পুরাণের দানব থেকে নোবেলের মঞ্চে অ্যান কারসন

অ+ অ-

 

বীরের জীবনী লেখার সময় দানবের বাড়ির ঠিকানাটা সাধারণত লাগে না। তাকে কোথায় পাওয়া গেল, কীভাবে মারা হল, এতেই কাজ চলে। তার মা ছিলেন কি না, সন্ধেবেলা সে কী ভাবত, ভালোবাসার মানুষটি তাকে কতখানি কষ্ট দিয়েছে, এসব খবর রাখতে গেলে বিজয়গাথার গতি কমে। আমাদের সমাজেও খ্যাতিমান মানুষের সহকর্মী, প্রেমিক বা পরিবারের সদস্যদের মাঝেমধ্যে এই অসুবিধা ঘটে। তাঁরা নিজের জীবনের কথা বলতে শুরু করেন। সংবর্ধনার মঞ্চে তখন মাইক্রোফোনের গোলমাল দেখা দেয়। অ্যান কারসনের বই পড়ার একটি উপায় হল, ওই গোলমালটিতে কান দেওয়া।

২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেলজয়ী অ্যান কারসন একাধারে কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। তাঁকে ঘিরে পাণ্ডিত্য, দুরূহতা, সাহিত্যিক রূপভাঙার আলোচনা যথার্থ। অ্যান কারসনের জন্ম ১৯৫০ সালের ২১ জুন, টরন্টোতে। শৈশব কেটেছে অন্টারিওর বিভিন্ন শহরে। গ্রিক ও লাতিন ভাষার অধ্যয়ন তাঁর লেখকজীবনের কেন্দ্রীয় প্রস্তুতি। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং ১৯৮১ সালে পিএইচডি করেছেন; সেন্ট অ্যান্ড্রুজেও ধ্রুপদি ভাষা ও সাহিত্য পড়েছেন। এই পাণ্ডিত্য তাঁর লেখায় পুরোনো বাক্যের সঙ্গে বর্তমানের অস্বস্তিকে পাশাপাশি বসায়। কোন লেখা টিকেছে, কোন শব্দ হারিয়েছে, কোন চরিত্রের অভিজ্ঞতা আড়ালে থেকেছে, তাঁর অনুসন্ধানে এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তাঁর লেখালেখিতে আরেকটি জরুরি প্রশ্নও রয়েছে: একটি গল্পে কার জীবন বিস্তারিত বলার যোগ্য বলে গণ্য হয়? কার মৃত্যু অন্যের কৃতিত্বের তালিকায় একটি সংখ্যা হয়ে থাকে? গ্রিক পুরাণের চরিত্রদের প্রেম, শরীর ও ঘরসংসারে ফিরিয়ে কারসন সেই বণ্টন পরীক্ষা করেন। পাঠকের দীর্ঘদিনের পক্ষপাতও সেখানে পরীক্ষার টেবিলে উঠে পড়ে।

পুরাণের সুবিধা, তার নামগুলো আমাদের আগেই চেনা। অসুবিধাও ওইখানে। পরিচিত নামের সঙ্গে তৈরি হয়ে থাকে অনুমোদন ও অনাস্থার প্যাকেট। বীর বললেই কিছু ছাড়, দানব বললেই কিছু বাড়তি সন্দেহ। বহুবার বলা গল্পের রায় আমরা ঘটনাটি পুনরায় দেখার আগেই মেনে নিই। এই অভ্যাস অতীতের চরিত্রদের ঘিরে বর্তমানেও কাজ করে। কোনো মানুষের পরিচয় সম্পর্কে একটি শব্দ শুনে তার বাকি জীবনের ব্যাখ্যা তৈরি করার যে তৎপরতা, কারসনের রচনা সেখানে বাধা দেয়। নামের ভিতরে ঢুকে তিনি জীবনের জন্য বাড়তি জায়গা খোঁজেন।

‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’-এর গেরিয়নকে ধরা যাক। গ্রিক কাহিনিতে হেরাক্লেসের শ্রমের সঙ্গে তার নাম জড়িত: গেরিয়নকে হত্যা করে তার গরু নিয়ে যেতে হবে। একটি জীবনের এই সংক্ষিপ্ত পরিচয় বীরের কাজে খুবই সুবিধাজনক। কারসনের ১৯৯৮ সালের পদ্য-উপন্যাসে গেরিয়ন রেড, ডানাওয়ালা এক কিশোর, যার বেড়ে ওঠায় পারিবারিক নির্যাতন রয়েছে। হেরাক্লেসের প্রেমে পড়ে সে, পরিত্যক্ত হয়, ছবি তোলে। এই গেরিয়নের দিন কাটে। সময় লাগে বড় হতে। তার জন্য পাঠকেরও সময় খরচ করতে হয়।

এখানেই প্রাচীন কবি স্তেসিখোরোসের প্রাপ্যটুকু মনে রাখা দরকার। গেরিয়নের প্রতি সহানুভূতির গোড়াপত্তন কারসনের হাতে হয়েছে, এমন দাবি সাহিত্যের ইতিহাসকে অকারণে ছোট করবে। স্তেসিখোরোসের খণ্ডিত ‘গেরিয়োনেইস’-এই তার সাহস, দ্বিধা এবং মায়ের উদ্বেগের পরিচয় মেলে। কারসন সেই আগের দৃষ্টিবদলের সঙ্গী হন। পুরোনো সাহিত্যের ভিতরেও মতভেদ আছে, ক্ষমতার প্রচলিত বিন্যাস নিয়ে আপত্তি আছে। ঐতিহ্যকে একমুখী নির্দেশিকা বানিয়ে ফেললে তার নিজেদের তর্কগুলো হারিয়ে যায়। কারসন সেই তর্কের চলমানতা ধরে আধুনিক অভিজ্ঞতার দিকে এগোন।

গেরিয়ন ও হেরাক্লেসের প্রেমে পুরাণের হত্যাকাণ্ড আর ঘটনার অবিকল নকশা হিসেবে কাজ না করলেও, তার চাপ থেকে যায় আকর্ষণ, অবহেলা ও বিচ্ছেদের সম্পর্কে। একজনের কাছে যে সাক্ষাৎ জীবন বদলে দেওয়ার ঘটনা, অন্যজন তার পরেও সহজে নিজের রাস্তায় হাঁটতে পারে। প্রেমের এই অসম সময়বোধ আমাদের চেনা। একই সম্পর্কের দুই বাসিন্দার কাছে তার আয়তন সমান হয় না। একজনের অবকাশ অন্যজনের অপেক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। বীরের স্বাধীন চলাফেরার পাশে কারসন সেই অপেক্ষার খরচটিও দেখতে দেন।

ছবি: উইকিমিডিয়ার সৌজন্যে 

এখানে গেরিয়নের সমকামী আকাঙ্ক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। যৌন পরিচয় সম্পর্কে সামাজিক অনুমোদন যেখানে অসম, সেখানে প্রেমের ব্যর্থতার সঙ্গে নিজের অস্তিত্বকে ভুল ভাবার বিপদও জুড়ে যায়। অথচ গেরিয়নকে পড়তে গেলে তার লজ্জা, একগুঁয়েমি, কৌতূহল, কামনা আলাদা আলাদা করে চিনতে হয়। কোনও পরিচয়ের প্রতিনিধি হওয়ার ভার একটি চরিত্রের সমস্ত ব্যক্তিত্ব দখল করে ফেলতে পারে। কারসনের গেরিয়ন সেই ভারের চেয়েও বিস্তৃত। তাকে ভালো মানুষ হওয়ার পরীক্ষায় পাস করিয়ে ভালোবাসার যোগ্য ঘোষণা করার দরকার পড়ে না। তার জটিলতাসহ তার জীবনটি বিবেচনার দাবি রাখে।

এমন চরিত্রকে ঘিরে পাঠকের নিজের সদিচ্ছারও পরীক্ষা হয়। প্রান্তে থাকা কাউকে দেখেই আমরা তার ওপর নিষ্পাপতার দায় চাপিয়ে দিতে পারি। সে যেন কোনও ভুল করবে না, অন্যকে আঘাত দেবে না, নিজের আকাঙ্ক্ষা নিয়েও দ্বিধায় পড়বে না। এই সদয় শর্তাবলিতে বেঁচে থাকা বেশ কঠিন। গেরিয়নের প্রতি মনোযোগের মূল্য তার ব্যক্তিগত অস্বচ্ছতা মেনে নেওয়ায়। একটি মানুষ নিজের পরিচয়ের পক্ষে সারাক্ষণ সাক্ষ্য দিয়ে যাবে কেন? তার হাস্যকর হওয়ার, ভুল ভালোবাসার এবং কিছু কথা নিজেও বুঝতে না পারার অবকাশ থাকা উচিত।

তার লাল শরীর ও ডানারও নিজস্ব জেদ আছে। সব অদ্ভুত জিনিসের নিচে একটি পরিচিত অর্থ বসিয়ে দেওয়ার অভ্যাস পাঠকের রয়েছে। ডানা মানে স্বাধীনতা, লাল মানে ক্ষত, এমন তালিকা বানালে ব্যাখ্যার কাজ দ্রুত শেষ হয়। গেরিয়নের শরীর সেই দ্রুততার কাছে পুরোপুরি ধরা দেয় না। সে দৃশ্যমান, অস্বস্তিকর, সুন্দর, নিজের মতো করে বাস্তব। তাকে চেনার জন্য অদ্ভুত অংশগুলো সরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সহানুভূতির শর্ত হিসেবে অপর মানুষটিকে আমাদের চেনা ছাঁচে ঢোকাতে গেলে তার কতখানি বদলে যায়, প্রশ্নটি তখন জরুরি হয়।

ছবি তোলার প্রসঙ্গও এই কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। গেরিয়ন পৃথিবীর সামনে নিজে প্রদর্শিত হয়ে থাকার পাশাপাশি পৃথিবীকে দেখছে। কোন মুহূর্ত ধরে রাখবে, কোথায় তাকাবে, সে-ও তার সিদ্ধান্ত। এই ছোট ক্ষমতাটির গুরুত্ব আছে। যাকে নিয়ে গল্প হয়, সে নিজেও ছবি বানাতে শুরু করলে গল্প বলার ব্যবস্থায় আরেকজনের হাত পড়ে। ক্যামেরা তাকে সমস্ত আঘাত থেকে মুক্তি দেয়, এমন সহজ আশ্বাস বইটি চায় না। একটি দৃষ্টি তৈরি হওয়ার শ্রমই যথেষ্ট বড় ঘটনা। সেই শ্রমের মধ্যে আহত কিশোরের ভবিষ্যৎ খোলা থাকে।

বইটির গঠনেও এই দৃষ্টির প্রস্তুতি রয়েছে। স্তেসিখোরোসকে নিয়ে আলোচনা, প্রাচীন কাহিনির খণ্ড এবং আধুনিক পদ্য-আখ্যান একই বইয়ে স্থান পায়। ফলে পাঠক গেরিয়নের জীবনে প্রবেশের সময় তার নামের পুরোনো নথিটিও সঙ্গে রাখেন। নতুন ঘটনার পাশে আগের রায়টির শব্দ শোনা যায়। একটি চরিত্র সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান কীভাবে তৈরি হয়েছে, বইটি সেই প্রক্রিয়াকেও পাঠের বিষয় করে। সাহিত্যিক রূপ নিয়ে কারসনের পরীক্ষা এখানে খুব বাস্তব কাজ করে: পরিচিত গল্প পড়ার স্বয়ংক্রিয় গতি ভেঙে দেয়, পাঠককে নিজের প্রত্যাশা লক্ষ করতে বাধ্য করে।

এই গেরিয়নের পাশে ‘এইচ অব এইচ প্লেবুক’-এর হেরাক্লেসকে রাখলে বীরত্বের প্রশ্ন আরও কঠিন হয়। ইউরিপিদিসের ‘হেরাক্লেস’ অবলম্বনে তৈরি ২০২১ সালের বইটিতে কারসনের আঁকাও রয়েছে। প্রাচীন নাটকে দেবীর প্রেরিত উন্মাদনার আঘাতে হেরাক্লেস নিজের স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যা করে। পরে বন্ধু থিসিউসের সহায়তায় তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়। যে মানুষ বিপদের হাত থেকে আপনজনকে উদ্ধার করতে পারে, তার হাতেই তাদের মৃত্যু ঘটে। সামর্থ্য ও নিরাপত্তার মধ্যে আমরা যে স্বচ্ছ সম্পর্ক কল্পনা করি, ঘটনাটি তাকে বিপর্যস্ত করে।

একে বর্তমানের কোনও মানসিক রোগের সরল উদাহরণ হিসেবে পড়লে প্রাচীন নাটকের দৈবশক্তি ও নৈতিক সমস্যাগুলো চাপা পড়বে। আবার দেবতার চক্রান্তের কথা বলেই মানুষের যন্ত্রণা থেকে সরে যাওয়া সম্ভব হয় না। কারসনের পুনর্লিখনের ভিতর দিয়ে প্রশ্ন করা যায়, যুদ্ধ ও জয়ের জন্য যে শক্তির প্রশংসা করা হয়, ঘরের সম্পর্কে সেই শক্তির স্থান কোথায়? যার সাফল্য মাপা হয়েছে পরাস্ত করার ক্ষমতায়, সে নির্ভরতা, কোমলতা ও নিজের সীমার সঙ্গে কীভাবে পরিচিত হবে? বীরের শিক্ষাক্রমে এই বিষয়গুলোর নম্বর কত?

এই প্রশ্নের সামাজিক পরিসর আমাদের খুব দূরের নয়। অসাধারণ সাফল্যের অধিকারী মানুষের দৈনন্দিন নিষ্ঠুরতার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কত সহজে ‘চাপ’, ‘প্রতিভা’, ‘বড় দায়িত্ব’ শব্দগুলো হাজির হয়। তাঁর আশপাশের মানুষের কাছে তখন ধৈর্যই প্রধান কর্তব্য। অবশ্যই প্রতিটি ঘটনায় আলাদা বিচার দরকার। সাহিত্য ঘটনাটির কাছে থেকে বিচারের প্রক্রিয়াটিকেও অনুসন্ধানের বিষয় করে তুলতে পারে। কারসনের হেরাক্লেস পড়ার সময় বীরের বিপর্যয় এবং নিহত মানুষের ক্ষতি একসঙ্গে মনে রাখতে হয়। সহানুভূতি একজনকে দেখলে অন্যজনকে ভুলে যাবে কেন?

সৌজন্য: Lannan || Photo by Don J. Usner

থিসিউসের বন্ধুত্ব এই দায় আরও বাড়ায়। ভয়ংকর ঘটনার পরেও কারও পাশে থাকার মধ্যে মানবিক সাহস রয়েছে। তার ভবিষ্যৎ থাকতে পারে বলে বিশ্বাস করারও মূল্য আছে। সেই বিশ্বাসের সঙ্গে মৃতদের স্মৃতি এবং ঘটে যাওয়া ক্ষতির সম্পর্ক কী হবে, পাঠকের বিচার সেখানে থামতে পারে না। ‘এইচ অব এইচ প্লেবুক’ বীরের পতনের পরে জীবন নিয়ে ভাবার জায়গা রাখে। ক্ষমা, উদ্ধার, দায়, এই শব্দগুলো উচ্চারণে যত সহজ, অভিজ্ঞতায় তত জটিল। বই বন্ধ করলেই হিসাবের সব ঘর মিলে যায় না।

‘অ্যান্টিগোনিক’-এ ক্ষমতার সামনে দাঁড়ায় অন্য এক শরীর। সফোক্লেসের অ্যান্টিগোনে নিজের মৃত ভাইকে সমাধিস্থ করতে চায়; শাসক ক্রেয়নের নিষেধ সেই কর্তব্যের পথে বাধা। এখানে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত এবং পারিবারিক দায় একটি মৃতদেহের সামনে মুখোমুখি। কার শোক গ্রহণযোগ্য, কাকে শেষ সম্মান দেওয়া যাবে, শাসনের অধিকার কোথায় শেষ হবে, প্রশ্নগুলো খুবই নির্দিষ্ট। ‘শৃঙ্খলা’ কথাটি শুনতে পরিচ্ছন্ন। সেই পরিচ্ছন্নতার জন্য কাকে নিজের প্রিয়জনের পাশে দাঁড়ানো ছাড়তে হবে, নাটকটি সেই খরচ সামনে রাখে।

কারসনের রূপান্তরে এই পুরোনো সংঘাতের সঙ্গে তার দীর্ঘ ব্যাখ্যার ইতিহাসও ঢুকে পড়ে। অ্যান্টিগোনে ও ইসমেনের কথায় হেগেল এবং বেকেটের নাম ঘোরাফেরা করে। সময়ের হিসাবমতো এ এক বিশ্রী অনিয়ম। সাহিত্য পড়ার অভিজ্ঞতায় ব্যাপারটি অবশ্য পরিচিত। কোনও প্রাচীন নাটক খুললেই আমরা তার পরে জন্মানো ভাষা, দর্শন, মঞ্চায়ন এবং নিজেদের দিনের প্রশ্ন নিয়ে বসি। কারসন এই জমে থাকা উপস্থিতিগুলোকে শ্রবণযোগ্য করেন। বইয়ের পাতা থেকে পুরোনো চরিত্ররা কথা বলছে, তাদের চারদিকে পরবর্তী পাঠকদের ফিসফাসও চলছে।

এই কৌতুকের একটা ধার আছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কোনও নারীর সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাখ্যা চলতে পারে; আলোচকদের মর্যাদা বাড়ে, চরিত্রটি তত্ত্বের আসবাব হয়ে ওঠে। অ্যান্টিগোনের কাছে আবার ফিরলে মনে পড়ে, তার সামনে একটি জরুরি কাজ রয়েছে। মৃত ভাইকে দাফন করতে হবে। ব্যাখ্যার বিশাল ভুবন এবং কাজটির নির্দিষ্টতা পাশাপাশি রাখলে পাণ্ডিত্যেরও জবাবদিহি তৈরি হয়। একজন কী করতে চাইছে, সেটি শোনার আগে তাকে আমাদের প্রিয় দর্শনের উদাহরণ বানিয়ে ফেলছি কি না, কারসনের ঠাট্টা সেই অস্বস্তিও জাগায়।

২০২১ সালে শিল্পী টাসিটা ডিনের সঙ্গে কথোপকথনে কারসন বলেছিলেন, ‘All time is now’। বাংলায় বলা যায়, সমস্ত সময়ই এখন। তাঁর রচনায় এই কথার একটা ব্যবহারিক চেহারা পাওয়া যায়। বর্তমানের পাঠক হিসেবে প্রাচীন চরিত্রের সামনে দাঁড়ানোর সময় আমাদের সমস্ত অর্জিত জ্ঞান ও অন্ধত্ব সঙ্গে থাকে। অ্যান্টিগোনেকে আমরা কী শুনতে দিই, গেরিয়নের কী দেখি, হেরাক্লেসের কী ক্ষমা করি, তার মধ্যে আমাদের নিজেদের সময় প্রকাশ পায়। পুরোনো কাহিনি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সমকাল নিজের মুখোমুখি দাঁড়ায়।

একই সাক্ষাৎকারে লেখার নৈপুণ্য সম্পর্কেও তাঁর একটি মন্তব্য রয়েছে। দীর্ঘ অভ্যাসে অর্জিত দক্ষতা লেখককে নিজের আড়াল তৈরি করতে সাহায্য করে। আঁকার সময় প্রতিটি দাগে নিজেকে বেশি প্রকাশিত মনে হয় তাঁর। ‘এইচ অব এইচ প্লেবুক’-এর আঁকা ও লেখাকে এই স্বীকারোক্তির আলোয় পড়া যায়। একটি চিন্তার শরীরে হাতের কাজের চিহ্ন থেকে যায়। সাজানো বক্তব্যের পাশাপাশি পাঠক কাজ করার ঝুঁকিটিও অনুভব করেন। পাণ্ডিত্যের নিরাপদ আসনে বসে এতখানি অস্বস্তি বজায় রাখা সহজ কাজ নয়।

এই পড়ারও একটি বিপদ রয়েছে। গেরিয়ন, হেরাক্লেস ও অ্যান্টিগোনের ভিন্ন অভিজ্ঞতাকে একটি নৈতিক স্লোগানের মধ্যে গুঁজে দিলে তাদের জটিলতা কমে যাবে। প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মাত্রেই কোনো চরিত্রের দৃষ্টিকোণ পৃথিবীর সমস্ত সত্যের মালিকানা পায় না। আবার বীরের দুর্দশা নিয়ে মুগ্ধ হতে গিয়ে তার আশপাশের মানুষগুলো আড়ালেও পড়তে পারে। পুনর্লিখনকেও তাই নিজের মনোযোগের বণ্টন নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে। কারসনকে পড়ার লাভ এই প্রশ্নগুলো সচল রাখায়। তাঁর চরিত্রদের অস্বস্তিকর সঙ্গ পাঠকের সুবিচারবোধকেও একটু সংশয়ে রাখে।

বাংলায় অনুবাদের সময় সেই সংশয় শব্দ নির্বাচনের মধ্যেও পৌঁছবে। গেরিয়নকে ‘দানব’ বলামাত্র পাঠকের মনে যে চেহারা ও বিচার তৈরি হয়, ইংরেজি ‘মনস্টার’-এর সঙ্গে তার সম্পর্ক কতখানি? ‘বীর’ শব্দের সম্মান হেরাক্লেসকে কতটা আগাম সুবিধা দেয়? আমাদের ভাষায় এসব নাম বহু পুরোনো গল্পের সঞ্চয় নিয়ে ঘোরে। কারসনের চরিত্ররা সেই সঞ্চয়ের সঙ্গেও দেখা করবে। ফলে অনুবাদককে বিশেষণগুলোর ওজন মাপতে হবে। একটি শরীর বর্ণনা করতে গিয়ে কখন তার বিরুদ্ধে রায় লিখে ফেলছি, ভাষার ভিতরে সেই সূক্ষ্ম ঘটনাটিও খেয়াল করার মতো।

কারসনের বই আমাদের আরামের একটি চেনা ব্যবস্থায় হাত দেয়। গল্প শুরুর আগেই বীর ও দানব ঠিক করা থাকলে বিচার সহজ হয়। গেরিয়নের দিনযাপন, হেরাক্লেসের বিপর্যয়, অ্যান্টিগোনের জেদ সেই সুবিধা কমিয়ে দেয়। পুরস্কারের আলোয় লেখকের মুখটি স্পষ্ট হয়েছে; এখন তাঁর চরিত্রগুলোর দিকে তাকানোর পালা। বিজয়গাথা শোনার পরে একটু সময় রেখে দেওয়া যাক। যার বাড়ির ঠিকানা জীবনীকার নেননি, তারও হয়তো কিছু বলার আছে।