একগুচ্ছ নতুন কবিতা
১ || মিথ্যার পাহাড়
পাহাড় জমে না, জমে অভ্যাস।
একদিন অভ্যাস ফেটে
ভিতর থেকে আলো বের হয়।
২ || নরকের কীট
অন্ধকারে যারা কীট ছিল,
আলো পেয়ে তারা
নিজের নাম ভুলে গেল।
এখন তাদের ডাকে প্রজাপতি।
৩ || শিয়াল-শকুনের সভা
ওরা সিঁড়ি বানাতে বানাতে
নিজেরাই সিঁড়ি হয়ে গেল।
এখন মানুষ সেই সিঁড়ি বেয়ে
উপরে ওঠে না, নিচে নামে।
৪ || ঘুমন্ত সূর্য
সূর্য মরেনি।
সে শুধু চোখ বুজে
মানুষের জন্য কাঁদছিল।
চোখ খুলতেই দিন।
৫ || গোরস্থানের নূপুর
এখানে মৃত্যু মানে শেষ না।
এখানে মৃত্যু মানে
মাটির নিচে রিহার্সাল।
সময় হলে নূপুর বাজে।
৬ || যমুনার পুরোহিত
পুরোহিত ভাবে সে ডোবেনি।
নদী পুড়ে ছাই
আগুন দিয়েছে ধুয়ে তাকে।
এখন সে ভিজে ভিজে যমুনার জলে
সিল্কের কাপড়ে
স্বর্গ সেলাই করে হাসছে।
৭ || নামহীন নদী
নদীর নাম নেই।
তাই নদী নিজেই নাম।
যে ছোঁয়, সে-ই বদলে যায়।
৮ || নীলপদ্মের বর্ণমালা
মিথ্যার হাড়ের ফাঁকে
ফুটেছে নীলপদ্ম।
প্রতিটা পাপড়িতে
একটা করে সত্যের অক্ষর।
খেয়ো না, পড়ো।
৯ || মাছের উপাসনা
আকাশ থেকে পড়া মিথ্যা
নদীতে ডুবেই মাছ।
ওরা এখন জলের উপর
নতুন প্রার্থনা লেখে।
প্রথম লাইন: ‘আলো এসো’।
১০ || স্বর্গের কাজ
স্বর্গে সিংহাসন নেই।
আছে শুধু বওয়া।
বইতে বইতে ময়লা
আগুনে ফেলে দেওয়া।
১১ || কাঁচের কবর
মৃতরা কাঁচের ভেতর ঘুমায়,
যাতে জীবিতরা নিজেকে দেখতে পায়।
১২ || উল্টো বৃষ্টি
বৃষ্টি নিচ থেকে ওপরে যায়,
মানুষের চোখের জল ফেরত দিতে।
১৩ || দেবদূতের ছুটি
আজ দেবদূত আসেনি।
তার পাখা রোদে শুকাতে দিয়েছে নদী।
১৪ || শব্দের ওজন
একটা মিথ্যা বলতেই
টেবিলটা এক ইঞ্চি দেবে গেল।
১৫ || আয়নার ভেতর নদী
আয়নায় তাকালেই দেখি,
আমার পেছনে একটা নদী বইছে
যেটা আমার সামনে নেই।
১৬ || প্রার্থনার মাছ
আমার প্রার্থনাগুলো মাছ হয়ে গেছে,
জাল ছিঁড়ে আবার আমার কাছেই ফিরে আসে।
১৭ || ঘড়ির কঙ্কাল
সময় মরে গেছে অনেক আগে,
আমরা শুধু তার কঙ্কালটাকে
ঘড়ি বলে হাতে পরে আছি।
১৮ || নীরবতার ভাষা
ঈশ্বর যখন কথা বলেন না,
তখন বুঝি—তিনি মন দিয়ে শুনছেন।
১৯ || পাপের ছায়া
পাপের কোনো শরীর নেই,
শুধু দুপুর বেলা ছায়া পড়ে না।
২০ || জলের সিঁড়ি
ডুবতে ডুবতে দেখলাম,
জলের নিচেও একটা সিঁড়ি আছে,
ওপরে ওঠার।
২১ || ভাঙা ডানার স্কুল
এখানে যাদের ডানা ভাঙা,
তারাই ওড়া শেখায়।
২২ || আলোর ঋণ
আমরা সবাই আলোর কাছে ঋণী,
অন্ধকারে সুদ গুনছে।
২৩ || দ্বিতীয় জন্ম
প্রথমবার মায়ের পেট থেকে,
দ্বিতীয়বার নিজের মিথ্যার পেট চিরে।
২৪ || নদীর স্মৃতি
নদী কাউকে মনে রাখে না,
শুধু পাথরগুলোকে একটু বেশি যত্নে ঘষে।
২৫ || স্বর্গের বাজার
স্বর্গে সবকিছু ফ্রি,
শুধু নিতে গেলে নিজের নামটা
জমা রাখতে হয়।
২৬ || চোখের ভেতর পাখি
চোখ বুজলেই একটা পাখি উড়ে যায়,
চোখ খুললেই সে ধরা পড়ে।
২৭ || মৃত ঘোড়ার হাসি
যুদ্ধ শেষ, ঘোড়াটা মরে গেছে,
তবুও পিঠে হাত রাখলে হাসে।
২৮ || কাগজের নৌকা
একটা কাগজের নৌকা
পুরো সমুদ্র ডুবিয়ে দিল।
২৯ || ঈশ্বরের ভুল
ঈশ্বর একদিন বানান ভুল করেছিলেন,
সেই ভুল থেকেই মানুষের জন্ম।
৩০ || অন্ধ ফুল
ফুলটা অন্ধ,
তাই গন্ধ দিয়ে দেখে।
৩১ || হাওয়ার হাড়
হাওয়ারও হাড় আছে,
ঝড়ের রাতে টের পাই।
৩২ || লবণের প্রার্থনা
সমুদ্র কোনোদিন মিঠা হতে চায়নি,
সে শুধু লবণ হয়ে থাকার প্রার্থনা করেছে।
৩৩ || মুখোশের ঘর
মুখোশ খুলে দেখি,
ভেতরে আরেকটা মুখোশ ঘুমাচ্ছে।
৩৪ || সময়ের জামা
আমি সময়কে জামা পরাতে গেলাম,
সে নগ্ন হয়ে দৌড় দিল।
৩৫ || মৃত্যুর পর দুপুর
মৃত্যুর পরেও একটা দুপুর আছে,
যেখানে রোদ নেই, ছায়া আছে।
৩৬ || আঙুলের নদী
আঙুল দিয়ে নদী আঁকতেই
আঙুল ভিজে গেল।
৩৭ || স্বপ্নের পাসপোর্ট
স্বপ্নের কোনো দেশ নেই,
তবুও রোজ পাসপোর্ট লাগে ঢুকতে।
৩৮ || নীরব ঘণ্টা
মন্দিরের ঘণ্টাটা বাজে না,
শুধু কাঁপে,
আর যারা পাপী, তারাই শুনতে পায়।
৩৯ || কাকের বেদ
কাকেরা সব জানে,
শুধু বলার ভাষাটা মানুষকে দেয়নি।
৪০ || জলের আগুন
জলের ভেতর আগুন জ্বলছে,
মাছেরা প্রদীপ ভেবে ঘিরে আছে।
৪১ || নামের কবর
আমার নামটা কবর দিয়ে এলাম,
এখন আমি হালকা।
৪২ || ঈশ্বরের আয়না
ঈশ্বর আয়না দেখেন না,
তিনি আমাদের দেখেন।
৪৩ || পাথরের ঘুম
পাথর ঘুমায় না,
সে ঘুমের ভান করে
যাতে আমরা তার ওপর বসি।
৪৪ || হারানো ছায়া
আজ সকালে আমার ছায়া হারিয়ে গেছে,
শুনেছি সে আলোর খোঁজে গেছে।
৪৫ || শেষ নৌকা
শেষ নৌকাটা কেউ ধরেনি,
সেটা এখনো অপেক্ষায় আছে
প্রথম মানুষটার জন্য।
৪৬ || চিঠি ছাড়া ডাকঘর
স্বর্গের ডাকঘরে কোনো চিঠি আসে না,
সবাই নিজে এসে দিয়ে যায়।
৪৭ || কান্নার রঙ
কান্নার কোনো রঙ নেই,
তবুও নদী নীল হয়ে যায়।
৪৮ || মাটির চোখ
মাটিরও চোখ আছে,
আমরা যখন কাঁদি, সে তাকিয়ে থাকে।
৪৯ || শূন্যের ভেতর পূর্ণ
শূন্যের ভেতর হাত ঢোকালাম,
একমুঠো আলো বেরিয়ে এলো।
৫০ || ফেরা
নদী কোথাও যায় না,
শুধু ফেরার ভান করে
যাতে আমরা তাকে যেতে দিই।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন