তোমার পথের পাশে ও অন্যান্য কবিতা
|| এ শহরের প্রতি ||
এ শহরের প্রতি ভালোবাসা ধীরে ধীরে মরে যায় রোজ। শুধু বেড়ে চলে পায়রার খোপে জমে ওঠা অতীত কুহক, সাদাকালো বৃষ্টির মায়াবী কথকতা, বেড়ালের লেজের গায়ে লেপ্টে থাকা টাটকা আঁশটে গন্ধ। এ শহরের সাথে ওঠাবসা ক্রমশ কমে আসে রোজ। পড়শি দেশ থেকে ভেসে আসে নিউক্লিয়ার মেঘ, বোমার স্প্লিন্টার, কতগুলো বারুদগাছের লাশ। চোখ বন্ধ করলে মনে হয় এক একটা মৃতদেহের নাড়িভুঁড়ি ভেদ করে আকাশের দিকে হাত বাড়াচ্ছে বট, অশ্বত্থ, হিজলের ছায়া। বিরামহীন বর্ষায় ক্রমে দূরে, আরও দূরে ছোট হতে হতে মিলিয়ে যায় রঙিন সূর্যের দেশ। জায়মান শিখার মতো নদীর পাশে বসে হাত-পা ছোঁড়ে সদ্যমৃত শিশুদের কঙ্কাল।
এসব পেরিয়ে যেতে যেতে ভালোবাসা ক্রমশ নিভে আসে শহরে। অন্ধ পথচারীকে দূর থেকে রাস্তা পার হতে দেখি। যে লাঠির ভরসায় সে জীবনকে বাজি রেখেছে, বাঁচিয়ে রেখেছে যাবতীয় খুদকুড়ো, তার নড়বড়ে গতিকে পাশ কাটিয়ে একটা উচ্চগতির যান চলে যায়। কোমরে পিস্তল নিয়ে চোখ রাখে কালপুরুষ। মনে হয়, একটু এদিক-ওদিক হলেই সে তার কুকুর লেলিয়ে দেবে। অন্ধ জীবনের যাবতীয় আশ্রয় নিমেষে গোঁৎ খেয়ে পড়বে মাঝরাস্তায়।
আজানের একঘেয়ে সুর কানে এলে বুঝি, পাখিদের বাড়ি ফেরার সময় হল। ধ্বংসের আগাম বার্তা পেয়েও পৃথিবীর আদিম প্রবৃত্তির প্রকাশে কোনও ছেদ নেই। সাইরেনের মতো জ্বলে ওঠে বিক্ষিপ্ত নিয়নের সারি। পায়রার খোপে কুহকের বিস্তার ক্রমশ ঘন হয়। যেন ঝঞ্ঝার আগমুহূর্তের সমুদ্র। ঢেউ আসে অনর্গল, সঙ্গে নিয়ে আসে পূর্বজন্মের বধিরতা আর ছেঁড়া ছেঁড়া শোচনার মেঘ। এ শহরের প্রতি ভালোবাসা মরে যায় ক্রমে ক্রমে।
|| তোমার পথের পাশে ||
তোমার পথের পাশে অরণ্য জেগে থাকে বলে
হঠাৎ জোনাকি এলে, আলো আসে আলো নিভে যায়;
তোমার নিবিড় ঘাসে কেউ তার মাথা রেখে কোলে
আকাশ ঘুমিয়ে পড়ে, সবুজ চাদরে ঢাকা গায়।
তোমার শরীর ঘিরে, আবাদ বসিয়ে নর-নারী
মানে না কারোর কথা, এপিটাফে ভেসে আসে গ্রাম;
তোমার বাতাস জুড়ে, এ বিষাদে বুক হয় ভারী,
শহর শুকিয়ে এলে, ভিনদেশে বয়ে চলে ট্রাম।
এ ধরণী ভরে ওঠে, অকাল পলিতে ভাসে নদী
তোমার আঁচল ছায়ে, গৃহহারা প্রাণ পেত যদি;
বনেতে আগুন জ্বলে, পাখি সব ঝড়ে উড়ে যায়
আকাশ এলিয়ে পড়ে, ধোঁয়ার পাথরে ঢাকা গায়।
|| যন্ত্রণার সুদীর্ঘ পরিসরে ||
যন্ত্রণার একাধিক অবসরে তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় বারবার।
হয়ত তখন রেলের শেষ কামরায় ঝুঁকে পড়েছে পড়ন্ত সূর্যের তেজ
যারা বাড়ি ফিরে যাচ্ছে, তাদের জন্য তুমি সাজিয়ে রেখেছ একটা চা খাওয়ার বারান্দা;
আর যারা ফিরতে পারছে না, একফালি আদিম অরণ্য বুকে নিয়ে তুমি অপেক্ষা করে বসে আছ।
তোমার কানের দুপাশে এসে লাগছে দমকা হাওয়ার স্রোত,
যার বিপরীতে জানলাটা টান করে খুলে রাখছ তুমি।
যন্ত্রণার একাধিক অবসরে
তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে বুঝি
পৃথিবীতে আদিম সম্ভোগ তখনও বেঁচে আছে উষ্ণতার বাগিচায়,
যেন সূর্যমুখীর সবুজ পাতাসব
ক্রমাগত দুলে চলেছে হলদে হওয়ায়,
অথবা কোনও শিশুর হাতে ধরে থাকা ঝুমঝুমি—
যার একঘেয়ে শব্দে ঘুমে কাতর হয়ে ওঠে
মায়ের সরল চোখ।
সন্ধের দিকে ফিরে যাই কোনও এক পাহাড়ি আস্তাবলে।
যেখানে একরাশ ব্যস্ততার ভারে ন্যুব্জ রাস্তার পাশে
অক্লান্ত ঘুমায় ঘোড়াশাবকের দল।
নোংরা হাতে একটা নেপালি ছেলে তাদের পিঠে হাত বুলিয়ে চলে অনর্গল,
এই বিকেলেই খবর আসে
দূরে এক গ্রামে তাদের ঘর ভেসে গেছে বন্যায়,
এক একটা আস্ত গ্রাম গোগ্রাসে গিলতে গিলতে
প্লাবনের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে তার হাড়-মজ্জায়,
সে একটা পাহাড়ি গান গুনগুন করে গেয়ে চলে
আর ভাবে, এ জন্মে আর মায়ের সাথে দেখা হবে না।
সেখান থেকে ছুটে যাই আরও পশ্চিমে—
সামনে দিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে
এক পা এক পা করে পিছিয়ে আসি,
বালিতে পায়ের ছাপ লেগে থাকে
আজন্মলালিত বিস্মৃতির মতো।
চোখ বন্ধ করলে দেখি একের পর এক দিন
ক্রমাগত তলিয়ে যাচ্ছে চোরাস্রোতের ভেতর,
অনেকটা যেন দেওয়ালঘড়ির কাঁটা—
যা শুষে নেয় যাবতীয় অকর্মণ্যতার হিসেব।
যন্ত্রণার একাধিক অবসরে তোমার সঙ্গে বারবার দেখা হয়ে গেলে বুঝি
এ পৃথিবীতে সব কিছু ভেঙে চুরমার হয়ে গেলে
শুধু এক ঝাঁক লাল-নীল বুদবুদ উড়ে বেড়াবে আকাশময়।
অন্তিম প্রস্তাবে খসে পড়বে দু-একটা নক্ষত্রের রাত, আচম্বিতে—
ভিখারির জমানো খুচরো পয়সায় সেই অন্ধকার জমতে জমতে আরও কালো হবে,
দিগন্ত পেরিয়ে ভেসে আসবে একটা বিষাদমাখা পিয়ানোর একঘেয়ে স্বর,
যাকে অনুসরণ করে পাড়ি দেওয়া যাবে জন্মান্তর।
যন্ত্রণার সুদীর্ঘ পরিসরে
তোমার সাথে দেখা হয়ে যায় বারবার,
যন্ত্রণার সুদীর্ঘ পরিসরে
তোমার সাথে দেখা হয়ে যাক বারবার।
|| শীত ||
এই যে আমরা দুহাত বেছানো মাঠে,
দিন শেষ করে টেনে ছিঁড়ে আনি শীত;
এই যে আমরা কুয়াশায় ঘাটে ঘাটে,
জড়ানো গলায় মেপে রাখি সম্বিত।
একটা শূন্যে অজস্র শূন্যতা
জুড়ে জুড়ে মাপি তোমার ঘরের পথ;
ছেড়ে যাই যত আদিম এই বন্যতা,
পায়ের গতি ততই হয়েছে শ্লথ।
মৃত্যু ভাবলে হাজারটা চিঠি আসে,
লিখে ফেলা যায় ঘোরের মতোই শ্লেষে—
শিশির শিশিরে তোমার কান্না ভাসে;
এমন করুণা কে ঝরায় অক্লেশে!
এই দেখো যায়, চলে যায় এক শীত,
গুমটিতে ঢোকে আগুন পোহানো ট্রাম,
এই দেখো যায়, নড়ে যায় কার ভিত—
তোমার ঘুমেতে খুঁজে নেয় বিশ্রাম।
এখনও আমরা দুহাত বেছানো রাতে,
জ্যোৎস্নায় ভিজে জুড়ে জুড়ে রাখি শোক;
এখনও আমরা বিলিয়ে দিই দুহাতে,
বনানীর বুকে আদিম সূর্যালোক।
|| নিষ্কৃতি ||
১
অতঃপর রুমালে বেঁধে ফেলা গেল সন্ধ্যা,
নিমেষে ছিঁড়ে ফেলা গেল মুখোশ
এক টানে।
এইসব সময়ে
সে বয়ে আনে—
বৃষ্টির সাদাকালো নকশা
এক পথ থেকে নানা পথে
বিদ্যুতের সুতোয় গড়িয়ে চলা রাত
ঠিক জানে—
নিস্তার নেই তার।
২
এখানেই নেমে যাই, বুঝলে?
এরপর ঘুরতে হবে অনেকটা—
তা নাহলে
কার্নিশ থেকে লাফ দিয়ে যে বেড়াল
নেমে এল তোমার পায়ের কাছে,
অন্তরালে,
তার পেটের ভেতর অনেক চিঠি
জমিয়ে জমিয়ে আলগা হাতে খিল দিয়েছি—
দেখার ছলে
কেই বা তার খোঁজ রাখে এই সাতসকালে।
৩
এই যে ধরো বছরখানেক
একটু খোঁচায় সহস্র মেঘ
ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে খুচরো বিবেক
ধোঁয়া ওড়াচ্ছ!
এই যে একটা বেলুন সময়
উড়ে উড়ে খালি মরবার ভয়
কমছে তবুও ফুরোবার নয়
বুঝতে পারছ?



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন