বকেয়া খাতায় তার নাম ও অন্যান্য কবিতা

অ+ অ-

 

|| স্থায়ী ঠিকানা ||

তোমার প্রান্তর যেদিন
চরজাগা নদীর মতো শ্রীহীন হলো
কোনো চঞ্চলা নদী খুঁজতে যাইনি ভাটিতে
অপেক্ষায় ছিলাম একটি সুখী শরতের।
অতঃপর তোমার শরীরে শরৎ এলো
আমি কাশফুল দেখে কবিতা লিখি।

তোমার চোখ যেদিন
চৈতালী বিলের মতো নিঃসঙ্গ হলো
কোনো দীঘির কাছে জল চাইতে যাইনি
অপেক্ষায় ছিলাম আরেকটি আষাঢ়ে বৃষ্টির।
অতঃপর তোমার উষ্ণতায় মেঘের নাম হল বৃষ্টি
আমি তোমার খোঁপায় কদমের কবিতা গুঁজে দেই।

তোমার বিষণ্ণতা যেদিন
হেমন্তের মাঠের শেষ ধানটির মতো একা হলো
পাশের ভরা ক্ষেতে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলিনি
অপেক্ষায় ছিলাম আরেকটি হেমন্তের।
অতঃপর তোমার উঠোনে সোনালি জোয়ার এলো
আমি তোমার ঠোঁটে নবান্নের ঘ্রাণ চাষ করি।

 

|| ছোঁয়াচে স্বপ্ন || 

যখন সূর্য লুকায় দিগন্তের ওপারে
আমার ঘরে সান্ধ্য প্রদীপ জ্বেলে 
তুমি আসো পরিযায়ী পাখির মতো
এক পশলা ছোঁয়াচে স্বপ্ন হাতে নিয়ে।
যখন ফিরে যাও বিদায়ী সূর্যের মতো
তখনও তুমি রয়ে যাও সবটুকু জুড়ে 
নিঃসঙ্গ বালিশে তোমার মায়ার গল্প
হাওয়ার ভাঁজে খেলা করে তোমার ঘ্রাণ।
আমি স্বপ্ন-রোগে ছটফট করি রাতভর 
ভোরের শিশির হয়ে যায় বেদনার অশ্রু 
ঝরে পড়া শিউলির মতো বেদনা নিয়ে 
চেয়ে থাকো তুমি সহস্র চোখে!
তোমার চলে যাওয়ার পর 
আমি তুমি রোগে আক্রান্ত হয়ে বাঁচি
এ কেমন ছোঁয়াচে রোগের চাষ কর তুমি!

 

|| আগাম প্রস্তুতি ||

সন্ধ্যার বাতাসে শীতের পূর্বাভাস 
গাছগুলো ধীরে প্রবেশ করছে 
পাতাঝরা শোকের পূর্ব-প্রস্তুতি পর্বে।
বস্ত্রহীন শিশুর উদ্বিগ্ন চোখ খুঁজছে 
পুরনো শীতবস্ত্র,
সে জানে শীত তাকে কতটা কাঁপায়
ঝড়ো বাতাসে দাঁড়িয়ে থাকা 
নিঃসঙ্গ কাকতাড়ুয়ার মতো।
মধ্যবিত্ত মা হিসেব করছেন, 
গত শীতে ছেলেকে কোন পিঠা 
খাওয়াতে পারেননি,
এবার যেনো বাদ না পড়ে একটাও।

 

|| নিঃস্ব গেরস্ত ||

কাঁচা সন্ধায় ফোটা গন্ধরাজের মতো
হাত বাড়িয়ে ডেকেছিলে তুমি
আমি সে হাত ধরিনি সেদিন 
দ্বিধায়িত হয়ে পিছিয়েছি দু’কদম।
তুমি ছিলে আবেগের কাদায় গড়া
অদম্য সাহসী কিশোরী
আমি যোগ বিয়োগ ভাগ গুণন শেখা
হিসেবী পরিণত পুরুষ।
তুমি ভোরের শিউলির মতো
নরম অভিমান বুকে নিয়ে 
নিরবে চলে গেলে অলক্ষ্যে।
আজ আমি হাত পেতেছি
ঘর পোড়া নিঃস্ব গেরস্তের মতো
তুমি অভিমানী অশ্রু ফেললে
তোমার শৃঙ্খলিত পরাধীন কব্জিতে।

 

|| নতুন করে পুরনো পাঠ ||

আমাকে পুনর্পাঠ করে জেনেছি
অন্তঃসারশূন্য এক গহ্বর আমি
যেখানে কোনো কবিতা জন্ম নেয় না
জন্ম নেয় না নতুন কোনো সুর
কোনো পাখি ফিরে আসে না
শুধু শূন্যতা এসে
নিজেরই প্রতিধ্বনি শুনে মুগ্ধ হয়।
কেউ যেন একদিন
আমার সমস্ত নদী শুকিয়ে নিয়ে গেছে সব জল
সমস্ত আলো তুলে নিয়ে গেছে সব কুঠুরি থেকে
শূন্য করে দিয়ে গেছে
ঘরের পর ঘর
তবু বারান্দায় ঝুলে আছে
ফিরে আসার ভান।
তারপর তোমাকে পুনর্পাঠ করতে গিয়ে
হঠাৎ থমকে যাই।
তুমি কোনো সহজ বাক্য নও
কোনো পরিচিত উপমার মতো
তোমাকে হৃদয়ঙ্গম করা যায় না।
তোমার ভেতরে ঢুকতে গেলেই
আরও একটি আকাশ খুলে যায়
আরও দূরে জ্বলে ওঠে
অচেনা নক্ষত্রের আলো।
তোমাকে পুনর্পাঠ করতে গিয়ে দেখেছি 
দুর্ভেদ্য এক মহাবিশ্ব
দাঁড়িয়ে আছে একা
সেখানেও শূন্যতা প্রতিধ্বনিত হয়
আমার অন্তঃসারশূন্য গহ্বরের মতোই।
আমার সমস্ত অনস্তিত্ব নিয়ে
তোমার মহাবিশ্বের সামনে
একটি ক্ষুদ্র পাঠক হয়ে
প্রতিদিন বসে থাকি আমি 
তোমার পুনর্পাঠে ব্যস্ত হবো বলে

 

|| কার কাছে মন রেখেছ || 

কার কাছে মন রেখেছ
কার কাঁধে রাখো মাথা
কই তুমি গড়েছ বসত
কই ছিল যাওয়ার কথা!

কোথায় তুমি দাঁড়িয়ে আছ
কার ডাকে দাও সাড়া
তুমি কারে চাইছো পেতে
কার লাগি ঘর ছাড়া!

কোন নদী ঘুম ভাঙায়
কোন বাতাস ছোঁয় চুল
কার চোখের আয়নায় তুমি
তোমায় দেখতে ব্যাকুল!

কার কাছে মন রেখেছ 
কার গল্পে কাটে রাত
কোন সে নাম বুকে ধরে
কার হাতে রাখো হাত।

 

|| বকেয়া খাতায় তার নাম ||

কেনো আমার বুকে মাথা রেখে
তুমি রাত কাটাতে পারো না!
কেনো তোমার বুকে মাথা রেখে
আমি একটু ঘুমাতে পারি না
বলতে পারো?
এত কাছে থেকেও তুমি
কেনো এত দূরের মানুষ
চোখের পাতায় স্বপ্ন হয়েও
কেনো শুধু ছায়া হয়ে রও!
একটি সন্ধ্যা তোমার সাথে
চুপচাপ বসে হাতটা ধরে
আঙুলে পাঁচটি আঙুল গুঁজে 
সন্ধ্যার কচি জোছনা দেখবো
সে কি আমার বেশি চাওয়া ছিল!
বৃষ্টির রাতে তোমার সাথে 
ভিজবো বলে সংসার বিবাগী হলাম
অভিমান হলে তোমার চোখে
খুঁজেছি আমার নাম 
সবই কেন রয়ে যায় বকেয়া খাতায়!
ক্লান্ত দিনে কিংবা কামার্ত রাতে
তোমার স্ফিত বুকে মাথা রাখতে
তোমায় একক আধিপত্যে পেতে
যে পণ করছি সে তো মিথ্যে নয়
তবু কেনো সবই হারায় বিরানায়!
তোমাকে লেখা প্রথম চিঠি সাক্ষ্য দেয় 
আমাদের গল্পটা ছিল ভালোবাসার 
আমি আজও তোমায় খুঁজি
নিঃসঙ্গ রাতের অন্ধকারে
পুরনো প্রেমের আলোয়।
কেনো আমার বুকে মাথা রেখে
তুমি রাত কাটাতে পারো না!
কেনো তোমার বুকে মাথা রেখে
আমি শেষবারের মতো
একটু কাঁদতেও পারি না!