চর্ব্য চোষ্য [দ্বাবিংশ পর্ব]
পড়ুন ► চর্ব্য চোষ্য [একবিংশ পর্ব]
চর্ব্য চোষ্য [দ্বাবিংশ পর্ব]
চেয়ারম্যান পার্টি দিচ্ছেন গুলশানের ‘আর্থ অ্যান্ড স্কাই’ রেস্তোরাঁয়। গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই নামের অর্থ বোঝা যায়। নিচু দালানের সামনে বড়সড় উঠোন। একপাশে মাটি আছে। আরেক পাশে ঘাস। উঠোনের চারপাশ দিয়ে সারি সারি ফুলগাছ। ওপরে খোলা আকাশ। শুধু একটু নাক উঁচু করলেই দেখা যায়। যাদের নাক এমনিতে উঁচু তাদের তাও করা লাগে না।
উঠোনের তিন পাশ দিয়ে দুই সারি লম্বা গাছ। গাছগুলোর ডালে ডালে তারার মত মিটমিট করছে বিদ্যুৎবাতি। দালানের সামনের ছোট এক সারি গাছেও তারা জ্বলছে। তারাগুলো আশপাশের বিদ্যুৎবাতির ঝলক দূরে ঠেলে রাখছে।
চেয়ারম্যান যখন পার্টি দেওয়ার কথা ভাবছিলেন তখন এক বিক্রয়কর্মী এই রেস্তোরাঁর খবর দিল। সে বলল যে, ‘গুলশানে আকাশ-মাটি ভাড়া দেওয়ার ব্যবসা শুরু হয়েছে, সার!’
‘মানে কী?’
চেয়ারম্যান মজা পেলেন। কৌতূহল মেটাতে গেলেন। আর্থ অ্যান্ড স্কাই তার পছন্দ হয়ে গেল। তারা খাবারের বিল নেয় পাঁচ তারার মতই। কিছু খাবারের বিল পাঁচ তারার চাইতে বেশি। চেয়ারম্যান খাবার টেস্ট করে দেখলেন। দাওয়াত পেয়ে তার বন্ধুরাও পুলকে-কৌতূহলে গুনগুন করতে করতে এসে পড়ল। নিন্দুক বন্ধুরা চেয়ারম্যানকে লজ্জা দেওয়ার জন্যও তৈরি হয়ে আসল।
রেস্তোরাঁটার চারপাশে বহুতল ভবন থাকলেও দুই পাশে প্রশস্ত রাস্তা। রাস্তার আকাশটাও রেস্তোরাঁর দখলে। সেখানে গাড়ি রাখা যায়। কেউ পাছায় গুঁতো মারে না।
প্রথম অতিথিকে চেয়ারম্যান ছাতার মত একটা লাল জারবেরা দিয়ে শুভেচ্ছা জানালেন। কিন্তু সে এক খটখটে বণিক। কাজ ছাড়া তার সাথে কোনো আলাপ জমে না। চেয়ারম্যান আশা করতে লাগলেন কিছু অম্লমধুর। যাদের না হলে পার্টি-টার্টি জমে না। মিনিট বিশেকের মধ্যে তেমন একটা দল প্রায় একসাথে হাজির হল। তাদের একজন জমির কারবারি। পোশাক কারখানাও আছে বটে। বন্ধুরা বলে রিয়েল এস্টেট ম্যাগনেট। তার ব্যবসা চেয়ারম্যানের চাইতে কয়েক গুণ বড়।
ম্যাগনেট বলল, ‘কয় বছর ধরে যা খোঁচাটা মেরেছ! পাছাটা একেবারে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। এখন আবার কী মনে করে দাওয়াত দিলে কে জানে! তুমি শালা আচ্ছা লোক আছো!’
চেয়ারম্যান চুপচাপ মুচকি হাসলেন।
অন্য একজন বলল, ‘ত তুমি সেই পিনগুলো, পেরেকগুলো সব কার্টনে জমিয়ে রেখেছ শুনলাম!’
আরেকজন বলল, ‘শুধু জমিয়ে রাখেনি। বিশাল একটা কারখানাও দিয়েছে!’
‘ওওহ!’
ব্যাপারটা আসলে এই, চেয়ারম্যানের পত্রিকা বলে আসছে, ম্যাগনেট দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার ভেতরে-বাইরে সরকারি জমি দখল করছে। সরকারি কর্মকর্তারা তাতে সহযোগিতা করছে। কৃষকের ফসলের খেত নামমাত্র টাকা দিয়ে জবর-দখল করে প্লট বানিয়ে বিক্রি করছে।
পত্রিকাটা ম্যাগনেটকে ভূমিদস্যু প্রমাণের চেষ্টা করল। তাতে তার কারবারে মোটেও টান পড়েনি বটে। জনগণ লাইন দিয়েছে প্লট কেনার জন্য। লাইনে দাঁড়াতে গিয়ে হুমড়ি খেয়েছে। সঞ্চয় দিয়েছে। ঋণ নিয়েছে। তার ওপর ম্যাগনেট এখন রাজনীতির লোকজনের সঙ্গে ভাব জমাতে শুরু করেছে। পত্রিকা খুলেছে।
জমি কেনাবেচার কারবার শুরুর আগে চেয়ারম্যানকে অংশীদার হবার প্রস্তাব দিয়েছিল ম্যাগনেট। চেয়ারম্যান রাজি হননি। কিন্তু শত্রু পুষে রাখা ত ভাল কথা না। অতএব ম্যাগনেটকে দাওয়াত দিলেন চেয়ারম্যান।
আর তিনি মান রক্ষা করলেন এই বলে যে, ‘আমাকে দোষ দেওয়া অন্যায়, ম্যাগনেট! বাঙ্গালের স্বভাব ত জানেন। ধরতে বললে বেঁধে ফেলে! উঁকি দিতে বললে সিঁধ কাটে! আমি শুধু একটু সুড়সুড়ি দিতে বলেছিলাম। কিন্তু সাংবাদিকরা আপনাকে খামচি দিতে লাগল।’
‘জানি জানি। নরম পাছা খামচাতে খুব মজা লাগে!’
‘আপনি জ্ঞানী ব্যক্তি, ম্যাগনেট!’
‘আমিও তাই ভাবছিলাম। দাওয়াত দিয়ে ভাল করেছ।’
‘ফিঙ্গেবাড়ি নিয়ে কী ভাবছেন, ম্যাগনেট?’
‘ওখানে কী হয়েছে?’
ম্যাগনেট ফিঙ্গেবাড়ি নিয়ে ভাবতে শুরু করেনি। এখন পর্যন্ত তার বেতনভোগীরাই ভাবছে যা ভাববার।
চেয়ারম্যান খাবারের টেবিলের দিকে পা বাড়ালেন। উঠোনের একপাশে চেয়ার-টেবিলে সেই বন্দোবস্ত।
অন্য অনেক খাবারের সঙ্গে আজকের প্রধান আকর্ষণ রাজকাঁকড়া। তবে বাংলায় একে কেউ কখনও ডাকেনি। সবাই বলে রেড কিং ক্র্যাব।
পৃথিবীর প্রায় কেন্দ্রস্থলে ব্যারেন্টস সাগরের হিমশীতল জলে জাহাজে করে এই মাল শিকার করে নরওয়ের জেলেরা। সেখান থেকেই বাংলাদেশে আসে। প্রধান খাদ্যাংশ এর মোটা মোটা পা। ক্র্যাব লেগ। মোটা পাটকাঠির চাইতে মোটা। লাল রাজহাঁসের গলার মত বলা চলে। এক-দেড় ফুট লম্বা। ছোট ট্রে-আকারের সাদা সিরামিক প্লেটে, একেক প্লেটে সাত-আটটা করে সাজানো রয়েছে বেক করা লেগ।
ম্যাগনেট বলল, ‘উয়াউ! তোমার সব স্পেশাল কাণ্ড! জানতাম বটে!’
‘গরিবের খাওয়াতেই সব, ম্যাগনেট! আপনার মত নিত্যনতুন ব্যবসা ফাঁদতে পারলে কে এসব খেয়েদেয়ে বেড়ায়!’
‘ঠিক বলেছ!’
ম্যাগনেট একটা লেগ নিয়ে লাঠির মত করে ধরল। ‘খাওয়ার সময় দরকার হলে এটা দিয়ে কাউকে মারও দেওয়া যায়, হুম?’
হাহা! হেহে!
ম্যাগনেট লেগটা বাঁহাতে ধরে ডান হাতে ক্র্যাকার দিয়ে ক্র্যাক করল।
ক্র্যাব খাওয়ার জন্য একগুচ্ছ টুলস রয়েছে। ক্র্যাব ক্র্যাকার, ক্র্যাব সিজার, ক্র্যাব পিকার, ইত্যাদি।
‘পোশাকের মতই এসব যন্তরপাতির বিশাল বাজার রয়েছে ইউরোপ-আমেরিকা আর জাপানে। সেই বাজার চিনের দখলে,’ একজন বলল।
এই আলোচনায় গেল না কেউ।
ম্যাগনেট কাঁচি দিয়ে কেটে পিকার দিয়ে তুলে নিল এক টুকরো সাদা শাঁস যাকে বলা হয় ক্র্যাব মিট। ঘি, রসুন ইত্যাদি দিয়ে বানানো সসে ডুবিয়ে নিয়ে মুখে পুরল ম্যাগনেট।
‘আআ! বাঙ্গালি খেয়েই মরল!’ স্বতঃস্ফূর্ত কণ্ঠে বলল ম্যাগনেট।
চেয়ারম্যান তাকে চিমটি কাটার উপায় খুঁজছিলেন। বললেন, ‘বাঙ্গালি কিচ্ছু খায় না, ম্যাগনেট! এই জিনিস এবং অন্য সবচেয়ে ভাল খাবারগুলো—সারা দুনিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি আমদানি করে ইউরোপ-আমেরিকা আর জাপান। অন্য আরো যারা আমদানি করে তাদের তালিকায় বাংলাদেশকে আতস কাঁচ দিয়েও খুঁজে পাওয়া যায় না।’
‘তুমি দেখছি গবেষক বনে গেছ!’
চেয়ারম্যান বেশ খুশি হলেন। তবে একটু পরেই তার মুখ ভার হয়ে যায়। কয়েক বছর ধরে তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে মাথা ঘামান না। বিশেষ চর্চা করেন না। বরং নানা বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়ার বাতিক হয়েছে। ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়েছেন বলেও তার ধারণা।
‘এগুলো কি খামারে হয়, মোগল?’
‘না, ম্যাগনেট। এগুলো বেরিং সাগর আর আলাস্কা উপসাগরে বেশি হয়। কিন্তু ওই এলাকার কম্পানিগুলো আমেরিকার চাহিদা মেটাতেই হিমশিম খায়। বাংলাদেশে সম্ভবত নরওয়ের ব্যারেন্টস সাগরের মালগুলোই আসে।’
‘ওটা ইউরোপে না? ওই মুলুকে জেলে আছে নাকি?’
‘নরওয়ে মাছ রপ্তানিতে সব সময় দুই-চার নম্বরে থাকে শুনেছি।’
‘কিন্তু তুমি এমন এক ব্যবস্থা করেছ যাতে বেশি না খাওয়া যায়। এভাবে মোচড়ামুচড়ি করব নাকি খাব?’
‘আপনি পেটুক আছেন তা আমি জানতাম, ম্যাগনেট!’
চেয়ারম্যান পাশের টেবিলটা দেখালেন। লম্বা লম্বা থালা অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল পেপারে মোড়ানো। যাতে ঠাণ্ডা না হয়। যদিও এগুলো এখনই তৈরি হয়েছে এবং শেষ হবার সময় আবার তৈরি হয়ে যাবে। মোড়ক খুললে দেড়-দুই ইঞ্চি করে কাটা, ফেড়ে দুই ভাগ করা টুকরোগুলো। সাদা শাঁসের ওপর লাল প্যাপরিকার গুঁড়া ছিটিয়ে আকর্ষণীয় করা হয়েছে। আরো সুস্বাদু হয়েছে। কিছু থালায় আবার ক্র্যাব টুকরোর সঙ্গে ভুনা সবজিভাত ছড়ানো। আছে বেক করা হ্যাডডক, হ্যালিবাট, ইত্যাদি সামুদ্রিক মাছ। অনেক বাঙ্গালি বরং গরু-খাসিতে বেশি স্বাদ পায়। তাদের জন্য আছে বাছুর গরুর মাংস ভুনা, তরতাজা খাসির রেজালা, ইত্যাদি। পাশেই লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রক্ত-মাংসে গড়া ডজন খানেক রোবট। অন্য আরো অনেকে এখানে-ওখানে, পানি-জুস আর ক্র্যাব কেকের ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে।
ঘণ্টা খানেকের মধ্যে অর্ধেক অতিথি এসে পড়ল। প্রায় সবাই গুলশান-বনানী-বারিধারার বাসিন্দা। অল্পকিছু ঢাকার অন্যান্য এলাকার। সবচেয়ে বেশি পুলিশ মিলিটারি আমলা। সবাই ইংলিশ বা বাংলিশ বলতে বিশেষ স্বচ্ছন্দ বোধ করে।
চেয়ারম্যান গেটের দিকে নজর রাখছিলেন। একদল সাবেক ও বর্তমান সেনাকর্তা আসতেই এগিয়ে গেলেন। তাদের বেশির ভাগই বারিধারা ডিওএইচএসের বাসিন্দা। চেয়ারম্যানের আরেক নিকট প্রতিবেশী এই ডিওএইচএস।
একজন সাবেক কর্নেল বললেন, ‘মোগল হঠাৎ করে আকাশ থেকে ভূতলে যে! কী কেস?’
আকাশ মানে পাঁচ তারা হোটেল।
চেয়ারম্যান বললেন, ‘ভূতলকে আকাশের মত বানাতে চাই, কলোনেল! তারই মহড়া চলছে!’
‘মানে কী? ব্লাডি সিভিলিয়ানদের নিয়ে—।’
বারিধারা ডিওএইচএসের প্রসঙ্গ তুললেন চেয়ারম্যান। যেখানে সবাই বড়, সুন্দর পুকুরের চারপাশে হাঁটতে-বসতে পারে। পুরো এলাকা পরিচ্ছন্ন। নিজস্ব গভীর নলকূপ থেকে নিরাপদ পানি সরবরাহ করা হয়। সব ধরনের আয়োজন নিয়ে শিশুদের জন্য রয়েছে শিক্ষা-দীক্ষা ও সাংস্কৃতিক চর্চার জোগাড়। জনসংখ্যার অনুপাতে আছে গোটা তিনেক শিশুপার্ক। তরুণদের খেলাধুলার ব্যবস্থা। দৈনন্দিন জীবন স্বচ্ছন্দ করার অন্যান্য ব্যবস্থাও আছে।
চেয়ারম্যান বললেন, ‘আপনারা সবকিছু এত সুন্দর করে গুছিয়ে রাখেন কিভাবে, কলোনেল?’
‘এসব ডিসিপ্লিন ম্যাটার করে, মোগল। ব্লাডি সিভিলিয়ান—। আপনি অনেক করাপটেড পলিটিশিয়ানকে দাওয়াত দিয়েছেন দেখছি। ব্লাডি—।’
‘গুলশানকে সুন্দর করে তুলতে আপনার পরামর্শ চাই, কলোনেল।’
‘ব্লাডি সিভিলিয়ানরা কাজ করতে পারে না। তাদের কমিউনিটি বোধ নেই। তারা স্বচ্ছতা বোঝে না।’
বারিধারা ডিওএইচএস পরিষদে কেন্দ্রীয় কমিটির অধীনে আছে ডজন খানেক সাব-কমিটি। সব কমিটির প্রায় সব সদস্য সাবেক সেনাকর্তা। কমিটিগুলো ঠিকঠাক কাজ করে। তাদের নিয়মিত বৈঠক হয়। রাস্তাঘাটের পরিমাণসহ অন্যান্য বিবেচনায় তারা ছয়তালার বেশি স্থাপনা নিষিদ্ধ করেছে ওই এলাকায়। এখন বিভিন্ন খাতে মিস্ত্রি নিয়োগ দেওয়ার চিন্তা চলছে যারা সেখানেই থাকবে। চাহিবামাত্র সবাইকে সেবা দেবে বিনা খরচে। তাদের ওয়েবসাইটে স্বচ্ছতার সঙ্গে সব তথ্য আপডেট থাকে। এলাকায় কতজন বিদেশি রয়েছে, বহিরাগতরা অনাকাঙ্ক্ষিত যাতায়াত করছে কিনা, ইত্যাদি নজরে রাখে তারা। যদিও তাদের শিশুরা যখন-তখন ঘর থেকে বের হতে পারে না। ততটা নিরাপদ হয়নি এখনও।
চেয়ারম্যান প্রসঙ্গটা তুললেন। গুলশানকে কিভাবে তেমন করে তোলা যায় সেই আলোচনায় যাওয়া তার উদ্দেশ্য। কিন্তু আলাপ এগিয়ে নিতে পারলেন না চেয়ারম্যান। কর্নেলের আগ্রহ নেই। ব্লাডি সিভিলিয়ানরা কাজ করতে পারে না।
কী আর করা।
চেয়ারম্যান ওই প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে সবাইকে তাদের প্রিয় খাবারগুলোর কাছে নিয়ে গেলেন। যেখানে ক্র্যাব ছাড়াও আছে গ্রিল করা লবস্টার। ছয় প্রকার রোস্ট করা সবজি। কচি অ্যাসপারাগাস, বেবি টমেটো, বরবটি, মাঝারি গাজর, ব্রকোলি, মিষ্টি কুমড়া।
অতিথিদের তালিকায় নাশিতাও আছে।
দাওয়াত পেয়ে সে বেশ বিপাকে পড়েছে। চেয়ারম্যানের অতিথিদের সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই। এমন পার্টি অস্বস্তিকর হতে পারে। আবার না গেলেও চলে না। আরেক বিপত্তি বাধল পোশাক নিয়ে। চেয়ারম্যানের পার্টিতে সে কেমন পোশাক পরবে। বন্ধুদের পার্টিতে ফ্যাশন ড্রেস পরে যায়। কখনও টি-শার্ট কখনও শর্ট টপস। জিনস বা সাধারণ প্যান্ট এমনকি থ্রি-কোয়ার্টার পরে চলে যায়।
চেয়ারম্যান তাকে দাওয়াত দিয়েছেন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা হিসেবে। ছয় বছরের চাকরিজীবনে এই প্রথম। বিভাগীয় প্রধান হবারও অনেক দিন পর। সেখানে দাপ্তরিক পোশাক পরে যাওয়া কি সংগত হবে। তাতে রুচিবোধের প্রশ্ন উঠতে পারে। আবার বন্ধুপার্টির পোশাকও পরা যাবে না। তাহলে যা করতে হবে সে সম্পর্কে তার ভাল ধারণা নেই।
মাইশা আবার মজা করতে লাগল, ‘এক কাজ করো। টি-শার্টের সাথে ওড়না পরো!’
‘ওহ!’
‘ওহ করতে হবে না। এটা নতুন ফ্যাশন, সখি! এতে দুই কূলই রক্ষা হবে!’
শেষ পর্যন্ত নাশিতা অফিসের পোশাকই পরল। তবে একটু অন্য রকম। ফুলহাতার বদলে হাফ হাতা ফ্লেয়ার ফিট কামিজ আর চুলগুলো ঘোড়ার লেজ না বানিয়ে পিঠের ওপর ছড়িয়ে দিল। সাথে ঘড়ি যা সে শুধু অনুষ্ঠানেই পরে। রোলেক্স লেডিজ ডেটজাস্ট ২০০৩-০৪ মডেলের। ফ্রেমের ওপরে আঠার ক্যারেট হলুদ সোনার চাকা। চাকার ওপর সাদা হিরের মালা। নাশিতার সবচেয়ে দামি উপহার। বিয়ে উপলক্ষে দিয়েছিল তার মামা। এই ঘড়ির একটা লম্বা গল্প আছে।
মামা বলেছিল, ‘তুই যা চাবি তাই পাবি।’
এর আগে নাশিতা যা চেয়েছে তা পায়নি। মামার যুক্তির সামনে সব সময়ই আপস করতে হয়েছে। কিন্তু রোলেক্স কিনতে গিয়ে ঢাকায় কোনো পরিবেশক পাওয়া গেল না। অনুমোদিত খুচরা বিক্রেতাও না। অন্য দোকানি হয়ত পুরনো মাল গছিয়ে দেবে। হয়ত নকল কিছু ধরিয়ে দেবে।
নাশিতার ভীষণ মন খারাপ।
তখন পর্যন্ত তার সিঙ্গাপুরে শপিং করতে যাওয়ার আবদারও কেউ মেটায়নি। বাবা-মামা দুইজনেরই সামর্থ্য ছিল বটে। অতটা তারল্য ছিল না। তারা যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছে, ‘এই ঢঙের কোনো মানে হয় না।’
অথচ তার সব বান্ধবী বিয়ের কেনাকাটা করেছে সিঙ্গাপুরে। এমনকি ঈদেও অনেক বন্ধু বাবা-মার সাথে সিঙ্গাপুরে কেনাকাটা করতে যায়।
মামা তার আবদার মিটিয়ে দিল।
সে সময় সিঙ্গাপুরের দোকান এই ঘড়ির দাম নিয়েছিল সাড়ে ছয় হাজার ইউএস ডলার। সেটা সে সময় রোলেক্সের সর্বনিম্ন দাম।
এটা নাশিতার একটা সেরা গল্প। এমন অনেক গল্পের পেছনে থাকে আরো নানা রকম গল্প। বাধ্য হবার গল্প। ক্ষয়ে যাবার গল্প। ইত্যাদি।
নাশিতা শেষ পর্যন্ত ঘড়িটা রেখে দিল।
মাইশা বলল, ‘ঘড়ি আবার কী দোষ করল?’
‘অনেকে পঞ্চাশ-ষাট লাখ টাকার প্যাটেক ফিলিপ্পে পরবে।’
‘অনেকে অ্যাগর-লে-কওল্টর পরবে। তাতে তোমার কী?’
নাশিতা চুপ।
‘তুমি অসুস্থ হয়ে যাচ্ছ, সখি! সেদিন একবার চেয়ারম্যানের বাড়ি যাবার পর তোমার অস্বস্তি হয়েছে। সব চিন্তাভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল। বস্তুত তুমি সুখে আছো। অফিসে বেশি সময় দেওয়া বন্ধ করো আর জীবনটা উপভোগ করো। তোমার চাকরিতে সেই সুযোগ আছে।’
‘চলো। ব্যবসা শুরু করে দিই।’
‘আমার যখন মুড হয় তখন তোমার হয় না। তোমার যখন হয় তখন আমার হয় না।’
‘আমরা কি পথ খুঁজে পাচ্ছি না নাকি একমত হতে পারছি না?’
‘একই কথা। সেই কৌতুকটার মত, হুম?’
‘কোন কৌতুকটা যেন?’
‘ওই যে ওই—চার বন্ধু ভাবল একটা ট্যাক্সি নামাবে।’
‘আমরা নামালে নিশ্চয় সব সময় তাতে বসে থাকব না। ফলে যাত্রী উঠবে। আয় হবে।’
‘তাতে যদি আমাদের মন না বসে?’
‘তাহলে ওটা আমরা সহজেই নদীতে ফেলে দিতে পারব।’
‘কিভাবে ফেলব?’
‘আমরা একজন সামনে থেকে আরেকজন পেছন থেকে ঠেলব না। এই বুদ্ধি আমাদের আছে, ঠিক?’
‘ঠিক!’
‘সেই চার বন্ধু কি এখনও ট্যাক্সিটা ফেলার চেষ্টা করছে?’
‘হা।’
‘চলো ত দেখে আসি।’
‘সকালে দেখে এসেছি। এখন চলো। তোমার পোশাক ক্ল্যাসিক। সব জায়গায় ঠিকঠাক চলে। এবং তোমাকে খুব গর্জিয়াস লাগছে।’
‘তুমিই ঠিক আছো।’
মাইশা অফিসের মতই ফুলহাতা জামা ছেড়ে পরেছে। আর জিনস আর লেডিজ জুতো। তার অফিসে আরো এক তরুণী এমন পোশাক পরে।
নাশিতা সালোয়ার-কামিজ বাদ দিয়ে মাইশার মত তৈরি হয়ে গেল। মতিঝিলের অফিসে পরলে উত্ত্যক্ত হতে হয় বলে পরে না।
মাইশা বলে, ‘শুধু মতিঝিল কেন? গুলশানের দিকে তাকাও। আমাদের বেশির ভাগ বন্ধু ফ্রি ছিল। আমাদের পরের প্রজন্মও মোটামুটি ছিল। কিন্তু এখন যারা উনিশ-কুড়ি—।’
‘এখন হাত-পা আচ্ছামত বেঁধে তারপর রোকেয়া দিবস পালন করতে যায়। সেই সাথে প্রগতিশীলতার পতাকাও ওড়ায়।’
‘হা হা হা! রংপুরের ওই মুক্তজীবনের স্বপ্ন দেখা নারীটার কথা বলছ নাকি, সখি? হা হা হা!’
‘হাহা করো কিভাবে? একটা মুহূর্তও আর এখানে থাকতে ইচ্ছে করে না।’
‘হা হা হা! বনানীর আমগাছগুলো তোমাকে কোথাও যেতে দিল না। একে একে প্রায় সব কাটা পড়ছে জেনেও না। তারপর যেগুলো থাকল সেগুলো স্কাইস্ক্রেফাকারে ঢাকা পড়ার পরও না। হা হা হা!’
‘হাহা কোরো না। চলো। সবাই এতক্ষণে ফিরতে শুরু করল।’
‘দুশ্চিন্তা নেই। তোমার চেয়ারম্যান আমাদের জন্য বসে থাকবে।’
গেট পার হতেই নাশিতা স্বস্তির দম ফেলল। তাদের মতই গেটআপ-মেকআপে আছে একদল তরুণী। কয়েকজন ইউরোপিয়ান। চেহারা দেখে অনুমান করল নাশিতা। দেশিরা পরেছে শাড়ি, কামিজ, শর্ট টপস, শার্ট, টি-শার্ট। এক সুন্দরীর হাফহাতা কামিজের কাঁধের ওপর বড় বড় লাল টমেটো। কয়েকজন ওড়না ছাড়া। অন্যরা পরেছে বগলে, বুকে, এবং পিঠেও। একজন আবার মাফলারের মত গলায় পেঁচিয়ে এক মুড়ো সামনে আরেক মুড়ো পাছে ঝুলিয়ে দিয়েছে।
মাইশা বলল, ‘এরা কারা?’
‘কাউকে চিনতে পারছ না?’
নাশিতা কয়েকজনকে চেনে। তেমন আলাপ নেই বটে।
কোয়েলি কয়েকজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। যাদের মধ্যে আছে কয়েকটি দূতাবাসের সিনিয়র অফিসার, জাতিসংঘসহ আরো কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা।
চেয়ারম্যান যাদের সঙ্গে পরিচিত হন তারা কাজের মনে হলে দাওয়াত দেন। সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। এটা গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। নাশিতাকে একজন কাজের লোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন চেয়ারম্যান।
‘অ্যাম কোল্টন স্মিথ,’ লোকটা নাশিতার সাথে হ্যান্ডশেক করল।
নাশিতা পরিচয় দিলে কোল্টন বলল, সে পিপিসি নামে আমেরিকান এক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি। সব ধরনের প্রোডাকশন প্লান্ট স্থাপনের যাবতীয় পরামর্শ দেয় পিপিসি। সেই প্লান্টের একদিকে কাঁচামাল দিলে অন্যদিক দিয়ে প্যাকেটজাত হয়ে পণ্য বের হয়। খাবার সুতো যন্ত্রাংশ ইত্যাদি।
নাশিতা হাসতে হাসতে বলল, ‘সব কাজ যন্ত্র করে দিলে মানুষ কী করবে?’
কোল্টনও হাসতে হাসতে বলল, ‘মানুষ যন্ত্র তৈরি করবে। রোবট সফটওয়্যার ইত্যাদি।’
‘ঢাকায় তোমার অফিস আছে?’
‘না। আমরা দিল্লির অফিস থেকে দক্ষিণ এশিয়া কভার করছি। মাঝে মাঝে ঢাকায় আসি।’
‘বাংলাদেশে তোমরা ইতিমধ্যে কোনো কাজ করেছ?’
‘এখন পর্যন্ত আমরা শুধু কয়েকটা ওষুধ প্লান্টের কাজ করেছি। আর একটা সুতোর কারখানার নকশার কাজ চলছে।’
‘নতুন প্রতিষ্ঠান?’
‘আমাদের বয়স প্রায় বিশ বছর। কাজ শুরু করেছিলাম ইউরোপ-আমেরিকায়। বছর পাঁচেক আগে ভারতে এসেছি। বাংলাদেশে বছর খানেক।’
তারা বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইমেইলে যোগাযোগ করে দেখা করতে চায়। কোনো উদ্যোক্তা দেখা করতে রাজি হলেই অফিসে হাজির হয়। তারপর বুঝিয়ে দেয় যে, তাদের এটা করা উচিত। করলে তাদের ভাল হবে। ইত্যাদি।
কোল্টন বলল, ‘পোশাক কারখানাও স্বয়ংক্রিয় হতে চলেছে। সেখানে কাটিং ম্যানের পদ বিলুপ্ত হবে। হেল্পারদের আর কাপড়ের বোঝা ঘাড়ে করতে হবে না। কার্টন কাউকে মাথায় করতে হবে না। সব চলবে কনভেয়ার বেল্ট দিয়ে। ওষুধ ও খাবারসহ অনেক কারখানায় সেটা আমরা ইতিমধ্যেই বাস্তবায়ন করেছি।’
নাশিতার এসব কথায় ভক্তি নেই। এরই মধ্যে তার দুই ব্যবসায়ী বন্ধু এসে পড়ল। বন্ধুদের দেখে নাশিতা যারপরনাই অবাক। এবং খুশি।
দুই বন্ধুর অংশীদারি কারবার রয়েছে যারা চিন থেকে র্যাক্সিন আমদানি করে। তারা এখন দেশে কারখানা দেওয়ার চিন্তা করছে। আর চেয়ারম্যান সেখানে বিনিয়োগ করতে চান।
এক ব্যবসায়ী বন্ধু বলল, ‘তোমার চেয়ারম্যান নাকি সব স্পেশাল পার্টি দেয় শুনেছি। চলো দেখি। খাবার দেখলেই বোঝা যাবে, হুম?’
‘হুম!’
খাবারের টেবিলে গিয়েই বন্ধু বলল, ‘উয়াউ! কিং ক্র্যাব! ঢাকায় এগুলো আছে নাকি?’
‘না থাকলে কোত্থেকে আসল? আমাকে একদিন এক বিক্রয়কর্মী দিতে চেয়েছিল।’
‘বাজারে ত দেখি না।’
‘এমন করে কথা বলছ যেন বাজারে তুমি সবকিছু কিনতে পাও।’
‘স্পেশাল অর্ডার হয়ে থাকবে, হুম?’
এক পরিচারক বলল, তারাও তাদের মেনুতে এগুলো যোগ করবে শিগগিরই।
মাইশা বলল, ‘কয়দিন পরেই ত মারা যাব। নতুন রেস্তোরাঁগুলো আমাদের মিস করা উচিত না। কী বলো, সখি?’
‘তুমি ত সব ঠিকই বলো। কিন্তু আমি কয়দিন পরেই মরতে চাই না। এখনও দুনিয়ার কিছুই দেখা হল না।’
‘দেখবা কী করে? চাকরগিরি করতে করতেই ত জীবন শেষ!’
‘আবার একটা ঠিক কথা বললে। এত ঠিক কথা বলে না, সখি। যত ঠিক তত ফাঁকি।’
নাশিতা ক্র্যাব পিকারে হাত দিয়ে থামল। তাকাল আশপাশে।
এই রেস্তোরাঁয় অনেকগুলো রুম রয়েছে। কে কোথায় কী করছে একটু দেখে নেওয়া যাক। এক রুমে বসানো হয়েছে আইসক্রিম পার্লার। গ্যালারি করে সাজানো ত্রিশ পদের আইসক্রিম। যার যেটা পছন্দ। আরেক রুমে ঢুঁ মারতেই সবার মন-প্রাণ ফুরফুর করে উঠল। এই রুমে সব খাবারের সঙ্গে রয়েছে ফ্রাঞ্চের সুদর্শন মদিরা। লুইস রোয়েদারার সোনালি ‘ক্রিস্টাল রোজ’ আর হুগেলের কচি সবুজ ‘পি-নট গ্রিজ’। সামুদ্রিক মাছের সঙ্গে বিশেষ উপাদেয়।
নাশিতা একটা লম্বা ‘ক্র্যাব লেগ’ আর ক্র্যাকার তুলতেই এক বন্ধু বলল, ‘মানুষ যে এখনও বুনো আছে তা তোমাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে।’
‘কে বলছে? বার্গার না হলে যার লাঞ্চ হয় না?’
চার-পাঁচ স্তরে সাজানো বিপুলকায় বার্গার দুই হাতে চেপে ধরে কামড়ে কামড়ে খাওয়ার সময় অসতর্ক হলেই মুখে মাখে। তার জন্য অবশ্য সুগন্ধী টিস্যু আছে। ঠোঁটের কানা বা নাকের ডগা আলতো করে মুছে ফেললেই হয়। তারপর আরো কয় ঘণ্টা তার সুঘ্রাণ শোঁকা যায়। তা নিয়ে আবার মজাও করা যায়।
নাশিতা বলল, ‘খাবার-দাবারে চিন-জাপানই স্মার্ট।’
‘কিন্তু আঙ্গুল চেটে না খাইলে খাবারের স্বাদ বোঝা যায় না যে, এটা ত বোঝ, তাই না?’
‘হা। ত?’
‘তাহলে তাদের আমি স্মার্ট বলতে রাজি না!’ আঙ্গুল চেটে বলল বন্ধু রাকাত উললা। তারপর লম্বা স্বচ্ছ গবলেটে ‘ক্রিস্টাল রোজ’ নিয়ে নাচে যোগ দিল। নাচ মানে তিন-চারজনের ছোট ছোট দল সামনা-সামনি দাঁড়িয়ে হাঁটু বাঁকিয়ে একটু নিচু হওয়া একটু উঁচু হওয়া। মাঝে মাঝে কাঁধ, মাঝে মাঝে কোমর ডানে-বাঁয়ে একটু হেলানো-দোলানো।
এই নাচ আসল নাচ না। এ হল মদিরা পানের পার্টি কেতা।
রাকাত গবলেট রেখে বলল, ‘চলো নাচি।’
নাশিতার তিনজন ছেলেবন্ধু বেশ নাচতে পারে। রাকাত তাদের একজন। শৈশবে একসঙ্গে শিখেছিল।
রাকাত বলল, ‘ছাছা?’
‘ওকে!’
কয়েক রকম বলরুম নাচের মধ্যে ছাছা একটা। ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের অবধারিত অঙ্গ বলরুম নাচ।
মিনিট চারেক নাচার পর নাশিতা বলল, ‘গুলশানে একটা ডান্স ক্লাব দাও। আলিয়ঁস ফ্রসেঁজে যোগাযোগ করলে টিচার পাবে।’
‘চলবে না। এখানে দিন দিন সবাই কুয়োর ব্যাঙ হয়ে যাচ্ছে। এত দিনে এখানে দুচারটা ভাল একাডেমি গড়ে উঠতে পারত না?’
‘আমরা শুরু করতে পারি।’
‘ধাক্কা খাবা। তখন খারাপ লাগবে। বাঙ্গালের যা দৃষ্টিভঙ্গি, তাতে—। দেখেছ ত যে, শোষণ, ভণ্ডামি, ঘুস, দুর্নীতি—সারাজীবন সবকিছু করে বেড়ায়। আর ডিস্কো ক্লাবের নাম শুনলেই তাদের মাথায় রক্ত চড়ে যায়।’
‘সেজন্যই ত আমাদের শুরু করতে হবে। ডিস্কো ক্লাবের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও কিন্তু বিরাট। এখানে বিশাল একটা বাজার রয়েছে। সেটা এখনও সম্পূর্ণ ফাঁকা।’
বিদেশিরা সবাই বলরুম নাচে যোগ দিল। দেশি জুনিয়ররাও প্রায় সবাই আর দেশি কয়েকজন সিনিয়রও। তাদের একজন হাদিউল চৌধুরী যার এখন সাতান্ন চলছে। নাশিতার সামনে গিয়ে বলল, ‘বাঙ্গালি এত সুন্দর ছাছা পারে! তোমাকে না দেখলে জানতাম না।’
‘একজনকে দেখেই পুরো বাঙ্গালির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন?’
‘উয়াউ! তোমার সঙ্গে চিন্তা করে কথা বলতে হবে দেখছি!’
‘আমি কিন্তু জানি না আমার ঠিকমত হয় কিনা।’
‘আসো, তোমাকে একটা জিনিস শিখিয়ে দিই!’
মাইশা আর অন্য জুনিয়র সবাই রক অ্যান্ড রোল শুরু করল। সঙ্গে আমেরিকান ইংরেজি গান। সাউন্ড সিস্টেমে। গত বছর প্রকাশিত ‘পার্টি রক অ্যানথেম’ ঘুরেফিরে আসতে লাগল। ফাঁকে ফাঁকে হিন্দি।
পাশের রুমে চলছে স্থানীয় পেশাদার শিল্পীদের গানবাজনা। ইভেন্ট ম্যানেজার এক মাস ধরে বেছে এনেছে সুকণ্ঠী একদল গায়ক-গায়িকা। অতিথিরা রুমে আর রুমের বাইরে মদিরা হাতে দাঁড়িয়ে। গান শুনছে। গপসপ করছে। কোটগুলো খুলে ঝুলিয়ে রেখেছে চেয়ারের পিঠে।
চেয়ারম্যানের মুখ ভার হয়ে আছে। উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে সেলফোন টেপাটিপি করছেন। নেট ঘাঁটাঘাটি করে হয়রান হচ্ছেন।
ব্যাপারটা আসলে এই, পার্টিতে নাচের আয়োজন ছিল। মনিপুরি নাচ। সেখানে ইভেন্ট ম্যানেজার যে ব্যবস্থা করেছিল তা না আধুনিক না নান্দনিক। চেয়ারম্যানের অতিথিরা মুখ টিপে হেসেছে সেই নাচ দেখে। যেখানে তারা জানত বাঙ্গালি নাচটাচ যা করে তা এমনি এক ম্যাদমেদে বস্তু। অথবা স্থূল। অথবা অশ্লীল। যেখানে তাদের চোখের সামনে হাজির থাকে নিখুঁত অপেরা ব্যালে রক পপ ইত্যাদি। আর তাদের আধুনিক নাচের বৈচিত্র্যের ত সংখ্যা নেই। বহুল চর্চিত, বিক্রিত, প্রচারিত এসব বস্তু তারা দেখে দলবেঁধে। ইউরোপ-আমেরিকায় সুদর্শন হলে বসে।
চেয়ারম্যান তা জানতেন। আর তিনি জানতেন যে, মনিপুরি নাচও এক অসাধারণ জিনিস। দিশি জিনিস। যা ভারতীয় নাচ তাই দিশি নাচ তা ঠিক। চেয়ারম্যান একবার দিল্লি গিয়ে সেই মনিপুরি নাচ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। সে ছিল তিন তরুণীর দলীয় নাচ। পেঁচিয়ে পরা সবুজ লুঙ্গির ওপর কালো ব্লাউজ। কোমরে লাল গামছা শাপলার মত করে বাঁধা। সবার আকার ছিল প্রায় একরকম। মনিপুরি গানের সঙ্গে তারা যেন শ্রাবণী ধানগাছের মত দুলছিল। বাতাসে ঢেউ হচ্ছিল। সবুজ নদী দোল খাচ্ছিল। নাচের মুদ্রায় তিনটি পা একসঙ্গে উঁচু করা আবার মাটিতে ফিরিয়ে আনার যে ছন্দময়তা, আর তাদের লাফ দেওয়ার ভঙ্গি, বাঁকা হবার কায়দা, মোড় নেওয়া, অথবা হাত ঘোরানো—চেয়ারম্যানের মনে হল জীবনে তিনি প্রথম নাচ দেখলেন। সেই নাচে একটা গল্প ছিল। গল্পটা মধুর লয়ে ছবি হয়ে ভেসে উঠছিল। যেন তুলির আঁচড়ে আঁচড়ে একটা চিত্রকর্ম একটু করে তৈরি হয়েছিল শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। চেয়ারম্যান মনে করলেন দুনিয়ায় একমাত্র মনিপুরি নাচেই প্রাণ আছে। মাধুর্য আছে। তিনি তার বিদেশমুগ্ধ বন্ধুদের এই নাচ উপহার দিতে চাইলেন।
চেয়ারম্যান জানতেন না যে, সেই মনিপুরির সঙ্গে আধুনিক নাচের মিশেল ছিল। পেছনে ভাল কোরিওগ্রাফার ছিল। পরিচালক ছিল। আধুনিকতার মিশ্রণ যেন স্থূল না হয় সেজন্য ভরতনাট্যমের সূক্ষ্মতা, নান্দনিকতার কথা তারা গুরুত্ব সহকারে মনে রেখেছিল। এবং তারা কয়েক মাস রিহার্সেল করে তবেই মঞ্চে উঠেছিল।
চেয়ারম্যান এও জানতেন না যে, বাংলাদেশে নাচ চর্চা বলতে যা হয় তা নামমাত্র। অত্যন্ত ক্ষীণ পরিসরে এবং দুর্বলভাবে। অতিথিরা হাসার পর চেয়ারম্যান ছায়ানট, উদীচী, শিল্পকলা একাডেমিতে খোঁজ নেওয়ার কথা ভাবলেন।
পার্টিতে চেয়ারম্যানের কয়েকজন শিক্ষক বন্ধু আছে। একটা পত্রিকার সম্পাদক আছে। চেয়ারম্যান তাদের সঙ্গে কথা বলার কথা ভাবলেন।
তার আগে চেয়ারপত্নী বললেন, ‘হঠাৎ করে এই বাতিক হল কেন? বুড়োকালে ভিমরতি হয়েছে, হুম? জোয়ান মেয়েদের এনে—!’
চেয়ারম্যানের মুখ আরো ভার হয়ে উঠল।
পত্নী বললেন, ‘লোকজন হাসছে যে—এখন কেমন লাগছে?’
চেয়ারম্যান চুপচাপ চিন্তা করতে লাগলেন।
ছোট শালা বলল, ‘দুশ্চিন্তার কিছু নেই, দুলোভাই! লোক হাসানো মোটেও সহজ কাজ না।’
চেয়ারম্যান মুখ তুললেন। শালা কি ঠাট্টা করছে নাকি সত্যি বলছে বোঝার চেষ্টা।
শালা তার সেলফোনে অনলাইনে একটা ভিডিও দেখাল। ‘দুলোভাই! আপনি কি এমন কিছুর কথা ভাবছিলেন?’
‘ঠিক ধরেছ! আমিও অনলাইনে খোঁজার কথা ভাবছিলাম।’
‘আপনি আগে আমাকে বললেই কিন্তু ফাটাফাটি হয়ে যেত!’
‘কিভাবে?’
‘খুবই সহজ। ভারতের মনিপুর থেকে একটা পেশাদার নাচের দল আমদানি করলেই বাজিমাত। আর সেই দায়িত্বটা যদি র্যাডিসন ব্লুকে দেন! তাদের শুধু বললেই হবে। তারা করবে যা করার।’
‘র্যাডিসন এসব করে নাকি?’
‘ঠিক এমন কিছু তারা কখনও করেছে কিনা জানি না। তবে এটা জানি যে, অনুষ্ঠান বিষয়ে তারা বলে থাকে যে, কল্পনাকে বাস্তবে ধরে দেয়ার দায়িত্ব তাদের।’
চেয়ারম্যানের মন-পরান ফুরফুর করে উঠল। আপনমনে হাসলেন তিনি। কিছুদিন পরে তাহলে তাই করবেন। এবার অনুষ্ঠানের আগে তিনি পারফরমেন্সও দেখে নেবেন।
স্বস্ত মনে মন্ত্রীদের সঙ্গে কাজের কথা শুরু করলেন চেয়ারম্যান।
পার্টিতে ছয়-সাতজন সাবেক-বর্তমান মন্ত্রী-এমপি আছেন। একজন সিনিয়র মন্ত্রী আর একজন জুনিয়র মন্ত্রী আছেন।
মন্ত্রী বললেন, ‘আরে! মোগল যে! আমরা ভাবছিলাম যে কী ব্যাপার—মোগল আমাদের দাওয়াত দিয়ে কই হারিয়ে গেলেন।’
‘সবাই এত খুশি কেন?’
‘আপনি দাওয়াত দিলেই মন খুশি হয়ে যায়, মোগল!’
‘আমি ফিঙ্গেবাড়ি নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। হচ্ছেটা কী ওখানে?’
‘কী হচ্ছে—একটা কৌতুক মনে পড়ল। নেটে পড়েছিলাম।’
একদল অতিথি কৌতুক ভরে ঘিরে ধরল মন্ত্রীকে।
মন্ত্রী বললেন, ‘কৌতুকটা হল—একজন সফল ব্যবসায়ী আর একজন এইডস রোগী কী করে?’
‘কী করে?’
‘উভয়ই ঝুঁকি নেয় এবং পজিটিভ রেজাল্ট পায়!’
হাহা! হোহো!
চেয়ারম্যানের মুখ আরো ভার হল। তিনি বুঝতে পারলেন না কারখানা বন্ধ করে ব্যবসায়ীরা কী ঝুঁকি নিল আর কী পজিটিভ রেজাল্ট তারা পাবে। মন্ত্রী রাজনীতির ময়দানের মত চাপা দিলেন বলে মনে করলেন চেয়ারম্যান। তবে তিনি কিছু বলতে গিয়েও বললেন না। কারখানা বন্ধ করা হয়ত একটা চাল। যে ব্যবসায়ী নেতারা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের অনেকেই তুখোড় রাজনীতিক। মন্ত্রী-এমপিদের মধ্যেও অনেক ব্যবসায়ী রয়েছে। ফিঙ্গেবাড়ি আছে তাদের কারখানা।
মন্ত্রী বললেন, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে, মোগল! সকালেই সব কারখানা খুলে যাবে ইনশাললাহ!’
‘নিরাপত্তার কী হাল?’
‘খুব ভাল। দেখি। এখন আবার একবার আপডেট নিচ্ছি।’
মন্ত্রী প্যান্টের পকেট থেকে সেলফোন বের করলেন। ফিঙ্গেবাড়ি শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপারকে কল করবেন।
চেয়ারম্যান তবু খুশি হতে পারলেন না। তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীকে দাওয়াত দিয়েছেন যারা তার সুপরিচিত। সেই ব্যবসায়ীদের কপালে এখনও কলঙ্কচিহ্ন পড়েনি। অন্তত মিডিয়ায় আসেনি। তারা কেউ পার্টিতে আসল না। আসার আর সময়ও নেই।
আসছে ► ত্রয়োবিংশ পর্ব



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন