নদীর অসীমে নিঃশব্দ যাত্রা
মেঘনা নদীর বুক চিরে এগিয়ে চলছে এম. ভি. কীর্তনখোলা। বিভুরঞ্জন সরকার দাঁড়িয়ে আছেন তিনতলার ডেকে। তার চোখ আর্দ্র, দৃষ্টি স্থির। দূরে একটি পালতোলা নৌকা ভেসে যাচ্ছে। তিনি তাকিয়ে আছেন সেদিকে, কিন্তু দেখছেন না কিছুই। তার দৃষ্টি যেন ভেদ করছে সময় ও স্থানের সীমানা, ফিরে যাচ্ছে একাত্তর বছর পিছনে, কিংবা আরও দূরে—এক অনির্দিষ্ট অতলে।
বিকেল গড়িয়েছে অনেক আগেই, সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিমে। তিনি মনে মনে হিসেব করলেন, ‘এই তো, আর পনেরো-বিশ মিনিট, তারপরই সব শেষ।’ এই যে নীলাকাশ, এই স্নিগ্ধ বাতাস, এই জীবন— সবকিছুর ইতি টানবেন তিনি নিজেই।
ভাড়া তিনি আগেই দিয়ে রেখেছেন। শেষ মুহূর্তে ভাড়া দেওয়ার কথা ভুলে যেতে পারেন, এই ভয়ে। জীবনে টাকার জন্য বহুবার পরিচিতজনের কাছে হাত পাততে হয়েছে; তবে সবই তিনি শোধ করেছেন, যত কষ্টই হোক না কেন।
তার জীবনে যে শুধু অর্থের ধার-দেনা ছিল, তা নয়, আবেগেরও এক ধার ছিল—যা তিনি শোধ করতে পারেননি, আর শোধ করা হবেও না। বিভুরঞ্জন সরকারের চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি চোখ মুছলেন। একজন বয়স্ক লোক কাঁদছে, এ দৃশ্য কারও চোখে পড়লে কৌতূহল সৃষ্টি হবে। কেউ কেউ তাকে চিনেও ফেলতে পারে। জীবনে তিনি অর্থ-বিত্তের মালিক হতে পারেননি ঠিক, কিন্তু লিখেছেন অজস্র। তার লেখা কলাম কত বিখ্যাত মানুষ পড়েছেন, কত খ্যাতিমান লোকেরা ফোন করে তারিফ করেছেন! কিন্ত সে সব খ্যাতি, সে সব স্বীকৃতি এখন পেছনে ফেলে তিনি যাত্রা করেছেন এক অনন্তলোকে।
সন্তানদের কথা মনে পড়ল, তার দুই চোখের মনি। মেয়েটা বড়, এমবিবিএস শেষ করে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক। কিন্তু ছেলেটা বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে এখনও বেকার। চার বছর বয়সে গুলেনবারি সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়ে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে। ওর ব্যয়বহুল চিকিৎসার ধকলও তিনি সয়েছেন, কিন্তু এখন আর পারছেন না।
সিদ্ধান্তটা নিয়ে ভাবছিলেন অনেক দিন ধরেই। ‘শেষবারের মত লিখছি’, ‘আর লিখব না’, ‘লেখা ছেড়ে দিচ্ছি’—এমন কথা ছোট ভাইকে বলেছেনও বহুবার।
তিনি এক জীবনে না পেয়েছেন জমি, না পেয়েছেন মাথা গোঁজার ঠাঁই। পঞ্চাশ বছর লিখেও শেষ বয়সে মাথা নত করে ধার চাইতে হয়েছে! তার মতো সৎ সাংবাদিকদের জীবন এভাবেই চলে যায়—নিঃশব্দে, অচেনা কষ্টের ভার নিয়ে।
নিচে নামতে শুরু করলেন তিনি, নিজের পায়ে ভর করে জীবনের শেষ যাত্রা। চোখে ভাসছে কেবল এক ঝাপসা শূন্যতা।
সকাল দশটার দিকে অফিসে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছেন, শেষবারের মতো নিজের ঘর ছেড়ে আসা! ফোন বাসায় রেখে এসেছেন, যাতে কেউ যোগাযোগ করতে না পারে।
বাসা থেকে বের হওয়ার সময় একেবারে স্বাভাবিক ছিলেন তিনি; চশমাটাও নিতে ভোলেননি। স্ত্রীকে বলে এসেছেন, বিকাল পাঁচটা থেকে সাড়ে পাঁচটার মধ্যে ফিরবেন। মিথ্যে বলেছেন—তিনি জানেন, ফেরার আর কোনো সম্ভাবনা নেই।
এসময় স্ত্রীর মুখটা ভেসে উঠল। বের হওয়ার সময় সে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এসেছিল। মনে মনে স্ত্রীকে বললেন, ‘তুমি আমায় ক্ষমা করে দিও। সংসারে যতটা পারলাম, দিলাম। বাকিটা ঋণ হয়ে রইল তোমার কাছে।’
দোতালায় আজ অনেক ভিড়, হয়তো বৃহস্পতিবার বলেই। একটু দাঁড়ালেন তিনি। মনে পড়ল, আশির দশকে সাপ্তাহিক যায়যায়দিন-এর সহকারি সম্পাদক থাকাকালে ‘তারিক ইব্রাহিম’ ছদ্মনামে লিখে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিলেন। এক দৈনিক যখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তখন প্রথম পাতায় তার লেখা মন্তব্য প্রতিবেদন ছাপা হতো। অথচ এখন কোনো কোনো পত্রিকায় লেখা পাঠিয়ে ছাপার জন্য অনুরোধ করেও লাভ হয় না। তার লেখা নাকি পাঠক আর সেভাবে ‘খায়’ না।
লঞ্চ এখন মেঘনার গভীরে। যেদিকে চোখ যায়, শুধু পানি আর পানি। জনপদের কোনো চিহ্ন দেখা যায় না। এটাই তার জন্য উপযুক্ত জায়গা। এখানে ঝাঁপ দিলে তার দেহ খুঁজে পাওয়া যাবে না—তিনি হারিয়ে যেতে পারবেন চিরতরে।
আত্মহত্যার নানা উপায় নিয়ে ভেবেছেন তিনি—গলায় ফাঁস দেওয়া বা বিষ খাওয়া। কিন্তু তাতে তার পরিবার সামাজিকভাবে হেয় হবে। তিনি চাননি তার সন্তানরা অপমান সয়ে জীবন কাটাক। জীবনে তিনি তাদের জন্য তেমন কিছুই করতে পারেননি। তাই মৃত্যুর পরে তাদের আর কোনো সমস্যায় ফেলতে চাননি।
এখন ছেলে-মেয়েদের কেউ বলতে পারবে না, তাদের বাবা আত্মহত্যা করেছে। বলবে হারিয়ে গেছে, নিখোঁজ হয়ে গেছে। তিনি হারিয়ে যেতে চান, সবার দৃষ্টির অন্তরালে—এক অদৃশ্য, অনামী সত্তা হয়ে।
নদীর বুক চিরে ছুটে চলছে লঞ্চ। যাত্রিরা হাসছে, কথা বলছে, কেউ কেউ হাতের ফোনের উপর ঝুঁকে আছে। কিন্তু কেউ বুঝতে পারছে না যে তাদের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা একজনের ভেতরে চলছে মানবজনমের সম্পূর্ণ জীবনকথা—সাহস, ত্যাগ, ভালোবাসা, আর অপূর্ণতার গল্প।
তিনি নিচতলায় নামতে শুরু করলেন, জীবনের শেষ ধাপ। এটা অতিক্রম করতে পারলেই অনন্তলোকে যাত্রা।
সারাজীবন তিনি লিখেছেন সত্যের পক্ষে, মানুষের পক্ষে, দেশের পক্ষে। কিন্তু আজ, যখন তিনি নিজের জীবনকে দেখেন, অনুভব করেন—‘সত্য লিখে বাঁচা সহজ নয়’। সত্য লিখতে গেলে ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য হারাতে হয়। তিনি অবশ্য তেমন স্বাচ্ছন্দ্য চাননি কখনো। তবে সারাজীবন হাত পেতে চলতে হবে, এটাও চাননি।
আচ্ছা, এই জায়গাটা কোথায় হতে পারে? মুন্সীগঞ্জ কি? হতে পারে। এটাই ভালো। শেষবারের মতো চারপাশে তাকালেন তিনি। সবকিছু কেমন ঘোলা লাগছে। নিজেকে প্রশ্ন করেন, ‘বেঁচে থাকা কি ঠিক হবে?’ মন উত্তর দেয়, ‘না; এভাবে বেঁচে থাকা যায় না।’
সাংবাদিকতা পেশায় দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় কাটিয়ে এখনো সন্মানজনক বেতন-ভাতা পাননি তিনি। যদি পেতেন, তাহলে হয়ত সংসার চালানোর জন্য নিয়মিত ধার-দেনা করার পেশাটি বেছে নিতে হতো না! অন্যসব খরচের হিসাব বাদ দিয়ে মাসে তার একারই ওষুধের ব্যয় বিশ-বাইশ হাজার টাকা! আর্থ্রাইটিস, লিভার সিরোসিস, ডায়াবেটিস, হৃদরোগসহ কত যে রোগ তার!
স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে পরিবারের দায়বদ্ধতাও তাকে প্রতিনিয়ত চাপে রেখেছে। এখন তার দৈনন্দিন জীবন শুরু হয় ওষুধ খেয়ে, স্বাস্থ্য পরীক্ষা দিয়ে, আর ওষুধ কেনার টাকার চিন্তায়। আর্থ্রাইটিস ও লিভারের চিকিৎসার জন্য কত যে ধারদেনা করতে হয়েছে...।
নিচতলায় এসে দাঁড়ালেন তিনি। ইঞ্জিনের শব্দ, হকারদের ভিড়, সিগারেটের গন্ধ—সবকিছুই বেশি এখানে। তবে কারো দিকে তাকাচ্ছেন না তিনি। তার দৃষ্টি শূন্য। আশ্চর্য, তিনি এখন আর কারো জন্য কোনো মায়া অনুভব করছেন না। তার ভেতরে কেবল একাকীত্ব, স্তব্ধতা, আর দীর্ঘশ্বাস।
তিনি বাইরে তাকালেন, কিছু দেখা যাচ্ছে না—কেমন যেন কুয়াশা চারদিকে। আচ্ছা, এখন তো শীতকাল না; এতো কুয়াশা হবার তো কথা না! দৃষ্টিতে কুয়াশা নিয়েই জীবন থেকে প্রস্থান নেওয়ার জন্য লঞ্চের শেষ প্রান্তে পা বাঁড়ালেন বিভুরঞ্জন সরকার।
এমন সময় শৈশবের কথা মনে পড়ল। সেই ১৯৫৪ সালের ৬ই জুন পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় তার জন্ম। জন্মস্থানের কথা মনে পড়তেই স্মৃতিগুলো একের পর এক ভেসে উঠতে লাগলো। নগরকুমারী গ্রামের কাঁচা রাস্তা, ধুলোমাখা খেলার দিন, বাবার হাত ধরে প্রথম স্কুলে যাওয়া—কত স্মৃতি, কত মুখ ভিড় করছে মনে! তিনি এক এক করে জীবনের রঙগুলো দেখতে পান।
চোখ দু’টো তিনি আর ধরে রাখতে পারলেন না। তবে এবার আর মুছলেন না, একটু পরেই তো নদীর পানিতে তা ধুয়ে যাবে।
ইঞ্জিনরুমের পাশে আসতেই শব্দ বিকট হতে লাগল, যদিও কোনো শব্দই তার কানে যাচ্ছে না। কেমন যেন এক ঘোরের মধ্যে আছেন তিনি। গতকাল সারারাত ঘুমাননি। একটি চিঠি লিখেছেন, ‘খোলা চিঠি’ নামে। চিঠিটা একটু বড় হয়ে গেছে—যাক গে—জীবনের শেষ লেখা। চিঠির শেষে লিখেছেন, “২১ আগস্ট, ভোর ৫টা। সিদ্ধেশ্বরী, ঢাকা।” এরপর সকাল সোয়া ন’টায় লেখাটি পত্রিকার মতামত বিভাগে মেইল করেছেন। মেইলে লিখে দিয়েছেন, “জীবনের শেষ লেখা হিসেবে এটা ছাপতে পারেন।”
হ্যাঁ, এটাই তার জীবনের শেষ লেখা। একাত্তর বছরের পথচলা শেষ হলো এক অপূর্ণ স্বপ্ন, অবহেলা ও দুঃখকষ্টের বোঝা বুকে নিয়ে। শেষবারের মতো তিনি তার মায়ের মুখটা মনে করতে চাইলেন, কিন্তু পারলেন না।
তিনি ধীর পায়ে ইঞ্জিনরুম পার হলেন। লোকজনের ভীর কমে আসছে, তিনি একা হতে থাকলেন।
আত্মহত্যা মহাপাপ, তা তিনি জানেন। এই একাত্তর বছর বয়সে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল না; কিন্তু তার জীবনে কোনো সাফল্যের গল্প নেই। সাংবাদিক হিসেবেও এডাল-ওডাল করে কোনো শক্ত ডাল ধরতে পারেননি। হয়ত তার কোথাও না কোথাও বড় ঘাটতি আছে। আফসোস, এই ঘাটতি আর কাটিয়ে ওঠা হলো না।
বিভুরঞ্জন সরকার দাঁড়িয়ে আছেন লঞ্চের শেষ প্রান্তে। পাশেই প্রমত্ত মেঘনার শীতল স্রোতধারা।
এখন তিনি সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। এমন জায়গাই তিনি চেয়েছিলেন, নিজেকে লুকিয়ে ফেলার জন্য। কেউ তাকে খুঁজে পাবে না, কোনদিন, তার ঈশ্বর ছাড়া।
তিনি ভাবলেন, জীবন থেকে প্রস্থান নিলে কী হবে? তিনি আর কলম ধরবেন না—এইতো? নাহ, তার কোনো অভিমান নেই; তিনি আত্মঘাতী হওয়ার পরিকল্পনা নিয়েই ঘর ছেড়েছেন। আচ্ছা, ওরা কি এতক্ষণে লেখাটা দেখেছে, পড়েছে? তার ঘরের মানুষরা কি টের পেয়েছে? তারা কি তাকে খুঁজতে বের হয়েছে?
আবার মনে হল, তিনি কেন এগুলো ভাবছেন? এগুলো নিয়ে তো গত একমাস অনেক ভেবেছেন। সব হিসাব মিলিয়েই তো তিনি নিজের জীবনের এই উপসংহার টানলেন।
তিনি এগিয়ে এলেন একদম কিনারে। শেষবারের মতো পৃথিবীর দিকে তাকালেন—বিশাল, অগাধ জলরাশি, তীর দেখা যায় না। মনে হলো, এই নদীই তার মুক্তির পথ। দুঃখই হোক তার জীবনের শেষ সঙ্গী। আর পৃথিবীর সকল প্রাণী সুখী হোক।
বিভুরঞ্জন সরকার চোখ বন্ধ করে ঈশ্বরকে স্মরণ করলেন। ফিসফিস করে বললেন, ‘ঈশ্বর, আমাকে ক্ষমা করো।’ তবে সেটা যেন কোনো অনুষঙ্গহীন ভক্তি বা প্রার্থনা নয়, কেবলই এক অধরা আশা।
চোখ বন্ধ রেখেই চশমাটা খুলে ফেললেন; ফেলে দিলেন নদীতে। নদীর ঢেউগুলো তার পায়ের কাছে এসে ধাক্কা দিল—কয়েক ফোঁটা এসে পড়ল তার পায়ে। ঠিক তখনই তার মায়ের মুখটা মনে পড়ল—অস্পষ্ট নয়, একদম স্পষ্ট। তার কণ্ঠ কাঁপল।
তিনি ঝুঁকে পড়লেন; নদীর কোল যেন তার অপেক্ষাতেই ছিল। তার মন-মস্তিষ্কে যা-ই ছলছল করে উঠুক না কেন, সেই মুহূর্তে সময় থমকে গেল। কীভাবে তিনি ডুবে গেলেন, তা বর্ণনা করা লেখকের সাধ্যের অতীত। মহান ঈশ্বরই এই ক্ষণটি জানেন।
বিভুরঞ্জন সরকার হারিয়ে গেলেন নদীর অসীমে, নিঃশব্দে। যেন অদৃশ্য হতে চাওয়া এক ছায়ার মতো তিনি এগিয়ে গেলেন অনন্তের পথে।
উৎসর্গ: বিভুরঞ্জন সরকারের প্রতি স্মৃতিতর্পণ



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন