বোঁটার পরান ও অন্যান্য কবিতা
|| দেয়ালে টাঙানো রোদ ||
উৎসবের ভিতর থেকে নেমে এলাম মাটির ধূলিতে
মেহেদী রঙ শুকাতে না শুকাতেই
কানের কাছে বিদায় ঘুঙুর,
আর কালো ডাহুকের প্রতিধ্বনি।
উষ্ণ উৎকণ্ঠায় বাতাস এঁকেবেঁকে নিয়ে আসে
বিষাদপারের স্বর
আমার কানের কণ্ঠে বেতাল ঘুঙুর
সোয়াসী নদীর মতো আশ্চর্য গীত নাই কোনো।
শুধু অবিচলিত চোখের চত্বরে
কার্তিকের শীতে
দেয়ালে টাঙানো রোদ কালো সুতোয় বোনা
দুপুরের জলছবি শুকায়।
|| মর্মর ||
এখনো যা কিছু মুখাপেক্ষী—
লুপ্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায়।
সমস্ত শহর খরস্রোতার দিকে
ধূলিঝড় নামিয়েছে।
বর্ষণ ঘন না হতেই
চোরাস্রোতে ভেসে যাচ্ছে
সম্পূর্ণ অধর ও আধুলি
কলা ও কাকলি।
তাকে বলেছি,
ধ্যানবিন্দু কিসের যেন নাম?
ফুটে থাকা কি কারাগার?
ধুতুরার মতো তুমি চেয়ে থাকো
ধুতুরার মতো আমি চেয়ে থাকি
এ কেবল মন্দ বিকশিত।
|| আপেলকুলের ঘ্রাণ ||
শীত জানে, পিপাসা ও প্রাপকের ঠিকানা
কার্তিক এলে জ্বলে ওঠে কতদিনের জোনাকি
বনের গভীরতা, সুরম্য অন্ধকার
ঝিঁঝি আর ভ্রমণের পথ গন্ধ ঘাট।
পাখিরা ঘুমিয়ে পড়ে স্বর্ণলতা তাপের ভেতর
অবদমনেরা ধৈর্য হারায়, জিভ কাঁপে
মনুষ্য দেহের স্বরে অনুকূল হাওয়া জাগে
কার্তিক এলে মনে পড়ে আপেলকুলের মদিরা
একজন বিচলিত তুমি
সারারাত বিরূপ গানের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছ
তোমার পায়ের গতি, না বলা ধ্বনি, পথরেখা
কোমল কুয়াশারা সেই সঙ্গ পায়।
শীত এলে মনে পড়ে পলকহীন নিদারুণ খঞ্জর
শিশির জমতে জমতে তার মগ্ন বরফ চোখে
‘না জ্বলেনি’
আগুনের নিরুত্তাপ কাঠি, মত্ততা ও লাভা
সারারাত জাগানো কবুতরের আত্মহত্যা।
কার্তিক এলে নিজের মধ্যে নদী
দেহের মধ্যে বধ্যভূমি, প্রাপকের পথরেখা খোঁজে
বিকেলের শেষে, দিক ও দিগন্তের অভিলাসে
ঘিরে থাকে নদী ও কার্তিকের অনেক কুহক।
|| অনঙ্গ কলার পর্বত ||
হাওয়াবনের ভেতরে সব গাছ পাতা, সব পথ সজাগ।
অরণ্যের দিনরাত্রি মিশে যাচ্ছে পাতায়,
নুয়ে আছে লাবণ্য ও লতায়, ছায়ায়
একটি পুকুর ঝুপঝাপ, হাওয়া ও টুংটাং
ঝিলমিল—কম্পনে কাঁপায়।
ঘাসের মহল পেরিয়ে একটি দিকের সঙ্গে কথা হতে পারে
হয়ত এ পথেই আছে। মাটির গোপনে থাকে সুরের নির্যাস।
নিবিড় খুঁড়েছে যে স্বরবিতান—তাঁর আনন্দ হয়েছে কান্নায়।
কদম কদম প্রান্তরের দূরে
যদি আরেকবার খুঁজে পাই নাচের গালিচা
তিরতির মুদ্রার কাল ছুঁয়ে যাবে অনঙ্গ কলার পর্বত।
|| বোঁটার পরান ||
সাজলাম রক্তমদির রঙে ছন্দে।
শিমুল ফুটে আছে লাল হয়ে।
দেহে ও শ্বাসের উপরিতলে।
বুকের বোঁটার কুসুম মেখে।
তার কাছে যাই,
যেতে চাই যদি
পালাবে পতন-স্বভাবে।
কুহক ও নিজস্ব পথে।
আমার সাজের দানিতে
কোনো ভণিতা নেই,
একাগ্র। তবু হলাম নত।
কুহকের ভারে মুহূর্ত ভাঙে।
ভাঙে বৃহৎ কোলাজ।
তবু আমিই রয়েছি জেগে।
একটি ক্ষুধার দিকে তাকিয়ে
অনেক ক্ষুধার কথা ভাবি।
তারা হারজিত হয়ে আছে।
জাগাবো না কুসুমস্বভাব।
বুকের বোঁটার কুসুম।
নত হয়ে আছে বোঁটার পরান।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন