ছেড়ে যাবো বহুকোষী জীবন ও অন্যান্য কবিতা

অ+ অ-

 

ছেড়ে যাবো বহুকোষী জীবন

কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে যাওয়ার
সময় অ্যামিবার কথা মনে পড়লো: 

আ্যামিবা আ্যামিবা, আমরা কতো
নির্বিঘ্নেই হাঁটছিলাম বুকে ভর দিয়ে,  
যেভাবে এককোষী আছো, থাকো,
আমাদের  ট্রিলিয়ন কোষের শরীর 
নিয়ে বড় বিপদেই আছি, ঘাড় ঘোরাবার
উপায় নেই, চেয়ারে উপবিষ্ট আছি 
অযুত কাল, একদম নট নড়নচড়ন 

তোমার নিঃশব্দ গড়িয়ে যাওয়া আর
আয়ত্ত করতে পারলাম কই? সেই 
অণুবীক্ষণ কাচের নিচে তোমাদের 
নিরিবিলি হাত-পা ছড়িয়ে চলা, 
তোমার জীবনচক্র খালি চোখে 
দেখতে পেলে টেনেহিঁচড়ে জবরদস্তি 
শার্ট-প্যান্ট পরিয়ে দিতে চাইবে 
আমাদের তথাকথিত বিজ্ঞান, 
তোমার প্রাকৃতিক চোখে ওরা পরিয়ে
দিতে চাইবে ধাতুর তৈরি অতিকায় চশমা 

অ্যামিবা তোমার যে কোন আকৃতি নেই, 
একটা মিষ্টি ঝিল্লি তুমি, সেই ক্ষুদ্রাকায়
ক্ষণপদ দিয়ে কোটি কোটি বছর হামাগুড়ি
দিয়ে যাচ্ছো, তাড়া নেই গন্তব্যে পৌঁছার 

কে দিবে আমাকে অ্যামিবার জীবন
এই ভারবাহী বহুকোষী জীবন ছেড়ে? 

 

রেহেনা বেগমের মুরগী’র দোকান

রেহানা বেগম রেহানা বেগম
মুরগীগুলো খাঁচায় পুরে রাখেন

সিনা টানটান হয়ে ওঠে এইপ্রান্তে
যখন টেলিফোনে কথা বলি

আপনে যেরকম স্মার্ট আর
বডিওলা মানুষ, আজকের
মুরগীও তেমন ভাইজান

টেলিফোনেও রেহানা বেগমের
কথার ঠিকরানি বুঝি, ইথারে
ভেসে আসে সেই ফুলকি
আর চকচক করে আমার চোখ

রেহানা বেগমের স্বামীকে
আল্লা নিয়ে গেলো, রেহানা
বেগম রাতে মুরগী হয়ে
গলা উঁচু করে স্বামীর যৌবনের
খুদ খুঁটে খুঁটে খেতেন
আর মোরগের মতো মর্দামি
করতো তার ঝাকড়া চুলের পুরুষ

যতবারই বাজারে যাই
রেহানা বেগমের মুরগীগুলোকে
খাঁচার মধ্যে ছটফট করতে দেখি

আর বোরকার ভেতর থেকে
চিকন একজোড়া চোখ দূর
থেকে জ্বলজ্বল ক’রে ওঠে

 

আতশ কাচের নিচে

শিউলি ফুলের ঘ্রাণ 
মুঠোয় চেপে ধরে
ল্যাবরেটরিতে 
নিয়ে আসলাম

বুঝলাম কেউ একজন
ছটফট ছটফট করছে
মুঠোর উষ্ণতায়

শিউলি ফুলের বোঁটা
দিয়ে খালাম্মা জরদার
রঙ বানাতেন আর 
একদিন সেই রঙ বাতাসে
উড়ে গিয়ে আকাশের 
কোনে জমে গেলো

তখন থেকেই সূর্য 
উদিত হয় দুনিয়ায়, 
জরদার রঙ ঝরে পড়ে
সন্ধ্যার নদীতে, কমলা 
আভায় রঞ্জিত ও কাঁপা কাঁপা 
সেই পানি, পানির ঘূর্ণি 

গোধূলি, গোধূলি 
চলো আমরা  কৃতজ্ঞতা
জানাই শিউলি ফুলকে
ওর বোঁটা থেকে
জন্ম নেয়া জরদার রঙকে
আর আমাদের খালাম্মাকে

তোমার জননী সূর্য
তোমাকে জন্ম দিলো
নদীর ওমঅলা 
পানির তরঙ্গে, 

নিচে বয়ে যায় 
কমলা বর্ণের  মাছ, 
নিচে বয়ে যায় 
কমলা চামড়ার 
খোয়াজ খিজির, 
উনি ভেসে উঠলেন
একটা ঢাউস
কমলা রঙের
কাতল মাছের পিঠে

আমরা মাছগুলোকে
কাটি না, বুঝলে, 
তুলতুলে শিউলি ফুল

শিউলি ফুলের টোপর
মাথায় দিয়ে মাছের
পুত্র আর কন্যার 
বিয়ে হচ্ছে,
বুঝছো, আমার 
স্বপ্নে পাওয়া প্রেমিকা

শিউলি ফুল একটা থট,
কতোদিন আর নির্মলতা
একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকবে ? 

আর একটু পরেই দানবাকৃতির 
একটা পা নেমে আসবে মাথার ওপর,
চুপসে যাবে হাসিখুশি 
মুখগুলো, তোমার বেদনার্ত চোখ
ভেসে উঠবে নদীর পানিতে

 

পথের পাশে লাল বাড়িটা

লাল বাড়িটা কার?
যার, সেকি বন্ধু হবে আমার?

হঠাৎ দেখা দিয়েই
চিকন রেখার মতো
মিলিয়ে গেলো লাল বাড়িটা
মনের কোনে দাগ রেখে

যতোই সামনে এগোই
ততোই পেছনে সরে যায়

একদিন যদি পেছনে
ফিরে আসি
বাড়িটাকে খুঁজে পাবো
কোন ঠিকানায়?

কে থাকে ওই লাল বাড়িতে
তারও কি লাল একটা
হৃদয় আছে, সেই রঙে
রাঙিয়েছে টুকটুকে সে বাড়ির

খুঁজে পেলে লাল বাড়িটা
কড়া নাড়ি যদি, কে খুলবে দুয়ার?

যতই ভাবি দূরে সরে যায়
লাল বাড়িটা, বিন্দু হয়ে
মাথায় থেকে যায় বারবার

 

ইমেজ

ইমেজ, সে এক স্মিত হাস্য,
জ্বী-জ্বী, হ্যালো বলার ঢেউ,
টেলিফোনে, আজকাল,
হ্যালাউউউউ কিংবা হ্যালোহ্,
এরকম ইমেজ আমার

তবে শর্টকাট কথা বলে
যারা, তাদের প্রকাশ্যে,
জড়িয়ে ধরতে যেয়েও
ধরি না, তারা অদৃশ্যলোক
থেকে হাত নেড়ে যায়,
চাকাঅলা পায়ে, নিপুণ,
ক্রুকাট, ছিপছিপে
আরোহিনীর চেয়ে
একটু হালকা মাংসল
ঢেউ, ভালোবাসি, মন থেকে,
তুমি এমন হলে, ডক্টর-কাজিন
গোগ্রাসে দেখছে ছবির আমিষ,
আমাদের বয়স যেনো জিরো;

স্ক্রিনের চামড়ায় তোমার স্পর্শ,
দুনিয়ার প্রকটিত চোখ,
টেবিলে টেবিলে নোট প্যাড,
সে এক প্রহেলিকা

তবে কি কথা হয়েছে
এই নিয়ে, পাঠানো পিকচার,
ইরোটিক, এগুলো,
সারফেসে ভুস  ক’রে
উঠে এলো, আমার
ইমেজ, যতো তাড়াতাড়ি
পারে, দৌড়ে, ঘাড়ে নিয়ে,
মেশিন থেকে বেরুবার
আগেই রটনা, মেশিন
হাজির জনাব, মাথা কাটা
কান নেই, ঠোঁটই স্বয়ং মোচ

বলেছি, সাক্ষাৎ, তুমি
চামচ মুখে জন্ম নিয়েছো,
সোনার, দাম বেড়ে গেলে
খুঁজে সেসব, উড়িয়েছ দু’পায়ে

এমনও ইমেজ তুমি,
বেগুন গাছে টুনটুনি’র
কথা কেনো পারবো না
বলতে, হালকা সে তুলোরও
অধিক, দেখো পাতার
উপর তার নৃত্য, ওরে
খুন করেছি একরত্তি
কলিজা, আহা, জখম,
পা-ফোলা, ছেঁড়া ডানা

আমার বুদ্ধ, ভগবান, তোমাকে
একটানে আঁকা বৃথা যায়নি,
প্রাণী হত্যা, মাফ করেছেন
কি তথাগত, বলুন

এহেন ইমেজ, স্মিতহাস্য,
আয়নায় মুখ, পারদের
জ্ঞান বৃথা যায়, বলেছি
চোখ টিপে, হ্যালো,
অচেনা চরিত্রকে

 

মদিরা

বন্ধু, কী হলো আমার,
এক বোতলের ছিপি
লাগাই অন্য বোতলে

গ্লাসখানা মুচকি মুচকি
হাসে দে’খে আমার
এই পেরেশানি, মাথার ওপর
হায় দুনিয়া শুদ্ধ দোলে

ঢকঢক ক’রে খাবো
পানি, তেমন পানির কণা
ছেকে দিবে, সেই জিগিরি
দোস্ত খুঁজি এক তল্লাট
থেকে তল্লাটে

চিন্তক মন দেখো
ঘুমের মধ্যেও হাঁটে

পানি শুধু পানি নয়
পানির আগে রচে মরীচিকা

পানি ভেবে তার মোহে
কতো জন মারে চক্কর,
বাতাস ফিসফিস ক’রে
তাই রটিয়ে যায়, দূরে
জ্বলজ্বল করে নীহারিকা 

সবাই ঘুমে কাদাকাদা, 
আটকা পড়ে পা সেই ক্বাথে
আর দূর টেবিলে সাজানো
গ্লাস, ভরা পানি লাস্যময়ী
বোতলে, বাড়ালে হাত
পিছে টানে ঘুমের ভূত,
তাড়াতে পারে তাকে, সেই
দোস্ত থাকে কোন্ শহরে?

বন্ধু, তোমার নসিহতে
যদি এবার আমার
শুকিয়ে যাওয়া দিল খুলে
যায়, যদি কানায় কানায়
ভরে ওঠে পানি, পারবো
কি এবার লাগাতে ছিপি
সঠিক বোতলে?