চশমাহিল ও অন্যান্য কবিতা

অ+ অ-

 

পাতা অপরাজিতা

কবে থেকে ঘুমিয়ে রয়েছ, পাতা, হে অপরাজিতা,
তাই হিম তলদেশে আড়ি পেতে আছি, সেই কবে
থেকে এত নির্মোহ তাকিয়ে আছি নিছক নৈঋতে,
শুধু চোখ ঘোলা হলো, চাঁদ গেল ডুবে, বহু বর্ণে

স্বপ্ন হলো ভাগ, বহু অর্থে উড়ে গেল হাঁস, দূরে,
কিছু তার কখনো পাও নি টের, কোথাও যাও নি
এই বাঁশবন ছেড়ে, অথবা খেলো নি কানামাছি,
ভেতরে হলুদ হ'লে, চ্যুত পাতা, সেই কবে থেকে...

এখনো পাতার হাট বসে, সবার অলক্ষ্যে পাতা
পতিত পাতার স্তূপে নিজেকে হারায়, সাড়াশব্দ
না পেয়ে এখনো বেণুবনে তাই শিস দিয়ে উঠি

বুকে ধ’রে রাখি তার মৃদু ঢেউ, যেটুকু পাতার,
যেটুকু মর্মর, পরিত্যক্ত, যে-পাতায় লেগে আছে
সামান্য ক্ষরণ, দ্যুতি আর আমার শেষ নিঃশ্বাস

 

বৃষ্টিনন্দন দিনে

ফড়িঙের মতো কেউ, স্বচ্ছ উড়ে এসে, নিমিষেই
কোথাও মিলিয়ে গেল ছাতাসহ, বৃষ্টির ফোঁটায়,
গগনশিরিষগুলো মাথা ঝেঁকে ঝরিয়ে ফেললে
জল, পাতা থেকে মন থেকে বাদলের স্বাদু ঘ্রাণ

থাকা-না-থাকার মাঝে পথে-বিপথে বৃষ্টিনন্দন
কিছু ঘটে, কিছু ধারণার কণা ছড়ায় বাতাসে,
তার ছিটেফোঁটা বয়ে নিলে কোণে কোণে, তার মানে
অবিরল টেনে নিয়ে গেলে একা, কিছু-বা আভাসে

যদি কেঁদে ইলশেগুঁড়ির চেয়ে হাল্কা হতে পারি,
যদি বৃষ্টি থেকে আলাদা করতে পারি সব ফোঁটা,
যদি ভিজে ভারি হ'য়ে ওঠা যেত, আরও সাদামাটা

তবে এই অতিবৃষ্টি মেনে নিয়ে বাইরে যেতাম,
ঘুরতাম ছাতার উল্লাসে, ছাতা হ'য়ে, সারাক্ষণ
ছাতার অধিক গোল হ'য়ে, শহরের খোলা পথে

 

উল্কাকাণ্ড

উল্কাবৃষ্টি হচ্ছে খুব, তবে কবে থেকে এত লাল
উল্কাবৃষ্টি হচ্ছে তা অন্তত কেউ আমরা জানি না,
আমরা বলতে, আমি আর কানা, আমরা কেন যে
উল্কাবৃষ্টি দেখছি এখন, এক অর্থে পাশাপাশি

বসে, ঠিক রক্তমাখামাখি নয়, এক অর্থে ঘুমে
দীর্ঘ পায়চারি ক’রে, তাতে আকাশপাতাল হয়,
সব অর্থে শুধু বসে থাকা হয়, তাতে ভাবনায়
অন্য মহাদেশ আসে কিংবা খুব দূরদৃষ্টি আসে

তবু উল্কাবৃষ্টি হ’লে আমাদের এই অন্তর্দেশে
গুবরেপোকার ভয়, আর শুধু তামাসা ও খাকি
জল্পনাকল্পনা হয়, আর বুকে রূপকথা জাগে

তথাপি চরের ব্যাপ্তি নিয়ে মনে সাহস জাগে না,
সন্দেহও না, ঘুমন্ত শিশুরা ঘুমে কাবু হতে থাকে,
তখন উল্কার শব্দ হয়......যেন-বা বৃষ্টির শব্দ

 

রাবারপ্রকল্প

জাদুর চেরাগ পেলে, বলো, কে আর রইবে পড়ে
রাবারবাগানে, কে তবে থাকবে বসে রাবারের
আঠালো সান্নিধ্যে, এত আঠা এতটা বছর ধ’রে
সংগ্রহ করেছি রাবারের, ভাবতেও গন্ধ লাগে

তার চেয়ে রাবারপ্রকল্প ছেড়ে একদিন ঠিকই
চ’লে যাব, জঙ্গলমহালে—তাড়িয়ে বেড়াবো মোষ,
অন্তত গাছের ক্ষত, ধরো, ততোধিক চুইয়ে-পড়া
রাবারের দুধগন্ধ ভুলে যেতে পারবো বাস্তবে

রাবার চাষের সঙ্গে একটানা লেগে-প’ড়ে থেকে
আজকাল নিজেকেও অদ্ভুত রাবার মনে হয়,
যেন-বা সহ্যক্ষমতা ছাড়া শরীরে সহানুভূতি

ব’লে আর কিছু নেই, কেবলই ক্ষরণ—রাবারের,
নিয়ত পড়ছে চুইয়ে দুধ, আহা, শাদা প্রস্রবণ,
তার থেকে এত আঠা, এত এত সহজ রাবার

 

আটকে-পড়া-দিন

নুড়িপাথরের মাঝে, দাদু হ’য়ে, মূলত কাটিয়ে
দিলাম তিনশ' পঁয়ষট্টি দিন—আরশিনগরে,
আর চিনলাম প্রতীতি ও ছায়া—মহাসময়ের,
দেখলাম রক্তপাতহীন যত মিনিঅভ্যুত্থান

ভাসলাম কচুরিপানার মতো চেতনাপ্রবাহে,
পাতাবাহারের পাশে, চুপচাপ, পোহালাম রোদ,
তাড়ালাম পাখি ও পতঙ্গ, বৃষ্টি, খুশির পালক,
কিংবা কাটালাম উষ্ণ দিনগুলি—খাদ্যের কিনারে

বুঝলাম এই অব্দি টিকে আছি কলমের জোরে,
লণ্ঠনের রূপের আলোয়, দেখলাম, সাক্ষ্য দিতে
গোপনে এসেছে যারা, সব ওরা প্রোষিতভর্তৃকা

একভাবে পাঠালাম ইশারা—জংশনে, জলদেশে,
এই ভেবে তাকালাম মরচে-পড়া স্ক্রুর চারপাশে,
এগোলাম আনপথে, পায়ে পায়ে, সরল বিশ্বাসে

 

মেট্রোমুখ

কোন মুখে তবে ওকে নিয়ে যাই আয়নামহলে!
বিপৎচিহ্ন দেখে ঠিক যত ভয়ের জটিল বিন্দু
জড়ো হয় মাথার ভেতরে, ঠিক যেন তার মতো
কিছু-বা অদূরে আছে আরও মহাদেশ—আয়নার,
কিংবা শিশি-বোতলের, আমার অজানা, আর শুধু
আমারই মনের অগোচরে রয়ে গেল ওই নীল
আকাশকুসুম, মেট্রোরেল, আমারই বিপদে ফিরে
গেল ডাকগাড়ি, জলপুলিশ, শীতের পাখিরাও

কোন দশা তবে আমাকে ঘুরায়, কোন ঋতু রোজ
ভোরে ওকে দিয়ে যায় চিরল পাতার ছদ্মবেশ,
তাই ও-কি ঋতুভেদে পাতাবাহারের সব জামা
পরে, ডুবে যায় আরও রসাতলে, হায়ের ভেতরে,
শেষে তো পাই না খুঁজে হস্ত-পদ-স্কন্ধ-মাথা তার,
কেবল রক্তের চিহ্ন, আগাগোড়া কেবলই সেলাই

 

চশমাহিল

             চশমাহিলের দিকে যাব।

সম্ভবত কোনও চশমাহিলের দিকে
তবে চলে যেতে হবে এখন আমাকে।

চশমাহিলের দিকে তবু যেতে হ’লে
কম্পাস, সরলরেখা কিংবা রোদছাতা
কারও সঙ্গে আমি আর নেই;
কারও মধ্যে থাকতে চাই না আমি আর
অমন বিরাট মাত্রা নিয়ে ট্রেন ছাড়ার সময়।

তারপরও চশমাহিলের দিকে গেলে
সম্ভবত কিছু-বা আভাস পাওয়া যাবে;
অন্তত আবারও দেখা পাওয়া যেতে পারে তাহাদের;
যদিও হে বিপন্ন ডাকবাক্স, ওদের কাউকে
আমি ঠিক চিনে নিতে পারবো না আজ ;
অথবা চিনতে পারবো না আর জেনে
চশমাহিলের দিকে প্রতিদিন আমিও চলেছি।

                 আসলে চলেছি না কি আর!
ভাবা যেতে পারে কোথাও চশমাহিল বরাবর
আমিও চলেছি: কিন্তু কোথায়? কিংবা আসলে কই?
কিংবা ভাবা যেতে পারে আসলে চশমাহিল ব’লে
কিছু নেই, সবই ঘুম আর শুধু ঘুমের পাহাড়।

                  তথাপি চলেছি আমরাও
দড়ির ওপর দিয়ে, ধরো, মর্মের ওপর দিয়ে,
কিছুকাল নিজের ভেতর, কিছুটা শূন্যের নাক বরাবর। 

 

বাঘবন্দি

                                      পায়ে পায়ে পায়ের ভেতর
                         মাথা রেখে যদি আরও ব’সে থাকা যেত,
                  কোনওভাবে, কোনও একভাবে, কোনও খড়ের গুহায়,
              দূরতম বাঁধের ফাটলে যদি ব’সে থাকা যেত,
          মাদকলতার গর্ভে জন্মে কিংবা বনবাদাড়ের
       সবুজ বিভ্রমে, আহা, আলতো ছোঁয়ায় যদি কেউ
          দাদু ভেবে আমাকে জাগায়—দাদু নাকি!

                         অগত্যা জেগেই থাকি;
                  অনেক গভীর হ'য়ে ব'সে থেকে, শুধু ব’সে থেকে
              অগত্যা নিজের সঙ্গে নিজে আমি বাঘবন্দি খেলি,
                         বাজি রাখি, তাঁবুর বাইরে তাকে নিয়ে যেতে চাই।

                                      তারপরও বসা হয়
                         ব’সে থেকে কিংবা তর্কের বাইরে থেকে
                              চারপাশে শেষ হয় গান—গড়াগড়ি;
                         ব’সে থেকে বা ব’সে-ছড়িয়ে-থেকে ভাবি
                              ছোটো-বড়ো ধূলিঝড় আর যত খালের বিপদ
                                      ঘুমে পার হওয়া গেল অথবা গেল না

                         আর গেল ব'লে এখনো বাঘের ভয়,
                                      কোথাও ক্ষরণ হয় খুব
                         এখনো আমার নিরাপদ ব’সে থেকে।

 

হাড়

যে হাড় ধূসরতম উটপাখি ছিল
আজ শুধু আমি তার ভূতুড়ে জীবাশ্ম চেয়ে দেখি!
দেখি, অনুজ্জ্বল উটপাখি বালির রহস্য ছেড়ে
পালিয়ে গিয়েছে রাতে—উল্কা আর উল্কার আকারে।

যদি দাও, ওর শাদা হার্দিক হাড়গুলো পুড়ে
যথার্থ শাবল করে দাও,
তবু, পুরো সমৃদ্ধ পাতাল খুঁড়ে আর
জলরেখা মিলবে না।

এমন বৃষ্টির জন্য বাইরে এসেছি
যার ভারী, ঠান্ডা জলজ শব্দের মধ্যে
শত শত ধূসর উটের আত্মা সমাহিত থাকে;
যা দেখে, পথিক, তুমি বৃষ্টিবেলা নৈঃশব্দ্যে পৌঁছাও।

পথ লুক্কায়িত পথে রোজ
উটপাখিদের প্রাচীন যন্ত্রণা আছে।
রোজ সুনিশ্চিত মৃত্যু ও মমতা আছে। 

 

জলদস্যু

সমুদ্রের স্বপ্ন দেখে কেউ কেউ জলদস্যু হয়।
নাকি, মুক্তাসমুদ্রের অতল জলের বিভীষিকা
হাওয়া এনে এখনো মেশায়
আমাদের অসম্ভব সমুদ্রতৃষ্ণায়।

কখনো নীলাভ মরীচিকা,
কখনো হাঙরমুখো উঁচু-নিচু ঢেউ ডেকে ডেকে
যে নীলসমুদ্রদেবী আজও অকূলে দেখায় তার

মুক্তাসমুদ্রের ফেনিল আনগ্ন হিম পোতাশ্রয়,
তাতে মনে হয়, যে-কোনও স্বপ্নের মাঝে
সুনিশ্চিত এক পুরাণসমুদ্র থাকে;
অথবা, কোনও না কোনও সমুদ্রের জন্য
আমাদের নাড়িগুলো ফুলেফেঁপে ওঠে
ভূতপূর্ব দস্যুর সত্তায়।

তবে, কোনও সমুদ্র কি দেখি নি আমরা!
বাতাসের ধারাল হ্রেষার চেয়ে তীক্ষ্ণ,
কিংবা দস্যুদের তীব্র হুংকারের চেয়ে দীর্ঘতম
কোনও জয়গান আজও স্বপ্নকে উসকে দেয় রক্তে,
কোষে কোষে বয়ে আনে নুনের ফোয়ারা!

তবু আজও সমুদ্র তো দেখি নি আমরা!
কিংবা কোনও মুক্তাসমুদ্রের জন্য তবু
দেখি নি গভীর কোনও স্বপ্নও!