ধারাবাহিক উপন্যাস : পর্ব-৩ || ও আমার বন্ধু
ও আমার বন্ধু || পর্ব-৩
শাহবাগের আড্ডা শেষ হতে হতে রাত গড়িয়ে গেছে। বিদায়ের সময় সবাই আগের মতোই হাসল, ঠাট্টা করল। প্রত্যেকের চোখের ভেতর তবুও আলাদা আলাদা কিছু চিন্তা জমে ছিল।
সান্তানু বাসার পথে হাঁটতে লাগল। রাতের শহরের আলাদা রূপ আছে। দিনের ব্যস্ততা নেই, মৌনতাও নেই। কোথাও রিকশার ঘণ্টি, কোথাও দূরের গাড়ির শব্দ, কোথাও চায়ের দোকানের শেষ আড্ডা।
দরজার সামনে এসে পকেট থেকে চাবি বের করল সে। তালায় চাবি ঢোকালো। প্রতিদিনের এই ছোট কাজটির মধ্যেও কত একাকীত্ব লুকিয়ে থাকে। চাবি ঘোরানো। দরজা খোলা। অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করা। নিজের উপস্থিতিতে ঘরটাকে জীবন্ত করে তোলা।
আলো জ্বালিয়ে সান্তানু জুতা খুলে রাখল। ঘরের শূন্যতা তাকে স্বাগত জানাল। হঠাৎ তার মুস্তাফিজের কথা মনে পড়ল। ভিড়ে থেকেও কিছু মানুষ আসলে খুব একা থাকে।
মুস্তাফিজকে দেখে কেউ তা বুঝবে না। সে সবসময় হাসে, গল্প করে, অন্যের সঙ্গে মিশে থাকে। প্রকাশনার কাজে প্রতিদিন কত লেখক, পাঠক, পরিচিতদের সঙ্গে তার যোগাযোগ। তাদের বন্ধুত্ব নিয়ে কারোর কখনও কোন প্রশ্ন নেই, দ্বিধা নেই। একটা সময় থেকে তারা বুঝেছিল, কিছু বন্ধুত্বের জন্য প্রতিদিন কথা বলার প্রয়োজন হয় না। শুধু জানা থাকে, প্রয়োজন হলে একজন আরেকজনের পাশে থাকবে।
ছুটির দিনে প্রায় তারা একসঙ্গে সময় কাটায়। কোনো বড় পরিকল্পনা থাকে না। সকালে বাজার করে আনে সান্তানু। কষা মাংস রান্না করে সে। আর মুস্তাফিজ খিচুড়ি রান্না করে।
মুস্তাফিজের দাবি, খিচুড়ি রান্নায় তার কোনো জুড়ি নেই। সান্তানু অবশ্য প্রতিবারই বলে—‘তোর খিচুড়ি ভালো, আত্মবিশ্বাসটা আরও বেশি ভালো।’
মুস্তাফিজ হেসে উত্তর দেয়—‘রান্নায় আত্মবিশ্বাস না থাকলে লবণ কম পড়ে যায়।’
দুজনের হাসিতে ছোট ঘরটা ভরে ওঠে। দুপুরের খাবার শেষে দীর্ঘ আড্ডা। কখনও সাহিত্য নিয়ে। কখনও পুরোনো বন্ধুদের নিয়ে। কখনও জীবনের এমন সব কথা, যেগুলো অন্য কাউকে বলা যায় না।
বিকেলের দিকে তারা বেরিয়ে পড়ে। কখনও কোনো বইয়ের দোকানে। নদীর ধারে কিংবা শহরের কোনো অচেনা রাস্তায় হাঁটতে থাকে। তাদের কোনো গন্তব্য থাকে না। হয়তো তারা জানে, জীবনের সব পথের শেষ জানা যায় না।
সান্তানু ফ্রিজ থেকে পানি বের করল। গ্লাসে পানি নিল। মুস্তাফিজের সঙ্গে তার বন্ধুত্বের মধ্যেও দুজনের আলাদা ক্ষত। তবুও কোথায় এসে তারা একে অপরের মৌনতার ভাষা বুঝতে পারে। রাতের খাবার খেয়ে লিখতে বসলো সান্তানু। লেখা শেষ করে গোসল সেরে ঘুমাতে যাবে হঠাৎ মোবাইল ফোনটি কেঁপে উঠল। সান্তানু তাকাল। বিষ্ণুর নাম ভেসে উঠেছে। সে কলটি ধরল—‘ঘুমাসনি?’
ওপাশ থেকে বিষ্ণুর গলা।
সান্তানু মৃদু হাসল—‘না।’
বিষ্ণু বলল—‘আজ তোকে একটু অন্যরকম লাগছিল।’
সান্তানু ছাদের দিকে তাকাল—‘কেমন?’
বিষ্ণু বলল—‘যেন তুই কোনো পুরোনো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছিস। খুলবি কি না, সেটা ঠিক করতে পারছিস না।’
সান্তানু কোনো উত্তর দিল না। কারণ কথাটা অদ্ভুতভাবে সত্যি। বিষ্ণু আর কিছু বলল না। ওপাশে যেন কারও সঙ্গে দু-একটি কথা বলার শব্দ শোনা গেল। সে তাড়াহুড়ো করে বলল—‘একটা জরুরি কল এসেছে। পরে কথা বলব।’
লাইন কেটে গেল। সান্তানু জানত, বিষ্ণু আর ফোন করবে না। ওর এই অভ্যাস বহু বছরের। কথা অসমাপ্ত রেখেও সে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে যেতে পারে। দুদিন পর দেখা হলে সেই অসমাপ্ত কথাই এমনভাবে শুরু করবে, যেন মাঝখানে কোনো বিরতি ছিল না।
মোবাইলটা টেবিলের ওপর রেখে সান্তানু জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। একটু আগেও আকাশে তারা জ্বলছিল। এখন আকাশ তার সমস্ত সংযম হারিয়ে ফেলেছে। বৃষ্টির ধারাগুলো একের পর এক কাঁচে এসে আছড়ে পড়ছে। দূরের বহুতল ভবনের আলোও ঝাপসা হয়ে গেছে। রাস্তার বাতিগুলোকে মনে হচ্ছে, কেউ ভেজা কাগজে জলরং মেখে দিয়েছে।
শহরের বৃষ্টির শব্দ আর গ্রামের বৃষ্টির শব্দ এক নয়। শহরের বৃষ্টি কংক্রিটে পড়ে। গ্রামের বৃষ্টি মাটিতে মিশে যায়। এই পার্থক্যটা সান্তানু কোনো দিন ভুলতে পারেনি। তার চোখের সামনে আরেকটি বাড়ি ভেসে উঠল। মাটির উঠোন। এক পাশে বাঁশঝাড়। দূরে ধানখেত। আর টিনের চালের ওপর অবিরাম বৃষ্টির শব্দ। সেই শব্দে ঘুম ভাঙত। সেই শব্দেই ঘুমিয়ে পড়ত তারা। তার ধারণা ছিল, বর্ষাকালে রাতের শেষ প্রহরে এই শব্দ ছাড়া পৃথিবীতে আর কোনো শব্দ নেই।
ছোটবেলায় সেই শব্দ তার খুব প্রিয় ছিল। বৃষ্টি নামলেই সে আর তার ছোট বোন দৌড়ে উঠোনে বেরিয়ে যেত। মা বারান্দা থেকে চিৎকার করতেন—‘এই, জ্বর হবে! ভেতরে আয়!’
কে শোনে কার কথা! বৃষ্টির পানি গায়ে মেখে, কাদায় পা ডুবিয়ে, কখনও কাগজের নৌকা ভাসিয়ে, কখনও ডোবায় ছোট মাছ ধরার অভিনয় করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিত তারা। পুকুরের পাড় বেয়ে নেমে আসা ছোট্ট স্রোতটাই তখন তাদের কাছে গঙ্গা। এক টুকরো কলাগাছের খোল ছিল নৌকা। একটা বাঁশের কঞ্চি ছিল বৈঠা।
সান্তানু হঠাৎ হেসে ফেলল। কী অদ্ভুত! মানুষ বড় হতে হতে কত খেলাই ভুলে যায়। অথচ খেলার আনন্দটা কোথাও গিয়ে লুকিয়ে থাকে। একদিন ফিরে আসে। তার মনে পড়ল, বর্ষার দুপুরে বন্ধুরা মিলে পাশের গ্রামের আমবাগানে ঢুকে কাঁচা আম পাড়তে গিয়ে কী দৌড়টাই না খেয়েছিল, খালের জলে ভেসে যাওয়া বল ধরতে গিয়ে সবাই মিলে স্রোতের সঙ্গে কত দূর চলে গিয়েছিল, বৃষ্টির দিনে স্কুল ছুটি হয়ে গেলে ভিজতে ভিজতেই বাড়ি ফেরা।
বই ভিজে নরম হয়ে যেত। খাতার পাতাগুলো ফুলে উঠত। তবু সেদিনগুলোর মধ্যে দুঃখ ছিল না। অভাব তখনও নিজের নাম জানত না।
জানালার কাচে হাত রাখল সান্তানু। বাইরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তার মনে ভেসে উঠল আনন্দহীন অজানা উৎকণ্ঠার সেই বৃষ্টিস্নাত সময়। পনেরো দিন ধরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। মাঠ-ঘাট ডুবে গিয়েছিল। খাল নদীর মতো ফুলে উঠেছিল। উঠোনে হাঁটুসমান পানি।
সান্তানুর বাবা পরিমল, বারবার দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন। তার মুখে এমন উদ্বেগ সান্তানু আগে কখনও দেখেনি। পরিমলের ছোট্ট মুদি দোকানটা বাজারের নিচু জায়গায়। পানি যদি আর একটু বাড়ে...
তিনি বাকিটা বলেননি।
সান্তানুর মা কাজলরেখা শুধু বলেছিলেন—‘এখন বের হইয়ো না। ভোর হলে দেখা যাবে।’
পরিমল হতাশ দৃষ্টিতে অন্ধকারের দিকে তাকিয়েছিল, কোনো উত্তর দেননি। বাইরে তখনও অবিরাম বৃষ্টি। টিনের চালের ওপর সেই একই শব্দ। সেই শব্দের ভেতর কোথায় যেন একটা অশনি-সংকেত লুকিয়ে ছিল।
সান্তানু চোখ বন্ধ করল। কত বছর কেটে গেছে। তবু সেই রাতের বৃষ্টির শব্দ এখনও তার কানে একই রকম বাজে। কিছু বৃষ্টি কখনও থামে না। তারা ভেতরেই বেঁচে থাকে। বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই। জানালার কাচ বেয়ে নামতে থাকা জলরেখাগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে সান্তানু। তার স্মৃতিরও বোধহয় নিজস্ব ঋতু আছে। বছরের অধিকাংশ সময় তারা নীরব থাকে। হঠাৎ কোনো এক রাত, কোনো এক গন্ধ, কোনো এক শব্দ তাদের জাগিয়ে তোলে।
সেই রাতও ছিল তেমনই। বৃষ্টি পৃথিবীর বুক ফুঁড়ে উঠেছিল। দূরের বাঁশঝাড় বাতাসে কাত হয়ে যাচ্ছিল। বিদ্যুতের আলোয় সাদা হয়ে উঠছিল চারপাশ। আবার সবকিছু অন্ধকার। কেরোসিনের কুপিটা জ্বলছিল। আলো লাফিয়ে, ঝাঁপিয়ে এত কম ছিল যে বাবার মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। শুধু বোঝা যাচ্ছিল, তিনি বারবার উঠে দরজার কাছে যাচ্ছেন, ফিরে আসছেন।
মা বললেন—‘এত চিন্তা করছ কেন? দোকান থাকলে থাকবে, না থাকলে থাকবে না। মানুষ আগে।’
বাবা বললেন—‘তুমি তো জানো, কাজলরেখা, দোকানটাই আমার কাছে সব।’
মা চুপ করে গেলেন। সেই বাক্যের অর্থ তখন সান্তানু বুঝতে পারেনি। এখন বোঝে। গ্রামের ছোট্ট মুদি দোকানটা শুধু একটা দোকান ছিল না। সেটাই ছিল সংসারের ভাত, ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ, পুজোর নতুন জামা, অসুখের ওষুধ, অনিশ্চিত আগামী দিনের একমাত্র ভরসা।
বৃষ্টির শব্দ আরও ঘন হয়ে উঠল। দূরে কোথাও চিৎকার শোনা গেল—‘পানি বাজারে ঢুকে গেছে!’
আরেকজনের গলা—‘নদীর বাঁধ টিকবে না!’
বাবা এবার উঠে দাঁড়ালেন। খুঁটির সঙ্গে ঝোলানো পুরোনো ছাতাটা হাতে নিলেন।
মা তাড়াতাড়ি সামনে এসে দাঁড়ালেন—‘যাবা পরিমল?’
বাবা শুধু মাথা নাড়লেন—‘এখন যেও না। ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করো।’
তিনি শান্ত গলায় বললেন—‘এক রাতেই যা হারানোর, তা হারিয়ে গেলে ভোর আর কিছু ফেরত দিতে পারবে না।’
মা বাবার হাত চেপে ধরলেন—‘আমার ভালো লাগতেছে না।’
বাবা একটু হেসে বললেন—‘এই বৃষ্টি আমি নতুন দেখছি নাকি?’
হাসিটা ছিল খুব স্বাভাবিক। এমন হাসি, যা বলে, একটু পরেই ফিরে আসবো। তিনি সান্তানুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন—‘ঘুমিয়ে পড়।’
সান্তানু কিছু বলতে গিয়েও বলল না। তার মনে হচ্ছিল, বাবাকে যেতে দেওয়া ঠিক না। কিন্তু ছোট ছেলের অকারণ ভয়কে বড়রা খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। ভেজা দরজায় ভোঁতা শব্দ হলো। উৎকণ্ঠিত মা দরজা খুলে দিলেন। দরজাটা খুলতেই এক ঝাপটা বাতাস আর বৃষ্টির ছাট ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। কাঁপতে থাকা বাতির নিভু নিভু আলোয় কয়েক মুহূর্ত বাবার পিঠ দেখা গেল। পরক্ষণে তিনি বৃষ্টির দেয়ালের মধ্যে মিলিয়ে গেলেন।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল। টিনের চালের ওপর বৃষ্টির অবিরাম শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। মা দরজার পাশে বসে রইলেন। ঠোঁট নড়ছিল। নিশ্চয়ই ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছিলেন।
সেই রাতের পর আর কয়েকদিন আকাশের মুখ পরিষ্কার হয়নি। নদীর পানি প্রতিদিন একটু একটু করে বাড়ছিল। সবাই অপেক্ষা করল, উদ্বিগ্ন হলো, শেষে ভয় পেতে শুরু করল। প্রায় একুশ-বাইশ দিনের মাথায় শুরু হলো সেই ভয়াবহ বন্যা, যার কথা বহু বছর পরও ইতিহাস কাঁপা গলায় স্মরণ করে।
বন্যার শুরু থেকেই বিমল ঘোষের ঘুম হারিয়ে গিয়েছিল। দিনের পর দিন পানি বাড়ছে, পানিবন্দিরা আশ্রয়ের জন্য ছুটছে, কারও ঘর ভেসে যাচ্ছে, কারও জীবনের সঞ্চয় চোখের সামনে হারিয়ে যাচ্ছে। তার বাড়ির বাইরের উঠোন, বারান্দা আর ছাদে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর দিকে তাকিয়ে বুক ভার হয়ে উঠত। নিজের বাড়িটা যেন আর শুধু নিজের নেই। এটি এখন বিপন্ন মানুষের শেষ ভরসা।
এমন সময় হঠাৎ মেঘলার কথা মনে পড়ল। মেয়েটা নানার বাড়ি যশোরে আছে। জানেন, সেখানে নিরাপদেই আছে। তবু বাবার মন তো যুক্তির কথা শোনে না। ফুলমতি থাকলে আজ কতটা সাহায্য করত! আশ্রয় নেওয়াদের খোঁজ রাখা, রান্নাবান্নার ব্যবস্থা করা, অসুস্থদের পাশে দাঁড়ানো, কার কী প্রয়োজন তা বুঝে এগিয়ে যাওয়া, সবকিছুতেই সে নিজেকে জড়িয়ে ফেলত। মেঘলাও ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে অন্যের বিপদে ছুটে গেছে। অন্যের কষ্ট দেখলে তার মন নরম হয়ে যেত।
কখনও বিমল ঘোষ ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকেন। মেয়ের কণ্ঠ শুনলেই বুকের ভেতর একটা শান্তি নেমে আসে। তিনি ভাবেন, মানুষ দূরে থাকলেও তার মায়া কখনও দূরে যায় না।
এই বন্যার সবচেয়ে নির্মম আঘাত নেমে এসেছিল যে অসংখ্য পরিবারের ওপর। তাদেরই একজন অরুণিমা। বন্যা শুধু ঘরবাড়িই ভাসিয়ে নিয়ে যায়নি, এক নিমিষে মুছে দিয়েছিল অরুণিমার সাতকুল। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। কোথাও কারো চিহ্ন নেই, নেই কোনো পরিচিত কণ্ঠস্বর।
ভাঙাচোরা ঘরের অবশিষ্ট চালা আর একটি খুঁটি আঁকড়ে অসম্ভব এক আশায় অপেক্ষা করেছে অরুণিমা। এখনই বুঝি ভাঙা সাঁকো পেরিয়ে তার দাদা হাট থেকে ফিরে আসবে। ছেঁড়া বাজারের ব্যাগ থেকে একে একে বের করবে গোটাকয়েক পেঁয়াজ, কয়েকটি কাঁচামরিচ, কিছু আলু, পোয়াখানেক ডাল আর এক কেজি চাল। সে ফুঁ দিয়ে দিয়ে চুলায় আগুন জ্বালাবে। রান্না করবে। রান্না শেষে মা, বাবা, ভাই, পিসি আর দাদা সবাই একসঙ্গে বসে খাবে।
বাস্তব ছিল নির্মম। চারদিকে থৈথৈ পনি, ভাঙা ডালপালা আর মৃত্যুর নিস্তব্ধতা। ভেসে যাওয়া স্বজনেরা বেঁচে আছেন কিনা কে জানে। ঘোলা চোখের পানি ধুয়ে বৃষ্টির ধারা হারিয়ে যাচ্ছে প্রান্ত ছাড়িয়ে প্রান্তে। হঠাৎই পানির বুক চিরে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা এগিয়ে এলো। এতটাই আকস্মিক যে কিছু বোঝার আগেই সেটি অরুণিমার গা ঘেঁষে থেমে গেল। চমকে উঠে সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। ঠোঁট নড়ল, গলা থেকে বের হলো শুধু ক্ষীণ এক ফিসফিসে শব্দ—‘কী... চান?’
নৌকায় থাকা এক স্বেচ্ছাসেবক হাত বাড়িয়ে বলল—‘আপা, হাতটা ধরুন। প্লিজ, নৌকায় উঠুন। পানি ক্রমেই বাড়ছে। আর আধঘণ্টা দেরি হলে এই জায়গাটাও ডুবে যাবে।’
অরুণিমা কাঁপতে কাঁপতে পানির দিকে আঙুল তুলল। বলতে চাইল—‘আমার... স্বজনেরা?’
ঝোড়ো বাতাস আর পানির গর্জনে তার অস্পষ্ট শব্দ হারিয়ে গেল। কেউ শুনতে পেল না। আর একবার ঘরের চালাটার দিকে তাকিয়ে, অনিচ্ছায় স্বেচ্ছাসেবকের বাড়িয়ে দেওয়া হাত ধরে নৌকায় উঠে বসল।
ইঞ্জিন গর্জে উঠতেই নৌকাটি আস্তে আস্তে দূরে সরে যেতে লাগল। সেই সময় অরুণিমার বুকের ভেতর জমে থাকা সব কান্না বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এলো। সে মুখ চেপে কাঁদছিল, অথচ সেই কান্নাও ডুবে যাচ্ছিল বন্যার অবিরাম গর্জনের মধ্যে।
নৌকাটি একটি আশ্রয়কেন্দ্রের সামনে ভিড়ল। সেখানে মানুষ আর মানুষ। কেউ সন্তান হারিয়েছে, কেউ বাবা-মা, কেউ বা পুরো পরিবার। ভেজা কাপড়ে জড়সড় হয়ে বসে থাকা অসংখ্য মুখে একই রকম শূন্যতা। তার ওপর ছড়িয়ে পড়েছে সর্দি, কাশি, ডায়রিয়া আর জ্বর। চিকিৎসকদের হাতে পর্যাপ্ত ওষুধ নেই, লোকবলও অপ্রতুল।
চারদিকে এত অসহায়তা দেখে অরুণিমা নিজের শোকটাকে বুকের গভীরে চেপে রাখল। চিকিৎসকদের একজনের কাছে গিয়ে শান্ত গলায় বলল—‘আমি কাজ করতে চাই। আমাকে বলুন কী করতে হবে।’
সেদিন থেকেই সে স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে রোগীদের সেবা করতে শুরু করল। ওষুধ পৌঁছে দেওয়া, স্যালাইন ধরে রাখা, শিশুদের দেখাশোনা, বৃদ্ধদের সান্ত্বনা দেওয়া, জ্বরের রোগীর কপালে ভেজা কাপড় চেপে ধরা, ক্ষুধার্তের হাতে খাবার তুলে দেওয়া... নিজের দুঃখ ভুলে সে অন্যের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের অংশ হয়ে উঠল। তবু কাজের ফাঁকে ফাঁকে মন ছুটে যেত আপনজনদের কাছে।
মাসতুতো ভাই সান্তানুর কথা মনে পড়ত বারবার। মাসি কাজলরেখা আর মেসো পরিমল তাকে নিজের সন্তানের মতোই স্নেহ করেন। তারা কোথায় আছেন, বেঁচে আছেন কি না, কোনো খবরই তার জানা নেই। আশ্রয়কেন্দ্রে বারো-চৌদ্দ বছরের কোনো কিশোরকে দেখলেই সান্তানুর মুখ ভেসে উঠত চোখের সামনে। আর ছোট্ট অপরাজিতার কথায় বুকটা মোচড় দিয়ে উঠত। মেয়েটা তো জলে খুব ভয় পায়। মনে মনে দু'হাত জোড় করে সে শুধু প্রার্থনা করত—‘হে ভগবান, ওদের ভালো রেখো। ওরা সবাই শুধু বেঁচে থাকুক।’
যখন আশ্রয়কেন্দ্রে বসে অরুণিমা সান্তানুদের জন্য প্রার্থনা করছিল, ঠিক সেই সময় সান্তানু দাঁড়িয়ে ছিল বিমল ঘোষের পাশেই। টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে তাদের ঘরেও বুকসমান পানি উঠে গিয়েছিল। উপায় না দেখে সান্তানু, তার বাবা পরিমল, মা কাজলরেখাসহ আশ্রয় নিয়েছিল বিমল ঘোষদের বাড়ির ছাদে। একসময়ের প্রশস্ত উঠান, বারান্দা আর বাহিরবাড়ি এখন শত শত বিপর্যস্তের অস্থায়ী আশ্রয়। শিশুদের কান্না, বৃদ্ধদের কাশি, ভেজা কাপড়ের গন্ধ আর অনিশ্চয়তার দীর্ঘশ্বাসে চারদিক ভারী হয়ে আছে। এই দুর্যোগে বিমল ঘোষ যেন নিজের বাড়ির মালিক নন, তিনি অভিভাবক হয়ে উঠেছেন। নিজের সামর্থ্যের শেষটুকুও তিনি উজাড় করে দিচ্ছেন। তিনি বিশ্বাস করেন—‘জীবসেবা পরম ধর্ম।’
খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো কাপড়, ওষুধ, আশ্রয়, উদ্ধার অভিযান, সবকিছুই চলছে তার তত্ত্বাবধানে। তার নির্দেশে নিরলস কাজ করে চলেছেন পরিমল, নিরু, রহিম শেখ, রশিদ, মেহেরাব, নন্দন, রঞ্জন এবং কিশোর সান্তানু। ইঞ্জিনচালিত নৌকা আর সাধারণ নৌকা নিয়ে তারা সারাদিন পানিবন্দিদের উদ্ধার করছে, কারও হাতে খাবার, কারও হাতে ওষুধ পৌঁছে দিচ্ছে। তবুও বিপদ যেন থামার নাম নেই।
প্রতি ঘণ্টায় পানি বাড়ছে। ইতিমধ্যেই বাজারের অধিকাংশ দোকান ডুবে গেছে। চাল, ডাল, কাপড়, ওষুধ, আসবাব, সবকিছু পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা প্রাণপণ চেষ্টা করেও মালামাল বাঁচাতে হিমশিম খাচ্ছে।
বিমল ঘোষ দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। তিনি বললেন—‘পরিমল, নিরু, রহিম... তোরা সান্তানুকে নিয়ে বাজারে যা। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে হাত লাগা। যতটুকু যা বাঁচানো যায়, ততটুকুই লাভ। বাকিরা অন্য এলাকাগুলো দেখ।’
সবাই মাথা নেড়ে কাজে ছুটে গেল। একটু পর সবাইকে ডেকে বিমল ঘোষ বললেন—‘শোন, লোক কম হয়ে যাচ্ছে। আরও দু-তিনজন স্বেচ্ছাসেবক জোগাড় কর। এখন আর কেউ বসে থাকার সুযোগ নেই।’
রশিদ তখন ভেজা কাপড়ে দাঁড়িয়ে ছিল তার সামনে। ক্লান্ত চোখে বলল—‘বড় কর্তা, আমরা প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করছি। এই পানি তো কারও কথা শোনে না। ক্ষতি আর থামানো যাচ্ছে না।’
বিমল ঘোষ গভীর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন—‘আমি জানি রশিদ। তোদের ওপর আমার ভরসা আছে। তোরা আমার আপনজনের মতো। তবু মনটা স্থির রাখতে পারছি না। এমন বিপদের দিনে শান্ত থাকা কি সহজ?’
রশিদ চুপ করে রইল। ঠিক তখন নন্দন এগিয়ে এসে বলল—‘বড় কর্তা, আরেকটা বিপদ দেখা দিয়েছে।’
বিমল ঘোষ চমকে উঠলেন—‘কী বিপদ?’
—‘সাপের উপদ্রব বেড়ে গেছে। তিনজনকে ইতিমধ্যেই সাপে কেটেছে। কেউ বাঁচেনি।’
বিমল ঘোষের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। তিনি বললেন—‘আমি দুজনের খবর জানতাম।’
পরিমল বিমর্ষ স্বরে বললেন—‘আমার হিসাবে পাঁচজন। পূবপাড়ার দুজন, নিধুর মা, অন্তির ছোট মেয়ে আর পারুর বাবা। কারোরই শেষযাত্রা ঠিকমতো করা যায়নি। পানির ওপরই ভাসিয়ে দিতে হয়েছে।’
চারদিকে স্তব্ধতা নেমে এল। বিমল ঘোষ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—‘পরিসংখ্যান বড় কথা নয়। সত্যি হলো, মানুষ মরছে। সাপগুলো বিষধর। আমি শহরে যোগাযোগ করে সাপের বিষের প্রতিষেধক আনার চেষ্টা করছি। কতটা কী পারবো জানি না। সেদিকেও বন্যার প্রভাব পড়েছে। সবাইকে সাবধান কর। আশ্রয়কেন্দ্রে যারা আছে, তাদের প্রাথমিক চিকিৎসার নিয়মও বুঝিয়ে দে।’
নিরু তখন গলা ভারী করে বলল—‘কর্তা, অনেকেই লাশ ভেলায় ভাসিয়ে দিচ্ছে। সঙ্গে একটা চিরকুট বেঁধে দিচ্ছে। সেখানে নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর লেখা থাকে। আর নিচে একটা অনুরোধ... “যদি কেউ আমার বাবার, ভাইয়ের কিংবা ছেলের লাশ খুঁজে পান, দয়া করে দাফন বা সৎকার করে আমাদের খবর দেবেন।”’
কথাটা শেষ হতে না হতেই চারপাশ আরও ভারী হয়ে উঠল।
পরিমল বললেন—‘ক’দিন পার হলো, বলতে পারিস কেউ?’
মেহেরাব বলল—‘না গো দাদা, বন্যার্ত আমরা, আমাদের কাছে এখন দিনের হিসাব নেই। সব দিনই একরকম।’
নিরু বলল—‘কর্তা, দুই কিলোমিটার দূরের একটা পাহাড়ে আমরা তিনটা লাশ দাফন করতে বাধ্য হয়েছি। এর চেয়ে ভয়ংকর দৃশ্য আমি জীবনে দেখিনি।’
বিমল ঘোষ ব্যথিত গলায় বললেন—‘কবরস্থান ডুবে গেছে, শ্মশান ডুবে গেছে, উপাসনালয়ও পানির নিচে। এমন অবস্থায় নিয়ম মেনে সব করা সম্ভব নয়’রে। শেষ সম্মানটুকু দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় ধর্ম। নিজের বিবেক দিয়ে সিদ্ধান্ত নিবি। কেউ এজন্য তোদের দোষ দেবে না।’
রঞ্জন নিচু গলায় বলল—‘পানির তোড়ে কত ভেলা, কত লাশ ভেসে যাচ্ছে গো কর্তা। হয়তো দূরে কোথাও গিয়ে থামছে। আমাদের চোখেও পড়ছে না।’
বিমল ঘোষ আকাশের দিকে একবার তাকিয়ে বললেন—‘তবু মনে রাখিস, আমাদের ভেঙে পড়া চলবে না। প্রাণ থাকলেই ঘর উঠবে। যতক্ষণ শক্তি আছে, ততক্ষণ আমরা মানুষের পাশে থাকব।’
কথাগুলো বললেও বিমল ঘোষের মন স্থির হচ্ছিল না। চারদিকে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে শুধু অভিজ্ঞতা বা সাহস দিয়ে সব সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। সড়কগুলো আগেই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। উপজেলা সদর, জেলা শহর, এমনকি পাশের ইউনিয়নগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন। কোথাও কোথাও বিদ্যুতের খুঁটি কেবল মাথা তুলে আছে, কোথাও সেগুলোরও আর কোনো অস্তিত্ব নেই।
বিমল ঘোষ সিদ্ধান্ত নিলেন, প্রয়োজনে ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে শহরে যেতে হবে। ওষুধ, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি তৈরির ট্যাবলেট, সাপের বিষের প্রতিষেধক, শিশুখাদ্য, সবকিছুরই তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
তিনি জানতেন, এই দুর্যোগ শুধু তাদের এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল তখন বন্যার পানিতে ডুবে। সীমান্তের ওপারেও ভারতের আসাম, কাশ্মীরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে একই বিপর্যয়। মুখে মুখে ভেসে আসছে প্রাণহানির খবর। কোথাও নদীর বাঁধ ভেঙেছে, কোথাও পাহাড় ধসে গেছে। প্রকৃতি যেন একযোগে ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে।
পড়ুন ► প্রথম পর্ব ► দ্বিতীয় পর্ব || আসছে ► চতুর্থ পর্ব



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন