বইয়ের ভাঁজে ভাঁজে আখতার হুসেনের স্মৃতি
গেল ২৪ সেপ্টেম্বর যখন খবরটা এলো আখতার ভাই আর নেই, তখন বুকের ভেতরটা কেমন যেন শূন্য হয়ে গেল। স্মৃতির জানালায় হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল প্রথমা প্রকাশনের সেই চেনা ঘরটি, আর সেই ঘরের মধ্যমণি হয়ে থাকা মানুষটি—শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন। বাইরে বয়সের ছাপ, চুলে-দাড়িতে শুভ্রতা, কিন্তু ভেতরে আজীবন এক জেদি, অভিমানী আর নিষ্পাপ শিশুকে লালন করে গেছেন তিনি। তাকে নিয়ে লিখতে বসলে শোকের চেয়েও আগে চোখের সামনে ভেসে ওঠে তাঁর অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা, যা আজও আমাদের মুখে অজান্তেই হাসি ফুটিয়ে তোলে।
দিনটা ছিল ২০২১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। প্রথম আলোর প্রথমা প্রকাশনে আমার যোগ দেওয়ার প্রথম দিন। আখতার হুসেনের নাম আমি শৈশব থেকেই জানতাম। আমাদের আগের প্রজন্মের পাঠ্যবইয়ে তাঁর ছড়া বা কবিতা ছিল বলে শুনতাম, তবে আমাদের সময়ে হয়তো টেক্সট বইয়ে তাঁর লেখা আমরা সেভাবে পাইনি। কিন্তু তাঁর শিশুসাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় ছিল অনেক আগে থেকেই। সেই কিংবদন্তি মানুষটার মুখোমুখি হব, ভাবতেই কিছুটা জড়তা কাজ করছিল।
প্রথম দিনেই তিনি আমার সেই জড়তা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলেন। প্রথমার অফিসে এসে দেখলাম, মানুষটা শুধু বিখ্যাত লেখকই নন, নিখাদ এক কাজের মানুষ। আমাদের অফিস টাইম ছিল সকাল ১১টা। কিন্তু কোনোদিন আখতার ভাইকে ১১ টা ১ মিনিটে আসতে দেখিনি। আমরা অফিসে গিয়ে দেখতাম, তিনি তাঁর নির্দিষ্ট ডেস্কে একেবারে সোজা হয়ে বসে আছেন। সময়ানুবর্তিতা ছিল তাঁর মজ্জাগত। প্রথম দিনেই টেবিলে পাণ্ডুলিপি টেনে নিয়ে লাল কলম ঘুরিয়ে আমাকে বই সম্পাদনার অ আ ক খ শিখিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘সম্পাদনা কেবল ভুল ধরা নয়, লেখকের ভাষাটাকে পাঠকের বোধগম্য করে তোলা।’ শুরুর সেই পরামর্শ আমার পেশাগত জীবনের স্থায়ী সম্পদ হয়ে আছে।
আখতার ভাই মানুষটা যেমন কাজের প্রতি যত্নবান ছিলেন, তেমনি তাঁর মেজাজ আর জেদ ছিল দেখার মতো। এই জেদের সবচেয়ে ঐতিহাসিক ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২১ সালেরই কোনো এক মাসে। তখন আমাদের সমন্বয়ক ছিলেন অরুণ বসু। অরুণদা একসময় ডাকসাইটে ছাত্রনেতা ছিলেন, পরবর্তী সময়ে প্রথম আলোতে যোগ দেন এবং সম্পাদক মতিউর রহমানের অত্যন্ত আস্থাভাজন ও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন।
সেদিন বড়সড় কোনো ঘটনা ঘটেনি। অরুণদা একটা পাণ্ডুলিপি কোনো একটা প্রয়োজনে আখতার ভাইয়ের টেবিলের ওপর ছুড়ে দেন। যতদূর জানি, অরুণদা রেগে বা কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে সেটা ছোড়েননি, নিতান্তই কাজের তোড়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু ছুড়ে ফেলার কারণে টেবিলে পাণ্ডুলিপিটা পড়ে বেশ জোরে একটা শব্দ হয়। আর তাতেই ঘটে গেল তুলকালাম!
আমরা যারা আশপাশে ছিলাম, তাদের চোখ তো চড়কগাছ! হতবাক হয়ে ভাবছি, কী করব না করব কিছুই বুঝতে পারছি না। একজন বর্ষীয়ান লেখক নিজের টেবিলের নিচের মেঝেতে সটান শুয়ে আছেন! আমরা সবাই ছুটে গেলাম, কত অনুনয়-বিনয় করলাম ওঠার জন্য, কিন্তু তিনি অনড়। শুয়ে শুয়েই ফ্লোর থেকে হাত তুলে ঘোষণা দিলেন, ‘আমাকে চরম অপমান করা হয়েছে। এর বিচার না হলে আমি উঠব না। আমি অনশনে গেলাম!’

লেখক ও শিশু সাহিত্যিক আখতার হুসেন || ছবি: সংগৃহিত
আখতার ভাই প্রচণ্ড ক্ষেপে গেলেন। এক মুহূর্তের মধ্যে তাঁর চেহারা লাল হয়ে গেল। তিনি টেবিল কাঁপিয়ে অরুণদাকে লক্ষ্য করে বলে উঠলেন, ‘জানেন, এইভাবে ছুড়ে দেওয়াতে যে শব্দ হয়, তাতে একজনের হার্ট অ্যাটাক হতে পারে!’
অরুণদা হয়তো ভাবতেও পারেননি এত সামান্য বিষয়ে এমন প্রতিক্রিয়া হবে। তিনি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে চুপ করে রইলেন, কোনো উত্তর দিলেন না। কিন্তু আখতার ভাই তো ছাড়ার পাত্র নন! তিনি বিষয়টিকে চরম আত্মমর্যাদার লড়াই বানিয়ে ফেললেন। কোনো কথা নেই, বার্তা নেই—আখতার ভাই ধপাস করে নিজের ডেস্কের নিচে ফ্লোরে শুয়ে পড়লেন!
আমরা যারা আশপাশে ছিলাম, তাদের চোখ তো চড়কগাছ! হতবাক হয়ে ভাবছি, কী করব না করব কিছুই বুঝতে পারছি না। একজন বর্ষীয়ান লেখক নিজের টেবিলের নিচের মেঝেতে সটান শুয়ে আছেন! আমরা সবাই ছুটে গেলাম, কত অনুনয়-বিনয় করলাম ওঠার জন্য, কিন্তু তিনি অনড়। শুয়ে শুয়েই ফ্লোর থেকে হাত তুলে ঘোষণা দিলেন, ‘আমাকে চরম অপমান করা হয়েছে। এর বিচার না হলে আমি উঠব না। আমি অনশনে গেলাম!’
কেউ আর কিছু বলার সাহস পাচ্ছিল না, যদি তিনি আরও বেশি রেগে যান। পুরো অফিসে তখন এক থমথমে এবং একই সাথে অবিশ্বাস্য এক পরিস্থিতি। অরুণদা তো চরম বিব্রত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। শেষমেশ খবর গেল মানবসম্পদ (এইচআর) বিভাগে। এইচআর থেকে কর্মকর্তা এসে অনেক তোয়াজ করলেন, কত রকমের আশ্বাসের বাণী শোনালেন। প্রায় আধাঘণ্টার ঘনঘটার পর আখতার ভাই শান্ত হলেন এবং মেঝের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়ালেন।
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, ওঠার পর তাঁর মুখের যে এক অদ্ভুত শিশুতোষ অভিব্যক্তি ছিল, তা দেখে আমরা কেউ আর হাসি চেপে রাখতে পারলাম না। পুরো অফিস একযোগে হেসে উঠল। এমনকি এতক্ষণ চরম অস্বস্তিতে থাকা অরুণদাও মুখ টিপে হেসে ফেললেন। আখতার ভাইয়ের সেই অভিমান মুহূর্তেই কর্পূরের মতো উবে গেল। আজ খুব কষ্ট হয় ভেবে, যে অরুণদাকে নিয়ে এত বড় ঘটনা, সেই অরুণদা কিন্তু ওই বছরই (২০২১) মহামারি কোভিডে আক্রান্ত হয়ে আমাদের ছেড়ে চলে যান। আজ আখতার ভাইও চলে গেলেন তাঁর কাছে।
আখতার ভাই ছিলেন আমাদের অফিসের ‘জোক্সের রাজা’। যদিও তাঁর ঝুলিতে জোক্স ছিল হাতে গোনা, ওই আট-দশটাই। কিন্তু তাঁর বলার কায়দা ছিল অতুলনীয়। তিনি যখন কোনো জোক্স বলতেন, তখন যেন কোনো দক্ষ মঞ্চাভিনেতার মতো অভিনয় করতেন। গলার স্বর পরিবর্তন, চোখের অভিব্যক্তি, হাত-পায়ের নাড়াচাড়া—মনে হতো গল্পের সবকটি চরিত্র তিনিই একা রূপ দিচ্ছেন। তাঁর বেশির ভাগ জোক্সই ছিল ১৮+ বা প্রাপ্তবয়স্কদের রসাত্মক গল্প। তরুণদের সঙ্গে মিশতে তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন। আর এই জোক্সগুলো ছিল তরুণ সহকর্মীদের আকৃষ্ট করার তাঁর নিজস্ব একটা কৌশল। আমরাও কাজের ফাঁকে তাঁকে নানা আজগুবি গল্প শোনাতাম। তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে তা শুনতেন এবং নিজের কল্পনা মিশিয়ে সেগুলোকে বানিয়ে বানিয়ে আরও রসাল জোক্স বা গল্প তৈরি করতেন।
সেদিন বড়সড় কোনো ঘটনা ঘটেনি। অরুণদা একটা পাণ্ডুলিপি কোনো একটা প্রয়োজনে আখতার ভাইয়ের টেবিলের ওপর ছুড়ে দেন। যতদূর জানি, অরুণদা রেগে বা কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে সেটা ছোড়েননি, নিতান্তই কাজের তোড়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু ছুড়ে ফেলার কারণে টেবিলে পাণ্ডুলিপিটা পড়ে বেশ জোরে একটা শব্দ হয়। আর তাতেই ঘটে গেল তুলকালাম!

সাংবাদিক ও লেখক অরুণ বসু || ছবি: সাখাওয়াত টিপু
তবে বাইরে খামখেয়ালী আর ফাজলামো থাকলেও, একটা জায়গায় আখতার ভাই ছিলেন সম্পূর্ণ নতজানু। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিল ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। মতি ভাইয়ের সামনে গেলে মনে হতো, একটা অবাধ্য স্কুলের বাচ্চা যেন প্রধান শিক্ষকের সামনে কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে! সেই বিনম্র ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা এখনো চোখে ভাসে। মতি ভাই যা বলতেন, আখতার ভাই তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। কখনো কখনো অভিমান করে বা রেগে গিয়ে তিনি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেন। কয়েকবার নিজের হাতে লেখা পদত্যাগপত্র জমাও দিয়েছিলেন। কিন্তু মতিউর রহমান তাঁকে খুব ভালো বুঝতেন। তিনি কখনো সেই চিঠি গ্রহণ করতেন না। পিঠ চাপড়ে বলতেন, ‘আরে আখতার, করো আরও কিছুদিন।’ ব্যাস! মতি ভাইয়ের এই এক কথাতেই আখতার ভাই সব রাগ ভুলে একগাল হেসে আবার ডেস্কে ফিরে এসে কাজে লেগে যেতেন।
ব্যক্তিগত জীবনে আখতার ভাই ছিলেন অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠ। বিশেষ করে নিজের খাওয়ার ব্যাপারে তিনি অসম্ভব সচেতন ছিলেন। সময় মেপে ঘড়ি ধরে ঠিক সময়ে তিনি খাবার খেতেন, সেখানে এক মিনিটের এদিক-সেদিক হওয়ার জো ছিল না।
তবে বয়সের ভার এবং অসুস্থতা তাঁর মনের ওপর কিছুটা প্রভাব ফেলেছিল। জীবনের শেষভাগে তাঁর মধ্যে এক ধরনের তীব্র সন্দেহপ্রবণতা তৈরি হয়েছিল। বয়সের কারণে তিনি প্রায়ই সন্দেহ করতেন, কেউ হয়তো তাঁর টাকা-পয়সা নিয়ে যেতে চাইছে বা তাঁকে ঠকাচ্ছে। আমরা বিষয়গুলো বুঝতাম, তাই কেউ কিছু মনে করতাম না; বরং এক ধরনের মমতা তৈরি হতো তাঁর প্রতি।
এই মানুষটার জীবনের সবচেয়ে বড় অহংকার ছিল তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরি। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল বেশ কয়েক হাজার দুর্লভ ও মূল্যবান বই। বইগুলোর কথা বলতে গেলে তাঁর চোখ চকচক করে উঠত। পরম গর্বের সাথে বলতেন, ‘আমার এই বইগুলো আমি কোনো একটা ভালো পাবলিক লাইব্রেরিতে দান করে দিয়ে যাব, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পড়তে পারে।’ আজ তিনি চলে যাওয়ার পর মনে প্রশ্ন জাগে, তাঁর সেই পরম যত্নে জমানো হাজার হাজার বইয়ের শেষ পর্যন্ত কী হলো? সেগুলো কোনো লাইব্রেরির আলো দেখবে নাকি অবহেলায় কোথাও ধুলো জমবে?
বাইরে থেকে প্রাণবন্ত হলেও তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছিল মারণব্যাধি ক্যানসার। এই কঠিন রোগের কথাও তিনি অফিসে প্রায়ই বলতেন। তবে তাতে কোনো হাহাকার ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত মেনে নেওয়া। আর ছিল তাঁর সন্তানদের প্রতি অপার, অতল ভালোবাসা। সন্তানদের কথা যখন বলতেন, তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে আসত। বোঝা যেত, এই খামখেয়ালী বৃদ্ধের ভেতরে এক গভীর স্নেহশীল পিতা সারাক্ষণ জাগ্রত রয়েছে।
বাংলা শিশুসাহিত্যে আখতার হুসেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়েই থাকবেন। কিন্তু আমাদের প্রথমার বন্ধুদের কাছে তিনি ছিলেন এক ‘বিরাট শিশু’। যিনি রাগে ফ্লোরে শুয়ে পড়তে পারেন, যিনি একই ১৮+ জোক্স দশবার বলে হাসাতে পারেন, আবার সম্পাদকের এক কথায় শিশুর মতো শান্ত হয়ে যেতে পারেন।
এখন আখতার ভাই চলে গেছেন চিরতরে। মৃত্যুর আগে চাকরিও ছেড়েছিলেন। সারাদেশ ঘুরবেন বলে। কিন্তু কতটা ঘুরতে পেরেছেন জানি না। তার মায়ের কবর মেরামতের কথা বলতেন। সেটাও করেছিলেন কিনা জানি না। আরও অনেক প্ল্যান তিনি শেয়ার করেছিলেন, সেগুলোর কি অবস্থা আখতার ভাই?
তবে প্রথমার প্রতিটি টেবিলে, বইয়ের ভাঁজে ভাঁজে আর আমাদের স্মৃতির অ্যালবামে আখতার ভাই বেঁচে থাকবেন এক রঙিন, চিরসবুজ, খামখেয়ালী অভিমানী মানুষ হিসেবে। ওপারে ভালো থাকবেন আমাদের প্রিয় ‘বিরাট শিশু’ আখতার ভাই।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন