমাদের ছোটদের জন্য ভাবনায়। সময় চলে যায়। মানুষ চলে যান। কিন্তু ভালো লেখকের লেখা থেকে যায়। আর অগ্রজের স্নেহ—
সেটি থেকে যায় আরও গভীরে, মানুষের নিজের ভেতরে।
‘কিশোর লেখা’র সঙ্গে আমীরুল ভাইয়ের যে দীর্ঘ পথচলা, সেটি আমাদের কাছে শুধু একটি পত্রিকার স্মৃতি নয়; এটি আমাদের শিশু সাহিত্যেরও এক মূল্যবান অধ্যায়। আজ সেই অধ্যায়ের একজন প্রিয় মানুষকে হারিয়ে আমরা গভীর ভাবে শোকাহত। বড় আসময়ে স্বজন হারানোর এ শোক সইবার ক্ষমতা আমাদের কই!
আমীরুল ভাই, আপনার লেখা ‘কিশোর লেখা’র পাতায় যেমন থেকে যাবে, তেমনি থেকে যাবে আমাদের স্মৃতির পাতাতেও। আপনার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা কোনোদিন মুছে যাবে না। ‘কিশোর লেখা’র পাতায় আপনি আমাদের সঙ্গে ছিলেন, আছেন, থাকবেন।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন