পুকুর ও অন্যান্য কবিতা

অ+ অ-

 

এই জম্বুদ্বীপে

খাগের কলমে লিখি ইতিহাস
আমি কবি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন

এই দেশ এক জতুগৃহ এইটুকু বুঝেছি আমি
এক নিষাদ মা কাঁদছে পাঁচপুত্র নিয়ে
কোথায় নিষ্ক্রমণের পথ?
চারিদিকে ‘পালাও’ ‘পালাও’ ধ্বনি
কিন্তু কিভাবে পালাবে?

আমার বিছানা ঘাসপাতার গন্ধে ভরে আছে
বালিশে জলজ পোকার দাগ
আর প্রাচীন পুথির হরফে আমি
আজও আমার দেশকে খুঁজে চলেছি।


দেহ

কাঁচকলাইয়ের গন্ধে-ভরা
সর্বাঙ্গ ভিজা পলিমাটি লেপা
তবু এই দেহ দাউ দাউ পোড়ে

আমি নিদ্রাতুর হরিণচর্মের শয্যায়
আর বিগত জন্মের কথা ঘুরেফিরে আসে:
পাশে বহে মৃদ্যুমন্দ নদী দৃশদ্বতী

এই মৎস্যভূমির শাসকেরা
চাবুক হাতে দাবড়ে বেড়িয়েছে চিরটা কাল
ঘোড়া ও জাহাজ চড়ে এসে
তাঁতে আর তাঁতঘরে দিয়েছে আগুন
নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে মানুষের ধনুক দেহ 

গঙ্গামাটির এই দেহে নাভিপুষ্প
সুতায় বাঁধা শিকড়বাকড়ের মাদুলি
ফুটি কার্পাস এখনও পুড়ছে!

 

ঠাঁই

নেড়ানেড়িদের এই দেশ
সিঙেল হরিণের এই দেশ
ডোঙা ভাসিয়ে দাঁড় টেনে
এইখানে প্রথম বসত আমাদের

এইদেশে হেঁতালের বন
পুরুষেরা কাঠ কাটে আর শণ আনে
উল্কি-আঁকা হাতে নারী বাঁধে ঘর
আর পাতে তুলে দেয়
গাঁজানো গন্ধমাখা পোড়ামাছ

এইদেশে কিছু বিচুন ছিটিয়ে মাটিতে
আর কিছু চারা রুয়ে পলিতে
নারী ও পুরুষ ফলায় ফসল 
এই সিঙেল হরিণের দেশে

হেঁতালবনের এইদেশে
কস্তুরীর গন্ধ গায়ে মেখে
বাঘিনীর নাসারন্ধ্রে সুঠাম দেহ এলিয়ে
এইভাবে সপ্তডিঙা ভাসিয়েছে পুরুষ।

 

বিটপী

এইখানে দেখা হলো আবার
এইদেশে, ক্রৌঞ্চ-ক্রৌঞ্চীর বনে
গ্রীবার ভঙ্গিমা এখনও অর্জুন সদৃশ
জীবনরস বাতাসে উষ্ণতা ছড়ায়

মাটি ফুঁড়ে-ওঠা উঁচু অবয়ব
ত্বকে নিষিক্ত এখনও আদিম গন্ধ
যদিও চরাচরে আমি ভিন্ন পুরুষ নেই
এতকাল পরে পাশাপাশি হলাম

শ্যাওলা আর জীবাশ্মের পলেস্তরায়
ভরে আছে পৃথিবীর দেহ
আমার মধ্যেও ক্লেরোফিল ও কামনা জ্বলছে
আবার কিংশুকবনে ছেয়ে যাবে এই জম্বুদ্বীপ।

 

পুকুর

ঘাটে কয়েকটি শিলপাথর
আশপাশে বাসি ভাত দু-চারটি পড়ে আছে
পুঁটি আর টেংরামাছ নির্বিগ্নে খুঁটছে খাবারের কণা

পাথরে মায়ের পরিত্যক্ত শাড়ি
পানিতে হারিয়ে যাওয়া মেহের ফুফুর জেওরাত
ডুবে ডুবে তল্লাশির পরও হদিস মেলেনি

পুকুরে এভাবেই তলিয়ে গেছে সমদুয় স্মৃতি
দাদার তামার দাঁতখিলাল আর দাদির রুপার কবজ
অথবা আমাদের সকলের দুধদাঁত ও প্রথম রক্তপাত
পুকুর এখন একটি স্মৃতি ছাড়া কিছু নয়।

 

প্রত্ন

এই ভূখণ্ডে ভূর্জবৃক্ষ ছিল না
তাই অঢেল তালপাতায়
তেঁতুল বিচির মাড় লেপে
আর ঝিনুক ঘষে ঘষে
প্রাচীন পুথির যত পাতা এখানে তৈরি হয়েছে

এইখানে তালপত্রে যারা উৎকীর্ণ করেছিল
তোমার নাম আর মুখের অবয়ব
আর তার পাশে প্রেমের সূক্তকথা আর ভজনগীত
এত এত যুগ বাদে জীর্ণ সেই তালপাতায়
তোমার নামের চিহ্ন অবশিষ্ট নাই
কিংবা সেই অশ্রু ও রুধিরের বাণী

কেবল অস্পষ্ট এক নারীর মুখ
বিশুষ্ক মথের দেহের আকৃতিতে ক্ষয়ে ক্ষয়ে গেছে!