শ্রাবণের নীল উপাখ্যান ও অন্যান্য কবিতা
|| শ্রাবণের নীল উপাখ্যান ||
শ্রাবণ নামলে আকাশের চোখে
কে যেন কাজল ভেঙে দেয়
মেঘের আঁচল বেয়ে বৃষ্টি নামে
পৃথিবী তখন ভেজা চুলের এক কিশোরী
কদমের কানে পরে সাদা দুল।
পাতার ডগায় একফোঁটা জল
আয়ু নিয়ে বসে থাকা ছোট্ট নক্ষত্র
বাতাস এলেই কেঁপে ওঠে
যেন প্রিয় কোনো নাম
ঠোঁট ছোঁয়ার আগেই বুকের কাছে বাজল।
তুমি সেই শ্রাবণের গোপন ঘ্রাণ
যাকে দেখা যায় না
অথচ ভেজা মাটির কাছে গেলেই
তার সমস্ত অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়।
তোমার চোখে মেঘ জমলে
আমার আকাশেও পাখিরা নিচু হয়ে ওড়ে
দূরের তালগাছ মাথা নোয়ায়
দিঘির জলে ভেঙে পড়ে আকাশ
শুধু একটি কদমফুল
বৃষ্টির সমস্ত ভার মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
তোমাকে ভালোবাসা
ঠিক শ্রাবণ পড়ার মতো—
কখন যে শরীর ছাপিয়ে মন ভিজে যায়
কেউ তার হিসেব রাখে না।
একদিন বৃষ্টি থেমে যাবে
মেঘ খুলে দেবে তার ধূসর চুড়ি
পাতার শরীর থেকে ঝরে যাবে শেষ জলটুকু
শুধু আমার ভেতর তুমি থেকে যাবে—
ভেজা মাটির নিচে
অদৃশ্য শিকড়ের মতো
যার কোনো ফুল চোখে পড়ে না
অথচ যার জন্যই
একটি গাছ এত সবুজ হয়ে বেঁচে থাকে।
|| এক স্বপ্ন-প্রভাতের অপেক্ষা ||
এই তো সেদিন, এক তুমুল ঝড় ছিল—
ঝড় নয় শুধু, যেন ভেঙে যাওয়ার সম্মিলিত শব্দ।
দুই প্রান্তের মাঝখানে ছড়িয়ে ছিল
না-বলা কথার ভাঙা কাচ,
শেষ দেখার মুহূর্তটুকু
দীর্ঘশ্বাস হয়ে মিশে গিয়েছিল বাতাসে।
বুকের গভীরে প্রসবযন্ত্রণার মতো কেঁপে উঠেছিল
হারিয়ে ফেলার ভয়,
শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়েছিল
নামহীন শূন্যতার বিষ।
চেনা পথগুলোও সেদিন
নিজেদের গন্তব্য ভুলে গিয়েছিল।
তবু অপেক্ষার চোখে আলো ছিল—
একদিন পৃথিবী আবার ঘুরে দাঁড়াবে,
সরষের হলুদে, কৃষ্ণচূড়ার লাল আবিরে
অসমাপ্ত বসন্ত ফিরে পাবে রং,
বুনোফুলের গায়ে লেখা হবে
পুরোনো কোনো স্পর্শের ইতিহাস।
স্বপ্নে ছিল দুটি হাত,
পাশাপাশি কিছুটা পথের অধিকার,
বুকের কাছে জমা রাখার জন্য
সযত্নে বাঁচিয়ে রাখা কয়েক ফোঁটা কান্না,
আর দুটি চোখের গভীরে
হারানো নামটি আরেকবার খুঁজে পাওয়ার সাধ।
অথচ দূরত্ব কেবল বেড়েই যায়,
ভাঙে পাঁজর, চেপে ধরে কণ্ঠস্বর।
প্রহর গোনে এক নিঃসঙ্গ মাঝি—
দিগন্তের সীমানায় কোনো পাল দেখা যায় না,
আকাশের গায়ে ঝুলে থাকে
শেষ কথার বিবর্ণ চাঁদ।
তবু ভাঙা তরী ডুবে যায়নি,
তার পাটাতনে আজও পড়ে আছে
এক মুঠো পুরোনো জোছনা।
কোনো এক অচেনা প্রভাতে
সমস্ত দূরত্বের আয়ু ফুরোবে—
দুটি হাত আবার কাছাকাছি এলে
স্পর্শ চিনে নেবে বহুদিনের পরিচয়,
কৃষ্ণচূড়ার নিচে ঝরে পড়বে সমস্ত অভিমান।
আর দীর্ঘ বিচ্ছেদের ধ্বংসস্তূপ ভেদ করে
জন্ম নেবে নতুন এক ভালোবাসা—
এক স্বপ্ন প্রভাতের অপেক্ষা।
|| হৃদয়ের গোপন ভূগোল ||
একটি নাম বুকের মধ্যে থাকলে
পৃথিবীর মানচিত্র অদ্ভুতভাবে বদলে যায়—
দূরের শহর কাছে আসে,
অচেনা গলিতেও ফুটে ওঠে কৃষ্ণচূড়া,
আর সামান্য বাতাসে কেঁপে ওঠে
বহুদিন না-ছোঁয়া কোনো তারের সুর।
কেউ জানে না,
একজোড়া চোখের ভেতর কতখানি আকাশ রাখা যায়,
কত নক্ষত্রের পতন লুকিয়ে
একটি মানুষ অনায়াসে হেসে যেতে পারে।
ভালোবাসা বোধহয় এমনই—
শরীরে কোনো ক্ষত রাখে না,
অথচ বুকের ভেতর একটি গোপন ভূগোল এঁকে
সমস্ত পথের দিক বদলে দেয়।
সেখানে একটি কৃষ্ণচূড়া সারাবছর লাল,
একটি চড়ুই ঠোঁটে নিয়ে ফেরে অসমাপ্ত চিঠি,
পুরোনো বইয়ের ভাঁজে আটকে থাকে
অকারণে ছুঁয়ে যাওয়া আঙুলের স্মৃতি,
আর জোছনা নামলেই
নদীর জলে জেগে ওঠে দুটি ছায়ার জলছাপ।
কাছাকাছি থাকা সবসময় স্পর্শ নয়—
কখনো বহু আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্রও
পৃথিবীর অন্ধকারে আলো রেখে যায়।
সেই আলোয় আজও দেখা যায়—
একটি পথ এসে আরেকটি পথের পাশে থেমেছে,
কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, কোনো দাবি নেই,
শুধু পাশাপাশি পড়ে আছে দুটি ছায়া।
পৃথিবী তাকে যে নামেই ডাকুক,
হৃদয়ের গোপন ভূগোলে
সেই জায়গাটুকুর নাম—
ভালোবাসা।
|| যে ভুলটি আজও সংশোধন করিনি ||
সেদিন ভুল করে একটি নাম
অন্য নামের পাশে লিখে রাখা হয়েছিল—
তারপর কত কালি শুকিয়ে গেল
কত কাগজ পুরোনো হলো
ভুলটুকু আর সংশোধন করা হয়নি।
বরং তার পাশে জন্মেছে ছোট্ট একটি বন,
দু-একটি বুনোফুল, কয়েকটি ঘাসফড়িং,
এক জোড়া চড়ুই সেখানে সংসার পেতেছে,
পাতার নিচে জমিয়ে রেখেছে
দুজনের অপ্রকাশিত কথাবার্তা।
আশ্চর্য—
মানুষ চলে গেলে তার স্পর্শ চলে যায় না।
কোনো পুরোনো বই খুললে আজও
একটি বিশেষ পাতায় আঙুল থেমে যায়,
যেন অক্ষরের নিচে চাপা পড়ে আছে
কারও হাতের উষ্ণতার জীবাশ্ম।
এত বছরেও কেউ জানতে পারেনি,
একটি নাম মুছে ফেলতে গিয়ে
কেন বারবার কাগজটাই ছিঁড়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত নামটি আর মোছা হয়নি,
তার চারপাশে শুধু সাদা জায়গা রেখে
জীবনের বাকি অংশ লেখা হয়েছে—
যেন পৃথিবীর সমস্ত শব্দের ভিড়ে
ওই একটিমাত্র ভুলের জন্যই
এখনও এতখানি শূন্যস্থান প্রয়োজন!
কে বলেছে প্রেম সবসময়
পাশাপাশি দুটি নামের গল্প?
কখনো একটি নামই যথেষ্ট—
আরেকটি নামের সমস্ত জীবন
ভুল বানানে লিখে দেওয়ার জন্য।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন