ধারাবাহিক গদ্য: ৫ || আহমদ ছফার স্মৃতি: অথ মহিউদ্দিন সমাচার

অ+ অ-

 

 

ধারাবাহিক গদ্য: ৫ || আহমদ ছফার স্মৃতি: অথ মহিউদ্দিন সমাচার

[বাংলার মনীষী আহমদ ছফাকে নিয়ে নানাজন নানা স্মৃতিকথা লিখেছেন। নানাজন নানাভাবে গবেষণা করছেন। স্মরণ করছেন। ভবিষ্যতেও করবেন। তবে তাঁকে নিয়ে সত্য-মিথ্যায় মোড়ানো স্মৃতিকথাগুলো নানা বিতর্ক, নানা কথা আর নানা মিথের জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি ঢাকার প্রথমা থেকে প্রকাশিত হয়েছে লেখক মহিউদ্দিন আহমদের বই ‘আহমদ ছফা: আমার কথা কইবে পাখি’। বইটি প্রকাশের পর আহমদ ছফাকে নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। খোদ ছফার পরিবার থেকে বইটি নিয়ে নানা ‘মিথ্যা-চাতুরী’র অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রথমার বইটির প্রতিবাদ স্বরূপ একটি বই লিখেছেন আহমদ ছফার ভ্রাতুষ্পুত্র, প্রথিতযশা লেখক ও ঔপন্যাসিক নূরুল আনোয়ার। তিনি দীর্ঘদিন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মনীষী ছফার সাহচার্যে ছিলেন। ক’দিন আগে নূরুল আনোয়ারের লেখা পাণ্ডুলিপিটি প্রতিধ্বনির হাতে এসেছে। লেখার গুরুত্ব বিবেচনা করে নূরুল আনোয়ার প্রণীত প্রকাশিতব্য বইয়ের চুম্বক অংশ ধারাবাহিকভাবে প্রতিধ্বনি প্রকাশ করছে। বি.স.]               

 

পঞ্চম কাণ্ড  ||  ‘ফাউস্ট’ এবং ‘গাভী বিত্তান্ত’

 

প্রসঙ্গ ‘ফাউস্ট’

এ রচনাটির ফাউস্ট নামকরণ করা হলেও লেখক বরাবরের মতো অন্য বিষয়কেও আলোচনায় এনেছেন। এ রচনায় মহিউদ্দিন আহমদ জাসদের সিরাজুল আলম খানের সঙ্গে আহমদ ছফার ‘লাভ অ্যান্ড হেইট’ একটি সম্পর্ক দেখানোর চেষ্টা করেছেন। বিমান দুর্ঘটনায় আহমদ ছফা নামের এক লোক মারা যায়। সে লোক আহমদ ছফা মনে করে সিরাজুল আলম খান বিচলিত হয়েছিলেন এবং তিনি তাঁর লোকজনকে লাগিয়ে দিয়েছিলেন তাঁকে খুঁজে বের করার জন্য। তারপর মহিউদ্দিন আহমদ কার্ল মার্কসের কবিতা অনুবাদ করেছিলেন, সেই কাজে আহমদ ছফার সাহায্য তিনি নিয়েছেন। তারপরে এলেন ফাউস্ট অনুবাদের বিষয়ে। এ নিয়ে মহিউদ্দিন আহমদ বলেছেন:

ছফা যখন বাঙালি মুসলমানের মন লিখছেন, সে সময় তিনি অনুবাদ করে চলেছেন জার্মান কবি গ্যেটের বিখ্যাত কাব্যনাটক ফাউস্ট। গ্যেটে বানানটা তিনি লেখেন গ্যোতে। জার্মান উচ্চারণে এটাই হয়তো সঠিক। এ সময় আমি ঘন ঘন যেতাম ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলে তাঁর কাছে, নিজের গরজে।১

মহিউদ্দিন আহমদ ফাউস্ট অনুবাদ করতে দেখেছেন, এটা ঠিক আছে। কিন্তু আহমদ ছফা তখন গ্যোতে লিখতেন এটা ঠিক নয়। তিনি ফাউস্ট অনুবাদ করার সময় গ্যেটেই লিখেছিলেন। অনুবাদ শেষ করার পর তিনি যখন গ্যোতে ইনস্টিটিউটে যাওয়া-আসা শুরু করেন তখন হের পিটার জেবিৎসের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয়। ওই সময় সেখানে আহমদ ছফা জার্মান ভাষা শিখতেন। তাঁর ভাষাগুরু ছিলেন মফিজুদ্দিন শেখ নামে এক ভদ্রলোক। আহমদ ছফা তখন বুঝতে পারেন আমরা যে গ্যেটে উচ্চারণ করি সেটি সঠিক নয়, জার্মানিতে তাঁকে গ্যোতে বলা হয়। আহমদ ছফা তখন তাঁর রচনায় গ্যেটের পরিবর্তে গ্যোতে লিখতে আরম্ভ করেন।

ফাউস্ট বইটি আয়েশা পারুল এবং মহিউদ্দিন আহমদ দম্পতিকে উপহার হিসেবে দিয়েছেন উনিশ শ ছিয়াশি সালে। সে অটোগ্রাফের একটা ছবি তিনি এ রচনার সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন যাতে পাঠক তাঁর দেওয়া তথ্যকে সঠিক হিসেবে ধরে নেন।

ফাউস্ট নিয়ে তিনি কয়েক লাইনে কিছু বলার চেষ্টা করেছেন। তারপর দেড় পৃষ্ঠার মতো আহমদ ছফার অনুবাদের অংশ তুলে দিয়ে তিনি তাঁর আলোচনার ইতি টানেন। রচনার একেবারে শেষের তিন লাইনে মহিউদ্দিন আহমদ ফাউস্ট অনুবাদের বিষয়ে কয়েকটি তথ্য দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন:

ফাউস্ট প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালের জুলাই মাসে। এটি প্রথম খণ্ড। প্রকাশক মুক্তধারা। ছফা ফাউস্টের ভাষান্তর করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টান্যাশনাল হোস্টেলের ১০৭ নম্বর কামরায় বসে। এখন সেখানে যাঁরা থাকেন, তাঁরা কি এটা জানেন?২

মহিউদ্দিন আহমদ ফাউস্ট সম্পর্কে যে তথ্য দিলেন তা আংশিক সত্য, সম্পূর্ণ নয়। আমার ধারণা, আহমদ ছফা তাঁকে ফাউস্ট উপহার হিসেবে দিলেও তিনি পুরো বইটি পড়েননি, পড়লে খণ্ডিত তথ্য উপস্থাপন করতেন না। আহমদ ছফা ফাউস্টের পুরো অনুবাদ ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলের কামরায় বসে করেননি। ফাউস্টের বড় একটি অংশ তিনি অনুবাদ করেছিলেন মিরপুরের শিয়ালবাড়ির বাসায় বসে। তখন আমি তাঁর সঙ্গে থাকতাম। আমি ফাউস্ট সম্পর্কে অনেক তথ্য নিজের থেকে দিতে পারি, কিন্তু আমার কথা পাঠক বিশ্বাস করবেন কেন? আহমদ ছফার চেয়ে বড় সাক্ষী তো আর কেউ হতে পারে না। ফাউস্ট বইয়ের ভূমিকায় তিনি কি বলেছেন সেটি জানা যাক:

আমি ফাউস্ট গ্রন্থটির অনুবাদ শুরু করেছিলাম ১৯৭৫ সালে। ১৯৬৪ সালের দিকে এই গ্রন্থটির সঙ্গে আমার আকস্মিকভাবে সাক্ষাৎ ঘটে যায়। সেই তখন থেকে এই গ্রন্থ এবং গ্রন্থের রচয়িতার প্রতি একটা তীব্র অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ ক্রমাগত অনুভব করতে থাকি। ফাউস্ট এবং গ্যোতে-সম্পর্কিত যা কিছু চোখের সামনে এসেছে আগ্রহ সহকারে পাঠ করে গেছি। এমনিভাবে এ গ্রন্থটির অনুবাদ করার ইচ্ছা ধীরে ধীরে আমার মধ্যে জন্মা লাভ করতে থাকে। যখনই সময় পেয়েছি, অনুবাদ করা যায় কি না চেষ্টা করে দেখেছি। কিন্তু প্রতি বারই আমার প্রয়াস ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। দু’তিনটি বাংলা অনুবাদ আমার কাছে ছিল, কিন্তু সেগুলোও আমাকে কোনো পথ দেখাতে পারছিল না। তীব্র একটা মানসিক চাপ অনুভব করছিলাম এই কারণে যে, প্রচলিত যে-অনুবাদগুলো আমার হাতের কাছে ছিল, সেগুলো একদিকে যেমন আমাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি, তেমনি অন্য দিকে আমার মন যেটি চায়, সে রকম একটা অনুবাদ আমার কলম সৃষ্টি করতে পারছিল না। এই মানসিক দোদুল্যমানতার মধ্যে অনেক দিন অতিবাহিত হয়ে যায়। অবশেষে ১৯৭০ সালের দিকে এক বসায় উৎসর্গ অংশের অর্ধেক অনুবাদ করে ফেলি। অনুবাদের ধরন দেখে আমার কেমন বিশ্বাস জমে যায়, যে ভাষারীতিটি আমাকে অনুসরণ করতে হবে তা আমার কলমে এসে গেছে। তা সত্ত্বেও পরবর্তী পাঁচ বছরে আর একটি ছত্রও অনুবাদ করতে পারিনি। ১৯৭৫-’৭৬ সালের দিকে হঠাৎ করে কল্পনার একটা নতুন শক্তি আমার মনের মধ্যে জেগে ওঠে। একচোটে প্রায় অর্ধেকেরও বেশি অনুবাদ করে ফেলি এবং মাসিক সমকাল পত্রিকায় প্রকাশ করতে থাকি। সে-সময়ের সমকাল সম্পাদক মরহুম হাসান হাফিজুর রহমান এই অনুবাদের প্রতি যে যত্ন এবং স্নেহ প্রদর্শন করেছেন তার কোনো তুলনাই হয় না। মূলত হাসান হাফিজুর রহমানের উৎসাহেই একনাগাড়ে অর্ধেকের বেশি অনুবাদ করতে পেরেছিলাম।

অপ্রাসঙ্গিক হলেও একটা কথা এখানে বলা উচিত মনে করছি। ১৯৭৬-’৭৭ সালের দিকে যখন অনুবাদটি সমকালে প্রকাশ পাচ্ছিল তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা থিসিস তৈরির কাজে ব্যস্ত ছিলাম। কিন্তু গ্যোতের চিন্তার গভীরতা এবং কল্পনার অনুপম সৌন্দর্য আমাকে এমনভাবে তন্ময় করে রাখে যে ওই গবেষণার কাজটিকেই আমার নিতান্ত তুচ্ছ মনে হতে থাকে। এই ধারণা জন্ম নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে গবেষণার কাজটি আমি ছেড়ে দিই। মজার ব্যাপার হলো, অনুবাদকর্মেও আর অধিক দূর অগ্রসর হতে পারিনি। একূল-ওকূল দুকূল হারানোর মতো ব্যাপার। বর্তমান বছর, অর্থাৎ ১৯৮৬ সালের শুরুর দিকে আমি জার্মান কালচারাল ইনস্টিটিউটে জার্মান ভাষা শিক্ষার একটা কোর্সে ভর্তি হই। এ জার্মান ভাষা শিখতে গিয়ে কালচারাল ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর হের পিটার জেবিৎসের সঙ্গে পরিচয় এবং বন্ধুত্ব হয়। তাঁর সংস্পর্শে আসার পর অসমাপ্ত অনুবাদকর্মটির একটি গতি করার আকাক্সক্ষা মনে ঘনিয়ে ওঠে এবং খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার যে মাত্র অল্প কদিনের মধ্যেই কাজটি শেষ করে ফেলি। মুক্তধারা যে এ বইটি প্রকাশ করছে তাও একটি আশ্চর্য যোগাযোগের ব্যাপার। সব কিছু মিলিয়ে মনে একটা বিশ্বাস থিতু হয়েছে যে, ঊর্ধ্বলোকের দয়া ছাড়া কেউ কোনো বড় কাজ করতে পারে না।৩

১৯৮৬ সালে যে ঠিকানায় বসে আহমদ ছফা ফাউস্ট অনুবাদ সম্পন্ন করেছিলেন—বি ৪, এফ ৬, রূপনগর হাউজিং এস্টেট, সেকশন ২, মিরপুর, ঢাকা ১৭। এ বইয়ের ভূমিকাতেও এ ঠিকানার উল্লেখ রয়েছে।

 

প্রসঙ্গ ‘গাভী বিত্তান্ত’

মহিউদ্দিন সাহেব আহমদ ছফার গাভী বিত্তান্ত উপন্যাসটি লেখার পেছনের ইতিহাস বয়ান করেছেন। এই ইতিহাস তৈরি করতে গিয়ে তিনি যে মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন সেটি কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের পক্ষে সম্ভব কি না বলা মুশকিল। মহিউদ্দিন আহমদের বয়ান:

কিছুদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়ে এলেন অধ্যাপক আবদুল মান্নান। ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেল থেকে ‘উৎখাত’ হওয়ায় ছফার রাগ ছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর। অধ্যাপক মান্নানের ওপরও তিনি যারপরনাই বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ। কারণটা জানি না। কারও ওপর খেপলে ছফা রাগ ঝাড়েন তাঁর কলম দিয়ে। তো এ নিয়ে তিনি লিখলেন একটা উপন্যাস। এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আখ্যান। সেখানে ‘তরণী’ নামে একটি চরিত্র আছে। এটি একটি গাভী। এটি পালন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মিয়া মুহাম্মদ জুনায়েদ। সেখানে ছাত্ররা দলাদলি করে। উপাচার্য ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। ছাত্ররা তাঁর নাম দেয় গো-আচার্য। বুঝতে অসুবিধা হয় না, ছফা এটি লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে। উপাচার্যকে নিয়ে আছে রসালো আলোচনা। তাঁর মাত্রাতিরিক্ত গাভী-প্রীতি নিয়ে স্ত্রীও তাঁকে সন্দেহ করেন। ছফা তাঁর উপন্যাসের নাম রাখেন গরু চোদা ভিসি। আজিজ সুপার মার্কেটে লুৎফর রহমান চৌধুরীর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সন্দেশ। ছফা তাঁকে পাণ্ডুলিপিটা দেন। লুৎফর ছাপতে খুবই আগ্রহী। তবে নাম নিয়ে তাঁর ঘোরতর আপত্তি। বললেন, এটা একটা নাম হলো! অশ্লীল! এ নাম দেওয়া যাবে না, নাম বদলান। ছফা জোরাজুরি করতে থাকেন—এ নামই থাকবে। লুৎফর তাঁর হাতে-পায়ে ধরলেন। কান্নাকাটি করলেন। লুৎফরের অনুনয়-বিনয়ে ছফার মন গলে। তিনি রাজি হন নাম বদলাতে। উপন্যাসের নতুন নাম হয় গাভী বিত্তান্ত।৪

উদ্ধৃতাংশটিতে মহিউদ্দিন যে সব কথা বললেন তার মধ্যে সত্যতা কতটুকু। তাঁর ভাষ্যমতে, আহমদ ছফাকে হোস্টেল থেকে উৎখাত করা হয়েছিল। মহিউদ্দিনকে সম্মান করে আমরা সেটি মেনে নিলাম। হোস্টেল থেকে উৎখাত করার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের ওপর তাঁর রাগ-ক্ষোভ ছিল সেটাও মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু তিনি অধ্যাপক আবদুল মান্নানের ওপর বিরক্ত হবেন কেন?

মহিউদ্দিন যে বললেন ‘কিছুদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়ে এলেন অধ্যাপক আবদুল মান্নান।’ এই ‘কিছুদিন’টা কতদিন সেটি তিনি বলেননি। আহমদ ছফা হোস্টেল ছাড়েন ১৯৮৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে। আবদুল মান্নান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিযুক্ত হন ১৯৮৬ সালের ১২ জানুয়ারি। মাঝখানে দু’বছরের অধিক সময় পেরিয়ে গেছে। এ দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর আহমদ ছফা ভিসি সাহেবের সঙ্গে কেন বিরোধে জড়াতে যাবেন সেটি কি একটা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় না? মহিউদ্দিন যদি এত কিছু জানেন তাহলে ‘কারণ’ কেন জানবেন না?

আমি আহমদ ছফার কথাসাধনা নামক একটি বই লিখেছিলাম। বইটিতে আহমদ ছফার সবগুলো উপন্যাস নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি। এ বইয়ে আহমদ ছফার উপন্যাসগুলো লেখার পেছনের ইতিহাস আমি যতটুকু জানি তা উপস্থাপন করেছিলাম। গাভী বিত্তান্ত উপন্যাস নিয়ে লেখার শুরুতে যে কথাগুলো আমি লিখেছিলাম:

গাভী বিত্তান্ত উপন্যাসটি লেখার পেছনে একটি প্রেক্ষাপট কিংবা ইতিহাস রয়েছে। চুরানব্বই সালের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক সন্ত্রাসের এলাকায় পরিণত হয়েছিল। দুটি রাজনৈতিক দলের ছাত্রদের মধ্যে যুদ্ধ চলত প্রায় প্রতিদিন। পত্রিকার পাতা খুললে কোনো না কোনো অঘটনের সংবাদ চোখে পড়ত অনায়াসে। দুটি দলের ক্যাম্পাস দখলের যে প্রতিযোগিতা চলছে সেটি আহমদ ছফাকে ভীষণভাবে ভাবিয়ে তোলে। আজিজ সুপার মার্কেটের অফিস কিংবা তাঁর বাংলামটরের বাড়িতে যে প্রতিদিন নানাজনের সঙ্গে আড্ডা চলত সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বীভৎস ঘটনাগুলো তাঁর আলোচনায় উঠে আসত। সকালবেলা পত্রিকা পড়ার পর তাঁর উত্তেজনা ভয়াবহ রকম বেড়ে যেত। ওই সময় তিনি একরকম অস্থির সময় পার করছিলেন।

ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র কোনো কিছুর অধঃপতন দেখলে চোখ বুজে বসে থাকবেন সেটি আহমদ ছফার ধাঁতে ছিল না। তাঁর যে স্বভাবজাত প্রতিবাদী চিন্তা সেই সময় আরও বেশি করে মাথায় ঘা দিয়ে যাচ্ছিল। ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের নারকীয় ঘটনাগুলোর প্রতিবাদে অনেকগুলো লেখা তিনি লিখেছিলেন। কিছু লেখা আমি উদ্ধার করতে পারলেও অনেক লেখা আমার অগোচরে থেকে গেছে। যাহোক, লেখালেখি করেও যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃশংস ঘটনাগুলোর ইতি ঘটাতে পারছিলেন না তখন আহমদ ছফা প্র্যাক্টিকেলি কিছু কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম ছিল সন্ত্রাস বিরোধী আন্দোলন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্র যারা এসব কর্মকাণ্ড প্রছন্দ করতেন না তাদের তিনি একত্রিত করার চেষ্টা করেছিলেন। ড. চিন্ময় হাওলাদার, অধ্যাপক সমীর সমদ্দার, রতন বাঙালি, প্রণব হাওলাদার (তখন তাঁরা ছাত্র ছিলেন) যাঁদের সঙ্গে তাঁর আগে থেকে বোঝাপড়া ছিল তাঁদের তিনি আন্দোলন পরিচালনার কাজে নিয়োজিত করেছিলেন। পরে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেক ছাত্র। তাঁরা সকলে আহমদ ছফার সঙ্গে প্রতিদিন দেখা করতে আসতেন। প্রায় সময় তাঁরা তাঁদের আন্দোলন নিয়ে আলোচনা করতেন এবং আহমদ ছফা তাঁদের নির্দেশনা দিতেন কিভাবে কি করবেন। তাঁরা প্রধানত যে কাজটি করতেন সেটি হলো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় লিফলেট বিতরণ করা। লিফলেটের কথাগুলো বের হতো আহমদ ছফার মাথা থেকে। তিনি তাঁর মাথার সাজানো কথাগুলো অনায়াসে বলে যেতেন আর অনুলিখনের কাজটি করতেন চিন্ময় হাওলাদার। ওই সময় আহমদ ছফা পত্রিকায় ঘোষণা দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জিত তাঁর যত সার্টিফিকেট রয়েছে তিনি তার সবগুলো প্রত্যাখ্যান করবেন এবং তা বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দিয়ে দেবেন। এ নিয়ে তখনকার সময়ে অনেকের মধ্যে প্রতিক্রিয়াও জন্ম নিয়েছিল। অনেকে তাঁর সঙ্গে একাত্ম ঘোষণা করেছিলেন সে রকম কথাও তখন পাঁচকান হয়েছিল।

তিনি মনে করতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে, বর্তমান সময়ে যে সব ঘটনা ঘটছে সে সব ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ইতিহাসকে ম্লান করে দিয়েছে। এক লেখায় তিনি এমন একটি বাক্য উচ্চারণ করেছিলেন, পড়লে বোঝা যায় তখন তিনি কি পরিমাণ মর্মযন্ত্রণায় ভুগছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সব ঘটনা ঘটছে তার চেয়ে যদি আমার মাকে আমার সামনে উলঙ্গ করে ধর্ষণ করে আমি অত কষ্ট পাব না।

ওই সময় তিনি একটি দীর্ঘ লেখা লিখেছিলেন, ‘শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস: একটি রাজনৈতিক পাপ’। এই লেখাটি তাঁর নিকট ও দূরের প্রসঙ্গ বইটিতে স্থান পায়। আমার মনে পড়ে তিনি আরও একটি লেখা লিখেছিলেন, শিরোনামটি ঠিক মনে করতে পারছি না। বোধকরি শিরোনামটি ছিল ‘ছাত্ররা রাজনীতির শিশুশ্রমিক’। ওই সময়ে তিনি আরও অনেক লেখা লিখেছিলেন। এই সব লেখা লিখে তিনি ক্ষান্ত হননি। এ সব লেখালেখির পাশাপাশি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন এবং র‌্যালিও করেছিলেন। ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। দুই দলের ছাত্রদের বন্দুকযুদ্ধের ক্রসফায়ারে একটি গর্ভবতী গাভী মারা যায়। গাভীটি উন্মুক্ত ক্যাম্পাসে ঘাস খাচ্ছিল। এই ঘটনাটি প্রায় সব পত্রিকায় সংবাদ হয়েছিল। সংবাদটি পড়ে আহমদ ছফা আরও উত্তেজিত এবং মর্মাহত হন। তার পরে পরে আহমদ ছফা একটি দীর্ঘ কবিতা লিখে বসেন। কবিতাটির শিরোনাম ছিল গাভীর জন্য শোক প্রস্তাব। এই কবিতাটি তিনি তাঁর লেনিন ঘুমোবে এবার কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করেন। কবিতাটির প্রথম কটি লাইন—

বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে নিহত গাভীটির
জন্যে আমি শোক প্রস্তাব পাঠ করছি।
এই অবলা প্রাণিটিকে শহীদ শিরোপা
দেয়া যায় কি না ও-নিয়ে অনেক চিন্তাভাবনা
করেছি। কিন্তু কুণ্ঠাটি থেকে গেল।
অস্বীকার করতে পারিনে শহীদ ধারণাটির
মধ্যে মর্মমূল স্পর্শ করা একটা
ব্যঞ্জনা রয়েছে। কিন্তু হালফিল এই
শব্দটি অপব্যবহার হয়ে হয়ে আদি
শুদ্ধতা অনেকখানি হারিয়ে বসেছে। গরুর
বেটির নিতান্তই দুর্ভাগ্য শহীদ অভিধা
তার নামের সঙ্গে যুক্ত করা গেল না।

তার পরের অংশটি তিনি লিখেছেন একেবারে ঢালাওভাবে যেভাবে প্রবন্ধ লেখা হয়। আমি কবিতা বিশারদ নই। এই কবিতাটি কোন পদবাচ্যে পড়ে বলতে পারব না। দীর্ঘ কবিতাটি পুরো তুলে না ধরে একেবারে শেষের অংশটি যদি উদ্ধৃত করি তাহলে তার কিছুটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে। কবি লিখেছেন:

মৃত্যু হলো শোকের চাইতেও প্রয়োজনীয়। মৃত্যু জীবিতদের জন্যে স্পেস সৃষ্টি করে। মৃত্যু সৃষ্ট জীবের কলুষ কালিমা হরণ করে। মৃত্যু জীবনকে শুদ্ধ এবং পবিত্র করে। মৃত্যুর নীরব গাম্ভীর্যের মধ্যে আমরা জীবনের পরিণতির ইঙ্গিত লাভ করে থাকি। অতএব মৃত্যুর ধারণাটিকেও নিরন্তর ঘষে ঘষে চকচকে এবং উজ্জ্বল রাখা প্রয়োজন। মানুষ মৃত্যু কিংবা শোক এই দুই মহামূল্যবোধের কোনটিকেই ধারণ, বহন এবং লালন করার ক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে বসে আছে।

এই কারণেই আমি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে নিহত গাভী এবং তার পেটের বাচ্চাটির উদ্দেশে শোক প্রস্তাব পাঠ করছি।

এ কবিতাটি লেখার পর পরই আহমদ ছফা গাভী বিত্তান্ত উপন্যাসটি লেখায় হাত দিয়েছিলেন। আমি মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়ে গাভীর মৃত্যুসংবাদটি তাঁকে ‘গাভী বিত্তান্ত’ উপন্যাসটি লিখতে অনুপ্রাণিত করেছিল। তাঁর মনের ঝাল ঝাড়ার একটা ক্ষেত্র তিনি তৈরি করে নিয়েছিলেন এই উপন্যাসের মাধ্যমে।

বাংলা সাহিত্যে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে লেখা অনেক সাহিত্য পাওয়া যাবে, কিন্তু গাভী বিত্তান্তের মতো টানা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে ভরা লেখা আর একটি আছে কি না আমাদের জানা নেই। মরণবিলাসও একটি ব্যঙ্গাত্মক উপন্যাস। ওই উপন্যাসে তিনি মন্ত্রীকে নাজেহাল করে ছেড়েছেন। এই উপন্যাসে তাঁকে দেখা যায় আরও কয়েক কাঠি এগিয়ে। মরণবিলাস নিয়ে ঔপন্যাসিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের একটা মন্তব্য মনে রাখার মতো ছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘তীক্ষ্ম বিদ্রুপ ও ঠাট্টা এই বইটির পরতে পরতে। আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠিত উচ্চবিত্তকে নিয়ে এ রকম ঠাট্টা আজ পর্যন্ত কোনো উপন্যাসেই এমন সফলভাবে করা হয়নি। মনে হয় লেখক যেন নিষ্ঠুর খেলায় মেতে ওঠেছেন, মন্ত্রীবেটার পাছার কাপড় তুলে নিয়ে তাকে তিনি ন্যাংটো করে ছাড়বেন।’ গাভী বিত্তান্তেও দেখা যায়, উপাচার্যকেও তিনি ন্যাংটা করে ছেড়েছেন আরও ন্যাক্কারজনকভাবে।

এই উপাচার্যটা কে, যে কারও প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। কবি রাজু আলাউদ্দিন এক সাক্ষাৎকারে আহমদ ছফার কাছে জানতে চেয়েছেন, ‘আপনার গাভী বিত্তান্তে যে চরিত্রটা পাই ওটা কতটা বাস্তব, কতটা ফ্যান্টাসি এর মধ্যে কাজ করেছে, একটু বলবেন?’ তার জবাবে আহমদ ছফা বলেছেন, ‘এর মধ্যে কোনো বাস্তব বা বিশেষ ব্যক্তি বলতে হয়তো আমি মিন করতে চাই। বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যে সমস্ত সংকটের মধ্যে পড়েছে, যে সমস্ত অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি, হৃদয়হীনতা, নিষ্ঠুরতা, বিদ্যা এবং সংস্কৃতির প্রতি অঙ্গীকারহীনতা সেগুলোকে বলতে গেলে তো একটা ফিগারের মাধ্যমে বলতে হয় এবং সেটা বলার জন্য যেভাবে আমাকে একটা ফিগার নির্বাচন করতে হয়েছে, সেটা একেবারে শূন্যের ওপর থেকে তো আপনি করতে পারেন না। এমনকি লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির এই যে মোনালিসা তারও তো একটা বাস্তব চরিত্র ছিল।’

ওই সাক্ষাৎকারের এক জায়গায় আহমদ ছফা উপন্যাসে নুরুন্নাহার বানুকে একটি ভালো চরিত্র হিসেবে অভিহিত করেন। বইটি যখন অনুবাদের প্রশ্ন ওঠে তখন গায়ত্রী স্পিভাক নামে এক নারীবাদী মহিলা বলেছেন, গাভী বিত্তান্ত নারীদের আক্রমণ করে লেখা একটি উপন্যাস। সুতরাং এই বই অনুবাদ করা যাবে না। তখন আহমদ ছফার জবাব ছিল, শেক্সপিয়রে যে লেডি ম্যাকবেথ কিংবা কিং লিয়ারে যে নারী চরিত্র আঁকা হয়েছে অথবা দস্তয়েভস্কির ব্রাদার কারমাজভ-এ তাহলে এগুলোকে কি বলা যাবে?

যাহোক, দেশসেরা একটি শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠের উপাচার্যকে ব্যঙ্গ করে আস্ত একটি উপন্যাস লেখা এটি সাধারণ কোনো বিষয় ছিল না। এখানে লেখকের সাহস এবং পুরো বিষয়টিকে হৃদয়াঙ্গম করার যে মানসিকতা সেটি যে কোনো পাঠককে কবুল করে নিতে বাধ্য করে। এ ধরনের উপন্যাসে লিখতে হলে অনেক ঝুঁকি কাঁধে তুলে নিতে হয়। অনেক সময় দেখা যায়, লেখাকে বেশি রসাত্মক করতে গিয়ে অনাবশ্যক অনেক কিছু অবতারনা করে পুরো বিষয়টিকে খেলো করে তোলার ভয় থাকে। সেই রকম উপন্যাসটিতে কোথাও ঘটেনি, যা লিখেছেন মনে হবে তার এক তিল পরিমাণও মিথ্যা নয়। উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে পাঠককে প্রতি পদে পদে ভাবনায় ফেলে দেয়। পাঠকের গা ভাসিয়ে দিয়ে উপন্যাসটি পড়ার কোনো সুযোগ নেই। যখনই পড়বেন, পাঠক কখনও ঘৃণায় ভ্রু কুঁচকাবে, কখনও রাগে-ক্ষোভে তার মনোজগত শক্ত হয়ে ওঠবে, কখনও হাসতে হাসতে তার পেটে খিল ধরে যাবে। পুরো উপন্যাসে আহমদ ছফার অনন্যতা এখানে। ঠাট্টা-বিদ্রুপের মাধ্যমে একটা সরল অথচ তীব্র প্রতিবাদ এমনভাবে প্রকাশ করেছেন যেটি তাঁর স্বভাবজাত মানসিকতার পরিচয় প্রতিটি বাক্যে ধরা দেয়।

গাভী বিত্তান্ত যখন লেখা হয় সেটি ধারাবাহিকভাবে সাপ্তাহিক রোববারে ছাপা হয়েছিল। পরে সন্দেশ থেকে উপন্যাসটি উনিশ শ পঁচানব্বই সালে বই আকারে প্রকাশ পায়। উনিশ শ চুরানব্বই সালের ডিসেম্বরে উপন্যাসটি লেখায় তিনি হাত দিয়েছিলেন এবং শেষ করেছিলেন পঁচানব্বই সালের জানুয়ারি মাসের দশ তারিখে। পুরো একটি বছর সাপ্তাহিক রোববারের চাপে তাঁকে উপন্যাসটি লিখতে হয়েছিল। বইটি উৎসর্গ করেছিলেন বাংলা-জার্মান সম্প্রীতির নিয়ন্ত্রক ফাদার ক্লাউস বুয়েলে। উৎসর্গপত্রে লিখেছিলেন, ‘আমার বন্ধু এবং শান্তিপথের যাত্রী’। এই বন্ধু, এই শান্তিপথের যাত্রীই তাঁর একদিন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। যারা আহমদ ছফার নুন খেয়েছিলেন, তাদের দিয়ে তাঁকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংগঠন থেকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে কূটকৌশলে সরিয়ে দিয়েছিলেন, যেটি তাঁকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। তাঁরাই আবার আহমদ ছফার মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে সুন্দর সুন্দর কথা বলেছেন। অবশ্য এটা তাঁর জন্য ব্যতিক্রম কোনো ঘটনা ছিল না, গোটাজীবনে তিনি কোনো না কোনোভাবে এই নিয়তির শিকার হয়েছিলেন।

কথায় কথা এসে প্রসঙ্গ পাল্টে গেল। মূল কথায় আসি। আহমদ ছফা যেসব উপন্যাস লিখেছেন সবগুলো উপন্যাস তিনি অল্প সময়ে শেষ করেছিলেন। কিন্তু অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী এবং গাভী বিত্তান্ত লিখতে তাঁকে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়েছে। তার কারণটি ছিল, সপ্তাহের লেখা সপ্তাহে লিখে তিনি সাপ্তাহিক রোববারে পাঠাতেন। পাঠাতেন বললেন ভুল হবে, পত্রিকা অফিস থেকে লোক এসে প্রতিটি কিস্তি নিয়ে যেতেন। অনেক সময় দেখা যেত তাঁকে তাগাদা দেওয়ার পরও তিনি লেখা লিখেননি, যখন পত্রিকার অফিসের লোক এসে হাজির হতেন তখন তিনি তাঁদের বসিয়ে রেখে লেখা লিখে দিতেন।

হৃদকলমের টানে শিরোনামে সৈয়দ শামসুল হক তাঁর প্রতিদিনকার ঘটনা নিয়ে সংবাদ পত্রিকায় ছোট ছোট কলাম লিখতেন। সেই কলামে সৈয়দ শামসুল হক আহমদ ছফার দুটি উপন্যাস নিয়ে কিছু কথা লিখেছিলেন। তার একটি ছিল গাভী বিত্তান্ত, অপরটি পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গপুরাণ। ওই কলামে সৈয়দ শামসুল হক উপন্যাস দুটির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। আমার লেখায় তাঁর কথাগুলোর একটু এদিক-সেদিক হতে পারে। তিনি লিখেছিলেন, ‘শাহবাগের সন্দেশ থেকে আহমদ ছফার দুটি উপন্যাস কিনলাম। দুটি উপন্যাসের নামকরণই আমাকে বেশি টেনেছিল। বাসায় নিয়ে এসে উপন্যাস দুটি একটানে পড়ে ফেললাম। আহমদ ছফা আমার চোখ খুলে দিয়েছেন। আমাদের চারপাশে কত কিছু ঘটে, অথচ আমরা তার কিছুই দেখতে পাই না।’ কথাগুলো উদ্ধৃত করলাম এই কারণে, গাভী বিত্তান্ত যখন প্রকাশ পায় তখন থেকে বইটি পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। তখন থেকে উপন্যাসটি সর্বস্তরের পাঠক, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, যারা সাহিত্য পড়েন না তারাও গাভী বিত্তান্ত বইটি একবার পড়ে দেখার আগ্রহবোধ করেছিলেন।৫

মহিউদ্দিন সাহেব যে কথাগুলো বললেন তার সত্যতা কতটুকু। তিনি বলেছেন, আহমদ ছফা তাঁর উপন্যাসটি ছাপার জন্য পাণ্ডুলিপি সন্দেশের লুৎফর রহমানকে দিয়েছিলেন। এটা কি সত্য? আহমদ ছফা লুৎফরকে কোনো পাণ্ডুলিপি দেননি। তিনি যে উপন্যাসটি লিখেছিলেন তার পাণ্ডুলিপি তাঁর কাছে ছিল না। তিনি যা লিখতেন সঙ্গে সঙ্গে রোববার পত্রিকার লোক এসে নিয়ে যেত। তিনি কখনও ফটোকপি রাখারও দরকার মনে করেননি। লুৎফর সাহেব রোববার পত্রিকা সংগ্রহ করে তা টাইপ করে নিতেন।

আহমদ ছফা রুচিশীল একজন লেখক। তাঁর সাহিত্যে একজন আলী কেনানের উত্থানপতন উপন্যাসটি বাদ দিলে আর কোথাও অশ্লীল শব্দ চোখে পড়ে না। এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এ উপন্যাসে কয়েকটি জায়গায় অশ্লীল শব্দের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। তার কারণ কি? তখন আহমদ ছফা বলেছিলেন, একটু সালাদ দিয়ে দেখলাম পাঠক কিভাবে গ্রহণ করে তা দেখার জন্য। যারা অশ্লীল ভাষায় সাহিত্য রচনা করতেন তিনি তাঁদের সমালোচনা করেছেন। হুমায়ূন আহমেদকে উদাহরণ হিসেবে টেনে বলেছেন, সাহিত্যে অশ্লীল শব্দের প্রয়োগ ঘটাতে হবে কেন? হুমায়ূন তো একটি শব্দ অশ্লীলতা না করেও জনপ্রিয় লেখক হয়েছেন। আহমদ ছফা এত বাজে অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করে বইয়ের নামকরণ করেছেন এটাও আমাদের বিশ্বাস করতে হবে? মহিউদ্দিনের কথা না হয় আমরা সত্য ধরে নিলাম। কিন্তু উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার আগে সেটি রোববারে গাভী বিত্তান্ত নামে ছাপা হয়েছিল। সেটি তো মিথ্যা নয়। সুতরাং বইটির নাম গরু চোদা ভিসি নামকরণ করতে হবে কেন? আমি যে এ ভদ্রলোককে নিয়ে লিখছি আমার সারা শরীর ঘিন ঘিন করছে। আমার তো মনে হয় তাঁর সমস্যা মাথায় নয়, শিশ্নে। তিনি লিখেছেন, নাম পাল্টাবার জন্য লুৎফর রহমান আহমদ ছফার হাতে-পায়ে ধরে কান্নাকাটি করেছেন। কোন স্তরের, কোন বয়সের মানুষ অন্যের হাতে-পায়ে ধরে কান্নাকাটি করে সেটি উপলব্ধি করার বোধশক্তিও মহিউদ্দিনের আছে বলে আমাদের মনে হয় না।

তথ্যসূত্র

১.  আহমদ ছফা: আমার কথা কইবে পাখি: মহিউদ্দিন আহমদ; প্রথমা (ঢাকা:২০২৫) পৃষ্ঠা: ১২২
২.  প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১২৪
৩.  ফাউস্ট, পৃষ্ঠা: ৩২
৪.  আমার কথা কইবে পাখি: পৃষ্ঠা: ১১৬
৫. আহমদ ছফার সাধনা, পৃষ্ঠা: ১৪৭

পড়ুন  ► প্রথম কাণ্ড  ► দ্বিতীয় কাণ্ড  ► তৃতীয় কাণ্ড  ► চতুর্থ কাণ্ড  || আসছে ► ষষ্ঠ কাণ্ড