ধারাবাহিক গদ্য || আহমদ ছফার স্মৃতি: অথ মহিউদ্দিন সমাচার

অ+ অ-

 

ধারাবাহিক গদ্য || আহমদ ছফার স্মৃতি: অথ মহিউদ্দিন সমাচার

 

[ বাংলার মনীষী আহমদ ছফাকে নিয়ে নানাজন নানা স্মৃতিকথা লিখেছেন। নানাজন নানাভাবে গবেষণা করছেন। স্মরণ করছেন। ভবিষ্যতেও করবেন। তবে তাঁকে নিয়ে সত্য-মিথ্যায় মোড়ানো স্মৃতিকথাগুলো নানা বিতর্ক, নানা কথা আর নানা মিথের জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি ঢাকার প্রথমা থেকে প্রকাশিত হয়েছে লেখক মহিউদ্দিন আহমদের বই আহমদ ছফা: আমার কথা কইবে পাখি। বইটি প্রকাশের পর আহমদ ছফাকে নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। খোদ ছফার পরিবার থেকে বইটি নিয়ে নানা ‘মিথ্যা-চাতুরী’র অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রথমার বইটির প্রতিবাদ স্বরূপ একটি বই লিখেছেন আহমদ ছফার ভ্রাতুষ্পুত্র, প্রথিতযশা লেখক ও ঔপন্যাসিক নূরুল আনোয়ার। তিনি দীর্ঘদিন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মনীষী ছফার সাহচার্যে ছিলেন। ক’দিন আগে নূরুল আনোয়ারের লেখা পাণ্ডুলিপিটি প্রতিধ্বনির হাতে এসেছে। লেখার গুরুত্ব বিবেচনা করে নূরুল আনোয়ার প্রণীত প্রকাশিতব্য বইয়ের চুম্বক অংশ ধারাবাহিকভাবে প্রতিধ্বনি প্রকাশ করছে। বি.স. ]               

 

প্রথম কাণ্ড || প্রথম দেখা

গণকণ্ঠে মহিউদ্দিন আহমদের যাতায়াত ছিল। একদিন পত্রিকা অফিসে আহমদ ছফার সঙ্গে তাঁর দেখা মেলে। তার আগে তিনি কখনও আহমদ ছফাকে দেখেননি। যেহেতু প্রথম দেখা তাই হয়তো তিনি তাঁকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করেছিলেন। সে দৃষ্টিকোণ থেকে লেখক তাঁর লেখার শুরুটা করেছেন এভাবে:

বাহাত্তর সালের আগস্টের এক দুপুর। আমি ঢুকেছি সম্পাদকের কামরায়। নির্বাহী সম্পাদক আফতাবও আছেন। আমাকে বললেন, বসো। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। দুপুর ১২টার দিকে এলেন এক তরুণ। বয়স আনুমানিক ত্রিশ। একটু কমবেশি হতে পারে। হালকা-পাতলা শরীর। চুল এলোমেলো। পরনে ট্রাউজার্স আর ফুল হাতা শার্ট। শার্টটা ট্রাউজার্সের ভেতরে ইন করা। কাঁধের দিকটা বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। মেদহীন কোমরে বেল্ট নেই। মনে হয় শার্টটা পেটের ওপর একটু ঝুলে আছে। দুই হাতের আঙুল দিয়ে মাথার চুল ঠিকঠাক করলেন। শুরু হলো আলাপ। আগন্তুকের নাম আহমদ ছফা।

এ অধ্যায়টিতে আহমদ ছফার শারীরিক বর্ণনার পাশাপাশি ছফা নামটি নিয়ে লেখকের মোটামুটি দীর্ঘ একটি বয়ান রয়েছে। পূর্বদেশ পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ ইদ্রিসের সঙ্গে আহমদ ছফার একটি তর্ক হয়েছিল। সেটি নিয়ে লেখক আবু কায়সারের একটি বয়ান পাওয়া যায় যেটি মোরশেদ শফিউল হাসান ও সোহরাব হাসান সম্পাদিত আহমদ ছফা স্মারকগ্রন্থে ছাপা হয়েছে। লেখক মহিউদ্দিন আহমদ হয়তো ওই বই থেকে সেটি উদ্ধৃত করেছেন। একই গ্রন্থে ফরহাদ মজহারও আহমদ ছফার নাম নিয়ে লিখেছেন, তারও উদ্ধৃতি মহিউদ্দিন আহমদ টেনেছেন। যদিও দুটি উদ্ধৃতির তথ্যসূত্র তিনি উল্লেখ করেননি। আনস্মার্ট আহমদ ছফার নামটিও আনস্মার্ট। সেটি অনেকের চোখে যেমন বেমানান মহিউদ্দিন আহমদের চোখেও সুন্দর ঠেকেনি।

মহিউদ্দিন আহমদ আল মাহমুদ এবং আলতাফ আহমাদের সঙ্গে আহমদ ছফার যোগাযোগের দুটি কারণ উল্লেখ করেছেন। আল মাহমুদের সঙ্গে আহমদ ছফার পরিচয় হয়তো কবির প্রতি কবির টান, অথবা দুজনে কলকাতায় ছিলেন সেই সুবাদে। আরেকজন চট্টগ্রামের মানুষ বলে চিটাগাং কানেকশনকে তিনি কারণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তিনি জানেন না আফতাব আহমাদের বাড়ি চট্টগ্রামে নয়, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে। আল মাহমুদ কলকাতায় থাকলেও আহমদ ছফার সঙ্গে তিনি এক সঙ্গে থেকেছেন বা কোথাও কখনও দেখা হয়েছে সে রকম কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।

তরুণ আহমদ ছফা || ছবি সংগৃহিত

সেদিকে আমরা আর না যাই। গণকণ্ঠে আহমদ ছফা যোগ দেবেন। কিন্তু এ গণকণ্ঠে আহমদ ছফার যোগাযোগটা কিভাবে ঘটল, এটা লেখক মহিউদ্দিনকে খানিকটা দ্বিধায় ফেলে দেয় এবং তিনি কিছুটা অবাকও হয়েছেন। অনেক মানুষ আছে তারা নিজের অবস্থান থেকে অন্যকে দেখার চেষ্টা করে। মহিউদ্দিন আহমদও হয়তো ওভাবে চিন্তা করেছেন, আহমদ ছফা নামক এ অযোগ্য মানুষটি কারও না কারও পাশ ধরে গণকণ্ঠে চাকরি চাইতে এসেছেনলেখকের লেখার ধরনে সেটিই মনে করিয়ে দেয়। মহিউদ্দিন সাহেব লিখেছেন:

ছফা গণকণ্ঠে যোগ দেবেন। গণকণ্ঠের সঙ্গে ছফার যোগাযোগটা হলো কিভাবে? ভেতরের খবর আমি জানি না। আল মাহমুদের পছন্দের কেউ হতে পারেন। এটা হলো কবির প্রতি কবির টান। তাছাড়া একাত্তরে দুজনে কলকাতায় ছিলেন। আবার আফতাবের সঙ্গে যোগাযোগের কারণেও তিনি এখানে এসে থাকতে পারেন। চিটাগাং কানেকশন। দুজনই চট্টগ্রামের। বাংলাদেশে অনেক লোকের মধ্যে জেলা জাতীয়তাবাদ প্রবল।

মহিউদ্দিন আহমদ আল মাহমুদ এবং আলতাফ আহমাদের সঙ্গে আহমদ ছফার যোগাযোগের দুটি কারণ উল্লেখ করেছেন। আল মাহমুদের সঙ্গে আহমদ ছফার পরিচয় হয়তো কবির প্রতি কবির টান, অথবা দুজনে কলকাতায় ছিলেন সেই সুবাদে। আরেকজন চট্টগ্রামের মানুষ বলে চিটাগাং কানেকশনকে তিনি কারণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তিনি জানেন না আফতাব আহমাদের বাড়ি চট্টগ্রামে নয়, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে। আল মাহমুদ কলকাতায় থাকলেও আহমদ ছফার সঙ্গে তিনি এক সঙ্গে থেকেছেন বা কোথাও কখনও দেখা হয়েছে সে রকম কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। আল মাহমুদ এক সাক্ষাৎকারে নিজেকে একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা লেখক হিসেবে দাবি করেছিলেন। তাতে আহমদ ছফা তাঁর প্রতি ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। তিনি আল মাহমুদের লেখার প্রতিবাদ করে বাংলাবাজার পত্রিকায় একটি কলাম লিখেন, যার শিরোনাম ছিলআশা করি আল মাহমুদ নিজের ভুল স্বীকার করবেন। ওই লেখায় আহমদ ছফা বোঝাতে চেয়েছেন আল মাহমুদ একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা লেখক নন, আরও অনেকে আছেন। তার মধ্যে আহমদ ছফাও একজন। লেখাটিতে আহমদ ছফা যেভাবে আল মাহমুদকে আহত করে কথা বলেছেন কলকাতায় দুজনের যদি দেখাসাক্ষাৎ, যোগাযোগ বা সখ্যভাব থাকত তাহলে তাঁদের মধ্যে কখনও ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হতো না। আহমদ ছফা কি বলেছিলেন সেটি তাঁর লেখা থেকে জানা যাক:

আমি শুধু একটি ছোট্ট বিষয়ে প্রতিবাদ ঠিক প্রতিবাদ নয় চ্যালেঞ্জ করতে চাই। আল মাহমুদ মুক্তিযোদ্ধা লেখক এবং মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র লেখক হিসেবে নিজেকে দাবি করেছেন। কথাটা যদি উত্তেজনার বশে বলে থাকেন তাহলে আমার কিছু বলার নেই। কিন্তু প্রকৃতি সত্য এই যে, তিনি ছাড়া আরও অনেক লেখক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এবং লিখেছেন। প্রতিভা এবং ক্ষমতা সকলের সমান নয়। কমিটমেন্ট তথা অঙ্গীকারই হলো আসল। অন্য কোন লেখক মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে কমিটেড ছিলেন নাএটা আল মাহমুদের বলা উচিত হয়নি। আমি আশা করছি, ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করলে তিনি নিজেও তাঁর এই ভুলটি স্বীকার করে নেবেন। আমার বলতে দ্বিধা এবং সংকোচ হচ্ছে, তথাপি সত্যের খাতিরে কথা বলা উচিত, আমি ব্যক্তিগতভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি এবং লিখেছি। সে সময় সে লেখাগুলো মানুষ পছন্দও করেছিল। যেহেতু আমরা আল মাহমুদের মতো দৃঢ়চিত্ত এবং মনোবল সম্পন্ন লেখক নই, সে জন্য ঘোষণা দিতে পারিনি। মেনে নিলাম আল মাহমুদ বড় লেখক এবং আমরা নিতান্ত তুচ্ছ লেখক। কিন্তু একজন বড় লেখকের একটি বড় গুণ হলো এই যে, তুচ্ছ লোকের তুচ্ছতা এবং অকিঞ্চিৎকরতার মধ্যেও কিছু যে মূল্য থাকে সেটা তারা চিনে নিতে পারেন। এখন আমার যেটা ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছেআল মাহমুদ অন্য সবাইকে তুচ্ছ করে নিজেকে কোন উচ্চতায় স্থাপন করলেন?

 

তথ্যসূত্র

১.  আহমদ ছফা: আমার কথা কইবে পাখি: মহিউদ্দিন আহমদ; প্রথমা (ঢাকা:২০২৫) পৃষ্ঠা: ১৭
২.  প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১৯
৩. সেইসব লেখা: আহমদ ছফা; সম্পাদনা: নূরুল আনোয়ার; খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি (ঢাকা: ২০১৬); পৃষ্ঠা: ১৮৬

চোখ রাখুন  আসছে দ্বিতীয় কাণ্ড