ধারাবাহিক উপন্যাস || সম্রাট ও প্রতিদ্বন্দ্বীগণ || চতুর্থ পর্ব
|| হুলিয়া জারির পর ||
Selios Patacos: You are a poet. Why do you get milked up in politics?
Yannis Ritsos: Poet is the first citizen of his country, and for this very reason it is the duty of the poet to be concerned about the politics of his country.
(গ্রিক সামরিক জান্তা বনাম গ্রিক কবি)
মোহাম্মদ রফিক হুলিয়া মাথায় পটুয়াখালিতে গিয়ে দু’মাসের জন্য ভূতলবাসী হলেন। এদিকে সামরিক গোয়েন্দারা বাগেরহাটে মোহাম্মদ রফিকের বাবা মায়ের কাছে, সাতক্ষীরায় তাঁর মামাবাড়িতে খোঁজখবর নিতে লাগল। ব্যাংক একাউন্টেরও খোঁজ নিল। তখন থেকেই মোহাম্মদ রফিকের পিঠে বছরের পর বছর গোয়েন্দাদের নিঃশ্বাস পড়তে শুরু করল। মাস দেড়েক পর তিনি প্রিয় সাভার ক্যাম্পাসে ফিরে এলেন। ফিরে এসে দেখেন, অনেক সহকর্মীই তাঁকে যেন চিনতে পারছেন না। মুখ ঘুরিয়ে রাখছেন। গাড়িতে পাশাপাশি বসেও কেউ কেউ তাঁর সাথে কথা বলছেন না। কিন্তু রফিকের সেই কবিতার দিকে মুখ তুলে তাকাচ্ছে বিশ্বজোড়া পাঠক—সুদূর চীন থেকে আমেরিকায়, ভারত থেকে মিশরে।
কবি আবারও ক্যান্টনমেন্টে গেলেন। একটি ঘরে নিয়ে তাঁকে বসানো হলো। উল্টোদিকে বসে আছেন বিভিন্ন ব্যাজ পরা চারজন অফিসার। মাঝের জনের সামনে একটা ফাইল। ফাইল খুলতেই বাঁ পাশে নিউজ প্রিন্টে ছাপা খোলা কবিতার একটা কপি। ডানপাশে অনেক কাগজের ভিড়ে খোলা কবিতা ইংরেজি অনুবাদ, হাতে লেখা। কিছু কিছু জায়গায় লাল কালি দিয়ে চিহ্নিত। মোহাম্মদ রফিক কৌতূহলী হলেন, অনুবাদকটি কে? কিছু ফটোগ্রাফও আছে।
কর্নেল—আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিরোধী মিছিল করিয়েছেন। সত্যি কিনা?
কবি—আমার কবিতা নিয়ে আমার ছাত্র আর ভক্তেরা অপরাজেয় বাংলার সামনে অনুষ্ঠান করেছিল। আমি তো জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা আর্মি-পুলিশের ভয়ে কবিতার অনুষ্ঠান স্থলে আসেনি। ওরা কেউ কেউ দোতলা-তিনতালায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান দেখেছে। কবিতার অনুষ্ঠান শেষে দেখি, আড়ালে দাঁড়িয়ে যারা কবিতা শুনছিলো, ওরাই হঠাৎ মিছিল শুরু করলো, স্পনট্যানিয়াসলি! আপনাদের সিএমএলএ-র বিরুদ্ধে ইতিহাসের প্রথম মিছিল। আমি তো মিছিল ডাকিনি!
কর্নেল—রুদ্র, মোহন, কামাল চৌধুরী, তুষার দাশ এমনকি অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ সেই মিছিলে ছিলেন। তারা আপনার খোলা কবিতার অনুষ্ঠানেও ছিলেন।
কবি—হতে পারে।
কর্নেল—আমাদের কাছে ছবি আছে।
কবি—বল আপনাদের কোর্টে। আমার কিছু বলার নেই। আমি ক্ষমাও চাইব না। যা হওয়া প্রয়োজন, তাই ঘটেছে।
কর্নেল—সিএমএলএকে নিয়ে আপনি যা করেছেন, সে প্রসঙ্গে আগেও কথা হয়েছে। আপনি কি বলবেন আমাদের কৃষিমন্ত্রীর উপরে এতো ক্ষোভ কেন? উনি কবিতা লিখেও মন্ত্রী হয়েছেন আর আপনি মাস্টারি করছেন, সেজন্যে?
কবি—আপনাদের কাছে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের স্থান যদি এই হয়, তাহলে কীভাবে কথা বলি আপনার সাথে? কয়েকদিন আগেই ফেব্রুয়ারি মাসে ছাত্র হত্যা করা হলো, শিক্ষকেরা কি চুপ থাকবে? শিশু হত্যা করলে কি বাবা-মা চুপ করে থাকে?
কর্নেল—এসব কথা বললে তো আমরা মূল জায়গায় আসতে পারবো না স্যার। বরং একটা একটা করে কথা বলি। আপনি তাঁর ‘কোনো এক মাকে’ আর ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’ কবিতা দুটোর যেভাবে ইন্টারপ্রিটেশন করলেন তাতে তো আপনাকে ঈর্ষাকাতর মনে হচ্ছে। আপনি আমার শৈশব-কৈশোর ধরে টান দিয়েছেন।
কবি—আপনিই বলুন, বাঙালি জাতি কি ক্রীতদাসের বংশধর? উনি তো আমাদেরকে সেই পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে দিয়ে আমাদেরকে গৌরব অনুভব করতে বলছেন! ক্রীতদাস হয়তো উনিই। তাই এখনও পিঠে রক্তজবার মতো ঘেয়ো ক্ষত বহন করে সামরিক জান্তার পদলেহন করছেন। যে সামরিক জান্তা ছদ্মবেশী কবি সেজে কবিতাকে ধর্ষণ করছেন, ভালোবাসার মতো মানবিক বোধের অপমান করে যাচ্ছেন—উনি একজন কবি হয়ে তাঁর সাথে জুটেছেন।
কর্নেল—আর একুশের কবিতাটা, কুমড়ো ফুলে ফুলে—সেটা নিয়েও আপনি খেলতে চেয়েছেন…
কবি—আপনি তো আমাকে বলেছেন যে আপনি কবিতা বোঝেন। কবিতার অন্তর্বয়ন তো কবিতার একটা শক্তি। নিজের বলবার কথা অন্য কবির কাছ থেকে ধার করে এনে একটা নতুন মাত্রা দেয়া। আমি শিল্প সৃষ্টি করতেই চেয়েছি। আমি খেলতে চাইনি। উনি একজন কবি, উনি দ্রষ্টা। উনার সেই বুকপকেটে মায়ের চিঠি নিয়ে শহীদ হওয়া খোকারা যাতে ভবিষ্যতেও আর কোনোদিন ঢাকা শহর থেকে কুমড়ো ফুলের জাংলার পাশে ডালের বড়ি শুকিয়ে রাখা মায়ের কাছে যাতে ফিরতে না পারে, কাকতালীয়ভাবে সেটাই নিশ্চিত করে যাবার দোসর যে তিনি নিজেও—এই দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারবেন না। এই যে জয়নাল-জাফর-কাঞ্চন-দীপালী—এরা ছাত্র নামধারী গুণ্ডা ছিল? আপনাদের স্বৈরশাসক কি সন্তানের মূল্য বোঝেন না? বোঝেন। বোঝেন বলেই যেমন করে আকাশ থেকে কবিতা পেরে এনে ছাপাচ্ছেন, তেমনিভাবে আকাশ থেকে হুকুম দিয়ে দেবশিশু ধরে এনে ঘর ভরাচ্ছেন আলোয়!
কর্নেল সাহেবকে মোহাম্মদ রফিকের কবিতা আপাদমস্তক টান দিয়েছে বলেই মূল কবিতা ‘খোলা কবিতা’র ‘সব শালা কবি হবে’, ‘দাঁতাল শুয়োর’, ‘জলপাই লেবাস্যা দেবতা’ ইত্যাদির ব্যাখ্যা চাইতে তিনি আদৌ ইচ্ছুক ছিলেন না। তাঁর সমস্যা খোলা কবিতাকে গান ও আবৃত্তির মাধ্যমে জনপ্রিয় করে তুলে মিছিল হয়ে যাওয়া আর দেশ বিদেশে কবিতাটা আস্বাভাবিকভাবে ছড়িয়ে যাওয়া। এখানে কোনো প্রতিবেশী দেশের লিঙ্ক আছে কিনা তাঁরা এখনো তার কোনো সন্ধান পাচ্ছেন না।
তিনিও কবিতাপ্রেমী মানুষ। ব্যক্তিগতভাবে কবি এরশাদের ব্যাপারে মোহাম্মদ রফিকের মূল্যায়নকে মেনে নিয়েছেন। কিন্তু মানতে পারেননি ‘১৯৮৩’ অংশে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহকে নিয়ে উদ্দেশ্য করে লেখা কবিতাটি। কর্নেল ফিরে গেলেন তাঁর ক্লাস সিক্সের বয়সে। সেই একুশে ফেব্রুয়ারির শিশির ভেজা সকালবেলা ‘প্রভাতফেরি’র পিছন পিছন খালি পায়ে হেঁটে গিয়েছিলেন। প্রভাতফেরিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে একুশের গান চলছিল। প্রভাতফেরি গিয়ে থামলো শহীদ মিনারে। কত ফুল, কত স্তবক! এর পরে শুরু হল গান—আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কিংবা বাংলার মাটি বাংলার জল। এইসব গান শুনতে শুনতে স্বদেশপ্রীতির আবেগ টলমল করে উঠে বালকের নরোম মনে।
শুরু হয় কবিতা আবৃত্তি প্রতিযোগিতা। বড়দের বিভাগের ছেলেরা গলা ফুলিয়ে আবৃত্তি করলেন আলাউদ্দীন আল আজাদের ‘স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার ভয় কি বন্ধু’; আর ছোটদের বিভাগের ছেলেরা আবৃত্তি করল ‘কুমড়ো ফুলে ফুলে নুয়ে পড়েছে লতাটা’। অনুষ্ঠান শেষে দু’চারটে সাইক্লোস্টাইল করা কবিতার কাগজ কুড়িয়ে নিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির বালক ঘরে ফিরল। বাসার ছাদে কয়েকটা ইটে সাজানো শহিদ মিনারের বেদিতে ফুলের অর্ঘ্য দিয়ে মাথার ভিতর নীল ভোমরার মতো গুন গুন করা ‘কুমড়ো ফুলে ফুলে’ কবিতাটার প্রতি সুবিচার করতে শুরু করল। দু’বার পড়তেই কবিতাটা মুখস্ত হয়ে গেল। কবিতার অনুসঙ্গগুলো খুবই চেনা—সজনে গাছটা ছিল ইস্টক নিক্ষেপ দূরত্বে, আর ডালের বড়িগুলো সামনের বাসার কার্নিশে কুলা-ডালায় শুয়ে বসে রোদ খায়।
এরপরে কবিতাটা আরো পেয়ে বসল বালকটিকে—“খোকা তুই কবে আসবি, কবে ছুটি?” তবে কবিতার শেষটা ভীষণ রকম অচেনা—
‘খোকা এলি?’
ঝাপসা চোখে মা তাকায়
উঠোনে, উঠোনে
যেখানে খোকার শব
শকুনিরা ব্যবচ্ছেদ করে।
স্মৃতিকাতর হলেন কর্নেল। কিন্তু এসব আবেগের কোনোই মূল্য নেই তাঁর কাছে। স্মৃতিকাতর হলেন মোহাম্মদ রফিকও। তাঁর মনে হল, জীবনের এই বিপর্যয়ে সৈয়দ আলী আহসানই তাঁকে সাহায্য করতে পারতেন। রফিক, সৈয়দ আলী আহসানের কাছে কৃতজ্ঞ, তাই তাঁর বিরুদ্ধে হয়ত কথা বলবেন না, কিন্তু তাঁর সাহায্যও তিনি চাইতে পারেন না। কেননা সৈয়দ আলী আহসান প্রেসিডেন্ট এরশাদের ঘনিষ্টজন এবং এরশাদের কাব্য আকাঙ্ক্ষার পার্থ সারথী। একজন প্রকৃত কবি কখনো ক্ষমতার বলয়ে ঢুকতে পারেন না। তিনি মনে করেন, এটা অনৈতিক। বাংলাদেশ কবিতাকেন্দ্রের মূল ব্যক্তি হচ্ছেন সৈয়দ আলী আহসান। মোহাম্মদ রফিক তার শিকড় পত্রিকায় সৈয়দ আলী আহসানের কবিতার বই ‘সমুদ্রেই যাব’-এর আলোচনা করতে ইউরোপের তামাদি রীতি অনুসরনের কথা উল্লেখ করলেন, লিখলেন কবির আখের গোছানোর কথা। আলোচনার শিরোনাম দিলেন ‘প্রতারক কাব্যাদর্শ’। দেখালেন ‘মৃতবৎসা কবির করণকৌশল’ আর তাঁর ‘চেতনার স্থবিরতা’।
অথচ সৈয়দ আলী আহসান এককালে তিনি ছিলেন নতুন, স্বাধীন এই দেশের সাহিত্য ও শিক্ষার জগতে এক আলোকবর্তিকা; প্রিয় জাহাঙ্গীরনগরকে তিনিই বিকশিত করেছেন। সৈয়দ আলী আহসান একজন জ্ঞানী ও জহুরী মানুষ। বিশেষ করে, শিল্প সাহিত্যের পাদপীঠ হিসেবে জাহাঙ্গীরনগরকে গড়ে তোলায় তাঁর অনেক বড় ভূমিকা আছে। তিনি মোহাম্মদ রফিককে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে নিয়ে এসেছিলেন। মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজ থেকে নাটকের বরপুত্র সেলিম আল দীনকে নিয়ে এসেছিলেন বাংলা বিভাগে। পরে অবশ্য তাঁকে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা-প্রধান করা হয়। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর উপাচার্য হয়ে আসার পেছনেও সৈয়দের ভূমিকা আছে। মোহাম্মদ রফিকের বন্ধু চিলেকোঠার সেপাইয়ের রচয়িতা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ভাই এখন রফিকের সহকর্মী। সেই সুবাদে ইলিয়াস মাঝে মধ্যে ক্যাম্পাসে আসেন। দুই বন্ধু মিলে ছাত্রজীবনের মতো কতরকম খুনসুটি করেন। ইলিয়াস আগে থেকেই মোটা ফ্রেমের ভারী চশমা পরতেন। ইলিয়াসের বিয়ের পরদিন রফিক গেছেন ইলিয়াসের বাসায়; দেখলেন যে বন্ধুর চোখে চশমা নাই।
—কি হয়েছে রে?
—আর বলিস না, সুরাইয়া ভেঙে ফেলেছে।
ইলিয়াস নাকি বাসরঘরে নবপরিণীতার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, আমিই কি তোমার জীবনে প্রথম, নাকি তোমার কোনো প্রেমিক ছিল? এই কথা শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে নতুন বৌ নাকি তাঁর চশমা ভেঙে ফেলেছিলেন। রফিক মাঝে মধ্যে ইলিয়াসকে ক্ষ্যাপানোর জন্যে বলেন, ‘কি রে, এটা কি তোর নতুন চশমা?’
আবার ইলিয়াস বলতেন, তুই একটা পাগল অথবা প্রফেট। তুই এর মাঝামাঝি কোনো কিছু নস!
মোহাম্মদ রফিক আবার নিজেকে ক্যান্টনমেন্টে আবিষ্কার করলেন। না, কিছুতেই কারো অনুগ্রহ নেবেন না। এটা তাঁর একটা যুদ্ধ। একাত্তর সালেও তিনি তাঁর অবস্থান থেকে যুদ্ধ করেছেন। এবার এটা স্বাধীন দেশে একজন কবির যুদ্ধ। তাঁর কবিতা লক্ষ লক্ষ মানুষের হাতে চলে গেছে। পাশে আর কাউকে না পেলেও তিনি যুদ্ধটা চালিয়ে যাবেন। একাত্তরে তাঁর যুদ্ধটা ছিল বহুমাত্রিক। যুদ্ধ অনেক কিছু নিয়ে গেলেও অনেক কিছু দিয়েছে। স্বাধীনতা! কিন্তু রফিক তাঁর স্মৃতির কাছে পরাধীন। তাঁর চোখে আজও কলকাতার জনারণ্যে হারিয়ে যাওয়া সরীসৃপ ট্রামটার উগরে দেওয়া বিষের থলেটার কথা মনে পড়ে।
ধারাবাহিক উপন্যাস || প্রথম পর্ব || দ্বিতীয় পর্ব || তৃতীয় পর্ব



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন