হুমায়ূন আহমেদের ‘বাদশাহ নামদার’: ইতিহাসের ক্ষত চিহ্ন

অ+ অ-

 

হুমায়ূন আহমেদ, যার রচনাশৈলী বহমান নদীর মতোকোথাও উজান ঠেলতে হয় না, কোথাও শরীরের সব শক্তি দিয়ে দাঁড় বাইতে হয় না, কঠিন নির্মম বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও হাঁসফাঁস করতে হয় না পাঠককে। আর তাই যে বাড়িতে কোনো সাহিত্যের বই নেই সেখানেও খুঁজলে রান্নার বইয়ের পাশাপাশি মিলবে একখানা হুমায়ূন অহমেদ। তিনি তার সাহিত্যের সব চরিত্রকে এমন এক জায়গায় পৌঁছে দেন যা সাধারণের স্বপ্নের স্থান। বাস্তবে যেখানে পৌঁছানো তাদের পক্ষে কখনোই সম্ভব না। তিনি ঘৃণ্য সন্ত্রাসীর ভেতরে সংযোজন করেন মানবিক গুণাবলী। তিনি তুচ্ছকে করেন মহান। ভবঘুরেকে করেন নায়ক। আর লেখকের এই অসাধারণ কল্পনাশক্তিই তাকে পৌঁছে দিয়েছে জনপ্রিয়তার শীর্ষে। আর তার মতো এমন একজন লেখক যখন ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস রচনা করেন তখন তা সর্বসাধারণের জন্য এক বিশেষ প্রাপ্তি হয়ে দাঁড়ায়। কারণ আমরা ইতিহাস বিমুখ মানুষ।

বলতে গেলে বিগত কয়েক বছর ধরে ইতিহাস নিয়ে দলাদলি আর কাদা ছোড়াছুড়ি আমাদের প্রায় ইতিহাস বিদ্বেষী জাতিতে পরিণত করেছে। রাষ্ট্র, সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলো যতই আমাদের কুইনাইনের মতো ইতিহাসের মিক্সার খাওয়ানোর চেষ্টা করে, যত তাদের ইতিহাস ব্যবসা জমজমাট করে তুলতে চায়, ততই সাধারণ মানুষ ইতিহাস থেকে পরিত্রাণ পেতে চায়। নিকট অতীতের ইতিহাস নিয়ে যখন এই অবস্থা তখন নির্দোষ দূর অতীতের ইতিহাস তো যাদেরকে পরীক্ষা পাশের জন্য পড়ানো হয়, তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। ইতিহাস নিয়ে দেশের মানুষের যখন এমন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা ঠিক তখন বাদশাহ হুমায়ূনকে নিয়ে ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের লেখা ঐতিহাসিক উপন্যাস বাদশাহ নামদার নিঃসন্দেহে পাঠকের জন্য এক বিশেষ প্রাপ্তি।

বিদেশি টিভি চ্যানেলে একটা বিজ্ঞাপন আমরা প্রায়ই দেখতে পাই যেখানে, একজন মা তার ছোট্ট শিশুকে শেখাচ্ছেন, বাবরের ছেলে হুমায়ূন, আর হুমায়ূনের ছেলে? শিশুটি উত্তর দেয়, আকবর দুঃখজনক হলেও সত্য যে এই শিক্ষা আমাদের দেশে বিরল। এখানে শিশুকে মুখে মুখে কেউ দূর অতীতের ইতিহাস শেখায় না। শিক্ষা ব্যবস্থাও এক সময় এমন ছিল যে, বিজ্ঞান ও বাণিজ্যের ছাত্রের ইতিহাস পড়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। অথচ একথা সত্য যে ইতিহাস বিমুখ জাতি কখনো উন্নতির শিখরে পৌঁছতে পারে না।

লেখকের পূর্ববর্তী ইতিহাস ভিত্তিক উপন্যাসগুলো সাক্ষ্য দেয় যে, ইতিহাসের বর্ণনায় তিনি নির্মোহ। কোন দল বা ব্যক্তি কখনো তাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করতে পারেনি। আর বাদশাহ হুমায়ূনের সময়কালে যেহেতু তিনি ছিলেন না, তাই তার পক্ষে লিপিবদ্ধ ইতিহাসের বাইরে যাওয়া সম্ভব ছিল না বলাই বাহুল্য। তবে মোহ যেটুকু ছিল সেটা তিনি তার ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন আর তা হলো, বাদশাহ হুমায়ূনের সাথে তার নামের মিল। বাদশাহ হুমায়ূনকে ইতিহাস যেখানে পরাজিত শাসক হিসেবে আখ্যা দেয় সেই হুমায়ূনকে তিনি চিত্রিত করেছেন পরম মমতায়। তিনি তার ভেতরের বীরত্ব, পাণ্ডিত্য, শিল্পীসত্তা, মানবিক গুণাবলী, প্রেম এবং নিষ্ঠুরতাকে স্পষ্ট করে তুলেছেন কোনো মহিমাকে ক্ষুণ্ণ না করেই।

বাদশাহ হুমায়ূন সম্পর্কে লেখক বলছেন, ...প্রচুর পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে তিনি ছবি আঁকেন। ছবি আঁকায় একজন হাবশি চিত্রকর তাকে সাহায্য করে।(পৃ:২৫)

প্রধান উজির বললেন, গোস্তাকি মাফ হয়। এই অপূর্ব শের কার কলম থেকে বের হয়েছে? সম্রাট বললেন, এই শের তোমাদের বাদশাহর কলম থেকে এসেছে। সে হিন্দুস্থানের বাদশাহ হলেও অন্তরে একজন দুর্বল কবি(পৃ:৪১)

বাবর পুত্র বাদশাহ হুমায়ূনের লেখক সত্তা, শিল্পীসত্তা এভাবেই ঘটনার পরতে পরতে উজ্জ্বল হয়ে বিকশিত হয়েছে।

চিতরের যুদ্ধে ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞ শুরু হলো। মোঘল সৈনিকের তলোয়ারের নিচে হাজার হাজার মানুষকে প্রাণ দিতে হলো। ...রক্তারক্তির পরে হুমায়ূন উন্মাদ হয়ে গেলেন। তাঁকে দেখে তাঁর সৈন্যরাও উন্মাদ হয়ে গেল। (পৃ:৩৫)

হুমায়ুনকে ইতিহাস যুগে যুগে পরাজিত শাসক হিসেবে চিত্রিত করতে চাইলেও যোদ্ধা হিসেবে বাদশাহ হুমায়ূন যে উদাসীন প্রকৃতির বা নির্লিপ্ত ছিলেন না একটা বিশেষ কারণে সেই দিকটা তুলে ধরতে লেখক দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন এবং ক্ষেত্রে তিনি বিশেষভাবে সফল হয়েছেন বলা যায়।

একবার ভুল বিচারের কারণে এক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড হলে—“সম্রাট হুমায়ূন একটি রাজকীয় ফরমান জারি করলেন। যে-কোন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে সম্রাটের অনুমতি নিতে হবে। এছাড়া তিনি যুদ্ধে ব্যবহার হয় এমন একটা দামামার ব্যবস্থা করলেন। কোনো প্রজা যদি মনে করে তার উপর বিরাট অবিচার করা হচ্ছে, তাহলে সে দামামায় বাড়ি দিয়ে সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে। (পৃ:৪৭) 

শুধু একজন যোদ্ধা একজন শাসক নন, সম্রাট হুমায়ূন যে কতটা ন্যায় বিচরক ছিলেন, কতটা প্রজাবৎসল ছিলেন, সেটা এমন অসংখ্য ঘটনা বর্ণনার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে উপন্যাসের পরতে পরতে।

একজন শাসক তার শাসনকালে কতটা বন্ধুহীন, আত্মীয় পরিজনহীন একা হন। কতটা শূন্যতা ও একাকীত্বের মধ্যে দিয়ে তাকে যেতে হয় সেই বাস্তবতা লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন সম্রাট বাবরের ভাষ্যে—“...সৈন্য বাহিনী নিয়ে কে আসছেন তিনি জানেন, আসছে পুত্র হুমায়ূন মীর্জা। যুদ্ধাবস্থার তাতে পরিবর্তন হলো না। সম্রাটের পুত্র থাকে না, ভাই থাকে না।…’’ (পৃ:১১)

একইভাবে মীর হামজা ও বৈরাম খাঁর কথোপকথনে দেখতে পাইআমার সম্রাটের সাথে আপনার কথা হয়েছে। সম্রাটকে আপনার কেমন মনে হয়েছে? তিনি ভীতু প্রকৃতির মানুষ। ...তাঁর ভাইকে খুশি রাখার চেষ্টা করছেন। ভ্রাতৃ স্নেহও তো হতে পারে। সম্রাটদের ভ্রাতৃস্নেহ থাকে না। ভ্রাতৃভীতি থাকে।

পৌরাণিক কাহিনী থেকে শুরু করে ভারতবর্ষের সম্রাজ্যবাদী শাসকদের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে ভ্রাতৃযুদ্ধ ও ভ্রাতৃহত্যার ইতিহাস। অথচ হুমায়ূন ভাইদের তীব্র ষড়যন্ত্র ও বিরোধিতা সত্ত্বেও ভ্রাতৃহত্যাকে এড়িয়ে গেছেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে সাম্রাজ্যবাদী হতেও পরিস্থিতি হুমায়ূনকে বাধ্য করেছে। প্রতিপক্ষ এবং তাদের আগ্রাসন তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফিরেছে বলেই তিনি রাজ্য রক্ষায় যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন।

উপন্যাসে হুমায়ূন ছাড়াও অন্য যে চরিত্রটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে সেটি হলো বৈরাম খাঁ। তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার জন্য হুমায়ূন পুত্র আকবরের গ্রেট উপাধি নিয়ে লেখক সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তবে এজন্য বালক আকবরের তুলনায় তার মাতা এবং দাদীমাকেই অধিক দায়ী বলা যায় না কি?

বাদশাহ হুমায়ূনকে ইতিহাস পরাজিত শাসক হিসেবে চিত্রায়িত করে লেখক তার প্রতি এক ধরনের করুণা মিশ্রিত মমত্বই প্রকাশ করেছেন বলতে হবে। কারণ একজন সংবেদনশীল নির্বিরোধী শাসককেও তার শাসনামলে কতটা নিষ্ঠুর, ফ্যাসিস্ট ও যুদ্ধবাজ হতে হয় উপন্যাস বাদশাহ নামদার তার সাক্ষ্য দেয়।