ধারাবাহিক উপন্যাস || সম্রাট ও প্রতিদ্বন্দ্বীগণ || তৃতীয় পর্ব

অ+ অ-


|| সব শালা কবি হবে ||

এদিকে রাজধানীর কাছেই সাভার সেনানিবাসে একজন কবিকে কবিতা লেখার অপরাধে সমন জারি করা হয়েছে। দু’দিন পুরান ঢাকায় এক বন্ধুর বাড়িতে আড়ালে থেকে তিনি নিজেই এসে ধরা দিয়েছেন। তিনি ‘খোলা কবিতা’ নামে সামরিক শাসন ও এরশাদ বিরোধী ১৬ পৃষ্ঠার একটা কবিতা লিখে প্রকাশ করেছেন। কবিতার দুটো লাইন সবার মুখে মুখে—

সব শালা কবি হবে; পিঁপড়ে গোঁ ধরেছে, উড়বেই;
বন থেকে দাঁতাল শুয়োর রাজাসনে বসবেই।

সেই কবিতা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ছাপা কপি শেষ হয়ে যাবার পর হাজার হাজার ফটোকপি হচ্ছে।

কবির ইন্টারোগেশন—
কর্নেল: কবি সাহেব, আপনাকে আমরা তিনদিন ধরে খুঁজছি। আপনি কোথায় ছিলেন?
কবি: আমার এক বন্ধুর বাড়িতে ছিলাম। কিন্তু সেটা অপ্রাসঙ্গিক। যে জন্যে ডেকেছেন, সেটা বলুন।
কর্নেল: আপনি কি নিজেকে অনেক সাহসী মনে করেন?
কবি: আইয়ুব খানের আমলের খাতা বের করে দেখেন। ১৯৬২ সালে প্রথম যে ছাত্রটিকে ওরা এরেস্ট করে দশ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল তার নাম মোহাম্মদ রফিক। সে যেদিন কোর্টে হাজিরা দিতে গেল তখন সে মাত্র কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। আগে যারা কোনোদিন কমিউনিস্ট দেখেন নাই, সেদিন কোর্টে হাফ প্যান্ট পরা কমিউনিস্ট দেখে আপনার মতো এমন একজন কর্নেল সাহেব ভিমড়ি খেয়েছিল।
কর্নেল: আই সি! আপনি তো দেখছি একালের ক্ষুদিরাম বসু! এখন আমি যা যা জিজ্ঞেস করবো তার ঠিক ঠিক জবাব দেবেন তো?
কবি: উত্তর দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েই এসেছি। আমার ‘খোলা কবিতা’ নিয়ে কথা বলতে চান তো? আগেই বলে রাখি, যে বেচারা তাঁর ছাপাখানায় কবিতাটা ছেপে দিয়েছে, তাঁর নামটা আমি বলতে পারবো না। আপনারা যদি গোয়েন্দা লাগিয়ে সেটা বের করতে পারেন তো করুন।
কর্নেল: (রেগে গিয়ে) এনাফ ইজ এনাফ, কবি! আপনি বাজার থেকে এই কবিতার বইটা উইথড্র করুন। নইলে সরকার তো নিষিদ্ধ করতেই পারে। এখন ঢাকঢোল বাজিয়ে আমরা সেটা আর করতে চাই না। 
কবি: (হাসলেন) সেই কবিতা তো আর আমার হাতে নাই। কয় হাজার ছেপেছিলো তা আমি ঠিক জানি না। ছাপানো কবিতা তো শেষও হয়ে গেছে। কিন্তু সেই কবিতার বই আর ছাপতেও হবে না। লক্ষ লক্ষ কপি ফটোকপি হয়ে হাতে হাতে দেশ-বিদেশে চলে গেছে। আরও হয়তো যাবে।
আজকের বিষয়টা খুব স্পর্শকাতর। ইন্টারোগেশন শেষে কর্নেল সাহেবকে একটা গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে আসতে হবে যাতে সরকার খুশি হয়, কবির সম্মান থাকে, ছাত্র-জনতাও নতুন করে উত্তেজনা না ছড়ায়। কর্নেল ভাবলেন, সৌভাগ্যক্রমে তিনি এই কবির ইন্টারোগেশন বা ইন্টারভিউ করতে পারছেন। কিন্তু তাঁর কাছে তিনি কতোটা ‘ওপেন’ হবেন!
কর্নেল: সিএমএলএ স্যারের উপরে এতো রাগ কেন বলেন তো? আপনি আমাদেরকে শুয়োরের বাচ্চা বলেছেন...
কবি: দেখুন, আপনি নিশ্চয়ই নিজেকে তাই ভাবেন না। হ্যাঁ আমি বলেছি, তাদের উদ্দেশ্যেই বলেছি, যারা আসলেই শুয়োরের বাচ্চা। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, আমলা, নিজেদের অফিসের কাজে অবহেলা করে কবিতাচর্চায় সময় দিতে শুরু করেছেন—যেন কবিতা লেখা এতই সহজ একটা কাজ। উদ্দেশ্য তো মহামান্যের নজরে পড়া! ওরাই শুয়োরের বাচ্চা।
কর্নেল: (কাষ্ঠ হাসি হেসে) যাক, গালিটা আমার গায়ে লাগেনি তাহলে। আর সিএমএলএ সাহেবের অপরাধটা কি?
কবি: একজন লোক, যে কোনো দিন লেখালেখির মধ্যে ছিল না—ভুঁইফোঁড়, সে আজ সামরিক শাসন জারির বদৌলতে কবিখ্যাতি অর্জন করবে, এটা মানতে পারছিলাম না। পত্রিকার ফার্স্ট পেজে কোন যোগ্যতায় তাঁর কবিতা ছাপা হয়? আর তার বাহিনী কি করছে?—যেখানে সেখানে মানুষকে ধরে চুল কেটে দিচ্ছে। আমার বাবড়ি দেখেন কতো বড়ো। সেদিন খুলনা থেকে ফেরার সময় ফেরি ঘাটে চা খাচ্ছি। এক লোক আমাকে দেখে বলে, স্যার—আর্মি জিজ্ঞেস করলে আপনি কোন পীরের মুরিদ হিসেবে পরিচয় দেবেন সেটা ঠিক করে রাখেন। নইলে ধরে চুল কেটে দেবে। রাস্তাঘাটে শাড়ি-পরা মেয়েদের পেট দেখা গেলে খোলা পেটে আলকাতরা লাগিয়ে দিচ্ছে। এসবের মাধ্যমে আপনারা তো মানুষকে মানুষ বলে গণ্য করছেন না। প্রত্যেক নাগরিককে একজন ক্রিমিনাল হিসেবে কাউন্ট করছেন। এরশাদ সাহেব আমাদের গৌরব বাংলা কবিতার যেভাবে সর্বনাশ করছেন, সেটা আর কি বলবো! 
কর্নেল: আপনাকে সেদিন কেউ কিছু বলেছিল?
কবি: আমার সাথে কারো দেখা হয়নি। কিন্তু মানসিকভাবে তো কুঁকড়ে গিয়েছিলাম। স্বাধীন দেশে কেউ আমার মাথার চুল কেটে দিতে পারে! গ্রাম্য শালিসে চোর-বদমাশদের এভাবে চুল কেটে দেয়। আত্মসম্মানের ব্যাপার। এটা কি একটা সভ্য দেশ?   
কর্নেল মনে মনে ভাবলেন, কবির তো বিশেষ কোনো অপরাধ নাই। তিনি দেশের কথা, জনগণের কথা, প্রকৃতি ও সংস্কৃতি—মূল্যবোধের কথাই বলেছেন। ব্রিগেডিয়ার স্যারকে রিপোর্ট দেয়ার আগে নিজের মুখোমুখি বসতে হবে একবার। মিরর ইন্টারোগেশন!

হঠাৎ আকাশ ফুঁড়ে তৃতীয় বিশ্বে গঞ্জে-গাঁয়ে
হুট্ করে নেমে আসে জলপাই লেবাস্যা দেবতা;
পায়ে, কালো বুট; হাতে, রাইফেলের উদ্যত সঙ্গীন।
(খোলা কবিতা, মোহাম্মদ রফিক)

...

তখন সুদূর দক্ষিণ আফ্রিকায় এক তরুণকে বর্ণবাদী অ্যাপারথেইড সরকারের পুলিশ ধরে নিয়ে গেল। অতি সাধারণ এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবক। নিষিদ্ধ ঘোষিত নেলসন ম্যান্ডেলার দল আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের একজন সমর্থক সে। ছেলেটা বিছানা বালিশ, সোফা বানানোর দোকানে কাজ করে। হয়তো কবিতাও লেখে। কেউ জানে না। সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় একজন পুলিশ মারা যায়। তখন পুলিশ এসে এই তরুণ অর্থাৎ বেনজামিন মলয়েসিকে ধরে নিয়ে যায়। দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি পিক বোথার সরকার বেঞ্জামিন মলয়েসিকে এক ষড়যন্ত্রে ফাঁসিয়ে সেই পুলিশ হত্যার অভিযোগ আনে। বেনজামিন বলেছিল, আমি খুন করিনি। কিন্তু আমি এএনসিকে সমর্থন করি। বেনজামিনকে মুক্তি দেয়া হলো না। ওদিকে নেলসন ম্যান্ডেলা ১৮ বছর যাবত রোবেন দ্বীপে নির্বাসনে। গোটা দক্ষিণ আফ্রিকা বর্ণবৈষম্য থেকে মুক্তির জন্য ফুঁসছে। 

ধারাবাহিক উপন্যাস || প্রথম পর্ব || দ্বিতীয় পর্ব