চুমু ও অন্যান্য কবিতা
কুয়াশার ফুলরা
কুয়াশার ফুল ছিঁড়তে আমি বৈলাম গাছে উঠি শীতের মরশুমে।
এত উচা গাছে নিচ থাকি
আমারেই কুয়াশার মতো ছোট লাগে।
তখন কুয়াশাদের আমার আপন ভাই ভাই লাগে। কোন ফাকে
কুয়াশার ফুল ছিঁড়ার কথা ভুলি যাই ।
শুনছি কেউ কেউ আমার মতো যে নিয়তে উপরে উঠে
পরে তারা সেইখানে পৌঁছি পুরাই ভুলি যায়।
কুয়াশারা ফুল সাজার তাগিদে রীতিমতো ওইখান থাকি তারা
আমারে ছাড়ি চলি যায়,
আমার নিজেরে তখন বেশ
নিরুপায় নিরুপায় লাগে!
শালিকের কিচিরমিচির জমি গেছে শীতে, তার মধ্যে অবশ্য
কুয়াশার ফুল ছিড়ার এ মরশুমে
শব্দ কট্টুক জোরালো হয়
সেইটাও তলায়ে দেখার সুযোগ ছিল!
ভাসা কচুরিপানা
মা আমার নাম রাখছিল কইচড়ি (ভাসা কচুরিপানা)
মারে মোবাইল করলেই কান্দে
তাই ডরে ফোন করি না!
আমি রাজশাহী যাই কাফেতে নিঃসঙ্গ একটা কোনার টেবিলে বসি
আমি মৌলভীবাজার যাই কাফেতে নিঃসঙ্গ একটা কোনার টেবিলে বসি
আমার ঘাড়ে বসা ময়না পাখিটারে বলি দূরে
কোনো জানালায় গিয়া আপাতত বস!
ওরে আমি ছাড়া কেউ দেখিতে পায় না!
আমি এক কাপ ভরা কফি আর
একটা কাফন রঙা খালি কাপ
সামনে নিয়া ঘন্টার পর ঘন্টা বসি থাকি।
হোটেল বয় কয়, খালি কাপে
কে কফি খায় আপনের লগে!
আমি কুমিল্লার লাকসামে যাই
পাটুয়াটুলি লেনে যাই
আমি আশুগঞ্জ যাই ক্যাফেতে বসি…
হোটেল বয় বলে, খালি কাপে
কে খায় কফি আপনের লগে!
আমি যেন একটা গ্রহের সব কফিখানায়
একই সময়ে এইভাবে কফি খাইতে বসি!
আম্মা ফোন দেয়
বলে ও আমার কইচড়ি, ও কইচড়ি, ও কইচড়ি
আমি ফোনে ধরা দিই না!
আমি কাফনরঙা কফি কাপের
ভিতর
আম্মার আহাজারি যেন ফোটা ফোটা
জমা রাখতে দেরি করি!
বৃষ্টি শেষে রুটি ভোজ
বৃষ্টি শেষ। রান্নাঘর হইতে
খড়ের গাদা হইতে প্যারালাল
তামাম ধুয়া উড়তেছে স্লোমোশনে যেন কাটাঅলা জুতা পায়ে ওদের।
আম্মার সেকা রুটির ঘিরানে বাতাস মও মও!
আমগাছের পাতার ফাকে যে আসমান আসছিল
অনীল হইতে
সেও মিলছে ধুয়ার লগে!
সব তাড়াহুড়ার যেন শিকড় গজাইছে
তাল রাখি উড়তেছে এক জোড়া শালিক!
যেন আমি কোনো ট্রেন স্টেশনে দাড়াই আছি
কতশ বছর
ট্রেনের ধোয়া বার হওয়ার দৃশ্য দেখবার লাগি!
বৃষ্টির এই দৃশ্যরা আমারে তাদের আয়না বানায়ে ফেলছে !
জানালার ধারে এইখানে!
আম্মার সেকা গোল রুটি আত্মার মতো
তাই রুটি খাইলে শরীর এতটা টিকে !
মাথা নিচু করি থাকতে চাই
পুরা বর্ষা আমি কুয়াশাছন্ন চোখ বুজি
মাথা নিচু করি থাকতে চাই।
জানতে চাই না আমি বৃষ্টির সামান্য অভিঘাতে
অ-গৃহপালিতদের যত হুড়াহুড়ি!
জানতে চাই না আমি
সে না থাকলেও থাকে বিরহ
শিউলি ফুলগুলা ভিজার আগেই ঝরি পড়ছিল!
চাদ উদিলা হইছিল শেষ রাইতে ছাগলের শিংয়ের মতো!
আজকার মেঘদল ছিল আমারই মনের মেঘরূপ
তথা ছিন্নভিন্ন বিষণ্ণ তাই যত
মনোবলহীন তাদের ঝরি পড়া!
জানতে চাই না আমি
কদম ভিজি গেছে ওগের ডালেই ভিজা কাক
ডানা ঝাড়ি আমাদের দেয়া নাম নিচে ফেলাইতেছিল!
পাশে ব্রিজটার নিচে বৃষ্টি না পড়ায়
ব্রিজটার মন খারাপ
নো ম্যান্স ল্যান্ডের মতো নো রেইনস ল্যান্ডের লাগি!
জানতে চাই না আমি
দূরে গাছগুলা ল্যাপ্টাই গেছে দিগন্তে
ইচ্ছা করলে চক ছাড়া
নখের আচড়েই নিজের নাম বানান করি লিখতে পারবে যেকেউ!
জানতে চাই না আমি
উঠান ছাড়ি লাল শাকের খ্যাতে
হাইব্রিড পেয়ারা বনে
নামছে কুকড়াগুলা,
দেড়ঝাক শালিক নামছে ঘাসের ভিতর
কীট পোকাদের নাচনকুদন দেখতে!
জানতে চাই না আমি
বহুদিন পর বিলুপ্ত কম চতুর মাত্র একটা হলদে সোনা ব্যাঙ
গায়েব হইতে উদয় হইছে কচু বনে,
সে আবার ডাকতেছে সাবেক স্টাইলে—
ওর ডাক শুনি কারো মনে হইল পেন্ডিং হই আছে
আমাদের সেই কবের অজানা দূরের
শয়ে শয়ে কতশ সফর!
পুরা বর্ষা আমি কুয়াশাছন্ন চোখ বুজি
মাথা নিচু করি থাকতে চাই।
বাইরে তাকাইতে কইও না আমারে
পাছে খন্ড খন্ড বর্ণনা দিতে থাকবোনে
ভারাক্রান্ত সবকিছুর উদাস ভাবটার পক্ষ নিতে গিয়া পাছে
বুড়া হাবড়া সজনা গাছটারে হাটা রাস্তারতে.
সরাইতে দেরি হই যায়
আর তাতে পুরা গোলকটাই কিছুটা সময় পিছাই পড়বেনে!
শেষ কদমের প্রতি
লোকজনরে নিরাময় করার লাগি সব বনের ভিতরই
মাথার উপর মাকড়সা ঝোলা একটা আলাভোলা
বুনোপথ রহে।
আমি সেইদিন বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় সেই বুনোপথের পাল্লায় পড়ি।
পথটার থাকি খানিকটা দূরে বর্ষা রতি সিক্ত
একটা কদমের তলে আসি দাড়াই,
পুরা জায়গাটারে নীপবন কওয়ায় ভালো।
পুরা গাছটায় একটাই কদম
পাহারা দিতেছে চুপেচাপে হলুদ ওরই পাপড়িগুলা
ওর সাদা পরাগে বৃষ্টি ফোটা কানপাশা ছলে ঝুলি আছে
অ-শব্দে বলতেছে, তুমি আমার!
আমি আর কোথাও যাইবো না হাবভাব যা দেখতেছি
নীল আকাশ আর মেঘদলরে ফুসলাই ভাগাই দিছে দূর কোন দেশে
কাপা কাপা তারা তাদের আলো
আসি থুতনি ঘষতেছে বৃষ্টিস্নাত কদমটার গালে,
কয়, তুমি আমার!
ঘুম আসতেছে না চোখে জোনাকি মাখা আন্ধারে
একটা ফটিকজল ডাকি উঠলো,
পষ্ট শুনলাম,
কয়, তুমি আমার!
একদল শীতল হাওয়া আইলো
পাগলা বাছুরের মতো বাদুড়ের আগে
যদি সে কদমটারে কামড় বসায়!
শীতল হাওয়ারা বলে, তুমি আমার!
সুবেহ সাদিকে আলো সাজি ভোর আসি কদমটার কানে কানে কয়,
তুমি শেষমেষ আমার!
কত কত ঘাস মাথা উঁচু তাকায় আছে বাতাসের জানলা দিয়া
তারাও একই কথা কইতে চায়!
বুনো পথে না দাঁড়াইলে
কদমমুগ্ধগোর এই ফিস ফিস আবদারগুলা শোনাই হইত না আজ!
ফের মেট্রোরেলে প্রেম
মেয়েটির মুখের কালো তিলের দিকে ২য় বার তাকায়ে
মনে হইলো আমার হারানো
কোনো দ্বীপ উপনিবেশ ঐ তিল,
ছিলাম আমি কতশ বছর সেই মানচিত্রে।
৩য় বার তাকাইলাম যেই
মনে পড়ি গেল হাফিজ সিরাজির সাথে কাল রাইতে
খোয়াবে সাক্ষাতের কথা।
কেন আপনে
তুর্কি-সুন্দরীর
মুখের সেই কালো তিলের বিনিময়ে সামরকন্দ ও বুখারা
লিখি দিতে রাজি হইছিলেন?
তিনি শুধু এই কই অন্তর্হিত হইলেন,
ঐ তিল আছিল মেয়েটার হারানো কৈশোরের রূপান্তর।
মেট্টোরেলে
মেয়েটার মুখের তিলের দিকে তাকায়ে
১ম বার কী কী ভাবছি আমি তা গোপন রাখি
পাঠকের কাছে
যেইভাবে দিনের পর দিন
বিছানায় লুকানো হুলঅলা শুয়োপোকার কথা
গোপন রাখে সতীন সতীনের কাছে!
শীতকাল আসবে আসবে করি
শীতকাল আসবে আসবে করি প্রতিবছর
আমি সেই গাফেল স্মৃতির কাছে ফিরি যাই
কুয়াশার ওইপারে তুমি আমার নাম ধরি ডাকো
কিন্তু যতই ধরতে যাই তুমি কুয়াশার ওইপারেই রই যাও
আ’র মনে হয় এক আঙুল দূরে তুমি আমারে ডাকতেছ!
তারপর আসে বসন্ত
তোমার ঘরখানা একটা জালে ঘেরা রয়।
যেন দুনিয়ায় খোদার জালে আটকা পড়া কেউ তুমি!
তোমার ঘরে যাইতে গেলে পার হইতে হয়
গোলাপ আর লজ্জাবতীর বন,
আমি কখনও তাদেরে ডিঙ্গাই না!
লজ্জাবতী পাতা আমারে দেখলে কুকড়ায় যায়
কারণ আমার ভিতর একটা বাঘ ল্যাজ নাড়ে,
তার ভয়ে লজ্জাবতী গো ওই দশা হয়!
অথচ বসন্তের বাগান
শীতের কুয়াশা যথেষ্ট কোনো ঘর ন!
তখন আমাদের সেই স্মৃতির প্রশংসা ছলে
মনে পড়তেই থাকে
এক ফু তে তুমি আমারে নিভায়ে ফেলো
আমি তোমারে এক ফু তে নিভায়ে ফেলি
এইভাবে কেয়ামত সে কেয়ামত তক চলতে থাকে
ত্রুটিমুক্ত দুরবিনে দেখা যায়!
আমরা তবু কেন চিরতরে নিভি না?
মহাকাশ প্রেম
ছোটকালে লুঙ্গি পরি পুকুরে গোসলে নামলে
লুঙ্গির ভিতর বাতাস ঢুকায়ে
পানির উপর ভাসি ভাসি ছুটতাম
যেন আমি মহাকাশ যানে ভাসতেছি বহুকাল!
এইভাবে আমি সবকিছুরই বিকল্প
স্বাদ নিতাম!
তাই আমি নিশ্চিত কইতে পারি না যে
আমি মহাকাশযানে চড়ি নাই কভু!
এও কইতে পারি না আমার মহাকাশ প্রেম নাই!
সেই আলতাফ না তো!
শ্মশান মাঠের বটগাছের নিচে কেউ যদি একা এক রাত কাটাইতে পারো
তাইলে তারে একশ টাকা দিব, এই কথা তুড়ি মারি আমিই কইছিলাম।
আমরা জানতাম ভুত তো আর প্রজাপতি ন যে
তার লগে খেলবো, গাল গল্প করবো!
কিংবা সে জোনাকিও না
যে তার মিট মিট আলো দেখতে দেখতে ভোর হই আসবো
মাত্র একশ টাকার বিনিমযে মওতের এই ঝুকি কেউ নিবো না!
ভুতের লগে এক রাইত মানে জীবনের শেষ রাইত!
তহনই বুঝবার শুরু করি জীবনের মায়া কি জিনিস!
এছাড়া মড়া খাইতো যেই শিয়াল তারাও কামড়াই দিতে পারে তারে
ভুলে যদি বট গাছের ভিমরুলের চাকটাতে খোচাই দেয়
তালে তো আর রক্ষা নাই,
বিষ পিপড়া বা নালসের টোপের লাল নালসের কামড়
বসাইলে কি অবস্থা যে হইবো!
অবশ্য জিয়েল মাছের কাটার ব্যথা যে সহ্য করছে
সে না হয়
এ সবই সহ্য করতে পারবো, অবশ্য তাতে কি,
ভয়রে জয় করতে
অনেকেই সাহসের ঘাড়ে চড়ি বসে,
এরকম লোকরে আমরা মনে করি নাই
যে তাদের দেহের লগে আত্মার কোনো প্রেম আছে!
আলতাফ দোস্ত
ওদের বাগানের গোলাপ গুনত প্রতিদিন কয়টা ফুটত আর ঝরত
এ রকম একজন বন্ধু ও, আমাদের আলতাফ
গাভিন ছাগলের মতো আস্তে ধীরে হাঁটত,
মাটিতে আমাদের পাশে বসত শিশিরের মতো স্লো,
মাথা নাড়ত আস্তে আস্তে ঢেকি শাকের মতো
যে ভাবত মেঘ বৃষ্টি আর রোদ কুয়াশা
সব অসভ্য কাজ করতে নামত
কলাই খেতের পাশে খরগোসের লগে
পাছে কেউ আসি পড়লে
তারা সবাই আজও দৌঁড় দিত কালও দৌঁড় দিত!
বিনা টাকায় এক রাত না দুই রাতই
বটগাছের নিচে থাকতে
রাজি হইছিল সে!
বরং সে-ই উল্টা চ্যালেঞ্জ দিল—
আসলে হে স্বেচ্ছামৃত্যু বাছি নিতে চাইছিল,
আমাদের শার্প ব্রেন
বুঝি ফেলি সাথে সাথেই কইছিলাম,
ধের বেটা আমরা বাইচালি করতেছি!
বাবারে,পাছে কোন দোষে যাবজ্জীবন জেল খাটি!
ঘুম থাকি উঠি
‘ঘোড়ার গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে
পড়ে আলতাফ নামক এক ব্যক্তির সন্দেহ
জনক মৃত্যু’
নিউজটা পড়তে পড়তে ছোটকালের বন্ধুটার কথা মনে আসি গেল।
সেই আলতাফ না তো!
চুমু
আমি তারে চুমু খাই না
কারণ আমি জানি
শীতকালে কুয়াশার ওইপারে হলুদ শরিষার খেতের ওইপারে
কেউ আমাদেরে দেখতে পাবে না, এই গোপনতা মানি
তবু চুমু খাই না চুমু,
পরে বার বার বার মনে হবে
ভালো এই জিনিসটা
দেরিতে খাইছিলাম কেন!
এই হীনমন্যতা
আমারে পুরা শীতকাল কুড়ি কুড়ি খাবে!
সমস্যা একটাই শীতকালে
কুয়াশারা উড়ি উড়ি তোমার ঠোঁটেতেই বসে!
প্রথম চুমু তারাই খায়!
আর পাখি উড়া এই প্রিয় চরের ভিতর কুয়াশার প্রতিদ্বন্দ্বী হই
নিজেরে টানার কোনো মানেই হয় না!



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন