বিবাহিত প্রশ্ন ও অন্যান্য কবিতা
|| বিবাহিত প্রশ্ন ||
জরুরি কাজে রুমি মাঝে মাঝে মায়ের কাছে যায়:
দেখেশুনে থাকো! দিনকাল যা পড়েছে!
পাঁচ দিন; সাতদিন; বিরল দৃষ্টান্তে দশদিন…
চারপাশে আমি একা। মাঠের গাছের মতো।
তখন কোনো উচ্ছল নারীর সঙ্গে একটু অন্তরঙ্গ হাওয়ায়
কথা বলতে গেলেই, অমনি মোবাইল কলের মতো
রুমি এসে দাঁড়িয়ে যায় পাশে:
‘কবিতা নিয়ে কথা বলছো বুঝি?’
হকচকিয়ে উঠি! পরীক্ষার হলে বসে বিষমবাহু ত্রিভূজের
ক্ষেত্রফলের ফরমুলা ভুলে যাওয়ার মতন হারিয়ে যায়
ভেবে আসা যাবতীয় কথা,
হাওয়ায় হইহই উড়ে যায় পরিযায়ী পিপাসার প্রাক্কলন,
আরেকদিন কথা বলবো; আজকের মতো আসি!
দুদিকে তাকিয়ে কেটে পড়ি ঝটপট: বাঁচা গেল বাবা!
আসলেই কি আমার কোনো একান্ত পিপাসা থাকে?
অথবা ফ্রয়েডীয় রসে সিক্ত কথা বলার জরুরত?
সাইকিয়াট্রিক গোলাম মোস্তফা বলে দিয়েছেন:
আপনার কোনো মানসিক রোগ নেই,
আপনি খালি খালি কেন এসেছেন আমার কাছে,
সেটাই বুঝতে পারছি না বকুল সাহেব!
আমিও তো বুঝি না ডাক্তার সাহেব!
শুধু বিবাহিত ধর্ষকদের কথা ভেবে গুলিয়ে যায় মাথা!
কিন্তু সেটাই একমাত্র ব্যাপার নয়,
রুমি কীভাবে জিনের মতো সঙ্গে থাকে আমার,
সেটাও তো জানা দরকার;
ডাক্তার সাহেব, আপনি কি একবার কথা বলবেন রুমির সাথে?
|| মশা ||
মশার কামড়ে বুঝি কাকে বলে বাঁশগন্ধী প্রেরণা বা প্রণোদনা
আর কাকে বলে প্রাতিস্বিক সংবেদনশীলতা
মশারা কামড় দেয়—উহ্!
চোখ হয় কৈশোরের প্রেমিকের চোখ
ঘুম নয় কাজ নয় রাত জেগে শুধু জেগে থাকা রাত
মগজের জানালায় নেচে যায়—
টপলেস হিজিবিজি—নগ্ননাভি ধোঁয়া ধোঁয়া চিত্রকল্প
ভোরে উঠে দেখি—
রাফখাতা কবিতার বীজতলা হবে বলে অপশন দিয়ে গেছে রাতে।
যাদের জীবন আগাগোড়া ছিদ্রহীন—মশারি খটানো
ভুল নাই—হুল নাই—দুঃস্বপ্নের শূল নাই—
তারা এটা হন—ওটা হন—কতকিছু হন—
হতে পারেন না শুধু দংশিত হৃদয়ের রাষ্ট্রদূত—কবি
অতএব তাদের মনের ডালে কবিরা ঝুলে থাকা
প্রবাদের আঙুর—‘শালা কবি! অপদার্থ একখান!’
আরে ও মশক—আরে ও রবিঠাকুরের ঘুম-ভাঙানিয়া-দুখজাগানিয়া,
ওই যে ওপাড়ার তারেক সাদিক—হাতে অর্থশাস্ত্র—বগলে বাদামি হালখাতা
মনে মনে তিনিও যে লিখতে চান গোটাতিনেক ‘সোনালি কাবিন’,
তুমি কি পারো না তার অর্থগন্ধী রক্তে প্রণোদনামাখা হুল ফোটাতে একবার?
|| চোখ বুজে থাকা দুপুর ||
মাঠের শরীর ছুঁয়ে বয়ে যাওয়া রাতের হাওয়ার মতো
কত আর বরফ ঘষি দেওয়াল ছোঁয়া রক্তের উষ্ণতায়?
আর বরফও তো অফুরন্ত নয়:
সম্রাটের সেপায়েরা না জানে তো না জানুক—
বারুদের মতো বরফেরও উজ্জ্বল ব্যর্থতা আছে।
ও আকাশ, ও সাগর, অনুরোধ—চোখ দেখে ভুল বোঝো নাকো!
|| ছাদের ওপর উড়ছে কবিতা ||
সবাই গেছে হাতির ঝিলে
ছাদের ওপর লীনা
আমার হাতে মোবাইল ফোন
হাওয়ার হাতে বীণা।
হাওয়ার হাতের পাঁচ আঙুলে
রোদের মধুর যোগ
মিষ্টি তানে উঠছে ফলে
অন্তরা আভোগ।
আমি তো নই সদারঙ্গ
বুঝি না সেই সুর
কিন্তু কতক্ষণ বা থাকি
ছন্দ থেকে দূর!
রফি তালাত মেহদী হাসান
বড়ে গুলাম আলী
লতা-রুনায় দুহাত পাতি
হাত রয়ে যায় খালি।
খৈয়াম বলে সাকি সে নয়
কিন্তু সাকির বাড়া
বুঝি নাকো চোখের ভাষা
চেয়েও পলক ছাড়া।
মসনবী তো আকাশঘেষা
ঘূর্ণিপাকের চলা
গজল আমার হবে নাকো
যতই সাধি গলা।
শাখ-ই নবাত গাইছে বুঝি
ছন্দ তালে সই
হায় আল্লাহ, শব্দ বিমুখ,
কেমনে হাফিজ হই!
ছুঁতে পারিনি পূর্বমেঘ
উত্তরমেঘও নয়
আকাশ দেখে উপমা খোঁজা
কেমনে আমার হয়!
তাই বলে কি বৃথা যাবে
ছাদের মাহফিল
মিলহীনতায় হোক না কথা
না পাই যদি মিল!
হাঁটুর ওপর তাল লাগালাম
মগজ লাফায় কেশে
হাজার শব্দ ভিড় রচে যায়
ছন্দে তালে হেসে।
কী লিখবো? হাসছে তারা—
পথ কি গেছো ভুলে?
সাঁঝের চিত্রকল্প দেখো
রং মাখাচ্ছে চুলে।
গালে নাচে মাত্রাবৃত্তে
বিকেল রোদের রং
ঠোঁটে ঘুমায় অনুপ্রাস
জাগলে অনুপম।
ওড়নাখানি গুনছে আঙুল
কয়টা হলো ঢেউ
ফেরেশতারা আড়নয়নে
দেখছে নাকি কেউ!
আকাশ জুড়ে ভিড় করেছে
ভেল কুত কুত দিন
স্মৃতির মেঘে হাওয়া দিলেই
বৃষ্টিতে রিমঝিম।
উপমা কি পাওনা খুঁজে
মনটা দেখো তার
দূরদিগন্তের সমান উদাস
একটু পড়াই ভার!
গালিবের শের বুঝতে পারো?
ডোমনির কী নাম?
লীনার মনও দীপের রাত্রি
ঘন শায়েরির ধাম।
দুই নয়নে করছে খেলা
পরাবাস্তব ছায়া
জোড়া পাতায় উঠছে দুলে
পথ-অপথের মায়া।
এখন কোনো জিজ্ঞাসা নয়
লাগিয়ে রাখো তালা
চাবি থাকুক ভুলের হাতে
আসবে খোলার পালা।



অসাধারণ সব কবিতা। শুদ্ধতম অভিবাদন গুণী কবিকে। কবিতা প্রকাশের জন্য সম্পাদক সাহেব কে ধন্যবাদ।
এম এ ওয়াজেদ
জুলাই ৩০, ২০২৫ ১১:৩৬