বিকেল ও অন্যান্য কবিতা
|| বিকেল ||
কাকচক্ষু জল। হাহাকারের মতো বাড়িঘরগুলো। কে থাকত এখানে… কেউ কি! তাকে সময় দিয়েছে সে। আসবে। লাল চুড়িদার। নীল ওড়নায় মোড়া বুক। উথলেছে… গভীর হয়েছে দুপুর। জল শুধু টলটল টলটল টলটল করে। ভয় পায় বন্ধুনি। মৃদু মৃদু হাসে!
সে আসছে...
আসে...
দিনের এই সময়টা বড় করুণ। ক্লান্ত ভাগবতপাঠের মতন চায়ের দোকানঘর। একচালা। পথভুলে, শালিখের রূপ ধরে আসে খরিদ্দার। সস্তার বিড়ি ফোঁকে ঠোঁটের ডগায়। আগুনেরা জ্ব'লে যায়! জ্ব'লে যায়! পাউরুটি ঘুগনি বিশকুট। কাঠিলজেন্সের মতো রোগা শিমুলগাছের নিচে দোকান। সে এসে বসে। গল্প শোনে পাড়ার, পাড়াতলির। দরিদ্র মানুষের কথা। ভবঘুরে মানুষের কথা। চাঁদোয়া পড়েছে। আজ বজরংবলির আরাধনা। সে এখনও কেন আসছে না! সময় হয়নি তার? ঘড়ি দেখে নয়ন, দুনয়ন। একমুঠো চাল চড়ে উনুনের আঁচে। সেদ্ধ হয়, সেদ্ধ হয় ভাত… আহা! ভাতের ঘ্রাণের মতো মেয়েটির শরীর মনে পড়ে… ছোট করে ছাঁটা চুল। এলোমেলো। নিকোনো দুঠোঁট। চোখ শুধু দুগ্গাপ্রতিমার... বেলোয়ারি! রেশমের তন্তুর নরম ও চোখটিতে আছে! তাকালে রাত্রি করে আসে ছেলেটির মন। দীর্ঘায়ু হোক আজীবন, দীর্ঘায়ু হোক প্রতিমাটি...
ফসলের দো-আঁশলা রোদ ওই আসিতেছে দূরে… দূর থেকে ঘন রিকশায় চড়ে আসিতেছে মধুর অভিমান। ছেলে উঠে দাঁড়ায়। তাকায়। দেখে…
সে এক কৃষ্ণ মেয়ে
গাঢ় তার বিদ্যালয় থেকে
দখিনের জানালার মতো এক বাতাসের নারী
আসিছে দিগন্তরেখা ধরে...
হাসে সে। সন্ধে নেমে আসে। ঠোঁট কামড়ে ধরে কোনও এক অলীক পক্ষী! কেটে যায় অধর। অধরা জলের তীর ছেড়ে ফিরে যায় সব খরিদ্দার। উনুন নিভন্ত হয়। অন্ন বাড়ন্ত আজ বড়!
শুধু টলটল টলটল টলটল করে ওঠে পা…
হেঁটে যায়, ফিরে যায় রাত্তিরের প্রেমিক প্রেমিকা...
|| সন্ধে ||
অস্পষ্ট হয়ে গেছে মুখটা। কিছু আর স্পষ্ট মনে নেই। উষ্ণ দিনগুলোয় যখন দাঁড়িয়ে থাকত রাস্তায়, দূর থেকে সুর ভেসে আসত নামগানের। দোকানগুলো টুলটুল করছে চারদিকে। লিট্টি, আলুকাটা, আচারের দুপুর থৈ থৈ করছে চারদিকে। বুঁদ হয়ে, বড় বুঁদ হয়ে তাকিয়ে রয়েছে সে। আসবে। প্রথাহীন পায়ের নূপুর!
ছিল সঞ্চয় কিছু কোনোদিন? ছিল না তো! চন্দনের গন্ধ আসত, যখন সে নাচের ক্লাসে যেত। এইবার ঘুঙুর। এইবার ওড়নায় স্তন কচি কচি। এইবার মা দুর্গা। এইবার সন্ধে আরতি….
বাহিরে গাছের সারি
বাতাসবন্ধু অবনত
হাওয়া খুব হাওয়া বয়
এই হাওয়া সিলেবাসে নেই...
পুকুরের জল ঘাঁটে পা। শব্দটি শোনা যায় না। শুধু কুলকুল সয়ে চলে সংসারে অবান্তর ছেলে। অপেক্ষা করে সন্ধ্যায়। কখন ফিরবে ও। কখন যমুনা হবে নদী। নদীতে ভাসাবে মন। নৌকো নীরব নিরবধি। আষাঢ়ের মনকেমনেরা খেলা করে। হাতে হাত ধরে ধরে, নেচে নেচে মাঠে ফুটে ওঠে। ছোট্টো ছোট্টো ফুল। সজলের কাজল বালিকা। মাথা নেড়ে নেড়ে গায় বৃষ্টির সুরেলা শৈশব...
ছেলেটি বসেছে এসে আজ এই গৌরবী রাতে
পূর্ণিমা মেয়েটিরও ছায়া যেন এসে বসে পাশে
এ বড়ো ব্যথার রাত, এই রাত গঙ্গাজলের
ভাসানে ভরেছে দেহ, দুঃখের সুর দিয়ে যাও
তাহারা নিদ্রাহীন, মুদ্রাদোষে হতেছে ব্যাকুল
আকাশবন্ধু ওরা ভালোবাসে… আলাদা ক’রো না!
|| রাত্তির ||
রাত। নিরবচ্ছিন্নতায় ভরে ওঠা রাত আজকের। দিন শেষ। ইশকুল শেষ। পড়া শেষ হয়েছে আজকের। যে পথে দাঁড়িয়েছিল সে, সে পথের ধুলো লেগে আছে পায়ের পাতায়। জানলায় আলো হ্যালোজেন। আবছায়া ছায়াদের ছায়ানুশীলন ভেসে আসে। টুকটুক লোক চলাচল। ঝুপঝুপ দোকানপাটির ঝাঁপ। ডুবডুব ডুপকি বেজে চলে। গান গায় দক্ষিণপাড়ার মাধবী। মাধুরীলতায় বোনা গলা... আহা! ক্লান্ত কণ্ঠে যেন ছাতিমের মগ্নতা; ঘোর লাগে। ঘোর লাগে তার। সে এখন কী করছে ঘরে? চশমার কাচে বুঝি থমকে আছে আজকের রাত? দ্বিধাহীন দোসর ছেলেটি পড়া করছে বুঝি?
বিছানায় এসে শোয় মেয়ে। অন্ধকার ঘর। বাহিরে বৃষ্টি নেমেছে। মনে পড়ে... কী যেন বলেছিল! এত আদো আর্দ্রস্বর, যেন শান্তিনিকেতন, যেন রাস্তা ফাঁকা আর তারা দুজনেই আইবুড়ো। লজ্জাবনত গাছ। ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে চলা। বাউলের মতো যেন একতারা একার আকাশ। কালো-নীল, নীল-কালো, নীল আর লাল অন্ধকার। হাত ধরে দেউল ছেলেটি। চোখ যেন মেঠো মৃত্তিকা। ঠোঁট যেন কার্তিকের মাঠ... নবান্ন, শিশির আর শিহরিত নিহিত বিষাদ! গাঢ় হয়ে আসে সে মেয়েটির শাড়ির আঁচলে। মুখ রাখে জীবনের পার্বণমুখর দুটি ঠোঁটে; ভিজে যায় ভিজে যায় কাবেরীর আহত নদীজল! নিভে আসে সকল আঘাত; দুঃখ, দারিদ্র্য নিভে আসে; দুটি প্রাণ বেঁচে ওঠে আঁধারিয়া রাতের প্রপাতে!
চোখ বেয়ে জল পড়ে তার
ছেলেটির খুউব সরলতা
ভালোবাসে, আর কিছু জানে না সামাজিক
রাতের বুড়িয়ে আসা রাত্রির নীল পারাবার
গভীর গভীর করে ঘনিয়েছে মেঘ মেঘাতুর
ও এখনও পড়ছে কি, না কি ওর অগোছালো গাল
গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে স্রোতের আসর ভরা সুর
ও বুঝি শুনছে গান, শুনতে পাচ্ছে কণ্ঠ!
মেয়ে যে ডাকছে ওকে...
‘বন্ধু আমার ফিরে আয়
আবার দাঁড়িয়ে থাক ইশকুল ফেরত ও পথে
আমি তোকে ভালোবাসি, আমি তোকে রসাতল করি
আমার অরণ্য ধরে হেঁটে আয় আজ এই রাতে...’
হাহাকার হাহাকার হাহাকার করে ওঠে কার
সংসার সন্তান সন্তাপের প্রহার প্রহার
সব ভেসে যাচ্ছে জলে… কৈশোর প্রেম ছেলেটি
জলে পুড়ে যাচ্ছে তারা
জ্ব’লে যাচ্ছে রাত্রি! রাত্রি!



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন