সংযোগের শিল্প এবং অ্যান কারসন পাঠের বিবিধ পথ

অ+ অ-

 

My religion makes no sense / and does not help me / therefore I pursue it.
—
My Religion, The Truth About God (Glass, Irony and God) by Anne Carson.

গেল ৮ অক্টোবর ২০২৬ সালে নোবেল পুরস্কারের খবর জানাতে রেইকিয়াভিকে তাঁর বাড়িতে ফোন বাজলো। তিনি রান্নাঘর পরিষ্কার করছিলেন। কয়েক মিনিটের সেই কথোপকথন চলাকালীন তাঁর বিমূঢ় ছবিটা অনলাইনে ভাসছে। তিনি ‘এটা একটু পাগলাটে ব্যাপার মনে হচ্ছে’ ধরনের স্বাভাবিক বিস্ময়ের বিপরীতে বাকি সময়টা শান্ত স্বাভাবিকই ছিলেন। যাই হোক, একটা ভিডিও ক্লিপে দেখলাম তাঁকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে কেউ তাঁর লেখা পড়তে চাইলে কোত্থেকে শুরু করবে, তিনি বললেন, ‘মাঝখানটা খুঁজে নিয়ে সেখান থেকেই শুরু করো।’ এটা যেন তাঁর বই পড়বার জন্যে সহায়ক পরামর্শ। আসলে তা না। তবে আমার ধারণা অ্যান কারসনকে বোঝার সবচেয়ে ভালো সূত্র এটাই। কারণ তিনি প্রায় কোনো কিছুরই শুরু থেকে শুরু করেন না। তিনি কোনো ধারণাকে তার চূড়ান্ত সংজ্ঞা পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে তারপর লিখতে বসেন না। তিনি এক স্থান থেকে আরেকটা স্থানে যান, একটা পুরোনো লেখার পাশে আরেকটা লেখা রেখে দেন, একটা শব্দের ভেতর আরেকটা শব্দ শুনতে পান, একটা স্মৃতির পাশে পুরাণ বসান, একটি উদ্ধৃতির ভেতর দিয়ে অন্য কোনো বইয়ে ঢুকে পড়েন, তারপর দেখেন মাঝখানে কী জন্ম নেয়। তাঁর সাহিত্য তাই একপ্রকার আন্তঃসংযোগের সাহিত্য। শুধু আন্তঃসংযোগ বললে একটু খামতি থাকে বোধহয়। আরেকটু গুরুত্বারোপ করে বলা যায় তাঁর সহিত্যযজ্ঞ কার্যত অসম্ভব, অপ্রত্যাশিত এবং কখনো আকস্মিক ও সুক্ষ্ম যোগসূত্রের সাহিত্য।

 

২

যা বুঝলাম তাঁর বইয়ের সংখ্যা নেহায়েত কম না। পঁচিশের অধিক। গদ্য, পদ্য, পদ্য-উপন্যাস, উপন্যাস, অনুবাদ, প্রবন্ধ মিলিয়ে বিরাট সাম্রাজ্য তাঁর। এত কম সময়ে তাঁর সব বই পড়ে কোনো সিদ্ধান্তে (অর্থাৎ তাঁকে বুঝতে) যেতে হলে প্রচুর সময় লাগবে। ফলে কয়েকটি বই, বিশেষ করে, ইরোস দ্য বিটারসুইট, অটোবায়োগ্রাফি অব রেড, দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড, ডিক্রিয়েশন, নক্স, দ এলবার্টাইন ওয়ার্কআউট, ফ্লোট, রং নরমা, এবং নানান উৎস থেকে পাওয়া সাক্ষাৎকার উল্টেপাল্টে দেখছি।

উইল আইটকেনের সঙ্গে দ্য প্যারিস রিভিউ-এর আর্ট অব পোয়েট্রি নম্বর ৮৮ তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত সাক্ষাৎকারগুলোর একটা। এটাকে শুরুতে উল্লেখ করা চলতি বছরের পাঁচ মিনিটের মন্তব্যের বহু আগের দীর্ঘ ব্যাখ্যা বলা যায়। সাক্ষাৎকারটি ২০০৪ সালের শরৎ সংখ্যায় প্রকাশিত হলেও কথোপকথনটি হয়েছিল তারও আগে, ২০০২ সালের বড়দিনের পর। আইটকেন তাঁকে তখন জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি কীভাবে বিভিন্ন জিনিসের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে পান। কারসন বলেছিলেন যে, কোন জিনিসের সঙ্গে কোন জিনিসের সংযোগ মাথায় আসবে সেটা তাঁর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নাই। কিন্তু সেই জিনিসগুলোকে কীভাবে যুক্ত করা হবে সেটাই তাঁর স্বাতন্ত্র্য। তাঁর ভাষায়, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য প্রকাশ পায় সংযোগ তৈরির ধরনে। তিনি ধারণাগুলোকে নির্দিষ্ট কোনো কাঠামোয় দেখতে পান বলেও জানিয়েছিলেন। দুটি আলাদা লেখা বা লেখকের মধ্যে যদি একই ধরনের গঠন টের পান তখন তিনি তাদের একসঙ্গে জুড়তে পারেন।

আমার উপলব্ধি জাগলো যে তিনি বোধহয় একজন ধারণাভিত্তিক লেখক। মানে তাঁর মধ্যে প্রথমে একটা স্বতঃস্ফূর্ত ধারণা জন্ম নেয়, তারপর তিনি সেটিকে নিয়ে খেলেন। পরে মনে হলো ব্যাপারটা পুরোপুরি এমন নয়। তাঁর কাজ অনেক সময় কোনো ধারণা দিয়ে না, বরং মুখোমুখি সংলাপের মুহূর্ত দিয়েও শুরু হয়। আর একের পর এক ইমেজ, বিভিন্ন উৎসের বাক্যাংশ, পুরোনো লেখা, চুম্বক শব্দ, স্মৃতির টুকরো আকস্মিক হানা দেয়। তারপর সেগুলো পরস্পরকে টানতে থাকে। মানে তাঁর লেখার পদ্ধতি নির্গমনমূলক নয়, সংশ্রবনির্ভর। তিনি কোনো পূর্বনির্ধারিত বক্তব্য প্রমাণ করতে উঠে-পড়ে লাগেন না, উল্টো মিথস্ক্রিয়ার ভেতর থেকে বক্তব্যটি আবিষ্কার করেন। আইটকেন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন কী তাঁকে লিখতে বসায়। কারসন জানালেন—‘কোনো নির্দিষ্ট ছবি বা দৃশ্য’। ‘দ্য গ্লাস এসে’ শুরু হয়েছে তাঁর মায়ের বাড়ির কাছে একটি বরফে জমে থাকা খাদ দেখবার অভিজ্ঞতা থেকে। বাসে শোনা কোনো বাক্যাংশ বা স্বপ্নে আসা কোনো বাক্যও তাঁকে লিখতে প্ররোচিত করেছে। এই সাক্ষাৎকারে তাঁর আত্মপরিচয়টি ছিল এমন: ‘আমি লিখি কোনো একটি বিষয় সম্পর্কে আমি আসলে কী ভাবি তা জানতে।’

এই একটি বাক্য হয়তো তাঁর সমগ্র সাহিত্য সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে উল্টে দেয়। সাধারণত আমরা জানি একজন লেখক কোনো বিষয় নিয়ে আগে ভাবেন, তারপর যা ভেবেছেন তা লেখেন। তাই কারসনের ক্ষেত্রে লেখা যতটা না চিন্তার পরিণতি, তারচে অধিক চিন্তার যন্ত্র। তিনি লিখে ফেলবার পর তার ভাবনাকে চিনতে-বুঝতে পারেন। তাঁর কাছে সাহিত্য প্রকাশের আগে অনুসন্ধান। জানা কোনো সত্যকে সুন্দর করে বলার চাতুরিকে সাহিত্য হিসেবে চালিয়ে দেয়ার প্রবণতা খারিজ করে তিনি নিজের অজ্ঞানতার সঙ্গে বোঝাপড়ার উপর জোর দেন। এই কারণেই তাঁর লেখায় গবেষণা ও কবিতার মধ্যেকার সীমা বারবার ভেঙ্গে যায়। গবেষণা তাঁর সৃজন প্রক্রিয়ার বাইরে কোনো একাডেমিক কাজ না; গবেষণাই তাঁর চিন্তার অপ্রচলিত পদ্ধতি। তাঁর গ্রিক ব্যাকরণ, অনুবাদ, উদ্ধৃতি, সাহিত্য-সমালোচনা, পুরাণবিষয়ক গবেষণাকে তাই তাঁর কবিতার বাইরে পড়ে থাকা একাডেমিক বাগাড়ম্বর বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এগুলোই তাঁর ভাবনার সরঞ্জাম।

বিষয়টা মাথায় এলো ইরোস দ্য বিটাসুইট নাড়াচাড়া করতে গিয়ে। ২০২২ সালে জর্জ সালিস তাঁর এই সমালোচনামূলক বইটির পুনর্মুদ্রণ নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। কারসন মজা করে ‘বইটি তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভ থেকে তৈরি’ বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন। এর মূল নামটি নাকি ছিল আরও রসিকতাপূর্ণ, এবং তিনি মনে করেন—‘কেটে-জোড়া লাগানোর চেয়ে মজার কিছু নাই।’ তিনি আরও যোগ করেছিলেন—‘বইটির মূল কাজটি ছিল একটা ভবনের চার কোণা ঘুরে দেখা এবং অদেখা পঞ্চম কোনো কোণ আবিষ্কার করা। কথাটা নিছক কারসনসুলভ রসিকতা নয়। তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের একটা সুক্ষ্ম মডেল কিন্তু চতুর পাঠক সহজেই ধরতে পারবেন।

ফলে হোর্হে লুই বোর্হেসের সঙ্গে তাঁর একটা গভীর আত্মীয়তা ধরা গেল। যদিও পার্থক্যও পরিষ্কার। বোর্হেসের গোলকধাঁধা অনেক সময় যেন আগে থেকেই নির্মিত। তাঁর গ্রন্থাগার, বিশ্বকোষ, উদ্ধৃতি, দার্শনিক প্রস্তাবনা মিলিয়ে একটি অধিবিদ্যাগত ধাঁধা তৈরি হয়। কারসনের গোলকধাঁধা লেখার সময় তৈরি হয়। তিনি আগে থেকে জানেন না কোন দুটি জিনিস কোথায় গিয়ে মিলবে। আইটকেনকে তিনি সিমোনিদেস এবং পল সেলানের কথা বলেছিলেন। কেন এই দুজনকে একসঙ্গে রেখেছিলেন? শুরুটা ছিল আকস্মিক। কিন্তু আকস্মিকতা ঘটে যাওয়ার পরে প্রশ্ন আসে সেই সংযোগ দিয়ে তিনি কী করবেন। সিমোনিদেস আর সেলেরিও হতে পারত। কিন্তু শিল্পীর কাজ আকস্মিকতাকে বাতিল করা নয়, বরং তার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো। বোঝা গেল মৌলিকতা তাঁর কাছে নতুন জিনিস আবিষ্কারের চেয়ে অনেক বেশি পুরোনো বা আপাত-অর্থহীন জিনিসের মধ্যে এমন সম্পর্ক দেখতে পাওয়া যা আগে দেখা হয়নি।

আকস্মিকতাটা প্রাসঙ্গিক, কারণ, তাঁর সাহিত্যকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে সবকিছু অসম্ভব রকম পরিকল্পিত। গ্রিক পুরাণ, ক্যাটুলাস, স্যাফো, প্রুস্ত, এমিলি ব্রন্টি, মেরিলিন মনরো, সিমোন ভেইল, আলোকচিত্র, আঁকা ছবি, অভিধানের সংজ্ঞা—সব যেন কোনো মহাপরিকল্পনার অংশ। অথচ কারসনের দাবী, প্রথম সংযোগটা প্রায়শই অভাবনীয়। শিল্পীর কাজ আকস্মিকতাকে না মুছে ফেলে তার মধ্যে আঙ্গিক খুঁজে বের করা। তাঁর সাহিত্যকে কি তবে ‘সম্পর্কনির্ভর ধারণাবাদ’ বলে ভেবে নেবো? এটা কোনো প্রতিষ্ঠিত পরিভাষা না অবশ্য। তাঁর কাজ বোঝার একটা সুবিধাজনক উপায় হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তাঁর ধারণা কোনো বিমূর্ত প্রস্তাব না। ধারণা মানে সম্পর্কের সম্ভাবনা। তিনি দুটি জিনিস সন্নিহিত রাখেন এবং তারপর স্বয়ংক্রিয় বিক্রিয়া ঘটতে দেন। এরপর দেখতে থাকেন সেখানকার গোপন টানাপোড়েন।

 

৩

২০২৪ সালে রবার্ট এনরাইটের একটা লিখিত সাক্ষাৎকার নজরে এলো। বর্ডার ক্রসিংস-এর ‘স্পার্কলি বিটস, ওয়ার্ডস উইথ থটস ইন দেম’ সাক্ষাৎকারে কারসনের উত্তরগুলো কখনো এক শব্দের, কখনো কয়েক লাইনের। এনরাইট তাঁকে ভুল বোঝাবুঝি নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন। কারসন বললেন, ভুল বোঝাবুঝি তাঁর কাছে নিছক ভুল বোঝা নয়; এতে এক ধরনের ‘উত্তেজনা ও শক্তি’ আছে, কারণ ভুল বোঝার সময় নানান অনাবিষ্কৃত দৃষ্টিকোণে পা পড়ে। তারপর তাঁর প্রশ্ন: ‘তারপর?’ কারসনের জ্ঞানতত্ত্বের সবচেয়ে সুন্দর সূত্রটা এই বেলায় দেখতে পাওয়া সম্ভব। মানুষের সাধারণ বুঝ মানে কোনো জিনিসের উপর সঠিক দৃষ্টিকোণ এবং ব্যাখ্যা পাওয়া। কারসন পুনরাবৃত্তি করেন—‘দৃষ্টিকোণ, দৃষ্টিকোণ, দৃষ্টিকোণ।’ অর্থাৎ জগতের কোনো চূড়ান্ত দৃষ্টিভঙ্গি নাই। প্রতিবার আমরা কোনো কিছুকে বুঝতে গিয়ে একটা নয়া দৃষ্টিকোণ পাই, তারপর অন্য আরেকটা দৃষ্টিকোণ এসে আগেরটাকে সরিয়ে দেয়। তাই দ্ব্যর্থতাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখেন না তিনি। দ্ব্যর্থতাই তাঁর পদ্ধতি। ভুল বোঝাকেও ব্যর্থতা মনে করেন না তিনি। বিপরীতে ভুল বোঝার মুহূর্তে নতুন দিশা মিলবার ব্যাপারটিকেই তিনি বিবেচনায় রাখেন।

তাঁকে কি উত্তরাধুনিক বলবো এখন? শব্দটা তাঁর জন্য যথেষ্ট নয় বোধহয়। উত্তরাধুনিকতার একটা বড় অংশ নিশ্চয়তা ভাঙ্গতে চেয়েছিল। কারসন নিশ্চয়তা ভাঙ্গার পর সেখানে কেবল শূন্যতা রেখে দেন না। তিনি অনিশ্চয়তার মধ্যেই নতুন প্রণালী তৈরি করেন। তাঁর কাছে ‘সবকিছু অনিশ্চিত’ বলে কোনো শেষ কথা না। তিনি প্রশ্ন দাঁড় করান যে, অনিশ্চয়তার মধ্যে কীভাবে নতুনভাবে দেখা সম্ভব। ফলে তাঁর সাহিত্য নৈরাশ্যবাদী নয়। তাঁর সংশয় উৎপাদনশীল।

একই সাক্ষাৎকারে এনরাইট প্লেইনওয়াটার-এর একটি কথার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন: ‘অসম্পূর্ণতাকে একটি ক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করো।’ কারসনের ব্যাখ্যায় এর অর্থ মনকে অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনার জন্য খোলা রাখা। এই ছোট্ট কথাটার মধ্যে তাঁর পুরো সাহিত্যিক দর্শনের ছায়া আছে। অসম্পূর্ণতাকে তিনি জরুরি মনে করেন এবং কোনো স্থির ঘাটতি মনে করেন না। অসম্পূর্ণ থাকা মানে এমন এক শূন্যাবস্থা যেখানটায় নতুন কিছুর আগমন সম্ভব। কিংবা অসম্পূর্ণতার কারসনীয় দৃষ্টিভঙ্গির আরেক নাম গ্রহণক্ষমতা।

স্যাফোর খণ্ডাংশের দিকে নজর দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। ‘ইফ নট, উইন্টার’-এ স্যাফোর কবিতাগুলোকে তিনি সম্পূর্ণ করেন না। হারিয়ে যাওয়া অংশগুলো নিজের কল্পনা দিয়ে পূরণ করবার চেষ্টা করেছেন। কারণ খণ্ডাংশকে সম্পূর্ণ করবার চেষ্টা অনেক সময় তার ইতিহাস মুছে ফেলে। কারসনের নিকট অসম্পূর্ণ পাঠের সঙ্গে কাজ করবার অর্থ তার অনুপস্থিতিকে সক্রিয় রাখা। এই দৃষ্টিতে স্যাফো তাঁর জন্য প্রাচীন কবির চাইতেও অসম্পূর্ণতার নান্দনিক আদর্শ।

হয়তো ইত্যকার মনোভাবের দরুণ প্রাচীন গ্রিক পাঠ তাঁর হাত ধরে প্রায় ধ্বংসাবশেষের মতো আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে। দ্য প্যারিস রিভিউ (২০০৪)-এর সাক্ষাৎকারে বিষয়টির উল্লেখ আছে। পাণ্ডুলিপি তৈরি হয়েছে, নকল হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, পুনরাবিষ্কৃত হয়েছে, পণ্ডিতেরা জোড়া লাগিয়েছেন, জাদুঘরে গেছে, আলোকচিত্র হয়েছে, বইয়ে এসেছে। এই স্তরগুলো পাঠটাকে যেমন নষ্ট করে তেমনি পরতে পরতে সময়ের ছাপও জমা করে। তাই তিনি নিজের বইয়ের পাতায় চায়ের দাগও পছন্দ করেন। খুঁতহীনতা তাঁকে কম টানে; ইতিহাসের চিহ্নই বরং আকর্ষণীয়।

কারসনের কাছে সাহিত্য তাই স্তরে স্তরে জমতে থাকা ধারণার শিল্প। কোনো পাঠ কখনো একবারে তৈরি হয়ে শেষ হয় না। তার মধ্যে আগের পাঠের ছাপ থাকে, অনুবাদের ছাপ থাকে, ভুলের ছাপ থাকে, পাঠকের ছাপ থাকে, সময়ের ছাপ থাকে, এমনকি বস্তুগত ক্ষয়ের ছাপও থাকে। তিনি সচেতনভাবে অপূর্ণতাকে ত্রুটির চাইতেও বেশি সময়ের দৃশ্যমান চিহ্ন মনে করেন।

তাঁর সাহিত্যে হুটহাট নানান উদ্ধৃতির অনুপ্রবেশকে আমার কেন যেন একটু বিরক্তই লাগছিল। গ্লাস, আইরনি এন্ড গড-এর পাতা উল্টাচ্ছিলাম। পরে মনে হলো এগুলো অলংকার নয়। অবচেতনের রসায়ন বরং। এনরাইট তাঁকে নর্মা জিন বেকার অব ট্রয়-এর উদ্ধৃতি নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি বাক্যের মধ্যে এমন ‘ঝিলমিলে টুকরো’ বুনতে পছন্দ করেন বলে জানালেন। কেন? তাঁর ধারণা, এ-সমস্ত কাণ্ড সবাই লক্ষ্য করবে না; আবার হয়তো কেউ কেউ করতেও পারে। একটা উদ্ধৃতি পাঠককে অন্য একটি পাঠের দিকে নিয়ে যায়, সেই পাঠ আবার আরও পুরোনো একটি পাঠের দিকে ধাবিত করে। অর্থাৎ একটি বাক্য একা থাকে না; তার পিছনে ভাষার স্মৃতি কাজ করে। এবং ফলে তাঁর এই অপ্রতিরোধ্য আঙ্গিক এইমূহূর্তে পাঠককে তাঁর নিজ অস্তিত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করে তুলবে।

এটা অন্যভাবে কারসনের আন্তঃপঠন বোঝারও চাবিকাঠি। তিনি সূত্র বা উদ্ধৃতি দিয়ে নিজের পাণ্ডিত্য প্রদর্শন করেন না। তিনি উদ্ধৃতিকে একটা গোপন পথ বানান। আপনি নর্মা জিন বেকার অব ট্রয় পড়ছেন, মেরিলিন মনরোর কথা শুনছেন, হঠাৎ ম্যাথ্যু আর্নল্ড এসে গেলেন, আর্নল্ডের ভেতর অন্য কোনো পুরোনো পাঠের প্রতিধ্বনি, তারপর গ্রিক পুরাণ। একটা পাঠ আরেকটি পাঠের দরজা হয়ে যায়। তাঁর বই যেন একাধিক দরজাওয়ালা ঘর। আপনি একটা দরজা দিয়ে ঢুকে অন্য কোনো যুগে অনায়াসে বেরিয়ে যেতে পারেন।

বোধহয় এ-জন্যেই তিনি কবিতাকে এমন এক অব্যাখ্যাত স্থান মনে করেন, যার মধ্যে পাঠক অবিরাম ভ্রমণ করতে পারে। তাঁর চিন্তায় কবিতা স্থির আলোকচিত্র না, আবার বাস্তবতার নিছক অনুলিপিও না; কবিতা তাঁর কাছে ‘পাতায় ধরা পড়া মনের ক্রিয়া।’ পাঠক সেই ক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি করে এবং এতে প্রবেশাধিকার পেলে বদলে যায়। কবিতাকে তাই তিনি কোনো বক্তব্য, বার্তা বা বস্তু মনে করেন না। কবিতা সেই মনের চলন যার মধ্য দিয়ে লেখক একবার হেঁটেছেন; পাঠক পরে সেই চলনের নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করেন।

তাঁর আগ্রহ ছোট ছোট জিনিসের প্রতি। মানে তিনি কোনো বড় দার্শনিক ধারণার পেছনে ছুটে প্রথমে তার সার্বজনীন অর্থ বের করতে চান না। পক্ষান্তরে তিনি একটা নির্দিষ্ট দৃশ্য, কাহিনি, খুঁত বা অরণ্যের প্রান্তের বিচ্যুতির দিকে তাকান। বাসযাত্রায় শোনা বাক্য, কোনো গ্রিক শব্দ, একটা ভুল বোঝাবুঝি, পটভূমি বা বিদ্রুপও বাদ যায় না। এইসব আপাত-তুচ্ছ জিনিসের দিকে যথেষ্ট সময় ধরে তাকালে এসবের সঙ্গে অন্য কোনো জিনিসের অবয়ব মিলে যেতে পারে। তখনই একধরনের সম্পর্ক তৈরি হয়। সেই সম্পর্ক থেকেই তাঁর চিন্তার বিস্তার। তবে কারসনের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা শুধু এই নয় যে ছোট জিনিস একদিন বড় হয়ে যায়। ছোট জিনিসের দিকে মনোযোগ দেয়ার কারণ হয়তো এই যে, আমরা জানি না সেটি আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে। একটা ক্ষুদ্র খুঁটিনাটি হয়তো নিজেই অর্থপূর্ণ, আবার হয়তো অন্য কোনো খুঁটিনাটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে অভিনব দিশা দেবে। তাঁর এই মনোগঠনের উদ্দেশ্য জিনিসটিকে যথেষ্ট গভীরভাবে দেখা যেন এর অপ্রত্যাশিত সম্ভাবনা নিজেই প্রকাশ পেতে পারে। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম এমত মনোযোগ মানে কি সৌন্দর্যবোধ কেবল? এটা একপ্রকার অনুশীলন। কোনো মানুষকে আগে থেকেই কোনো শ্রেণিতে ফেলে না দেখা। কোনো পুরোনো পাঠকে আগে থেকেই প্রাসঙ্গিক ধরে না নেয়া। কোনো অনুভূতিকে আগে থেকেই ‘বোঝা হয়ে গেছে’ বলে না ধরে নেয়া। কোনো খণ্ডাংশকে নিজের সুবিধামতো সম্পূর্ণ না করা। এই অর্থে কারসনের সততা অনেকটা জ্ঞানগত সততা: আমি জানি না, তাই দেখি। আমি বুঝিনি, তাই লিখি। আমি নিশ্চিত নই, তাই আরেকটা দৃষ্টিকোণ খুঁজি।

 

৪

নক্স তাঁর সাহিত্যতত্ত্বের এই শক্তিশালী অংশটি উন্মোচন করে। ভাইয়ের মৃত্যুর পর তিনি সরাসরি আত্মজীবনী লেখেননি। ক্যাটুলাসের একটি শোক-কবিতার পাশে নিজের ভাইয়ের স্মৃতির খণ্ডাংশ বসিয়েছেন। লাতিন শব্দের অভিধানগত অর্থের পাশে ব্যক্তিগত স্মৃতি রেখেছেন। পারিবারিক আলোকচিত্রকে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যেখানে পরিবেশও কথা বলে। তিনি জানালেন, নক্স তাঁকে ও তাঁর ভাইকে বুঝতে সাহায্য করবে না। এবং এখানেই বইটির গভীরতা। শোকের কাজ সবসময় বোঝা নয়। কখনো তার কাজ মৃত মানুষের অনুপস্থিতির চারপাশে একটা প্রতিবিম্ব তৈরি করা। বা একটা কুৎসিত বিশৃঙ্খলাকে এমন সুন্দর বস্তুতে রূপ দেয়া যার মধ্যে অন্য একজন মানুষও প্রবেশ করতে পারে। এই কারণে তাঁর শিল্পে সবসময় বাস্তবতা খোঁজা অবান্তর। শিল্প বাস্তবতাকে নতুন বিন্যাসে সাজায়। ফলে নক্স শোকগ্রন্থ হয়ে উঠবার বিপরীতে হয়ে উঠেছে শোকের বিশৃঙ্খলাকে আবিষ্কারের বই। একই প্রবণতা অটোবায়োগ্রাফি অব রেড-এও খেয়াল করলাম। পুরোনো পুরাণকে আধুনিক উপন্যাসে বসানো তার উদ্দেশ্য মনে হলো না। এনরাইট যখন তাঁর এই মিশ্রধর্মী রূপ নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, কারসন বলেছিলেন, ‘বাক্সটাকে একটু নাড়িয়ে দেখা।’ এই রহস্য তিনি সাহিত্যিক ধরন ভাঙ্গার জন্য ব্যবহার করছেন কি? না। তিনি শ্রোডিঙ্গারের বিড়ালটা মৃত নাকি জীবিত তা নিয়ে চিন্তিত নন, তিনি অনুভব করেন, হয়তো বাক্সের ভেতরের জিনিসটা অন্যভাবে নড়তে চাইছে।

সেই কারণেই কিনা কে জানে, তাঁর দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড নৃত্যের কাঠামো নেয়, দ্য আলবার্টিন ওয়ার্কআউট প্রুস্তের একটা চরিত্রকে বিশ্লেষণাত্মক অনুশীলনে পরিণত করে, অটোবায়োগ্রাফি অব রেড পুরাণকে সমকালীন বড় হয়ে ওঠার গল্পের সঙ্গে মেলায়, নর্মা জিন বেকার অব ট্রয় ইউরিপিডিসের হেলেনকে মেরিলিন মনরোর সঙ্গে একই নাট্যপরিসরে দাঁড় করায়। বাইরে থেকে এরা একে অপরের সঙ্গে খুব কম মেলে। কিন্তু ভেতরের আবেদন যেন একই: আকাঙ্ক্ষা, অনুপস্থিতি, স্মৃতি, বৈসাদৃশ্য, অসম্পূর্ণ জ্ঞান। সেহেতু ‘ফর্ম’ আর ‘বিষয়বস্তু’-কে আলাদা করা যায় না। তাঁর ফর্মই তাঁর চিন্তার অনুলিপি।

নর্মা জিন বেকার অব ট্রয়-এর কথা পুনরায় ধরা যাক। সারাহ মুরকে কারসন বলেছিলেন তিনি আশির দশক থেকেই ইউরিপিডিসের হেলেনকে অনুবাদ ও পুনঃ অনুবাদ করে আসছেন; নাটকটি তাঁর কাছে দীর্ঘদিনের একটি ‘সমস্যা’ হয়ে ছিল। ইউরিপিডিসের হেলেন তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ কারণ পুরাণের সমতল প্রতিকৃতির জায়গায় তিনি একটা জটিল মানুষ তৈরি করেন। নাটকে ‘ছোট, বিস্ময়কর পরিবর্তন’ কীভাবে একটি চরিত্রকে সম্পূর্ণ অন্যভাবে দৃশ্যমান করে তোলে সেটিই কারসনের আগ্রহ। আর মেরিলিন মনরোর সঙ্গে হেলেনের সম্পর্ক? ‘তাদের একই ক্ষমতা ছিল—আকাঙ্ক্ষার গলায় আটকে যাওয়ার।’ কারসন দুই যুগের মধ্যে কোনো বিমূর্ত তত্ত্ব বসাননি। আকাঙ্ক্ষার এক আকৃতিকে দুই জায়গায় পাশাপাশি রেখে মিলিয়ে দিয়েছেন। তাঁর ধ্রুপদি চর্চা বোঝার এটাও একটা পথ। তিনি গ্রিকদের কাছে ফিরে যান, কারণ গ্রিকরা আমাদের মতো ছিল বলে নয়। বরং উল্টো কারণে। আইটকেনের নিকট তিনি জবানবন্দী দিয়েছেন যে, প্রাচীন গ্রিকদের আকর্ষণ তাদের ‘অবিশ্বাস্য ভিন্নতা’-তে। আমরা সাধারণত ধ্রুপদি সাহিত্য পড়ি এই প্রশ্ন নিয়ে যে আজকের জীবনের সঙ্গে এর প্রাসঙ্গিকতা কী। কারসন যেন বলেন আগে ভিন্নতাকে তার জায়গায় থাকতে দাও। অতীতকে আমাদের মতো করে ফেলো না। তার অচেনাভাবকে টিকিয়ে রাখো। তারপর হয়তো সেই অচেনা জিনিসের মধ্যেই এমন কোনো আকৃতি দেখতে পাবে যা বর্তমানের সঙ্গে কথা বলে।

ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শ্রদ্ধার হলেও নিছক আনুগত্যের নয়। এটি সংলাপের। নোবেল কমিটিও তাঁর এই ফর্মের উপর জোর দিয়েছেন, বলেছেন—তাঁর কাজ ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে ‘খেলাচ্ছলে সংলাপ’ তৈরি করে। ধ্রুপদি ঐতিহ্য তাঁর কাছে জাদুঘরের মৃতদের মচ্ছব না। সেটি কখনো কথোপকথনের সঙ্গী, কখনো সহযাত্রী, কখনো প্রতিপক্ষ। সারাহ মুরকে তিনি এমনও বলেছিলেন যে, ইউরিপিডিস তাঁর স্বাদের লেখক নন। এই মতভেদই তাঁর কার্যকর প্রান্ত। তিনি প্রাচীন লেখককে ভালোবাসেন বলেই তাঁর সঙ্গে একমত হবেন, এমন নয়। বরং ঘর্ষণ থেকেই নতুন রূপ বেরিয়ে আসে। তাঁর গবেষণার সবচেয়ে সুন্দর দিকটিও এখানেই। তিনি প্রাচীন পাঠকে উপাসনা করেন না। তিনি তাদের সঙ্গে কাজ করেন। কখনো অনুবাদ করেন, কখনো কাটাছেঁড়া করেন, কখনো ভুল বোঝেন, কখনো আধুনিক চরিত্রের সঙ্গে বসান, কখনো খণ্ডাংশ আত্মস্থ করে নতুন চরিত্র তৈরি করেন, কখনো তার বিরুদ্ধে যান, কখনো নিজের শোক তার ভিতরে ঢুকিয়ে দেন। তিনি টেক্সটকে পরিষ্কার, নিখুঁত, সিলমোহর-লাগানো বস্তু হিসেবে চান না। তিনি চান এর মধ্যে সময় ঢুকুক, ভুল ঢুকুক, অন্য মানুষের হাত ঢুকুক, অন্য ভাষা ঢুকুক, মৃত মানুষ ঢুকুক, পাঠকের ভুল বোঝা ঢুকুক। সাহিত্যভাবটা তখন শেষ হয়ে যাওয়ার পরও অসমাপ্ত থাকে।

চব্বিশের পূর্বোল্লিখিত সাক্ষাৎকারের এই জায়গাটায় আটকে গেলাম: ‘আমাদের বিষয়গুলোই আমাদের বেছে নেয়।’ মানে আকাঙ্ক্ষা, গ্রিক পুরাণ, শোক, অনুবাদ—এসব তিনি যেন নিজের ইচ্ছায় সবসময় বেছে নেননি; ধীরে ধীরে বুঝেছেন যে বিষয়গুলোই তাঁকে বেছে নেয়। এই জায়গায় লেখকের কর্তৃত্বও কি একটু বদলে যায় না? লেখক সবকিছুর নিয়ন্তা নন। তিনি কখনো সাক্ষাৎ, হয়তো অনাকাঙ্খা, কিংবা একটি প্রশ্নের কাছে নিজেকে উন্মুক্ত রাখেন। এই গ্রহণক্ষমতার সঙ্গে তাঁর ডিক্রিয়েশন বা আত্ম-বিলোপের ধারণার সম্পর্ক আছে। কারসনের কাছে নিজেকে একটু সরিয়ে দেয়া মানে নিজেকে ধ্বংস করা নয়; বরং নিজের অভ্যস্ত দৃষ্টিভঙ্গির একচেটিয়া আধিপত্য কমানো। নিজের কথা সরাসরি না বলে অন্যপাঠের পাশে নিজেকে রাখবার যে প্রবণতা তাঁর, সেটিও সেই বৃহত্তর গতির অংশ। এনরাইট আত্মজীবনী নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন এবং নিজের কথা বলতে কারসন গভীরভাবে অপছন্দ করেন বলেই জানিয়েছিলেন। কিন্তু নিজের সম্পর্কে তিনি আর কী জানেন? গবেষণা কখনো মুখোশ, কখনো নিজেকে সরিয়ে রাখবার উপায়। কথাটা তাঁর ব্যক্তিগত সাহিত্যকে নতুনভাবে দেখতে সাহায্য করে। দ্য গ্লাস এসে বা নক্স সরাসরি আত্মজীবনী নয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার চারপাশে তিনি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো বসান। ফলে ‘আমি’ সরাসরি মঞ্চে আসে না। এটা কি আত্মরক্ষা? নাকি নন্দনতত্ত্ব?

তিনি নিজের জীবনের দিকে সরাসরি তাকালে যা দেখেন সেটা সবসময় বোঝা বা সহ্য করা সহজ নয়। তাই তিনি তার পাশে অন্য একটি পাঠ রাখেন। নিজের শোকের পাশে ক্যাটুলাস। নিজের বিচ্ছেদের পাশে এমিলি ব্রন্টি। নিজের আকাঙ্ক্ষার পাশে স্যাফো। নিজের সমকালীন নারীর পাশে হেলেন। এই ত্রিমুখী বিন্যাসের মাধ্যমে তিনি নিজের অভিজ্ঞতাকে দূরে সরান, আবার নতুনভাবে কাছে আনেন। এ কারণেই তাঁর লেখায় আত্মজীবনী এবং গবেষণার সম্পর্ক এত অদ্ভুত। তিনি নিজেকে অন্যের মধ্যে আড়াল করেন, কিন্তু সেই আড়ালেই নিজেকে বেশি স্পষ্ট করেন।

 

৫

এই ব্যক্তিক ফর্ম তাঁর আঁকার প্রতি আকর্ষণও ব্যাখ্যা করে। আইটকেনকে তিনি বলেছিলেন, আঁকা তাঁর নিকট লেখার চেয়ে বেশি নগ্ন। লেখায় মানুষ নিজের জন্য কিছু আড়াল রাখতে পারে; আঁকায় সেই আড়াল কম। কিন্তু আঁকা একটা বস্তু তৈরি করে। কারসনের কবিতার ক্ষেত্রেও সেই বস্তুটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি চান কবিতা শুধু কোনো কথা না বলুক; কবিতা যেন এমন কিছু হয়ে উঠুক যার ভেতর দিয়ে আগম-নিগম করা যায়। তাই নক্স, ফ্লোট, আঁকা ছবি, বাক্সবন্দি বই, পরিবেশনা, নাটক থেকে তাঁর কবিতা সম্পূর্ণ আলাদা করা কঠিন। তাঁর সাহিত্য পৃষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না, আবার পৃষ্ঠা ত্যাগও করে না। তাঁর ‘মাঝখান থেকে শুরু করো’ আবার প্রাসঙ্গিক এখানে। কারণ শুরু থেকে শুরু করলে আমরা শ্রেণিবিন্যাস বানাই। এটা আগে, এটা পরে; এটা মূল, এটা গৌণ; এটা লেখক, এটা উৎস; এটা অতীত, এটা বর্তমান। কিন্তু কারসন থাকেন বাইনারির বাইরে, মাঝামাঝি কোনো এক অনির্দিষ্ট স্থানে। তাই তাঁর সাহিত্যে স্যাফো ও কারসন স্বয়ং, বা ক্যাটুলাস ও কারসনের ভাই, কিংবা হেলেন-মেরিলিন-প্রুস্ত পাশাপাশি অবস্থান করে। এই মাঝামাঝি থাকাটা আসলে এমন এক অবস্থা যেখানে জিনিসগুলো এখনও একে অপরের সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি, কিন্তু একে অপরকে ছেড়েও দেয়নি।

এক্ষণে কারসনের সাহিত্যকে কি তবে মেটাসাহিত্য বা আন্তঃপাঠের সাহিত্য বলবো? আন্তঃপাঠ অনেক লেখকের মধ্যেই আছে। কারসনের বিশেষত্ব তিনি আন্তঃপাঠকে চিন্তার পদ্ধতি বানিয়েছেন। পাঠ একা চিন্তা করে না। একটা পাঠ আরেকটা পাঠের সঙ্গে ঘষা খেয়ে চিন্তা করে। একইভাবে পাঠকও একা চিন্তা করে না। কারসনের বই পড়ার সময় পাঠকের নিজের মাথার ভেতরের অন্য পাঠগুলোও জেগে ওঠে। যেকোনো উদ্ধৃতি পাঠকের নিজের কোনো পুরোনো স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। গ্রিক পুরাণের কোনো ঘটনা পাঠককে ব্যক্তিগত কোনো অভিজ্ঞতার ব্যাপারে মনে করিয়ে দিতে পারে। তখন কারসনের বই আর শুধু কারসনের থাকে না। তার অভ্যন্তরে পাঠকের নিজস্ব স্মৃতিভাণ্ডারও ঢুকে পড়ে। তাঁর সাহিত্য তাই পাঠকের কাছ থেকেও সেই একই কাজ দাবি করে: সংযোগ তৈরি করা। লেখক সংযোগ দেন, কিন্তু সব সংযোগ দেন না। কিছু সংযোগ পাঠককে নিজে তৈরি করতে হয়। এই অর্থে তাঁর সাহিত্য স্রেফ বিনোদনের জন্য নয়। তিনি পাঠককে সিদ্ধান্ত দেন না; পাঠককে একটা অদ্ভুত সম্পর্কের মধ্যে দাঁড় করান। তারপর পাঠকের নিজের চিন্তা সেই সম্পর্কের তৃতীয় বিন্দু হয়ে ওঠে। তাঁর কোনো বই হয়তো আপনার সামনে নিছক বস্তু হিসেবে পড়ে থাকে, কিন্তু সাহিত্য ঘটে আপনার মাথার ভেতর, যখন আপনি তার বিভিন্ন অংশের মধ্যে চলাফেরা করেন। প্রথমবার তাঁর বই পড়লে আপনি হয়তো একটি সম্পর্ক দেখলেন। দ্বিতীয়বার অন্যটি। তৃতীয়বার নিজের জীবনের সঙ্গে আরেকটি সম্পর্ক তৈরি হলো। কারসনের বই শেষ হয়ে যায় না। কারণ সম্পর্কের সংখ্যা নির্দিষ্ট নয়। তাঁর লেখা তাই কখনো কখনো কঠিন, বিরক্তিকর, একঘেয়ে লাগতে পারে। তবে তাঁকে পাঠ করবার সূত্রটা জানা থাকলে পাঠকেরই লাভ। তিনি পাঠককে সিদ্ধান্ত দেন না; পাঠককেই আগবাড়িয়ে খেলাটা খেলতে হয়। কিন্তু এই কাঠিন্য বুদ্ধিবৃত্তিক ঔদ্ধত্য না। বিপরীতে তিনি পাঠককে বুদ্ধিমান ধরে নেন। তিনি ধরে নেন পাঠক একটি পংক্তি বা অনুচ্ছেদ দেখে অন্য বইয়ে যেতে পারে, একটি খণ্ডাংশ দেখে অনুপস্থিতির উপস্থিতি অনুভব করতে পারে, একটি পুরাণ দেখে নিজের সময়কে নতুনভাবে দেখতে পারে।

সম্ভবত তিনি পাঠকের মনকে তাঁর নিজস্ব ফর্ম বা আঙ্গিকের অংশ করে নেবার ক্ষমতা রাখেন। এবং কারসনের সাহিত্যকে শেষ পর্যন্ত ফর্ম-নির্ভর সাহিত্য বললে অত্যুক্তি হবে না। এই ফর্ম কেবল ফর্মের জন্য ফর্ম নয়। তাঁর ফর্ম অসম্ভব (বা পরাবাস্তব) যোগাযোগের পদ্ধতি। তিনি একটি খণ্ডাংশকে পূর্ণ করতে পারেন না, তাই খণ্ডাংশকেই ফর্মে ফেলে দেন। তিনি মৃত মানুষকে ফিরিয়ে আনতে পারেন না, তাই স্মৃতিকে বস্তুতে পরিণত করেন। তিনি অন্য মানুষকে সম্পূর্ণ বুঝতে পারেন না, তাই আকাঙ্ক্ষাকে চিন্তায় পরিণত করেন। প্রাচীন পাঠকে বর্তমানের সঙ্গে পুরোপুরি মেলাতে না পেরে দুটিকে পাশাপাশি রাখেন। নিজের কথাও সরাসরি বলতে পারেন না, ফলে গবেষণার আড়ালে নিজেকে খুঁজে নেন। তিনি কোনো বিষয়কে আগে থেকে পুরোপুরি জানেন না, লিখতে লিখতে জানতে পারেন তিনি কী ভাবছেন। আবার তিনি কোনো বিষয়ের শুরু কোত্থেকে তাও জানেন না, তাই তাঁকে মাঝখান থেকে শুরু করতে হয়। মনোযোগ, সংযোগ এবং অসম্পূর্ণতা—এই তিনটি জিনিস তাঁর কাছে সমার্থক। তিনি কোনো জিনিসের দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দেন, তার মধ্যে একটা কিছু দেখতে পান। সেই ‘একটা কিছু’ তাঁকে অন্য কোনো জিনিসের দিকে নিয়ে যায়। নতুন সম্পর্ক আবার আগের বোঝাপড়াকে খারিজ করে দেয়। আর সেই অসম্পূর্ণতা তাঁকে আবার নতুন করে দেখতে বাধ্য করে। এই যে মনোযোগ থেকে সংযোগ, সংযোগ থেকে অনিশ্চয়তা, অনিশ্চয়তা থেকে নতুন মনোযোগ—তাঁর লেখার ভেতর এই চক্র ক্রমাগত চলছে।

তাঁর ‘অসহনীয়’ হয়ে  উঠবার আকাঙ্ক্ষাটিও এই পুরো দর্শনের সঙ্গে যুক্ত। তিনি পাঠককে ধ্বংস করতে চান না, কিন্তু তাকে আগের আরামের জায়গায়ও রেখে যেতে চান না। একটি ভালো সাহিত্যকর্ম হয়তো সেই কাজই করে: পাঠকের চিন্তার কাঠামোকে ভেঙ্গে চুরমার না করে শুধু একটি দেয়াল সামান্য সরিয়ে দেয়। সেই ছোট ফাঁক দিয়ে পাঠক অন্য একটি দৃশ্য দেখতে পান। তারপর আবার আগের ঘরে ফিরলেও ঘরটি আর আগের মতো থাকে না। কারসনের সাহিত্য এই সামান্য স্থানচ্যুতির সাহিত্য। তিনি কোনো ঘোষণাপত্র লেখেন না। কোনো দার্শনিক মতবাদও দেন না। তিনি কেবল দুটি জিনিস সমান্তরাল বলে যান। তারপর বলেন—‘দেখো কী হয়।’ এই ‘দেখো কী হয়’ মনোভাবটাই তাঁর কাজ করবার ধরন। এবং সম্ভবত নোবেল কমিটির ‘ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে খেলাচ্ছলে সংলাপ’ কথাটার গভীর অর্থও এখানেই। ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে খেলা করা যায়, তর্ক করা যায়, ভুল বোঝা যায়, আবার নতুনভাবে অনুবাদও করা যায় এবং সম্পর্কটি শ্রদ্ধা ও বিদ্রোহের মাঝামাঝি কোথাও জায়গা করে নেয়।

আবার তাঁর বয়াণভঙ্গি আমলে নিলে মনে হয় তিনি কেন্দ্রে থাকতে চান না, প্রান্তে শান্তি পান। দুই যুগে অনায়াস যাতায়াত করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। দুই সাহিত্যরীতির সংশ্লেষ ঘটাতে ভালোবাসেন। দুই ভাষার মধ্যবর্তী নো-ম্যান্স ল্যান্ডে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকেন। দু’জন মানুষের বাহুর ফাঁকা অংশে ঢুকে পড়েন। কিংবা এমন অগম্য অঞ্চলে জাল ফেলেন যেখানে একটি পাঠ আরেকটি পাঠের মধ্যে কারণে-অকারণে ছুটোছুটি করে। জানা এবং অজানার মধ্যেকার সংশয়ে দাঁড়িয়ে বর্ণনা করেন একে অপরকে ছুঁয়ে থাকা নানান বস্তু, শরীর, এমনকি অশরীরও। এ-বেলায় বোধকরি কারসনকে ‘ধারণাভিত্তিক লেখক’ বলার চেয়ে ‘সম্পর্কনির্ভর ধারণাবাদী’ বলা বেশি কার্যকর। তাঁর ধারণা বিমূর্ত চিন্তা ছাপিয়ে পারস্পরিক সংশ্লেষণের সম্ভাবনা। তাঁর সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক কাজ এমন দুটি অনুষঙ্গ (আমরা যেসব সচরাচর ভাবি না) সংলগ্ন রাখা এবং টান তৈরি করা যেন পাঠক নিজে চিন্তা করতে বাধ্য হয়। তিনি পাঠককে বলেন না যে এই দুইটি বিষয়ের অর্থ হলো অমুক। তাঁর সাহিত্যের প্রান্ত উন্মুক্ত। ফলে তাঁর নোবেল স্বীকৃতি যতটা না কবিতার জন্য, তারচে অধিক এমন স্বতন্ত্র সাহিত্যচর্চার জন্য, যেখানে সাহিত্যিক ফর্ম নিজেই চিন্তার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। তিনি দেখিয়েছেন কবিতা শুধু কবিতা হতে হবে না; প্রবন্ধ, অনুবাদ, নাটক, আলোকচিত্র, অভিধানে থাকা শব্দার্থ কিংবা পুরাণের কোনো চরিত্র, এমনকি কোনো অব্যাখ্যাত সহিংসতাও সাহিত্য-চিন্তার অংশ হতে পারে।

৬

‘গ্লাস, আইরনি অ্যান্ড গড’ গ্রন্থের ‘দ্য গ্লাস এসে’ চ্যাপ্টারের কবিতা ‘থ্রি’-এর তরজমাটি পাঠ করলে কারসনকে কিছুটা আঁচ করা যাবে আশা করি। বঙ্গানুবাদের দায় সম্পূর্ণ লেখকের।

 

তিন

রান্নাঘরের টেবিলে তিনজন নিঃশব্দ নারী।
মায়ের রান্নাঘরটা অন্ধকার আর ছোট, কিন্তু জানালার বাইরে
পড়ে রয়েছে সেই প্রান্তর, বরফে অসাড়।
যতদূর চোখ যায় বিস্তৃত হয়ে আছে
মাইলের পর মাইল সমতল পথজুড়ে এক নিরেট আলোহীন সাদা আকাশ।
মা আর আমি সন্তর্পণে লেটুস চিবোচ্ছি।
রান্নাঘরের দেয়ালঘড়িটা থেকে একটা খসখসে নিচু গুঞ্জন ভেসে আসে, যা
প্রতি মিনিটে একবার বারোটার উপর দিয়ে লাফিয়ে ওঠে।
চিনির পাত্রের সঙ্গে ঠেস দিয়ে আমি এমিলির ২১৬ নম্বর পৃষ্ঠা খুলে রেখেছি,
কিন্তু আড়চোখে তাকিয়ে আছি মায়ের দিকে।
ভেতর থেকে হাজারটা প্রশ্ন আমার চোখের তারায় ধাক্কা খায়।
মা গভীর অভিনিবেশে তার লেটুস পর্যবেক্ষণ করছে।
আমি ২১৭ পৃষ্ঠায় চোখ ফেরাই।
“রান্নাঘর দিয়ে ছুটে যাবার সময় আমি হেয়ারটনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিই,
যে দরজার চৌকাঠে একটা চেয়ারের পিঠ থেকে
কয়েকটি কুকুরছানাকে ফাঁসিতে ঝোলাচ্ছিল...”
মনে হয় যেন আমাদের সবাইকে কাচের আবহাওয়ার ভেতর নামিয়ে দেয়া হয়েছে।
মাঝে মাঝে সেই কাচ ভেদ করে উড়ে আসে দু-একটা আলগা মন্তব্য।
পেছনের জমির কর। তরমুজটা ভালো না,
তরমুজের এখনো সময় হয়নি।
নগরের নরসুন্দর ঈশ্বরের সন্ধান পেয়েছে, প্রতি মঙ্গলবার দোকান বন্ধ রাখে।
চায়ের তোয়ালে রাখার ড্রয়ারে আবার ইঁদুর ঢুকেছে।
ছোট ছোট নাদি। চিবিয়ে কেটে দিয়েছে
কাগজের ন্যাপকিনের কোণগুলো; ওরা যদি জানত
আজকাল কাগজের ন্যাপকিনের কী চড়া দাম।
আজ রাতে বৃষ্টি হবে।
কালও বৃষ্টি।
ফিলিপাইনের ওই আগ্নেয়গিরিটা আবার ফুঁসছে। কী যেন নাম তার-
অ্যান্ডারসন মারা গেছে, না শার্লি নয়,
সেই অপেরা গায়িকা। নিগ্রো নারী।
ক্যান্সার।
গার্নিশটা খাচ্ছ না যে, পিমেন্টো পছন্দ নয়?
জানালার বাইরে দেখি সমতল ভূমির ওপর শুকনো পাতাগুলো কাঁপছে,
পাইন গাছের ঝুল-কালিতে দাগযুক্ত বরফের অবশেষ।
প্রান্তরের ঠিক মাঝখানে
যেখানে জমিটা ঢালু হয়ে খাদে নেমে গেছে,
সেখানে বরফের আঁটসাঁট বাঁধন আলগা হতে শুরু করেছে।
কালো উন্মুক্ত জল
ক্রোধের মতো জমাট বেঁধে ওপরে উঠে আসে। মা হঠাৎ কথা বলে ওঠে।
ওই সাইকোথেরাপিতে তোমার বিশেষ কোনো লাভ হচ্ছে না, তাই না?
তুমি তাকে ভুলতে পারছ না।
সবকিছু এক কথায় সারসংক্ষেপ করবার অদ্ভুত কায়দা আছে মায়ের।
ল-কে সে কখনোই তেমন পছন্দ করেনি,
তবে আমার একটা পুরুষসঙ্গী থাকবে আর আমি জীবনের পথে এগোব—এই ভাবনাটা তার ভালো লেগেছিল।
‘ও তো কেবল নিতে জানে আর তুমি দিতে জানো, আশা করি কোনোমতে খাপ খাবে,’
তার সঙ্গে দেখা হবার পর মা কেবল এইটুকুই বলেছিল।
দেয়া আর নেয়া তখন আমার কাছে ছিল কেবল কতগুলো শব্দমাত্র।
তখন তো আমি আগে কখনো প্রেমে পড়িনি।
সেটা ছিল পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে যাওয়া চাকার মতো।
কিন্তু আজ খুব ভোরে, মা যখন ঘুমাচ্ছিল,
আমি নিচে বসে ‘উদারিং হাইটস’-এর সেই অংশটা পড়ছিলাম
যেখানে ঝড়ের মধ্যে জানালার জাফরির শিক ধরে হিথক্লিফ কেঁদে কেঁদে ডাকছিল—
‘ভেতরে এসো! ভেতরে এসো!’—তার হৃদয়ের প্রিয়ার প্রেতাত্মাকে ডেকে,
আমিও কার্পেটের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে অঝোরে কেঁদেছিলাম।
কুকুরছানাদের কীভাবে ফাঁসিতে ঝোলাতে হয়, সে বিদ্যা ভালোই জানা আছে
ওই এমিলির।
‘জানোই তো, এটা কোনো অ্যাসপিরিন খাওয়ার মতো চটজলদি ব্যাপার নয়,’ আমি দুর্বল কণ্ঠে উত্তর দিই।
‘ডা. হ বলেন শোক এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া।’
মা ভ্রু কোঁচকায়। কী লাভ হয় তাতে—
অতীতের ছাইপাঁশ ঘেঁটে?
ওহ—আমি দুহাত প্রসারিত করি—
আমি জয়ী হই! আমি তার চোখে চোখ রাখি।
সে শুকনো হাসে। ‘হ্যাঁ, তা তো বটেই।’