এখানে এক নদী ছিল

অ+ অ-

 

ধীরেনমাঝি এক কথার লোক। মরে গেলেও কথার বরখেলাপ করেন না। গাঁয়ের লোক অবশ্য তাঁর এই বিশেষ গুণকে ঘাড়ের-রগ ত্যাড়া বলে অবজ্ঞা করে। তাতে অবশ্য তাঁর জবানের নড়চড় হয় না!

ওদিকে গাঁয়ে চলছে হুলস্থুল কাজ-কারবার। গাঁয়ের একদাগের উপর প্রায় বিঘা চল্লিশেক বসতবাড়ির জায়গাজমি সাধারন দরের চেয়ে কয়েকগুণ চড়াদরে উত্তরপাড়ার হাফিজুদ্দিন খরিদ করেছে। হাফিজউদ্দিনের মেয়ে, বিদেশের বাড়িতে লটারিতে এক মিলিয়ন ডলার পেয়েছে! তাতে নাকি তার মাথায় বিশেষশ্রেণির ভূত চেপে বসেছেগাঁয়ের লোকে বলে! তারা আরও বলে, মেয়ে মানুষ, স্বভাবতই বিষয়ভিত্তিক বিচার-বিবেচনা ক্ষীণ! তাই যদি না হবে, তো এই গণ্ডগাঁয়ে কেউ লাইব্রেরির কথা মাথায় আনে! ধীরেনমাঝির বসত ভিটের দাগের উপর পুরো তল্লাটের একক স্বত্বাধিকা্রিণী এখন এই নির্বোধ মেয়ে মানুষ! একমাত্র ধীরেনমাঝির ভিটেটা মধ্যিখানে, যা হাফিজুদ্দিনের গলার কাঁটা হয়ে আটকে আছে। 

ধীরেনমাঝির বসতভিটে হাল-আমলের নয়। সাতপুরুষের দাপুটে-জীবনকালের সাক্ষী এই ভিটেখানা। ভিটের অদূরে একসময়ে দুর্দান্ত দাপটে বয়ে চলা ইছামতী নদী। নদীর জল, তাঁর সাতপুরুষের হাসিকান্নার স্বয়ংদ্রষ্টা।

বহুকাল আগের কথা। প্রকাণ্ড ইছামতীর বুকের ওপর চর জাগে। দিনকে দিন তা আয়তনে বেড়ে বিশাল বালুচরে রূপ নেয়। বালুর উপর ধীরেধীরে পলিমাটির আস্তর জমে। উর্বর-মাটির টানে দূরদূরান্ত থেকে দলে দলে লোক এসে বসত গড়ে এই চরায়। ধীরেনমাঝির পূর্বপুরুষ সে-দলের লোক। দলের প্রায় সকলে চরের পলিমাটিতে চাষাবাদ শুরু করলেও তাঁর পূর্বপুরুষ গেল একটু ভিন্নপথে। তারা নদীতে কড়ইকাঠের কোষানৌকা নামাল এবং খেয়া পারাপার দিয়ে শুরু করল তাদের জীবনযুদ্ধ। আর সেই থেকে তাদের নামের শেষে মাঝি শব্দটি অলংকারের মতো জুরে বসেছে। সাতপুরুষের জাত ব্যবসা খেয়া পারাপার। এতকাল পরে নদীপারের জন্মভিটা লোভে পরে বেঁচে দেবার চিন্তা মাথায় আনা বড়ো অন্যায় কাজ!

হাফিজুদ্দিনের মেয়ে শহুরে পড়াশুনা জানা মেয়ে। কৃষক বাবা বহু দুর্ভোগে মেয়েকে শহরের কলেজে পড়িয়ে শিক্ষিত করে। মেয়ে একসময় উঁচু পড়াশুনা করতে বিদেশে চলে যায়। বিদেশে পড়াশুনার ফাঁকে দোকানে কাজ করে। সেই দোকানের এক খরিদদার উপহার হিসেবে তার হাতে এক লটারির টিকিট ধরিয়ে দিয়ে যায়। কিছুদিন পরে সেই লটারি থেকে এক মিলিয়ন ডলার মূল্যের জয় আসে।

গাঁয়ে এক উটকো-সংকটের শুরু হয়, হাফিজুদ্দিনের মেয়ের লটারি-টাকা লাভের পর থেকে!

হঠাৎ পাহাড়ি ঢলে নিচু লোকালয় জলেরতলে তলিয়ে গেলে যেমন হয়, গাঁয়ের শান্তশিষ্ট মানুষগুলোর বহুকালের জীবনযাপনের ধারায় তেমন একটা টালমাটাল দশা চলে আসে। তারা অগাধ অর্থের টোপে সাতপুরুষের ভিটেমাটি বিক্রি করে দিয়ে ভিনগাঁয়ে গিয়ে ঘর বাঁধে। সারাদিনের ব্যস্ততার পর কুড়েঘরের সুখ কী আর ইটবালুর বাসাবাড়ি দিতে পারে! তাছাড়া হাতে টাকা আছে কিন্তু কোন কাজকর্ম নেই, অসার সময়ক্ষেপণ! এমন কর্মহীন জীবনে এরা চরম অস্থিরতায় দিন পার করে! 

হাফিজুদ্দিনের মনেও যে স্থিরতা আছে তা কিন্তু নয়। তার দিনরাত কাটে চরম উৎকণ্ঠায়। মেয়ে জেদ ধরে বসে আছে জগত বিখ্যাত লাইব্রেরি তার গাঁয়ে সে দেখতে চায়। কিন্তু এমন ঘন বসতিস্থলে এক দাগে জায়গা জুটানো চাট্টিখানা কথা নয়। টাকায় সব হয় এমন আপ্তবাক্য আদতে অন্তঃসারশূন্য। হাফিজুদ্দিন এই জমাজমি ক্রয় করতে যেয়ে তা কড়ায়গণ্ডায় টের পায়। সোনাদানায় মোড়ানো টাকাকড়িতেও ধীরেনমাঝিকে সম্মত করা যায় না! তাঁর মাত্র নয় কাঠার ভিটেখানা, তাও পড়ল হাফিজুদ্দিনের কেনা তল্লাটের মধ্যিখানে! হাফিজুদ্দিনের ঘুম কেড়ে নেয় ধীরেনমাঝির নকাঠার জমিটুকু!

মাঝি আধপাগলা, স্বপ্নবাজ তবে প্রচণ্ড আশাবাদী মানুষ। একসময়ের বিস্তীর্ণ ইছামতী এখন শুকিয়ে মরাখাল! বর্ষাকালে নদীতে হাঁটুজল থাকে। উন্নাকালে ছেলেরা নদীর খড়খড়ে বুকে ফুটবল খেলে। নদীর ওপর গুইসাপের পিঠের মতো আজদেহা শহুরেপুল যা দখল করেছে বাঁশের সাকোঁর জায়গা! মাঝি, প্রতিবছর উন্নাকালে বাপ-দাদার শালতিটাকে গাবের কষে মেখেজুকে রোদে পুড়িয়ে খেয়া পারাপারের উপযুক্ত করে তোলে। নদী দখলবাজরা নদীর দুপারে অবৈধ বসতি গড়ে পুরোনদী গিলে প্রায় নিঃশেষ করে দিয়েছে! কিন্তু সে স্বপ্ন দেখে, একদিন নদীর দুকূল ছাপিয়ে জলে ভরবে এ-নদী! খেয়াঘাটে জমায়েত হবে ইছামতীর এপার-ওপারের লোক। ধিরেনমাঝি নাম ধরে উচ্চস্বরে হাঁক আসবে, বৈঠা হাতে সে ছুটে যাবে খেয়াঘাটে!

তাঁর বাড়িটি অবশ্য এককালে নদীর মধ্য চরে ছিল। এখন নদী নেই! একসময়ের খাঁখাঁ নদীরচর এখন ঘনবসতি, জনপদ। তার প্রতিবেশিরা চড়াদামে ভিটেমাটির স্বত্ব ত্যাগ করে ভিনগাঁয়ে বসত করেছে। তাদের সাথে তাদের ঘরদোরও সরে গেছে! মধ্যিখানে বয়োবৃদ্ধের ফাঁকামাড়িতে নড়বড়ে শেষদাঁতটির মতো বেখাপ্পা হয়ে কেবল মাঝির দুচালা বাঁশেরঠেকা দেওয়া ঘরখানা রয়ে গেছে! বাড়ির উঠান থেকে নদীরপার ঘেঁষা উঁচু পাহাড়ের মতো রাস্তাটা পষ্ট দেখা যায়। রাস্তাপাড় ভেঙ্গে আরও নিচে, জলকাদায় মাখামাখি করে ইছামতীনদী নামে একখণ্ড সরু খাল, বহু কষ্টে আজও কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে! সকাল-বিকাল মাঝি ছুটে যায় সেই মরাখালে, জোয়ারের খোঁজে। মাঝেমধ্যে বর্ষাদিনে রাস্তায় জমাপানি ঢাল বেঁয়ে নদীতলে জমা হয়! মাঝি নদীতে জল এসেছেএমন খুশিতে বৈঠা হাতে পাগলের মতো ছুটে যায়, খেয়াঘাটে!

হাফিজুদ্দিনের ত্বর সয় না! মেয়ে মাস দুয়েকের মধ্যে দেশে ফিরবে। লাইব্রেরির দাপ্তরিক কামকাজ প্রায় শেষের দিকে। শহর থেকে প্রসিদ্ধ ডিজাইনার আসে। সকাল-বিকাল গজ ফিতায় জায়গা-জিরত মাপজোক করে। লোকমুখে শুনেছে মাঝি এখানে মস্তবড়ো দালানঘর উঠবে; দেশ-বিদেশের মোটা মোটা বই দালানঘরের চারপাশের দেওয়ালে থরে থরে সাজানো থাকবে। সারা পৃথিবীর জ্ঞানী লোকজন পড়াশুনা করতে ভিড় জমাবে এ-তল্লাটে। কিন্তু তাঁর মাথার খোঁড়লে একটা সহজ প্রশ্ন সারাক্ষণ ঘুরঘুর করে, যে  দেশের লোকেরা আস্ত নদীটাকে গিলে সাবার করে দিল,তাদের কাছে এসে মানুষ আদতে কী শিক্ষা নেবে! মোটা মোটা বইয়ে কী লেখা থাকে! নদী নিধনের গল্প থাকে? নিরক্ষর মাঝি লোক ধরে ধরে এসব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে কিন্তু যুতমতো কারো কাছে উত্তর পায় না!

অবশেষে উপায়ান্ত না পেয়ে সে তাঁর স্বপ্ন নিয়ে হাফিজুদ্দিনের কাছে ছুটে যায়। একসময় তাদের দুজনের সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ ছিল। খেয়াঘাটে বসে কতো গল্প করেছে। নদীর কথা, গাঁয়ের কথা, নিজেদের সুখ-দুঃখের কথা। সেসময়ের অধিকার নিয়ে এক সন্ধ্যায় হাফিজুদ্দিনের বাড়ি গিয়ে হাজির হয় সে। নদীটাকে যদি বাঁচানো যায়, যদি নদীর দুকূল ছাপিয়ে আবার জোয়ার আসে! হাফিজউদ্দিনের এখন মেলা টাকা! টাকায় তো নাকি সবই হয়! হাফিজ উদ্দিন তাঁর কথা শুনে উচ্চস্বরে হাসে! শুধু হাফিজুদ্দিন না, গাঁয়েরলোকও তাঁকে পাগল বলেই জ্ঞান করে!

এতকিছুর পরও মাঝির ক্লান্তি আসে না! সে এলাকার মন্ত্রীর কাছে ছুটে যায়। মাঝেমধ্যে ছুটি-ছাঁটায় মন্ত্রী এলাকায় আসেন। মনমর্জি ভালো থাকলে সাধারণ মানুষেরে সাক্ষাত দেন। তবে এও সে শুনেছেইদানিং নাকি মন্ত্রীর মনমেজাজ কড়া থাকে! এলাকায় এসে দলের লোকদের সাথে কীসব মিটিংসিটিং করে তারপর থানার অফিসারদের ডেকে এনে ধমকিধামকি দিয়ে শহরে চলে যান! তারপরও সে মন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করতে মনস্থির করে।

বর্তমান মন্ত্রীর বাবা ছিলেন আগের আমলের নামকরা মন্ত্রী। তিনি ছিলেন অতি অমায়িক লোক। ধনী-গরীবের ভেদাভেদ করতেন না। একবার খেয়াঘাটে এসে মাঝিকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন! সে কথা আজও  মনে পড়লে মাঝির বুকটা ফুলেফেঁপে একসার টানটান হয়ে যায়! যদিও এমন ঘটনা নাকি ইলেকশনের পূর্বে অহরহ ঘটে! তারপরও সে-ঘটনা তাঁর জীবনে সেরা হয়ে স্মৃতিতে গেঁথে আছে। সে লোকসমাজে গর্ব করে সে-গল্প বলে বেড়ায়।

তবে ছেলেমন্ত্রী ইলেকশনে এলাকার সাধারন জনগণের ইচ্ছা অনিচ্ছা আমলে নেয় না! এমন কী এলাকার ময়মুরব্বীদেরও তোয়াক্কা করে না! যদিও ইলেকশনের আগে এলাকায় মোটরসাইকেল/ গাড়ির বহরে চ্যালাচামচাদের নিয়ে মিছিল করে! এসব চ্যালারা নিজেরা নিজেরা ভোট দিয়ে ভোট বাক্স ভরে তাকে পাশ করিয়ে নিয়ে আসে! গত ইলেকশনে খুব শখ করে মাঝি ভোট দিতে কেন্দ্রে যায়। মন্ত্রীর দলের লোক তাঁকে কেন্দ্রের কাছে ঘেঁষতে লাঠি হাতে তেড়ে আসে! এরপর অবশ্য তাঁর আর ভোট দেওয়ার শখ জাগে নাই!

মাঝি মন্ত্রীবাড়ি পৌঁছে মধ্যদুপুরে। ভাদ্র মাস চটচটে ভ্যাপসা গরম। আকাশে ধূসর ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ জমা হয়ে আছে। সে মাথার উপর আকাশটাকে তাকিয়ে দেখে। মেঘ গলে বৃষ্টি নামার কোন লক্ষণ নেই! দীর্ঘ পথ হেঁটে এসেছে। শরীর থেকে দরদরিয়ে ঘাম নামছে। কাঁধের গামছাটা মন্ত্রীর বাইরবাড়ির চাপকলে ভিজিয়ে গা মুছে নেয়। বাইর বাড়ির বৈঠকখানায় বহুলোক ঠাঁসাঠাসি করে বসে আছে মন্ত্রীর অপেক্ষায়! মাঝি ভিড় এড়িয়ে মন্ত্রীর অপেক্ষায় বাড়ির শেষসীমানার আমগাছ তলায় বসে থাকে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়, মন্ত্রীর দেখা মেলে না! বার কয়েক সে বৈঠকখানার লোকের কাছে জেনে এসেছে, মন্ত্রী নাকি অতিশয় ব্যস্ত আছেন! বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে! কিন্তু মন্ত্রীর ব্যস্ততা কমে না। বেশ রাত করে মন্ত্রীর কালো কাচের গাড়িটি, অশ্বদৌড়ে ধুলো উড়িয়ে মাঝির সামনে দিয়ে শহরে যাওয়ার পথে অদৃশ্য হয়ে যায়! 

হাফিজুদ্দিনের মেয়ের শখের পাঠাগার ডিজাইনার সময়মতো গাঁয়ে এসে পৌঁছে। সাদা চামড়ার চীনালোক; বেঁটেখাটো শরীর,সংকীর্ণ চোখজোড়ার মধ্যিখানে পাতিহাঁসের ঠোঁটের মতো চ্যাপ্টা একটা নাক। সাদা একখানা টুপি পরে,সঙ্গীদের নিয়ে মাঝেমধ্যে মাঝির বাড়ির চারপাশে ঘুরঘুর করে! শীতকালের ভোরসকালে চরাচর যেমন কুয়াশার সরে ঢেকে যায় সেরূপে মাঝির মনটা বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। বিরবিরিয়ে নিজের মনে আবুলতাবুল বকে সে—‘শেষমেশ বুঝি শহুরে দালানটা এমন অজপাড়াগাঁয়ে বাসা বাঁধবে! তবে সে মনে মনে আরও দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। জীবন গেলেও আপোস করবে না! সাতপুরুষের ভিটেমাটি সে যে করে হোক রক্ষা করবে।

মাঝি, প্রায়সময়ে ঘরের কাড়ে যত্নকরে তোলে রাখা সেই দাদারকালের সবুজরঙা জংধরা টিনের ট্রাঙ্কটা খুলে বসে। বড়দাদা কিংবা তারও আগেকার দলিল নথিপত্র রাখা আছে ট্রাঙ্কে। কাগজ গুনে গুনে দেখে সে, দলিলপত্র ঠিক আছে কিনা! নিজের অক্ষরজ্ঞান না থাকলেও এসব নথিপত্রের ব্যাপারে সে তাঁর বাবার মতো সতর্ক। বাবার কাছ থেকে দলিলপত্র দেখার জ্ঞান তাঁর শেখা আছে। অক্ষরগুলোর গায়ে যত্নেরহাত বুলায়, অক্ষরের সংখ্যা গুনে গুনে হিসেব মেলায়। এরপর শক্ত করে নথিপত্র বুকের কাছে ঝাঁপটে ধরে বসে থাকে! মনে হয় যেন সাতপুরুষের মায়া ভালোবাসা জড়িয়ে ধরে বসে আছে সে! নিজের ভিটেটা কিছুতেই হাতছাড়া করবে না, শালতিটাও না।

তাঁর বিশ্বাস সুদিন আসবে! সেদিন উত্তরপাড়ার রহিমগাজীর রেডিও-সংবাদ সে নিজ কানে শুনেছে। তবে আফসোস! সংবাদের শুরুতে উপস্থিত থাকতে পারেনি! বাকিটা যারা ওখানে উপস্থিত ছিল, বিস্তারিত আলোচনা করছিল।

সেসব কথা মাঝির খুব মনে ধরেছে। সরকার নাকি দেশের নদীগুলোতে বিদেশি দৈত্যাকার কলের-মেশিন নামাবে। সেই মেশিন চারপাশের অবৈধ বসতবাড়ি ভেঙ্গেচুরে খুঁড়েপেড়ে নদীগুলোকে উদ্ধার করবে। এরপর নদীতে জোয়ার আসবে। নদীগুলো সেই আগেরমতো জলবতী হয়ে উঠবে। নদীর উপরের অজগরের মতো সিমেন্টের পুলগুলো জোয়ারের স্রোতে ভেসে যাবে দূরে কোথাও। তখন এ-তল্লাটের মানুষ মাঝির খোঁজ করবে। শালতিটাকে সেই কবে থেকে সে গাবের-কষে প্রলেপ দিয়ে রোদের পোড় মাখছে। খুশিতে মাঝির চোখে জল গড়িয়ে পড়ে।

সাদা টুপির চীনালোক একদিন মাঝির বাড়ি আসে। বাড়ির চারপাশের পুরোটাই এখন খোলামেলা। প্রতিবেশীরা চলে গেছে ভিনগাঁয়ে। বসতবাড়িগুলোকে কলের মেশিন ভেঙ্গেচূড়ে মাঠের মতো সমান করেছে। যতদূর চোখ যায় খাঁ খাঁ শূন্য!

মাঝির প্রায়দিন ঘুম ভাঙে ভোরবিয়ানে। এরপর নানান ভাবনায় তাঁর চোখে আর ঘুম ফেরে না! সে ভোরের নীলচে আলো ফুটতে বাড়ির পুবকোণায় বাঁশের মাচায় চুপচাপ বসে থাকে। শিমুলফুলের মতো লাল টকটকে সূর্যটা, পূবের আকাশে আলসেমী ভঙ্গিতে জেগে উঠতেবড়ো চিত্তাকর্ষক সে-দৃশ্য। মাঝি একদৃষ্টিতে সেদিকে চেয়ে থাকে। কখন এসে চীনালোক তাঁর কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে, সে জানে না। পেছন ঘুরতে তাঁর হুঁশ ফেরে। একঝটকায় সে দূরে সরে পড়ে! চীনালোক, দুর্বোধ্য ভাষায় এবং মুখে প্রশ্রয়ের হাসি মেখে তাঁকে আশ্বস্ত করে। চীনালোকের হাসিতে তাঁর ভয় কাটে। মনে হয় লোকটা মন্দ নয়। তার ভাষা না জানলেও, মুখের হাসি সে ঠিকই পড়তে পারে। ও-যে নির্ভরতার হাসি। পৃথিবীর সকলজাতের হাসির-ভাষা একই হয় যে!

একসময় হাফিজুদ্দিনের মেয়ে দেশে ফিরে আসে। গাঁয়ের লোক ভেঙ্গে পড়ে তার সাক্ষাত পেতে। শুধু মাঝি এ খবর শুনে সারাদিন একলা ঘরে চুপচাপ বসে থাকে। তবে মেয়েটার ওপর তাঁর কোন রাগক্ষোভ নাই। ক্ষোভ যা হয়, তা সেই লটারি আর সে দেশের সরকারের ওপর। এত টাকা যাদের কাছে আছে তারা কেনো তাঁর ইছামতী নদীটাকে ফিরিয়ে দিতে পারছে না! অথচ লটারির নামে মেয়েটাকে বিনা পরিশ্রমে এতগুলো টাকা দিয়ে দিল! এসবের কিছুই তাঁর মাথায় ঢোকে না!

মেয়েটাকে সে স্কুলে পড়াকালীন সময়ে দেখেছে। বড় লক্ষ্মীমেয়ে ছিল। সকাল-দুপুর স্কুলে যাওয়া-আসার পারাপার সে-ই করত। এক কানাকড়িও কখনো তার কাছ থেকে মাঝি নেয়নি। স্কুলের শিক্ষকরা যখন খেয়াঘাটে আসতো তারা স্কুলের নানান বিষয়ে গল্পগুজব করত। মাঝি সেসব গল্পে মনোযোগ দিত। তখন সে এই মেয়েটার নামডাক তাদের মুখে খুব শুনেছে। বিরাট পড়াশুনা জানা মেয়ে। এস্কুলে নাকি তাকে টপকিয়ে যাওয়ার সাধ্যি কারো নাই। সে নিজে দারিদ্রের চাপে পড়াশুনা করতে পারে নাই, সে আক্ষেপ তাঁর ছিল কিন্তু যারা স্কুলে ভালো পড়াশুনা করত তাদের বিনেপয়সায় খেয়া পার করে দিত সে!

দুদিন পর হাফিজুদ্দিনের মেয়ে মাঝির বাড়ি আসে। বাবার মতো তাঁকে ঝাপটে বুকে জড়িয়ে নেয়। মাঝি অবুঝ বালকের মতো ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে থাকে। কুরবানির পশুর মতো দুচোখ বেঁয়ে নীরবজল পড়ে! মনে হয়, ভিটেটা বুঝি বাঁচানো গেল না! এমন আতঙ্কে তার পাঁজরের গহীনে একটা শীতলস্রোত বয়ে যায়!

চীনা লোক মাঝির মনের কথা বোধ হয় পড়তে পারে। মাঝিকে সে পিঠ চাপরে নির্ভয় দেয়। এরপর হাফিজুদ্দিনের মেয়ের সাথে ইংরেজিতে কীসব কথা বলাবলি করে। মেয়ে তার কথা গভীর মনোযোগে শুনে এবং মেয়ের কপালে এতক্ষণ ধরে রাখা চিন্তার সুতিকাপড়ের মতো ভাঁজগুলো মিলিয়ে যায়। মাঝি বিষয়ের আগাগোড়া কিছুই বুঝতে পারে না। তবে তাদের বোবা আশ্বাসে এটুকু আশ্বস্ত হয় যে বিপদ তার কেটে গেছে! মনটা তার খুশি হয়ে ওঠে!

বহুকাল পরে দেশজুড়ে হাফিজুদ্দিনের মেয়ের ইছামতী লাইব্রেরির নাম ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিদিন দেশ-বিদেশের বহুলোক ছুটে আসেঅনবদ্য পাঠাগারের সৌন্দর্য একনজর দেখতে। দেশি-বিদেশি হাজারো বইয়ের দুর্লভ ভাণ্ডারে, বই পড়ুয়াদের ভিড় জমে সেখানে। দালানকোঠার ভিড়ে ইছামতী নদীর চিহ্ন একসময় পুরোদস্তুর নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়! কিন্তু চীনা লোকের পরামর্শে হাফিজুদ্দিনের মেয়ে, লাইব্রেরির মাঝখানে ধীরেনমাঝির সেকেলের বাড়িটি, অবিকল সেরকম করে এ-অঞ্চলের বিগত ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে যত্ন করে ধরে রাখে। বাড়িটি দেখে যে কেউ বুঝতে পারে, এককালে এখানে একটি বড়ো নদী ছিল।