মওলানা ভাসানীর গায়েবানা জানাজা

অ+ অ-

 

ঢাকায় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চলছে। ৬ দফার সমর্থনে দেশের বিভিন্ন স্থানে মিছিল-বিক্ষোভ চলছে। আইয়ুব-মোনেমের সরকার তা শক্ত হাতে দমন করছে। ১৯৬৮ সালের ৭ ডিসেম্বর। ওই দিন ছিল অটো-রিকশা চালকদের অর্ধবেলা ধর্মঘট। সকাল থেকেই পুলিশ-জনতার খণ্ড খণ্ড সংঘর্ষ চলছে। কিন্তু পুলিশের গুলিতে তিন শ্রমজীবী নিহত হওয়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ঘটনা সামাল দিতে সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী গায়েবানা জানাজার কর্মসূচি ঘোষণা করলেন। এই অ্যাসাইনমেন্ট কাভার করার দায়িত্ব পড়লো সাংবাদিক আহমেদ নূরে আলমের ওপর। তিনি তখন দৈনিক আজাদ পত্রিকার জুনিয়র রিপোর্টার। বিকেল ৪টার দিকে তিনি বায়তুল মোকাররম মসজিদ প্রাঙ্গনে যান। গিয়ে দেখেন লোকজন তেমন নেই। কিন্তু পুলিশ প্রচুর। মনে হলো গায়েবানা জানাজায় লোক হবে না। কিছুক্ষণ পর ভাসানী এলেন। তাঁর পরনে চিরাচরিত সাদা পাঞ্জাবি-লুঙ্গি। কাঁধে চাদর। মাথায় বেতের টুপি।

ভাসানীকে দেখে ছুটে এলেন পুলিশের তৎকালীন আইজিপি মহিউদ্দিন আহমদ। বললেন, হুজুর এখানে জানাজা পরা যাবে না। ভাসানী নির্বিকার। কাঁধ থেকে চাদরটা মাটিতে বিছালেন। আইজিপি বাঁধা দিলেন। ভাসানী তাঁকে বাঁ হাত দিয়ে সরিয়ে বললেন, সরো মহিউদ্দিন। আমি ১৪৪ ধারা বুঝি না। আমি এখন গায়েবি জানাজা পড়বো। তুমি গুলি করতে হয় করো। চাদরের ওপর দাঁড়িয়ে নিয়ত বেঁধে শুরু করলেন নামাজ। সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে লোক এসে দাঁড়িয়ে গেলো নামাজে। বোঝা গেল জনতা এই মুহূর্তের জন্যই অপেক্ষা করছিল।

আইজিপি ও পুলিশ সদস্যরা অসহায় দর্শকের মতো সব দেখলো। নামাজ শেষে ভাসানী মোনাজাত ধরলেন। মোনাজাতের মাধ্যমেই তিনি তাঁর বক্তব্য পেশ করলেন। এরপর ছোট একটা বক্তৃতা। মওলানা আবেগকণ্ঠিত কণ্ঠে বললেন, আমরা ভাত চেয়েছিলাম, কাপড় চেয়েছিলাম; বাক-স্বাধীনতা চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রতিক্রিয়শীল শাসকগোষ্ঠী আমাদের বুলেট উপহার দিয়েছে। কিন্তু বুলেটের কাছে আমরা কখনো নতি স্বীকার করবো না। বক্তৃতার মাঝেই ঘোষণা করলেন, গভর্নর হাউস [মোনেম খানের বাসভবন। বর্তমানে বঙ্গভবন] ঘেরাওয়ের। ১৪৪ ধারা জারি ভঙ্গ করে তিনি হাঁটা শুরু করলেন। তাঁর পেছনে কয়েকশ মানুষ। জনতাকে ঠেকাতে এক পাকিস্তানি সৈন্য রাইফেল উঁচিয়ে সামনে আসতেই ভাসানী চিৎকার করে বলে উঠলেন—‘খামোশ। ভাসানী রাইফেলটা এক হাত দিয়ে ধরে ফেলতেই এক অবাঙালি সেনা অফিসার এগিয়ে এসে সৈনিকটিকে সরিয়ে নিলেন।

এরপর বড় একটা মিছিল নিয়ে ভাসানী গভর্নর হাউসের গেটে গেলেন। তখন গুলিস্তানের অদূরে ছিল গভর্নর হাউসের গেট [পরে তা সরিয়ে নেওয়া হয়]। অনেকক্ষণ ধরে বিক্ষোভ স্লোগান চললো। ভাসানী ঘোষণা করলেন, কাল আবার হরতাল। সেই দিন থেকে শুরু হলো লাগাতার আন্দোলন-হরতাল, যা সবশেষে রূপ নিলো ঊনসত্তরের উত্তাল গণঅভ্যুত্থানে, মুজিবের মুক্তিতে।

এই ঐতিহাসিক ক্ষণটির অন্যতম সাক্ষী হায়দার আকবর খান রনো। কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রবাদ পুরুষ ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক হায়দার আকবর খান রনো তাঁর ভাষ্যে [রাজনীতির মওলানা: মজলুম জননেতা বিক্ষোভের কারিগর, মহিউদ্দিন আহমদ, বাতিঘর, ফেব্রুয়ারি, ২০২৩, পৃষ্ঠা: ২১৮] উল্লেখ করেন, ভাসানীর বহু বক্তৃতা আমি শুনেছি, কিন্তু তাঁর এমন মূর্তি কখনো দেখিনি। এই দৃশ্যটি ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছিল এবং পরে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

১৯৬৮ সালের ৭ ডিসেম্বর আসলে কী ঘটেছিল? গভীরভাবে অনুধাবন করতে পরের দিন পত্রিকাগুলোতে কী সংবাদ ছাপা হয়েছিল সেই তথ্য খুঁজতে থাকি। সত্য এই, সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে ওইদিন কোনো পত্রিকায়ই মওলানা ভাসানীর গায়েবানা জানাজার ছবি ছাপা হয় নাই! ঘটনা ধামাচাপা দিতে সরকার আগের রাতেই সংবাদপত্র অফিসগুলোতে প্রেস নোট পাঠিয়েছিল। তাই ৮ ডিসেম্বরের পত্রিকায় ভাসানীর ছবি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু পরের দিন ৯ ডিসেম্বর প্রায় সব পত্রিকায় মওলানা ভাসানীর গায়েবানা জানাজার ছবি প্রকাশিত হয়।

বহুল আলোচিত এই ছবিটির তথ্যগত ভ্রান্তি এখনো মানুষের মন থেকে দূর হয়নি। গায়েবানা জানাজার সময় ভাসানীর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন যিনি, তাঁকে অনেকেই ন্যাপ নেতা মহিউদ্দিন আহমদ [পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ নেতা] বলে মনে করে থাকেন। এই নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়ই নানা রকম যুক্তি-তর্ক দেখা যায়। প্রকৃত পক্ষে ভাসানীর পাশের সুদর্শন লোকটি একাত্তরে শহীদ ও বিশিষ্ট ন্যাপ নেতা সাঈদুল হাসান। মওলানা ভাসানী ঢাকায় আসলে সাইদুল হাসানের ইস্কাটনের বাসায়ই থাকতেন। সাঈদুল হাসানকে চেনার আরো সহজ উপায় হলো, তিনি ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের চাচা। তাঁর সঙ্গে মহিউদ্দিন আহমদের উচ্চতা ও চেহারায় মিল থাকার কারণেই এই ভ্রান্তি।

ভাসানী গবেষক সৈয়দ ইরফানুল বাবীর লেখা বইয়ে মওলানা ভাসানীর গায়েবানা জানাজার ছবিটি প্রকাশ করা হয়েছে। ছবিটির ক্যাপশনে লেখা—‘একশ চুয়াল্লিশ ধারা অগ্রাহ্য করে মওলানা ভাসানী গায়েবী জানাজায় দাঁড়িয়েছেন। পাশে একাত্তরের শহীদ প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতা সাঈদুল হাসান। অন্যদিকে আইয়ুব-মোনেম আমলের পুলিশ প্রধান মওলানা সাহেবকে জানাজা পড়তে বাঁধা দিতে সচেষ্ট। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত তারিক আলীর লেখা প্রথম বই Pakistan : Military Rule or People’s Power-এ ঘটনার বর্ণনা আছে। হায়দার আকবর খান রনোর ভাষ্যেও উল্লেখ আছে, ওই দিন মওলানা ভাসানী ইস্কাটনে সাঈদুল হাসানের বাসায় ছিলেন। বেলা ১২টার দিকে ভাসানী রিকশায় করে বায়তুল মোকাররমের সামনে এসে উপস্থিত হন। তাঁকে দেখে এগিয়ে আসে কয়েকশ মানুষ।

১৯৬৭ সালের ৭ ডিসেম্বর পুলিশ ও ইপিআরের গুলিতে প্রাণ হারান ঢাকার হাতিরপুল পাওয়ার হাউজের কেরানি আবদুল মজিদ, নীলক্ষেতের একটি সাইকেল মেরামত দোকানের কর্মচারী আবু মিয়া ও অজ্ঞাত পরিচয়ের এক বালক। ইতিহাসের আলোকে ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে এরাই প্রথম শহীদ।

ক্যাপশন

১.  মওলানা ভাসানীর গায়েবানা জানাজা [বায়তুল মোকাররম, ঢাকা, ৭ ডিসেম্বর, ১৯৬৮]। আলোকচিত্র : রশীদ তালুকদার
২.  দ্য পাকিস্তান অবজারভার-এর শেষ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত ছবি [৯ ডিসেম্বর, ১৯৬৮]। সংগ্রহ : সাহাদাত পারভেজ