জেলার সিরিজ কবিতা

অ+ অ-

 

|| নাটোর ||

নাটোর মানেই ঘোর
জীবনানন্দের স্বপ্নঘোর!
সেই ঘোরের ভেতর একজন বনলতা
প্রেমের স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে বাংলা কবিতা!
আকবর আলি খানের চোখে
তার রহস্যময়তা
দ্য ভিঞ্চির মোনালিসার চেয়েও অধিক
কিন্তু আমার নজর নয় সেদিক।
বরং আমি ভাবছি অন্যকথা
জমিদার প্রথা
ব্রিটিশ বেনিয়ার অনুগত কুতুবের কথা
তাহাদের একেকজন রানী হয়ে ওঠার কথা
সময়ের অশ্রুবাহী নদীর নীরবতা!

 

|| হবিগঞ্জ ||

বলছি না তুমি আমার মনের তসবি 
হেমন্ত এলে শুধু ঝরাপাতা গুনবে!
এ নহে তোমার আমার হবি
তারপরও হবিগঞ্জ এলে বদলে যাই
যেন ডাকে ঐ নদী খোয়াই 
যার তীরে সৈয়দ হবিব উল্লাহ’র প্রতিষ্ঠিত বাজার তথা গঞ্জ
আজ এই হবিগঞ্জ। 
জানি না মেঘপুঞ্জ ঘিরে থাকে কিনা তার আকাশে
তবে শ্রীমঙ্গলের গা ঘেঁষে 
চা আর রাবার বাগানের মনোরম দৃশ্য 
গেঁথে থাকে চোখে
যেন জীবন্ত ফটোগ্রাফি! 
প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এ জেলা
চারপাশ ঘিরে আছে বিপুলসংখ্যক নদী
তারচেয়ে বড় বিপুলসংখ্যক আদিবাসীর সম্প্রীতি! 
ফলে কেন নয় ভাসাই প্রাণের ভেলা?

 

|| মাগুরা ||

মাগুরা এক ঐতিহাসিক জেলা
তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মগ জলদস্যু ও বর্গী পালা।
মগ জলদস্যুর অগ্রযাত্রা থামাতে গিয়েই তার নামকরণ! 
কিন্তু আমার ভ্রমণ অন্যখানে
যখনই মাগুরা যাই
আমার চোখ চলে যায় প্রেমেরবেদী
চণ্ডিদাস ও রজকিনীর সেই ঘাটে
যেন আমি যোগ দিই জীবনের অন্য এক পাঠে।
যদিও ভেতরে জাগায় শিহরণ 
মহম্মদপুর উপজেলার বাবুখালীর ঐতিহাসিক ঘোড়দৌড় মেলা।
তবু গড়াই নদীর দিকে তাকিয়ে যেন বলি
এখনও কি সেই অন্ধকারে আছি?
নইলে কেন উচ্চারণ করি
কবি ফররুখ আহমদের পাঞ্জেরী কবিতার
সেই আর্তিঝরা পঙ্ক্তি?
‘রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী’?

 

|| মৌলভীবাজার ||

 বাঁচার জন্য চাই খাদ্য 
আর সেই খাদ্য সংগ্রহ পাখির জন্য উন্মুক্ত। 
কিন্তু মানুষের সুনির্দিষ্ট এক পরিধির ভেতর
সেই লক্ষ্যেই হয়তো মধ্য অষ্টাদশ শতকে মনু নদীর উত্তর তীরে 
মৌলভী সৈয়দ কুদরত উল্লাহ স্থাপন করেন কয়েকটি দোকান ঘর।
কিন্তু কে জানতো নৌপথে ধীরে ধীরে লোক সমাগমে
ছড়িয়ে পড়বে তা গোটা অঞ্চল জুড়ে
আর তার নাম হয়ে উঠবে মৌলভীবাজার? 
এর বাইরে তাকে ঘিরে আছে অপূর্ব সব চা বাগান
দূর থেকে মনে হবে সবুজের উদ্যান।
ফলে পাখিরা হৃদয়ের লেনদেনে 
কেন যাবে না সেখানে?
আপনিই বলুন
যখন প্রস্তুত প্রকৃতির রংমহল 
শ্রীমঙ্গল।

 

|| সুনামগঞ্জ ||

পাখিসব মুখস্থ করে নাম
নাম তাই সর্বদাই উচ্চগ্রাম!
কিন্তু সুনামগঞ্জের সুনাম
যেন হাওরের সঙ্গে তার অলিখিত এক প্রেম। 
উজান ঢলে বুক ভেসে যাওয়া নদীর সঙ্গে 
লেখা তার পরিনাম।
কিন্তু তারপরও কি থেমে থাকে জীবন-সংগ্রাম? 
থেমে থাকে না
যেহেতু জলের সঙ্গেই তার সকল বোঝাপড়া! 
জল তার মুখ দেখার আয়না!

 

|| মানিকগঞ্জ ||

পাখি নই তুমি ছুঁড়বে তীর
আর আমি খুঁজব একজন মানিক পীর!
মানিকগঞ্জ এলে
আমার ভেতর এই বাহাসই চলে।
কত বড় পীর ছিলেন মানিক?
যার নামে গোটা অঞ্চল দিচ্ছে ঝিলিক! 
মনে হয় তার মনের রৌদ্র ছড়িয়ে পড়েছে
মানুষের অন্তরে
নইলে কেন মনে হয় মাটির পুতুল কথা বলে ওঠে
হাওয়ার ঠোঁটে! 
যেন হীরালাল সেনের জীবন্ত ছায়াচিত্র। 
অন্যদিকে নটরাজ অমলেন্দু বিশ্বাসের বিবেকী কণ্ঠে 
নদী বয়ে যায় জমিলার চোখে!
আমি তখন আর মনোযোগই দিতে পারি না
কী ঘটছে ক্ষমতান্ধ রাজনীতির মাঠে।

 

|| ব্রাহ্মণবাড়িয়া ||

ব্রাহ্মণবাড়ি থেকে আসিছে সুর ভাসিয়া
তা থেকে যদি ব্রাহ্মণবাড়িয়া
তবে ব্যথিত উপমহাদেশের বুকের খাঁ খাঁ
একাই নিভিয়েছেন একজন আলাউদ্দিন খাঁ।
বংশ পরস্পরায় সেই সুরের নদী
আজও বহিছে নিরবধি!
গানের ভুবনে এসে হিংসা-বিদ্বেষ হানাহানি যদি ভুলে যায় পাখি
তবে তার আর অন্য পরিচয় দরকার আছে কী?
তাছাড়া কবিতায় কৌম সমাজের বেদনাবোধ
আগলে আছেন আল মাহমুদ। 
আর উপন্যাসে তিতাসের হৃৎস্পন্দন
একজন অদ্বৈত বল্ল বর্মণ। 
এমনই যখন সুখকর বাস্তবতা
তখন সেখানে অহেতু ও হীনস্বার্থে টেঁটা ও বল্লম যুদ্ধে
বুকের রক্তক্ষরণ 
কেন নয় মর্সিয়াগাথা?

 

|| চাঁদপুর ||

তোমাকে যে-ই রাখুক সংশয়ে
চাঁদপুর যে মেঘনা পাড়ের মেয়ে
এটা মানতেই হবে।
চোখে তার নদী ভাঙনের ঘোর
তবু সে নাছোড় রাত্রি ছিঁড়ে 
আসবেই ভোর!
ফি-বছর তাই মেতে ওঠে 
ইলিশ উৎসবে।
আর ওদিকে বেলতলি
কথিত ন্যাংটা ফকিরের আস্তানা
তার জন্যও মানুষের উন্মাদনা কম না!
কিন্তু আমার কাছে চাঁদপুর 
কেবলই মনে হয় বর্ষণমুখর 
একটি দুপুর! 
সে কি কবিতার ঘোর?