ধারাবাহিক উপন্যাস || সম্রাট ও প্রতিদ্বন্দ্বীগণ || পঞ্চম পর্ব

অ+ অ-

 

|| আপনার ঋণ যেন জন্মদাগ ||

বাংলাদেশের উপন্যাসে সমাজচিত্র বিষয়ে ভুঁইয়া ইকবাল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন। স্ত্রী লায়লা জামানসহ তিনি বেহালা এলাকায় থাকেন। সকাল সকাল ঘরদোর গুছিয়ে প্রস্তুত হয়ে বসে আছেন। পার্ক হোটেল থেকে শামসুর রাহমান ফোন করেছেন। আজ তিনি ফ্রি আছেন। ভাবিসহ আসবেন। তাঁদেরকে কিছু জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। কবি এবারে কলকাতায় এসেছেন ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনের আমন্ত্রণে। ইকবাল অনেক বছর কবির সাথে দৈনিক বাংলায় কাজ করেছেন। তিনি এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান।

ভুঁইয়া ইকবাল দম্পতি, রাহমান দম্পতিকে নিয়ে গেলেন আবু সয়ীদ আইয়ুবের পত্নী গৌরী আইয়ুবের সাথে দেখা করতে। যাবার পথে ট্যাক্সিতে বসে কবি বলছিলেন তিরিশ বছর আগে শান্তি নিকেতনের সাহিত্যমেলায় কীভাবে তাঁদের সাথে কবির পরিচয় হয়, বলছিলেন গৌরী আইয়ুবের মেধা আর রূপের কথা। ইকবাল বললেন, রাহমান ভাই, আমাদের সাথে গৌরীদির আলাপ আছে। আমি জানি, আপনাকে দেখলে তিনি কত খুশি হবেন।

কথা বলতে বলতে পৌঁছে গেলেন ৫ নম্বর পার্থ রোডের ফ্ল্যাটে। গৌরী আইয়ুব বললেন, আইয়ুব সাহেব কবির কবিতা কত পছন্দ করতেন। পাকিস্তান আমলেই তিনি শামসুর রাহমানকে নিজের একটা বইও উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভারতীয় লেখক বই উৎসর্গ করলে তিনি পাকি শাসকদের কোপানলে পড়তে পারেন ভেবে পিছিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় শামসুর রাহমানের কবিতাগুলো তিনি নিয়মিত দেশ, অমৃত, নবজাতকসহ নানা পত্রিকায় প্রকাশের ব্যবস্থা করেছেন। কবি যেহেতু অধিকৃত ঢাকায় বাস করছিলেন, তারা তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলেন। সে কথা এখনও আলোচনা করলেন।

গৌরীদির বাসায় চা খেয়ে পরের গন্তব্য অন্নদাশঙ্কর রায় ও লীলা রায়ের বালিগঞ্জের বাড়িতে। রাহমান দম্পতিকে পেয়ে রায় দম্পতি ভীষণ উচ্ছ্বসিত। লীলাদি বললেন, এই দেখুন, সম্প্রতি আমি শামসুর রাহমানের এই কবিতাগুলো অনুবাদ করেছি। রাইটার্স ওয়ার্কশপ থেকে শামসুর রাহমানের নির্বাচিত অনুবাদ কবিতার একটা পুস্তিকা ছাপা হচ্ছে। তারই প্রুফ দেখছিলাম। অন্নদাশঙ্কর রায় বললেন, শামসুর, তোমার কবিতা আমরা সেই কবে থেকে ভালোবাসি। শামসুর রাহমান বললেন, সেই পাকিস্তান আমলেই তো লীলাদি আমার কবিতা অনুবাদ করে আমেরিকার জার্নালে পাঠিয়েছিলেন। অন্নদাশঙ্কর বললেন, অনেক বছর ঢাকা যাওয়া হয় না। ইচ্ছে আছে একবার দেখে আসব ঢাকা এখন কেমন দেখতে হলো। অবশ্য, দুই রাষ্ট্রের ইচ্ছেও থাকতে হবে। শোনো, ঢাকার কিছু খবর তো পাই। তুমি কবি হিসেবে দেশকে বদলে বা শুধরে হয়তো দিতে পারবে না। কিন্তু তোমার বাক্যের ভেতরে যে শক্তি আছে, ধ্বনিতে যে আগুন আছে তা দিয়ে আগে যেমন ধ্বংসের বিপরীতে সৃষ্টি করতে পেরেছ, মানুষকে জাগিয়ে তুলতে পেরেছএখনও পারবে। শামসুর রাহমান বললেন, আশীর্বাদ করবেন দাদা।

অন্নদাশঙ্করের মতো মানুষ কবিকে যে মর্যাদা ও সম্মান দিলেন, ভূঁইয়া ইকবাল অবাক চোখে সেই দৃশ্যের প্রত্যক্ষদর্শী হলেন। দুপুরে না খেয়ে উঠতে পারলেন না তাঁরা।  

বেলা পড়তে তাঁরা বেড়িয়ে পড়লেন। এবারের গন্তব্য প্রিন্স গোলাম মোহাম্মদ স্ট্রিট। বিষ্ণু দের বনেদি বাড়ি। তিরিশের কবিতার অন্যতম স্তম্ভ বিষ্ণু দের সাথে কবির অনেক বছরের পত্র যোগাযোগ ছিল। তিনি আবু বকর সিদ্দিকের সাথে যৌথভাবে শামসুর রাহমানকে একটি বইও উৎসর্গ করেছিলেন। কবিজায়া প্রণতি দে আপ্যায়ন করতে করতে বারবার শামসুর রাহমানের কবিতা নিয়ে বিষ্ণু দের মুগ্ধতার কথা বলছিলেন। আরো বললেন, মৈত্রেয়ী দেবী একদিন কী উচ্ছ্বসিতভাবে রৌদ্র করোটিতে পড়ে বইটা বিষ্ণু দের জন্যে উপহার হিসেবে নিয়ে এসেছিলেন। কবি এতে সংকোচ বোধ করলেও জোহরা রাহমানসহ অন্যরা গৌরববোধ করছিলেন। কবিকে লজ্জার হাত থেকে উদ্ধার করতেই হয়তোবা, জোহরা রাহমানের হাত ধরে প্রণতি বললেন, আপনি যখন অসুস্থ হয়েছিলেন, উনি আপনার জন্যে খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন। শামসুর রাহমান বললেন, হ্যাঁ, জোহরার অসুস্থতার সুযোগে আমি বিষ্ণু দের কাছ থেকে অনেকগুলো চিঠি বাড়তি পেয়েছিলাম। সেবারে কেন যেন ওনার মনে হয়েছিল জোহরা আর বাঁচবে না।  

ভূঁইয়া ইকবাল তাঁদেরকে পার্ক স্ট্রিটের হোটেলে পৌঁছে দিলেন। কবিজায়া আর ইকবালের স্ত্রী নিউ মার্কেটে গেলেন।

শামসুর রাহমান ইকবালকে নিজেদের রুমে নিয়ে গেলেন। বললেন, তাঁর কিছুটা আর্থিক সমস্যা চলছে। কলকাতার প্রকাশকের কাছ থেকে কিছু টাকা আদায় করা গেলে এখন কাজে লাগতো। ইকবাল বললেন, আমি আপনার প্রকাশককে চিনি। আমি আপনার বকেয়া পাওনা নিশ্চয়ই আদায় করে দিতে পারব। দুজন কথা বলতে বলতেই জোহরা ভাবি আর লায়লা জামান নিউ মার্কেট থেকে ফিরলেন। লায়লা খুব বিব্রত আর খুশি হয়ে বলছেন, এই দেখো না, ভাবি আমাকে কী সুন্দর একটা শাড়ি কিনে দিয়েছেন! ইকবাল অবাক হয়ে গেলেন।এত অল্প অর্থ সম্বল করে কোলকাতায় এসে আবার উপহারও কিনে দিলেন!

ভূঁইয়া ইকবাল আরেকদিন কবিকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে নিয়ে গেলেন। ইতিমধ্যে প্রকাশকের কাছ থেকে টাকা আদায় হয়ে গেছে। যাদবপুর গিয়ে দেখেন, সেখানের সাহিত্য আসরে উপস্থিত নরেশ গুহ, সুবীর রায়চৌধুরী, শুদ্ধশীল বসু, যশোধরা বাগচী, মালিনী ভট্টাচার্য প্রমুখ বিশিষ্টজন।

কবির বন্ধু নরেশ গুহ খুবই আনন্দিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন, এগিয়ে এলেন, দুহাতে কবির হাত ধরলেন

এই যে শামসুরঅবশেষে! শেষ কবে দেখা হয়েছিল? আমরা এতো কাছে, তবু কতো দূর।

শুদ্ধশীল বসুকে জড়িয়ে ধরে শামসুর রাহমান বললেন, কতো বড়ো হয়ে গেছ, কতো বিদ্বান তুমি এখন! আমি তোমাকে যখন দেখেছি তুমি তখন স্কুলে পড়তে। মনে আছে আমাকে?

শুদ্ধশীল একটু লাজুক হেসে মাথা নাড়লেন।

বললেন, মনে আছে, আবছাভাবে। কবিতাভবনে আপনি এসেছিলেন একদিন। বাবার সাথে গল্প করছিলেন।

বুদ্ধদেব বসুর কথা মনে করে কবির কণ্ঠটা ভারী হয়ে এল। তাঁর প্রথম বইয়ের কবিতা তার শয্যার পাশে পড়ে বুদ্ধদেব বলেছিলেন, এটা বাংলাভাষায় আমার পড়া অন্যতম সেরা কবিতা! ভাবলেন, বুদ্ধদেব বসুর মতো মেন্টর না পেলে তিনি কি আজকের শামসুর রাহমান হতে পারতেন। মনে মনে আওড়ালেন, আপনার ঋণ/ যেন জন্মদাগ কিছুতেই মুছবে না কোনো দিন।

ধারাবাহিক উপন্যাস || প্রথম পর্ব || দ্বিতীয় পর্ব || তৃতীয় পর্ব || চতুর্থ পর্ব