দ্য গ্রেট গ্যাটসবি || পঞ্চম অধ্যায় || এফ. স্কট ফিটজেরাল্ড
দ্য গ্রেট গ্যাটসবি || পঞ্চম অধ্যায় || এফ. স্কট ফিটজেরাল্ড
পড়ুন || ►প্রথম অধ্যায় || ►দ্বিতীয় অধ্যায় || ►তৃতীয় অধ্যায় || ►চতৃর্থ অধ্যায়
অনুবাদ || লায়লা ফারজানা
সেই রাতে ওয়েস্ট এগে ফিরে মুহূর্তের জন্য ঘাবড়ে গিয়েছিলাম যে বাসায় আগুন লেগেছে। রাত দুটো, প্রজ্বলিত উপদ্বীপের পুরো কোণটি আলোয় ঝলসে ঝোপঝাড়ের উপর সৃষ্টি করেছিল এক অবাস্তব বিমূর্ত পরিবেশ, রাস্তার পাশে ঝুলন্ত তারগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছিল লম্বাটে নরম আভা। মোড় ঘুরতেই দেখি সেলার থেকে টাওয়ার পর্যন্ত আলোকিত—গ্যাটসবির বাড়ি।
প্রথমে ভেবেছিলাম আরেকটি পার্টি; বন্যপথে নিজেকে “হাইড-অ্যান্ড-গো-সিক” নয়তো “সার্ডিনস-ইন-দ্য-বক্স”-এ মীমাংসা করেছে, আর খেলার জন্য উন্মুক্ত করেছে সমস্ত বাড়ি। কিন্তু কোন আওয়াজ ছিল না। কেবল গাছের আড়ালে বাতাসে তারগুলো উড়ছিল, আর আলোগুলো এমনভাবে নিভছিল জ্বলছিল যেন পুরো বাড়িটি অন্ধকারে চোখ মিট মিট করছে। ট্যাক্সিটা হাহাকার করে চলে যেতেই লক্ষ্য করলাম লন পেরিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে গ্যাটসবি।
“তোমার বাড়িকে “ওয়ার্ল্ড ফেয়ারের”১ মতো লাগছে,” আমি বললাম।
“তাই নাকি?” উদাসীনভাবে নিজের বাড়ির দিকে চোখ বুলাল সে। “আমি মাত্র কয়েকটা ঘর দেখেছি। চল পুরোনো খেলার সাথী, আজ আমার গাড়িতে কোনি আইল্যান্ড২ ঘুরে আসি।”
“খুব দেরি হয়ে গেছে।”
“আচ্ছা, ধরো যদি আজ আমরা সুইমিং পুলে ডুব দিই? সারা গ্রীষ্মে একবারও ডুব দিইনি।”
“আমাকে ঘুমাতে হবে।”
“আচ্ছা ঠিক আছে।”
চাপা আগ্রহে, আমার দিকে তাকিয়ে ছিল সে।
“আমি কথা বলেছি, মিস বেকারের সাথে,” বললাম, “আগামীকালের মধ্যেই ডেইজিকে চায়ের নিমন্ত্রণ জানিয়ে দিব।”
“ওহ, ঠিক আছে,” নির্লিপ্তভাবে বলে সে। “কিন্তু আমি তোমাকে কোনো সমস্যায় ফেলতে চাই না।”
“কোন দিন তোমার জন্য ভাল হয়?”
“কোন দিন তোমার জন্য ভাল হয়?” সে আমাকে দ্রুত সংশোধন করে, “আমি আসলেই তোমাকে কোনো ঝামেলায় ফেলতে চাই না, তুমি ভেবে দেখো।”
“পরশু কেমন হয়?”
সে কিছুক্ষণ ভেবে অনাগ্রহের সাথে বলে: “ঘাসগুলো কাটা দরকার।”
আমরা দুজনেই ঘাসের দিকে তাকাই—সেখানে আমার ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন লনের শেষ আর তার প্রগাঢ়, যত্নে বেড়ে ওঠা বিস্তৃত লনের শুরুতে একটি তীক্ষ্ণ বিভাজন রেখা—দৃশ্যমান। সন্দেহ হল, সে বুঝি আমার লনের ঘাসকেই বোঝাতে চাইছে।
“আরেকটা ছোট ব্যাপার,” ইতস্তত করে অনিশ্চিতভাবে বলে সে।
“তুমি কি এটাকে কয়েক দিনের জন্য বন্ধ করে দিতে চাও?” আমি জিজ্ঞেস করি।
“ওহ, না না এ বিষয়ে নয়। অন্তত—” শুরু করার আগেই একের পর এক তার কথাগুলো জড়িয়ে যেতে থাকে।
“কেন, আমি ভাবলাম—কেন, আচ্ছা আমাকে একটা কথা বল, দেখো পুরোনো খেলার সাথী, তুমিতো খুব একটা বেশি উপার্জন কর না, তাই না?”
“না, খুব বেশি না।”
তাকে আশ্বস্ত মনে হল এবং ততোধিক আত্মবিশ্বাসের সাথে সে বলল—“আমিও ভেবেছিলাম যে তুমি কর না, যদি তুমি আমাকে ক্ষমা কর—তবে দেখ, আমি পাশাপাশি একটা সামান্য ব্যবসা চালাই, এক ধরনের সাইডলাইন, তুমি বুঝতে পারছ? আমি ভাবছিলাম তুমি যদি খুব বেশি উপার্জন না কর—তুমি তো বন্ড বিক্রি কর, তাই না পুরোনো খেলার সাথী?”
“করার চেষ্টা করি।”
“ঠিক আছে, তাহলে এতে তোমার আগ্রহ হবে। বিষয়টা তোমার বেশি সময় নেবে না এবং তুমি বেশ ভালো অংকের কিছু টাকা তুলে আনতে পারবে। বিষয়টি বরং একটু গোপন।”
উপলব্ধি করলাম ভিন্ন পরিস্থিতিতে আমাদের এই কথোপকথন আমার জীবনের অন্যতম সংকটের কারণ হতে পারে। যেহেতু প্রস্তাবটি কৌশলহীনভাবে একটি বিশেষ কাজ সম্পাদনের উদ্দেশ্যে, তাই গোড়াতেই ছেটে ফেলা ছাড়া আমার কোন উপায় ছিল না।
“আমার দুহাত ভর্তি,” আমি বললাম। “আমি বিশেষ কৃতজ্ঞ কিন্তু আমার পক্ষে এখন নতুন কাজ নেয়া সম্ভব নয়।”
“তোমাকে উলফশিয়ামের সাথে কিছু করতে হবে না।”
স্পষ্টতই সে ভেবেছিল আমি লাঞ্চে উল্লিখিত “গনেগশন” থেকে দূরে থাকতে চাচ্ছি, তাকে আশ্বস্ত করলাম ব্যাপারটি আসলে তা নয়।
তবুও আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল সে; হয়ত এই আশায় যে আমি কোনো আলাপ শুরু করব, কিন্তু আমি ততটাই আত্মনিমগ্ন ছিলাম। সারা না পেয়ে অনিচ্ছাসত্বেও সে বাড়ি ফিরে যায়।
আমি হালকা ফুরফুরে মেজাজে ছিলাম সেই সন্ধ্যায়; সম্ভবত সে কারণেই সদর দরজা পার হয়েই গভীর ঘুমে তলিয়ে যাই। গ্যাটসবি কোনি আইল্যন্ডে গিয়েছিল কিনা, কিম্বা কত ঘণ্টার জন্যই বা তার বাড়ির প্রজ্বলিত ঘরগুলোর দিকে তাকিয়েছিল, জানা হয় না আমার। পরদিন সকালে অফিস থেকে আমি ডেইজিকে ফোন করে চায়ের নিমন্ত্রণ জানাই।
“টমকে এনো না কিন্তু” আমি তাকে সতর্ক করলাম।
“কি?”
“টমকে এনো না।”
“টম” কে?” সে নির্দোষভাবে প্রশ্ন করে।
যেদিন ঠিক হল, সেদিন ছিল ঝুম বৃষ্টি। এগারোটার দিকে রেইন-কোট পড়া এক লোক লন-মোয়ার৩ টানতে টানতে আমার সামনের দরজায় টোকা দেয়, জানায় মিস্টার গ্যাটসবি তাকে ঘাস কাটতে পাঠিয়েছে। তক্ষুনি আমার মনে পড়ে যায়, আমি আমার ফিনকে (ফিনিশ রাঁধুনি) বলতে ভুলে গেছি, কুয়াশা-ধোয়া সাদা অলিগলিতে গাড়ি চালিয়ে—ওয়েস্ট এগ গ্রামে আমি তাকে খুঁজতে বের হই, কিছু চায়ের কাপ, লেবু আর ফুল কেনার উদ্দেশ্য নিয়েও।
ফুলগুলোর আসলে কোন দরকারই ছিল না, কারণ দুপুর দুটো নাগাদ গ্যাটসবির কাছ থেকে আসে অসংখ্য আধারযুক্ত, গোটা এক গ্রিন-হাউস। এক ঘণ্টা বাদে ঘাবড়ে যাওয়া সদর দরজা ঠেলে, সাদা ফ্ল্যানেল স্যুট, রূপালি শার্ট আর সোনালী টাইয়ে দ্রুত ঘরে ঢোকে গ্যাটসবি। ফ্যাকাশে চেহারা, চোখের নীচে অনিদ্রাজনিত অন্ধকারের চিহ্ন।
“সব ঠিক আছে তো?” ঢুকেই জিজ্ঞেস করে।
“ঘাস দেখতে ঠিক লাগছে, যদি তুমি সেটাই জানতে চাও।”
“কিসের ঘাস?” সে নির্বাক হয়ে প্রশ্ন করে। “ওহ, উঠানের ঘাস।” সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়, যদিও তার অভিব্যক্তি বিচার করে আমার মনে হয়নি সে আদৌ কিছু দেখেছে।
“খুব ভালো লাগছে,” অস্পষ্টভাবে মন্তব্য করে সে। “একটা দৈনিক কাগজ বলছে সম্ভবত চারটা নাগাদ বৃষ্টি থামবে। মনে হয় ‘দ্য জার্নাল’। চায়ের জন্য যাবতীয় যা যা প্রয়োজন সব কাছে আছে তো?”
তাকে আমি প্যান্ট্রিতে নিয়ে যাই, সে ফিনের দিকে কিছুটা তিরস্কারপূর্ণ নজরে তাকায়। সেখানে আমাদের একসাথে দোকান থেকে যাচাই করে নিয়ে আসা বারোটি লেমন-কেক।
“এগুলো চলবে তো?” আমি জানতে চাইলাম।
“অবশ্যই চলবে! ভালোই তো!” তারপর ফাঁপাভাবে যোগ করে, “...পুরোনো খেলার সাথী।”
সাড়ে তিনটা নাগাদ ঠাণ্ডা হয়ে আসা বৃষ্টির ছড়িয়ে দেয়া স্যাঁতসেঁতে কুয়াশায় হালকা বৃষ্টির ফোঁটা শিশিরের মতো সাঁতার কাটতে থাকে।
বাইরে কোন অদৃশ্য উদ্বেগজনক ঘটনার শংকায়, রান্নাঘরের মেঝে কাঁপানো ফিনিশ পদধ্বনিতে শুরু গ্যাটসবির শূন্যদৃষ্টি ক্লের৪ “অর্থরনীতি”র অনুলিপি থেকে ক্ষণে ক্ষণে ঝাপসা জানালার দিকে উঁকি দিচ্ছিল। অবশেষে একসময় উঠে পড়ে অনিশ্চিত কণ্ঠে সে বলে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে।
“কেন?”
“আজ চায়ে কেউ আসবে না। অনেক দেরি হয়ে গেছে!” সে ঘড়ির দিকে তাকায় যেন অন্য কোথাও যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। “আমিতো আর সারাদিন অপেক্ষা করতে পারব না।”
“বোকার মত আচরণ করো না; চারটা বাজতে এখনও দুই মিনিট বাকি।”
সে এমনভাবে ধপ করে বসে, যেন আমি তাকে ধাক্কা দিয়ে বসিয়েছি, একই সাথে আমার গলিতে গাড়ি ঘোরানোর শব্দ পাওয়া যায়। দুজনেই লাফিয়ে উঠি, কিছুটা হয়রান হয়েই আমি উঠানের দিকে রওনা হই।
ঝরা লাইলাকের শূন্য গাছের নীচে বড় ছাদ-খোলা একটি গাড়ি এগিয়ে এসে থামে। ল্যাভেন্ডার রঙা ত্রিভুজাকৃতি টুপির নিচে ডেইজির পাশ ফেরা মুখ, উজ্জ্বল আনন্দময় হাসিতে আমার দিকে তাকায়।
“তাহলে তুমি ঠিক এখানেই থাক, প্রিয়তম?”
বৃষ্টিতে তার কণ্ঠের উচ্ছ্বসিত তরঙ্গ যেন এক বন্য টনিক। কোনো অর্থ না বুঝেই আমি কিছুক্ষণ কেবল তার উচ্চারিত শব্দের অনুরণনকে অনুসরণ করছিলাম, তাল মিলিয়ে আমার কান কখনও উপরে, কখনও নীচে। তার গাল জুড়ে নীল রঙের রেখার মতো পড়েছিল ভেঁজা চুলের একটি গুচ্ছ আর চকচকে জলবিন্দুতে তার ভেঁজা হাত ধরে আমি তাকে গাড়ি থেকে নামতে সাহায্য করি।
“তুমি কি আমার প্রেমে পড়েছো,” ফিস ফিস করে আমার কানে কানে বলে সে। “তা না হলে আমাকে একা আসতে হল কেন?”
“এটা ক্যাসেল রেকরেন্টের৫ রহস্য। তুমি তোমার চালককে বলো দূরে কোথাও গিয়ে এক ঘণ্টা সময় কাটিয়ে আসুক।”
“এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে এসো, ফার্ডি।” তারপর গম্ভীরভাবে বিড়বিড় করে জানায়, “তার নাম ফার্ডি।”
“পেট্রল আবার তার নাকে প্রভাব ফেলবে না তো?”
“আমি তা মনে করি না,” সে নির্দোষভাবে বলে।
“কিন্তু কেন?”
আমরা ভিতরে এলে আমার অপ্রতিরোধ্য বিস্ময়ে আবিষ্কার করি বসবার ঘরটি নির্জন, জনশূন্য।
“তাজ্জব ব্যাপার!” আমি চিৎকার করে উঠি।
“কী তাজ্জব ব্যাপার!?”
তারপরই সদর দরজায় একটি আলো আর মর্যাদাপূর্ণ কড়া নাড়ার শব্দে সে মুখ ঘুরায়।
আমি বেরিয়ে দরজা খুলি। মৃত্যুর মতো ফ্যাকাশে মুখ নিয়ে, কোটের পকেটে দস্তার ওজনের মতো ভারী হাত ডুবিয়ে, জমে থাকা জলে দাঁড়িয়ে আছে গ্যাটসবি, দুঃখ ভারাক্রান্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায় সে।
কোটের পকেটে হাত রেখেই হলের মধ্যে আমার পাশে ঝুঁকে পড়ে সে, তারপর হঠাৎ করেই বাঁক নেয় যেন কোনো কাঁটাতার সামনে পড়েছে এবং পরপরই বসার ঘরে অদৃশ্য হয়ে যায়। ব্যাপারটা মোটেও সুখকর ছিল না। নিজের হৃৎপিণ্ডের শব্দে সচেতন আমি ক্রমবর্ধমান বৃষ্টির বিরুদ্ধে দরজা টেনে দেই।
আধা মিনিট পিনপতন নিস্তব্ধতা। তারপর বসার ঘর থেকে শুনতে পাই শ্বাসরুদ্ধকর খুনশুটি, ভেসে আসে হাসির কিয়দংশ, স্পষ্টতই ডেইজির কৃত্রিম কণ্ঠস্বরে।
“এখানে তোমাকে আবারও দেখতে পেয়ে কি যে খুশি লাগছে!”
খানিকটা বিরতি; আমার জন্য সহ্য করা ছিল ভয়াবহ। হলে দাঁড়িয়ে কিছু করার ছিল না বলে ঘরেই প্রবেশ করলাম।
গ্যাটসবি, তখনও হাত পকেটে রেখে, নিখুঁত স্বাচ্ছন্দ্যর একঘেয়ে অভিনেতা ম্যান্টেলপিসটিতে৬ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। তার মাথাটি এতদূর পিছনে ঝুঁকে ছিল যে একটি বিলুপ্ত প্রায় ম্যানটেলপিস—ঘড়ির মুখে বিশ্রামরত অবস্থান থেকে তার বিচলিত চোখ ডেইজিকে অনুসরণ করছিল, যেখানে সে একটি শক্ত চেয়ারের প্রান্তে ভীত অথচ সুন্দর ভঙ্গিতে বসে।
“আমাদের আগে থেকেই পরিচয় আছে,” বিড়বিড় করে বলে গ্যাটসবি।
তার চোখ ক্ষণে ক্ষণে আমাকে দেখছিল, তার খোলা দুটি ঠোঁটে ছিল ব্যর্থ হাসির গোপন প্রচেষ্টা। সৌভাগ্যবশত ঘড়িটি তার মাথার চাপে বিপজ্জনকভাবে কাত হতে কিছুটা সময় নিয়েছিল, আর সেই সুযোগে সে তার কম্পিত হাতের আঙ্গুলে সেটিকে ঘুরিয়ে যথাস্থানে দাঁড় করিয়ে দিল। পরপরই, কনুই সোফার বাহুতে আর চিবুক হাতে রেখে অনমনীয়ভাবে বসে পড়ল।
“ঘড়ির জন্য দুঃখিত,” বলল সে।
আমার নিজের মুখে তখন গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উত্তাপের গভীর পোড়। মাথায় হাজারের মধ্যে একটি সাধারণ জিনিসও সংগ্রহ করতে পেরেছি বলে মনে করতে পারছিলাম না।
“এটি একটি পুরানো ঘড়ি,” নির্বোধভাবে বললাম।
আমার ধারণা সবাই এক মুহূর্তের জন্য মনে করেছিল যে ঘড়িটি মেঝেতে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে।
“আমরা অনেক বছর দেখা করিনি,” ডেইজি বলে, কণ্ঠটি পরিশীলিত ঠিক যেমনটি হওয়া উচিত।
“আগামী নভেম্বরে পাঁচ বছর।”
গ্যাটসবির তাৎক্ষণিক যথার্থ উত্তর আমাদের সবাইকে অন্তত আরও এক মিনিট পিছিয়ে দেয়। রান্নাঘরে আমাকে চা বানাতে সাহায্য করার মরিয়া পরামর্শে রাজি হয়ে তারা দুজনে উঠে দাঁড়াতেই ডাইনী ফিন ট্রে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে।
কাপ ও কেকের স্বাগত বিভ্রান্তির মধ্যে একটি নির্দিষ্ট বাস্তবিক শালীনতা নিজেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। ডেইজি আর আমি যখন সচেতনভাবে একে অপরের সাথে কথা আর দুঃখ ভারাক্রান্ত নজর বিনিময় করছিলাম, গ্যাটসবি নিজেকে ছায়ায় নিয়ে বসাল। যাই হোক, নির্জনতা যেহেতু নিজেই ভঙ্গ হল না, আমিই প্রথম সম্ভাব্য মুহূর্তে একটি অজুহাত তৈরি করে উঠে দাঁড়ালাম।
“কোথায় যাচ্ছ?” তাৎক্ষণিক সতর্ক সংকেতের মত গ্যাটসবির প্রশ্ন।
“আসছি।”
“তোমার সাথে কিছু কথা ছিল।”
আমাকে অনুসরণ করে সে রান্নাঘরে ঢুকল, দরজা বন্ধ করে ফিসফিস করে ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলল: “ওহ, ঈশ্বর!”
“কি ব্যাপার?”
“ভয়ানক ভুল হয়ে গেছে” সে মাথা এদিক ওদিক নাড়িয়ে আবার বলল, “ভয়ানক, ভয়ানক ভুল”।
“তুমি শুধু বিব্রত, এটাই হয়েছে,” এবং ভাগ্যিস আমি যোগ করেছিলাম: “ডেইজিও বিব্রত।”
“সেও বিব্রত!” অবিশ্বাসী কণ্ঠে পুনরাবৃত্তি করে সে।
“হুম, ঠিক ততটাই যতটা তুমি।”
“এত জোরে কথা বলো না!”
“বাচ্চা ছেলের মতো আচরণ করছ তুমি,” আমি অধৈর্য হয়ে উঠলাম।
“শুধু তাই নয়, তুমি অভদ্র আচরণও করছ। তুমি ভুলে গেছ যে ডেইজি ওই ঘরে একা বসে আছে।”
সে হাত বাড়িয়ে আমাকে থামায় আর ভর্ৎসনাপূর্ণ দৃষ্টিতে এমনভাবে তাকায় যা ভোলার নয়, তারপর দরজা খুলে আলতোভাবে ভাব ঘরে ফিরে যায়।
আমি পিছনের পথ দিয়ে বেরিয়ে যাই—ঠিক যেমনটি গ্যাটসবি বেরিয়ে গিয়েছিল ঠিক আধা ঘন্টা আগে, এই বাড়িতেই, তার নার্ভাস সার্কিট—তারপর দৌড়ে কালো বিশাল জটযুক্ত একটি গাছের নিচে আশ্রয় নিই যার পাতার ভর বৃষ্টির বিরুদ্ধে পর্দা তৈরি করেছিল। আরেক দফা বৃষ্টি ঝরল; ছোট ছোট কর্দমাক্ত জলাভূমি আর প্রাগৈতিহাসিক খালবিলে পরিপূণ, গ্যাটসবির মালির যত্ন নিয়ে সদ্য কামানো আমার অগোছালো লনে। গ্যাটসবির বিশাল অট্টালিকা ছাড়া গাছের নিচ থেকে আর কিছু দেখার ছিল না, আমি কেন্টের৭ মতো তাঁর গির্জার স্টিপলের শিখরে আধা ঘণ্টা তাকিয়ে থাকলাম। কোনো এক মদ প্রস্তুতকারী এক দশক আগে “পিরিয়ড”৮ উন্মাদনার প্রথমে এটিকে নির্মান করেছিল এবং এমন একটি গল্পও চালু আছে, যে সে প্রতিবেশীদের কটেজের পাঁচ বছরের শুল্ক পরিশোধ করতে রাজি ছিল এই শর্তে যে, মালিকরা তাদের ছাদ খড়ে ঢেকে দিবে। সম্ভবত তাদের প্রত্যাখ্যানে তার “একটি পরিবার গড়ার” পরিকল্পনা এবং বুক ভেঙে গিয়েছিল—এবং অবিলম্বে সে পতনের সম্মুখীন হয়। পরবর্তীকালে তার ছেলেমেয়েরা বাড়িটি বিক্রি করে দেয়, দরজায় কালো পুষ্পস্তবকটি এখনও ঝোলানো।
আমেরিকানরা, প্রয়োজনে দাস হবে, তবু কৃষক হবে না।
আধঘণ্টা পর আবার সূর্য ঊঠল, কাঁচাবাজারের গাড়িটি ভৃত্যদের রাতের খাবারের কাঁচামাল সরবরাহের জন্য গ্যাটসবির ড্রাইভে টহল দিতে শুরু করল—আমি যদিও নিশ্চিত ছিলাম আজ রাতে সে এক চামচ খাবারও মুখে তুলবে না। একজন দাসী তার বাড়ির উপরের জানালাগুলো খুলতে শুরু করে, এক এক করে প্রতিটিতে মুহূর্তের মধ্যে হাজির হয়ে, বিশাল কেন্দ্রীয় করিডোর থেকে ঝুঁকে ধ্যানমগ্নভাবে বাগানে থুথু ছেটায়। আমার তখন ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে। আবারও বৃষ্টি শুরু হলে মনে হল যেন তাদের কণ্ঠস্বরের গুঞ্জন, আবেগের তাড়নায় একটু একটু করে ফুঁসে উঠেছে। কিন্তু নতুন এক নীরবতায় যেন বাড়িটিও নীরব হয়ে গেল।
আমি ভেতরে ঢুকলাম—চুলার ওপর ঠেলেঠুলে রান্নাঘরে সম্ভাব্য সব রকম আওয়াজ করলাম—কিন্তু মনে হল না তাদের কেউ কোনো শব্দ শুনল। সোফার দুই প্রান্তে, একে অপরের দিকে তাকিয়ে বসে ছিল তারা, যেন কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন, কিম্বা বাতাসে ভাসছে কোনো জিজ্ঞাসা, ইতিমধ্যেই অস্বস্তির সমস্ত আবরণ ভেঙে গিয়েছিল। অশ্রুতে ভেসে গিয়েছিল ডেইজির মুখ, আমি ভিতরে প্রবেশ করতেই লাফিয়ে উঠে সে আয়নায় রুমাল দিয়ে তার চোখের জল মোছে। অথচ গ্যাটসবির মধ্যে ছিল এক বিভ্রান্তিকর পরিবর্তন। আক্ষরিকভাবেই দ্যুতিময় হয়ে উঠেছিল সে; কোনো শব্দ বা উচ্ছ্বাসের অঙ্গভঙ্গি ছাড়াই সেই দ্যুতি মঙ্গলময় নব বিকিরণে ছোট্ট ঘরটিকে পূর্ণ করে রেখেছিল।
“ওহ, হ্যালো, পুরোনো খেলার সাথী,” সে এমনভাবে বলল, যেন আমাকে অনেক বছর দেখেনি। আমিও মুহূর্তের জন্য ভাবলাম হয়ত সে এবার হাতও মেলাবে।
“বৃষ্টি থেমে গেছে।”
আমি কিসের ইঙ্গিত করছি, বুঝতে পেরে বলল, “তাই কি?”
ঘরে তখন ঘণ্টাধ্বনির মত সূর্যের আলোর ঝলকানি, আবহাওয়া দফতরের মানুষের মতো হেসে, বারবার ফিরে ফিরে আসা আলোর উৎসাহী পৃষ্ঠপোষকের মত ডেইজিকে সে খবরটি পুনরাবৃত্তি করে বলল, “তোমার কেমন লাগছে? বৃষ্টি থেমে গেছে।”
“আমি আনন্দিত, জে।” শোকার্ত সৌন্দর্যে ভরা তার বেদনার্ত কণ্ঠস্বর কেবল তার অপ্রত্যাশিত আনন্দের কথাই বলেছিল।
“আমি চাই তুমি আর ডেইজি আমার বাড়িতে আসো,” সে বলে, “আমি তোমাদের ঘুরিয়ে দেখাতে চাই।”
“তুমি কি নিশ্চিত চাও যে আমিও আসি?”
“অবশ্যই, ওল্ড স্পোর্ট।”
আমি আর গ্যাটসবি লনে অপেক্ষা করছি, ডেইজি মুখ ধুতে উপরের তলায় গেল—মনে মনে ভাবছিলাম, টু লেইট, অনেক দেরি হয়ে গেছে—তোয়ালের লজ্জাজনক অপমান বরদাস্ত করা ছাড়া আর উপায় নেই।
“আমার বাড়িটা তো ভালোই, তাই না?” তার দাবি। “দেখো সামনের দিকটা কত আলো ধরে!”
“হ্যাঁ।” আমি সম্মতি জানাই যে সত্যিই চমৎকার।
তার চোখ ঘুরতে থাকে, প্রতিটি খিলান দরজা আর বর্গাকার টাওয়ারের ওপরে।
“যত টাকা দিয়ে এটা কিনেছি, তা উপার্জন করতে আমার মাত্র তিন বছর লেগেছে।”
“আমিতো জানি তুমি তোমার অর্থ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছ।”
সে সাথে সাথে বলে, “তা পেয়েছি, ওল্ড স্পোর্ট”, “কিন্তু “বিগ প্যনিক”—যুদ্ধের আতঙ্কে বেশিরভাগই হারিয়েছি।”
মনে হল, সে কী বলছে নিজেই জানে না, কারণ যখন তাকে জিজ্ঞাসা করলাম সে কোন ব্যবসার সাথে যুক্ত, বুঝতে পারার আগেই যে এটি উপযুক্ত উত্তর নয়; সে বলে উঠল “সেটা আমার ব্যাপার।”
তারপর নিজেকে সংশোধন করে উত্তর দিল, “ওহ, আমি অনেক কিছুর সাথেই জড়িত,”
বলল, “প্রথমে মাদক ব্যবসায় ছিলাম তারপর তেলের ব্যবসা করেছি। যদিও আমি এখন আর এদের কোনোটিতেই নেই।” তারপর সে মনোযোগ দিয়ে আমার দিকে তাকাল। “তুমি কি বলতে চাচ্ছ আগের রাতে আমি যে প্রস্তাব দিয়েছি তা নিয়ে তুমি ভেবেছ?”
আমি উত্তর দেয়ার আগেই, ডেইজি বেরিয়ে এল, তার পোশাকের দুই সারি পিতলের বোতাম সূর্যের আলোতে জ্বলে উঠল।
“ওটাতো বিশাল?” বাড়ির দিকে ইশারা করে বিস্ময়ের আতিশয্যে কেঁদে উঠল সে।
“তোমার পছন্দ হয়েছে?”
“অবশ্যই পছন্দ হয়েছে, কিন্তু বুঝতে পারছি না, তুমি সেখানে একা থাক কীভাবে!”
“আমি একে রাত দিন, আকর্ষণীয় সব লোকে পরিপূর্ণ রাখি যারা ততোধিক আকর্ষণীয় ঘটনা ঘটায়। সেলিব্রেটেড মানুষ।”
আমরা সাউন্ড বরাবর শর্টকাট না নিয়ে, রাস্তা বরাবর বড় খিড়কি দিয়ে তার বাড়িতে প্রবেশ করলাম। মন্ত্রমুগ্ধ ডেইজি আকাশছোঁয়া সামন্তীয় সিলুয়েটের প্রশংসা করল, উদ্যানের তারিফ জানাল, জোনকুইলসের ঝলমলে গন্ধ, হথর্ন আর বরই ফুলের ফেনিলযুক্ত গন্ধ এবং কিস-মি-অ্যট-দ্য-গেট-এর ফ্যাকাশে সোনার গন্ধের গুণগান গাইল। মার্বেল সিঁড়িতে পৌঁছে দরজার ভিতরে এবং বাইরে আসা-যাওয়া করা উজ্জ্বল পোশাকের আলোড়ন না পাওয়া প্রশান্তি আর পাখির কুজন ব্যতিত নিরঙ্কুশ শাব্দিক নির্জনতা বড় অদ্ভুত লাগছিল। ভিতরে প্রবেশ করে যখন মেরি আন্টোইনেটের৯ মিউজিক রুম আর পুনর্নির্মিত সেলনগুলোর মধ্য ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল যেন প্রতিটি পালঙ্ক আর টেবিলের পিছনে অতিথিদের লুকিয়ে রাখা হয়েছে, যতক্ষণ না আমরা সেগুলো অতিক্রম করি, দম বন্ধ করে তাদের নীরব থাকার নির্দেশ দেয়া আছে। গ্যাটসবি যখন “মারটন কলেজ লাইব্রেরির”১০ দরজা বন্ধ করল, আমি শপথ করে বলতে পারি যে পেঁচা—চোখের লোকটি ভৌতিক হাসিতে ভেঙ্গে পড়েছিল।
গোলাপ, ল্যাভেন্ডার সিল্ক আর রঙ-বাহারি নতুন ফুলে আবৃত “পিরিয়ড বেডরুম”, ড্রেসিং রুম, পুলরুম এবং ডুবন্ত—চৌবাচ্চার স্নানাগার অতিক্রম করে আমরা উপরে উঠলাম—একটি কক্ষে অনধিকার প্রবেশ করে দেখি পায়জামা পরা এক উষ্কখুষ্ক লোক মেঝেতে লিভারের ব্যায়াম করছে। তিনিই সেই মিস্টার ক্লিপস্প্রিংগার, যাকে সবাই “জায়গীরদার” বলে জানে। সেদিন সকালেও তাকে সৈকতে ক্ষুধার্তভাবে ঘুরে বেড়াতে দেখেছিলাম। সব কিছুর শেষে গ্যাটসবির অ্যাপার্টমেন্ট—একটি শয়নকক্ষ, লাগোয়া একটি স্নানাগার এবং অ্যাডাম স্টাডি১১, আমরা এসে বসলাম অ্যাডাম স্টাডিতে, সে দেয়াল—আলমারি থেকে চার্ট্রিউস নামের পানীয় বের করে আমাদের আপ্যায়ন করল।
পুরোটা সময় একবারও ডেইজির মুখ থেকে সে চোখ সরায়নি এবং আমার ধারণা সে তার প্রিয় চোখের প্রতিক্রিয়ার পরিমাপ অনুযায়ী নিজের বাড়ির সমস্তকিছুকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করছিল। মাঝে মাঝে, সেও নিজের প্রতিপত্তির দিকে স্তম্ভিত হয়ে তাকাচ্ছিল যেন ডেইজির বাস্তব এবং বিস্ময়কর উপস্থিতিতে এসবের কিছুই আর বাস্তব ছিল না। একবার তো প্রায় সিঁড়িতে হোঁচট খেয়ে নিচে পড়েই যাচ্ছিল।
বাড়িতে তার শয়নকক্ষটিই ছিল সবচেয়ে সাধারণ, কেবলমাত্র ড্রেসারটি ছাড়া, যেটি খাঁটি নিস্তেজ সোনার প্রসাধন সামগ্রিতে সুসজ্জিত। ডেইজি আনন্দের সাথে সেখান থেকে একটি ব্রাশ তুলে তার চুলগুলোকে মসৃণ করতেই গ্যাটসবি বসে বসে তার চোখ ঢেকে হাসতে শুরু করে।
“এটি সবচেয়ে মজার জিনিস, ওল্ড স্পোর্ট,” সে হাসতে হাসতে বলে। “আমি পারি না—যখন আমি চেষ্টা করি—”
দৃশ্যমানভাবে দুটি পর্যায় অতিক্রম করে এখন সে তৃতীয় অবস্থানে প্রবেশ করছিল। বিব্রতবোধ এবং অযৌক্তিক আনন্দের পরে এবার সে ডেইজির উপস্থিতির বিস্ময়ে আচ্ছন্ন। এতদিন সে কেবল কল্পনা করেছে, শেষ পর্যন্ত স্বপ্ন দেখেছে, দাঁত কামড়ে অপেক্ষা করেছে, বলতে গেলে, অকল্পনীয় তীব্র পিচে। অতি ঘুর্ননের প্রতিক্রিয়ায় সে এখন, চাবিকাটা ঘড়ির মতো ক্লান্ত।
মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে পুনরুদ্ধার করে আমাদেরকে দুটি বিশাল আকারের “প্যাটেন্ট ক্যাবিনেট” খুলে দেয় সে, যেগুলিতে এক ডজন উঁচু ইটের মতো স্তূপিকৃত তার স্যুট, ড্রেসিং-গাউন, টাই আর শার্ট।
“আমি ইংল্যান্ডের একজনকে পেয়েছি যে আমার জামাকাপড় কিনে দেয়। প্রতিটি ঋতু, বসন্ত এবং শরতের শুরুতে সে বাছাই করা জিনিস কিনে আমাকে পাঠায়।”
পাতলা লিনেন, মোটা সিল্ক এবং সূক্ষ্ম ফ্ল্যানেলের এক গাদা শার্ট বের করে সে আমাদের সামনে একের পর এক ছুঁড়তে থাকে, পড়ে যাওয়ার সাথে সাথে যেগুলো তাদের ভাঁজ হারিয়ে বহু রঙের বিশৃঙ্খলায় টেবিলটি ঢেকে দেয়। আমরা যতই প্রশংসা করি, ততই সে আরও বের করে এবং নরম স্তূপটি অধিক থেকে অধিকতর উচ্চ চূড়ায় সমৃদ্ধ হয়—প্রবাল, আপেল-সবুজ, ল্যাভেন্ডার এবং ম্লান কমলা রঙের সাথে ইন্ডিয়ান-ব্লু মনোগ্রামওয়ালা স্ট্রাইপ, স্ক্রোল এবং প্লেডের শার্টগুলো। হঠাৎ চাপা আওয়াজে শার্টগুলোতে মাথা গুঁজে ঝড় তুলে কাঁদতে শুরু করে ডেইজি।
“এগুলো এত সুন্দর শার্ট,” শার্টগুলোর ভাঁজে, ভাঁজে তার চাঁপা কণ্ঠস্বর ডুকরে ওঠে। “আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে—এত সুন্দর শার্ট আমি আগে কখনো দেখিনি।”
* * *
বাড়ি দেখার পর আমাদের গ্রাউন্ড, সুইমিং পুল, হাইড্রোপ্লেন এবং মধ্য-গ্রীষ্মের ফুলগুলো দেখতে যাওয়ার কথা—কিন্তু গ্যাটসবির জানালার বাইরে আবারও বৃষ্টি, তাই আমরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে সাউন্ডের ঢেউ খেলানো পৃষ্ঠেরদিকে তাকিয়ে রইলাম।
“কুয়াশা না থাকলে সাগরের মোহনার ওপারে তোমার বাড়ি দেখতে পেতাম,” গ্যাটসবি বলে। “তোমার ডকের শেষে একটি সবুজ আলো সারা রাত জ্বলে।”
ডেইজি হঠাৎ নিজের বাহুতে তার বাহু জড়ায়, আর গ্যাটসবি মগ্ন হয়ে বলেই চলে সেই একই প্রসঙ্গে। হয়ত তার মনে হয়েছিল প্রতীক হিসাবে সেই আলোর বিশাল তাৎপর্য আর শক্তি এখন চিরতরে অদৃশ্য। এখন ডেইজি তার পাশে দাঁড়িয়েছে। যে অসীম দূরত্ব ডেইজিকে তার কাছ থেকে আলাদা করেছিল তার তুলনায় সে এখন তার খুব কাছের, প্রায় স্পর্শ করে থাকার মত। যত কাছাকাছি চাঁদ আর তারা। সে বিশেষ আলোটি এখন ডকের উপরে এক নিছক সবুজ আলো মাত্র। এখন তাকে মন্ত্রমুগ্ধ করার বিষয় ভিন্ন এবং শুধুমাত্র একটি।
আমি ঘরের চারপাশে হাঁটতে শুরু করি, আধো অন্ধকারে বিভিন্ন অজানা বস্তু পরীক্ষা করে দেখি। নৌকা-বাইচের পোশাকে এক বয়স্ক ব্যক্তির বড় একটি ছবি আমাকে আকৃষ্ট করে, ডেস্কের উপরে, দেয়ালে টাঙানো।
“ইনি কে?”
“উনি? উনি মিস্টার ড্যান কোডি, পুরোনো খেলার সাথী।”
নামটা বেশ চেনা মনে হলো।
“সে মারা গেছে। বহু বছর আগে সেই ছিল আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু।” নৌকা-বাইচের পোশাকে গ্যাটসবির একটি ছোট ছবি, ব্যুরোতে১২—গ্যাটসবি তার মাথা নিচু করে—আপাতদৃষ্টিতে তার বয়স তখন প্রায় আঠারো।
“কী দারুন!” ডেইজি বলে উঠল। “পম্পাদোর!১৩ তুমি তো আমাকে কখনই বলনি যে তোমার একটি পম্পাদোর—বা একটি ইয়ট১৪ ছিল!”
“এই দেখ,” দ্রুত বলে ওঠে গ্যাটসবি। “এখানে অনেক ক্লিপিংস আছে—তোমার।”
তারা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দেখছিল। আমি রুবিগুলোর কথা জিজ্ঞাসা করতেই যাচ্ছিলাম, তখনই ফোন বেজে উঠল আর গ্যাটসবি রিসিভারটি হাতে তুলে নিল।
“হ্যাঁ... আচ্ছা, আমি এখন কথা বলতে পারব না... আমি এখন কথা বলতে পারব না, ওল্ড স্পোর্ট... আমি বলেছিলাম একটা ছোট শহর... তার অবশ্যই জানা উচিত একটা ছোট শহর কী... ...ঠিক আছে, যদি ডেট্রয়েট তার কাছে একটা ছোট শহরের নমুনা হয় তাহলে সে আমাদের কোন কাজে আসবে না...”
সে ফোন কেটে দেয়।
“তাড়াতাড়ি এখানে এসো!” জানালার কাছে ডেইজি চিৎকার করে বলে। তখনও বৃষ্টি পড়ছে, কিন্তু অন্ধকার কেটে গেছে পশ্চিমে, এবং সমুদ্রের উপরে ফেনাযুক্ত মেঘের একটি স্বর্ণ—গোলাপী ঢেউ১৫।
“দেখো,” ফিসফিস করে কিছুক্ষণ পর সে বলে: “আমি ওই গোলাপি মেঘগুলোর একটি চাই, তারপর তোমাকে তাতে বসিয়ে, তোমাকে চারপাশে ঠেলে দিতে চাই।”
আমি তখন বিদায় নেবার চেষ্টা করছি, কিন্তু তারা শুনতে পেল না; সম্ভবত আমার উপস্থিতি তাদের আরও সন্তোষজনকভাবে স্বতন্ত্র করে তুলেছিল।
“আমি জানি আমরা এখন কী করব,” গ্যাটসবি বলল, “আমরা ক্লিপস্প্রিংগারকে পিয়ানো বাজাতে বলব।”
সে “ইউইং!” বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই সঙ্গে নিয়ে ফিরল বিব্রত, কিছুটা বিধ্বস্ত, শেল—রিমের চশমা পরা, পাতলা সেনালী চুলের এক যুবককে। আপাতত শালীনভাবে একটি বুক খোলা “স্পোর্টসশার্ট”, স্নিকারস এবং একটি ঝাপসা নীল রঙের ডাক—ট্রাউজার পরা।
“আমরা কি আপনার ব্যায়ামে ব্যাঘাত ঘটিয়েছি?” ডেইজি বিনয়ের সাথে জিজ্ঞাসা করে।
“আমি ঘুমিয়ে ছিলাম,” বিব্রত ব্যাথায় চিৎকার করে বলে মিস্টার ক্লিপস্প্রিংগার। “মানে, আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। তারপর উঠলাম...”
“ক্লিপস্প্রিংগার খুব ভাল পিয়ানো বাজায়,” তাকে থামিয়ে দেয় গ্যাটসবি। “তাই না ইউইং, পুরোনো খেলার সাথী?”
“আমি ভালো বাজাই না। আমি ভাল না—আমি খুব কম বাজাই। আমি অনেকদিন রেয়াজও করিনি—”
“আমরা নীচে যাব,” গ্যাটসবি বাধা দিল। সে একটি সুইচ ঘুরালো। পুরো ঘর আলোয় পূর্ণ হয়ে ধূসর জানালাগুলো অদৃশ্য হল। গ্যাটসবি মিউজিক রুমে পিয়ানোর পাশে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বাতি জ্বালালো। কম্পমান ম্যাচের আগুনে ডেইজি একটি সিগারেট ধরাল, তারপর ঘরের অপর প্রান্ত জুড়ে থাকা একটা সোফায় তার সাথে বসল, যেখানে জ্বলন্ত মেঝেটির বয়ে আনা লবি—বাউন্স করা আলো ছাড়া আর কোন আলো ছিল না।
“দ্য লাভ নেস্ট” বাজানোর সময় ক্লিপস্প্রিংগার বেঞ্চের উল্টো দিকে ঘুরে অন্ধকারে গ্যাটসবিকে দুঃখজনকভাবে খুঁজছিল।
“আমার কোনো অনুশীলন নেই, দেখুন। আমি বলেছিলাম আমি বাজাতে পারব না। আমি অনুশীলন করি না—”
“এত বেশি কথা বলো না, পুরোনো খেলার সাথী,” গ্যাটসবি আদেশ দিল। “বাজাও!”
“সকালে,
সন্ধ্যায়, আমরা কি সুখ পাইনি—”
বাইরে দমকা বাতাস, শব্দের সাথে বজ্রপাতের ক্ষীণ প্রবাহ। ওয়েস্ট এগে সব আলো জ্বলে উঠেছে; নিউ ইয়র্ক থেকে যাত্রীবাহী বৈদ্যুতিক ট্রেনগুলো বৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়া তাদের ঘরে ফিরছিল। গভীর মানবিক পরিবর্তনের সে সময়ে, বাতাসে ছিল উত্তেজনা।
“একটি বিষয় নিশ্চিত,
যদিও কিছুই নিশ্চিত নয়
ধনীরা আরও ধনী হয়
এবং দরিদ্ররা পায়—সন্তান।
এরই মধ্যে, সময়ের মধ্যে—”
বিদায় জানাতে গিয়ে দেখি গ্যাটসবির মুখে আবারও সেই বিভ্রান্তির অভিব্যক্তি, যেন তার বর্তমান সুখের প্রকৃতি তার মনে জাগ্রত করেছে কোনো ক্ষীণ সন্দেহ। প্রায় পাঁচ বছর! এমন কিছু মুহূর্তও নিশ্চই সেই বিকেলে ছিল, যে মুহূর্তগুলো ডেইজিকে তার স্বপ্নের চেয়ে ক্ষুদ্র করে তুলেছিল—তার নিজের সীমাবদ্ধতার কারণে নয় বরং বিমোহিত গ্যাটসবির অসীম আবেগে সৃষ্ট—স্বপ্নের বিশালত্বের কারণে; যা তাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল, তাকে ঘিরে সবকিছুকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সৃজনশীল নৈপুণ্যে সেই স্বপ্নে গ্যাটসবি নিজেকে প্রতিনিয়ত নিক্ষেপ করেছে, প্রতি মুহূর্তে তাকে আরও আরও নতুন মাত্রা দিয়েছে, প্রতিবার তার পথে বাহিত এক একটি উজ্জ্বল নতুন পালকে তাকে নবতর রূপে সাজিয়েছে। পৃথিবীতে এমন কোন আগুন বা প্রাণের আকর নেই যা তার হৃদয়ের সেই আধ্যাত্মিক সঞ্চয়কে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
আমি যখন তাকে দেখছিলাম সে দৃশ্যত নিজেকে অন্তত কিছুটা হলেও মানিয়ে নিয়েছে। ডেইজি তার বাহুবন্ধনে নিজেকে আঁকড়ে ধরে নিচু স্বরে ফিসফিস করে কিছু বলতেই আবারও প্রবল আবেগে সে তার দিকে ঝুঁকে যায়।
আমি বিশ্বাস করি সেই কণ্ঠটিই তার আবেগী ওঠা নামাকে প্রশমিত করে রেখেছিল, ঘোরলাগা জ্বরের উষ্ণতা দিয়ে তাকে আগলে রেখেছিল, কারণ স্বপ্নের সকরুণ আতিশয্যেও সেই কণ্ঠ বদলায়নি—কণ্ঠ বদলায় না—সেই কণ্ঠের গান মৃত্যুহীন।
তারা আমাকে ভুলে গিয়েছিল, কিন্তু ডেইজি চোখ তুলে হাত বাড়িয়ে দিল; গ্যাটসবি এখন আর আমাকে চিনছেই না।
আমি আবারও একবার তাদের দিকে ফিরে তাকাই, তারাও ফিরে তাকায়—কোন সদূরের অপার দূরত্ব থেকে, দুর্দান্ত জীবন-প্রাচুর্যে আবিষ্ট হয়ে।
আর তাদের মিলন ঘটিয়ে, ঘর থেকে বেরিয়ে, মার্বেল সিঁড়ি বেয়ে—আমি নেমে যাই বৃষ্টিতে।
* * *
টীকা
১. ওয়ার্ল্ড ফেয়ার (world’s fair)—১৯ শতকের মাঝামাঝি থেকে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ফেয়ার/ বিশ্ব মেলা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং শিল্পকলায় বিভিন্ন দেশের মহান অর্জনের একটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী।
২. কোনি আইল্যান্ড (Coney Island)—নিউ ইয়র্ক সিটির ব্রুকলিন বরোর দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের একটি উপদ্বীপের আশেপাশের এলাকা এবং বিনোদন এলাকা।
৩. লন-মোয়ার (lawnmower)—ঘাসকাটা যন্ত্র।
৪. ক্লে (Clay)—স্যার হেনরি ক্লে (১৮৮৩-১৯৫৪) একজন ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ এবং অক্সফোর্ডের প্রাক্তন ছাত্র যিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নুফিল্ড কলেজের ওয়ার্ডেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ‘ইকোনমিক্স, এন ইন্ট্রোডাকশন ফর দ্য জেনারেল রিডার’ ১৯১৬ সালে প্রকাশিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যেও জনপ্রিয় একটি প্রশংসিত সূচনামূলক অর্থনীতির বই।
৫. ক্যাসেল রেকরেন্টের (Castle Rackrent)—এটি মারিয়া এজওয়ার্থের ১৮০০ সালে লিখিত উপন্যাস, যার সমাপ্তি পাঠকদের কাছে একটি রহস্য।
৬. ম্যান্টেলপিস (mantelpiece)—ফায়ারপ্লেস/অগ্নিকুণ্ডের উপরে একটি তাক, সাধারণত একটি ফ্রেমের অংশ যা ফায়ারপ্লেসকে ঘিরে থাকে।
৭. কান্ট (Kant)—ইমানুয়েল কান্ট (১৭২৪–১৮০৪) একজন জার্মান দার্শনিক। যিনি আধুনিক পশ্চিমা দর্শন এবং আলোকিত চিন্তাধারা উভয়েরই কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব। গুজব ছিল যে কান্ট তার জানালার বাইরে গির্জার স্টিপলের দিকে তাকিয়ে তার দর্শনের চিন্তা ও বিকাশ করতেন।
৮. পিরিয়ড উন্মাদনা (Period craze)—“পিরিয়ড উন্মাদনা” একটি সংক্ষিপ্ত স্থাপত্য প্রবণতা যেখানে বাড়িগুলো বিভিন্ন ঐতিহাসিক সময়ে জনপ্রিয় বাড়িগুলোর অনুরূপে ডিজাইন এবং নির্মিত হয়৷ গ্যাটসবির বাড়িটি একজন মদ প্রস্তুতকারীর জন্য তৈরি; যিনি দৃশ্যত একটি সামন্ততান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করতে চেয়েছিলেন যেখানে তার বাড়িটি হবে একটি প্রাসাদ; আশেপাশে খড়ের ছাদের বাড়িতে বসবাসকারী কৃষকদের এলাকাকে উপেক্ষা করে। পুরো উপন্যাস জুড়ে, এই ধরনের উপাখ্যান নিককে গসিপের সংস্কৃতিতে স্থির করে এবং ফিটজেরাল্ড কীভাবে বিষয়গুলোকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন সে সম্পর্কে সংকেত দেয়।
৯. মেরি আন্টোইনেট (Marie Antoinette)—ফ্রান্সের শেষ রানী মেরি আন্টোইনেটের প্রতি ইঙ্গিত, যিনি তার সৌখিন, ব্যয়বহুল রুচির জন্য পরিচিত ছিলেন।
১০. মারটন কলেজ লাইব্রেরি (Merton College Library)—মারটন কলেজ লাইব্রেরি (মারটন কলেজ, অক্সফোর্ডে) ইংল্যান্ড তথা সমগ্র বিশ্বের প্রাচীনতম গ্রন্থাগারগুলোর মধ্যে একটি।
১১. অ্যাডাম স্টাডি (Adam study) —অ্যাডাম স্টাইল বা শৈলী ১৭৬০-এর দশকের শেষের দিক থেকে ১৮ শতকের ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, রাশিয়া এবং বিপ্লবী যুদ্ধ-পরবর্তী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্তের বাসস্থানে লক্ষ্য করা যায়। এটি ১৮ শতকের ইন্টেরিয়র ডিজাইন এবং স্থাপত্যের একটি নিওক্ল্যাসিকাল শৈলী, যেটি স্কটিশ স্থপতি উইলিয়াম অ্যাডাম এবং তার পুত্ররা অনুশীলন করতেন। ‘অ্যাডাম স্টাডি’ একটি সুশোভিত অভ্যন্তরীণ স্থান (প্রায়শই ক্লাসিক বুকশেল্ফে সাজানো) যেখানে পান করা, আয়েশ করে পড়ালেখা এবং গল্পগুজব করা যায়।
১২. ব্যুরো (bureau)—অফিস, দপ্তর।
১৩. পম্পাদোর (The pompadour)—হেয়ারস্টাইল যা ফ্রান্সের রাজা লুই XV-এর উপপত্নী মাদাম ডি পম্পাদোরের নামে নামকরণ করা হয়েছে। যদিও পুরুষ, মহিলা এবং শিশুদের জন্য শৈলীর অনেক বৈচিত্র্য রয়েছে, তবে মূল ধারণাটি হল মুখ থেকে উপরের দিকে বৃহৎ পরিমাণে চুল ঝরে কপালের উপরে পরা, এবং কখনও কখনও পাশ এবং পিছনের দিকেও উল্টে যায়। এলভিস প্রিসলি, জেমস ডিন, টনি কার্টিস থেকে শুরু করে বহু মার্কিন তারকা এই স্টাইল অনুকরণ করেছেন।
১৪. ইয়ট (Yacht)—প্রমোদতরী; পালতোলা বা শক্তিশালী জাহাজ যা আনন্দ, সমুদ্র ভ্রমণ বা রেসিংয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়।
১৫. গোলাপি ঢেউ/মেঘ—বৃষ্টির মতো, বজ্রপাতের আশঙ্কা সম্ভবত ডেইজি এবং গ্যাটসবির পুনর্মিলনে যে তারা চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হবে তারই পূর্বাভাস।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন