ভ্রান্তি ও অন্যান্য কবিতা
|| ভ্রান্তি ||
সেপ্টেম্বর হুরমুর করে ফুরিয়ে আসে
খোলস থেকে বেরিয়ে
মুখোশ বদলে যায়
কেউ বদলায় শব্দের গাঁথুনি,
সুর, স্বর, উচ্চারণ;
ভূকম্পন অনুভূত হওয়ার আগেই
মাটি থেকে সরিয়ে নেয় পা।
জানা পথ্য গিলছে যে,
সে জানে না চরকি ফুলগুলো
কোন ভুল হাতে ফুটে আছে।
মিথ্যে কথার ভার চাপিয়ে,
দুষছে আমায় কেউ,
অথচ কেউ জানে না সত্যিটা কার।
একদিন ভেঙে যাবে
কাঁচপোকাদের ঘুম,
কালো মেঝে জুড়ে রক্তের দাগ মেখে,
ফাগুন এসে দাঁড়াবে দরজায়।
তখন কার কাছে যাবে?
কার কাছে গিয়ে ভুলভ্রান্তিগুলো ভাঙাবে?
ঠোঁটে পালিশ মাখা মানুষগুলো
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে—
মুখ দেখা যায় না,
শুধু মুখোশের ওপর আরেকটি মুখোশ।
সেপ্টেম্বর ফুরিয়ে আসে
আমি দেখি মানুষ বদলায় না,
শুধু মুখোশগুলো অহরহ বদলে যায়।
চরকি ফুল ঘুরতেই থাকে
আর কোথাও, খুব কাছেই
কেউ একজন নিজের নামটা,
নিজের কাছেই লুকিয়ে রাখে।
|| হারানা ||
দেহ শিথিলের আসনে বসলে, হাত-পা ছড়িয়ে ধ্যান করার ইচ্ছে বৃথা। জীবন সন্ধিক্ষণ যখন অতীত না ছুঁয়ে বর্তমান ঘিরে থাকে, তোমরা বলো তাকে বেঁচে থাকার আলোকময় অবলম্বন। কমরেড—নিউজেন্ডার— হিউমেন বিলিভস!
শব্দগত দৌরাত্ম্য কতোটা আর্ট ফ্রেম বোঝে, যে জীবনকে ছাড়িয়ে যাবে একদিন? প্রতিদিন জীবন মানেই মেকিতার অংশ, কবে হবে অবসান? এই বুঝি জল গড়িয়ে নেমে আসবে মায়ারথ বিসর্জন।
ভেবে দেখো একটা লাল রং, আলোর স্পর্শ না পেয়ে কালচে বর্ণে হারিয়ে যায়, সে কি আশ্চর্যরকম বাস্তবতা! এ প্রলাপে বিশ্বের ভূগর্ভ ছুঁয়ে কান্না হবে না, বিমূর্ত বলে থাকবে না কিছুই। আমার ভাষা কি বোঝ; হারানা?
সবকিছুর ব্যাখ্যা হয় না, বুঝে নিও। ঝাপসা চোখের জল কৌটের মিনারে আঙুল রেখে দিও। দেখবে, সেখানে কোনো প্রার্থনা নেই, কোনো ঈশ্বর নেই, শুধু একফোঁটা জল নিজের ভেতর ডুবে যেতে যেতে তোমার মুখের মতো একটি অস্পষ্ট পৃথিবী ধরে রেখেছে।
|| পাতার মোহ ||
পাশাপাশি দাঁড়িয়েছি
আর এই ঘূর্ণন রাজপথ
ছায়া এসে পড়েছে দূর থেকে
আমাদের চুম্বনে গ্রাস করেছে সকল নথিপত্র
যেন অতিক্রম করছে সে ও তার
আসক্তিপূর্ণ জেগে থাকা রাত!
মৃদুস্বরে অনুরাধার হাসি ফুটছে
সিঁথির রেখায়
অন্যপথে ফুল ফুটছে অবিশ্বাস্য
তবুও অনুরূপ রক্তিম বর্ণ
শিরায় নীল শুঁকনো পাতার ঘোর কাটছে না।
এই ঘোর কাটেও না
শ্যাওলা পুকুর
মাটির শ্বাস
আস্ফালিত আপন মানুষ
মুখোমুখি তিল ছুঁয়ে বাড়ে বাতাসের অসুখ।
ফিরে যাচ্ছে আলোর মিছিল
মুখোশহীন কালো রাত
একক সে খুনির নাম।
|| আবর্তন ||
ধিন—
পৃথিবী নেমে আসে
পায়ের নখের কাছে,
প্রলয়ের আগুন জ্বলে—
কে কাঁদে কার কাছে?
জলরাশি মুছে গেলে
তেপান্তরে সাদা ক্ষয়,
গৃহহারা হাওয়া শুধু
খেয়ালখাতায় ভাঙে সময়।
তা—
খিলখিল হাসির শব্দে
ঈশ্বরও মন খারাপ করে,
অথচ হাসতে শেখার আগেই
শিখেছি কেমন করে
মন খারাপ করতে নেই—
শৈশবের প্রথম পাঠ যেন
কাঁদতে নেই,
ভেঙে পড়তে নেই,
কারও চোখের জলে
নিজের মুখ দেখতে নেই।
ধিন—
খোলা আকাশ
পুকুরপাড়ে বসে শুনি
ঘাসেরা গাছেদের সাথে
কীসব গল্প জুড়েছে।
সবার মতো ওরাও বুঝি
সুখ-দুঃখ জানে,
দখিনা বাতাস এলেই শুধু
হেসে ওঠে গোপন গানে।
দিনশেষে পাতারা নড়ে,
গাছেরা মুচকি হেসে বলে—
‘জীবনে দুঃখ নেই,
আমরা সুখী, সুখী!’
আমি কান পেতে থাকি,
ফিঙ্গে পাখি ডেকে যায়—
তি... তি... তি...
পাতাহীন গাছের ডালে
শূন্যতার পূর্ণচাঁদ,
আজ যে দোল পূর্ণিমা—
আকাশজুড়ে রঙের বাঁধ।
রাতের মহুয়া আবীর মেখে
নেয় নীল আকাশ,
অন্ধকারের বুকের ভেতর
জ্বলে ওঠে জোনাকির বাণী।
ধিন—তা—ধিন—
যত দূরে সরে যায়
হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো,
তত কাছে আসে
অচেনা কোনো নরম হাওয়া।
মন ভালো করা
ভয়ংকর এক সুখানুভূতি—
যেন পৃথিবী এতদিন পরে,
আবার আমারই পায়ের কাছে নেমে আসে!
একটি ডার্ক রোজের মতো
নিঃশব্দ, গাঢ়, সুগন্ধময়—
ধীরে ধীরে রঙ ঝরে যায়
তার পাপড়ি থেকে অন্ধকার খুলে যায়,
আর সেই ডার্ক রোজ ধীরে ধীরে আকাশ হয়ে যায়।



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন