ধারাবাহিক গদ্য: ৪ || আহমদ ছফার স্মৃতি: অথ মহিউদ্দিন সমাচার
ধারাবাহিক গদ্য: ৪ || আহমদ ছফার স্মৃতি: অথ মহিউদ্দিন সমাচার
[ বাংলার মনীষী আহমদ ছফাকে নিয়ে নানাজন নানা স্মৃতিকথা লিখেছেন। নানাজন নানাভাবে গবেষণা করছেন। স্মরণ করছেন। ভবিষ্যতেও করবেন। তবে তাঁকে নিয়ে সত্য-মিথ্যায় মোড়ানো স্মৃতিকথাগুলো নানা বিতর্ক, নানা কথা আর নানা মিথের জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি ঢাকার প্রথমা থেকে প্রকাশিত হয়েছে লেখক মহিউদ্দিন আহমদের বই ‘আহমদ ছফা: আমার কথা কইবে পাখি’। বইটি প্রকাশের পর আহমদ ছফাকে নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। খোদ ছফার পরিবার থেকে বইটি নিয়ে নানা ‘মিথ্যা-চাতুরী’র অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রথমার বইটির প্রতিবাদ স্বরূপ একটি বই লিখেছেন আহমদ ছফার ভ্রাতুষ্পুত্র, প্রথিতযশা লেখক ও ঔপন্যাসিক নূরুল আনোয়ার। তিনি দীর্ঘদিন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মনীষী ছফার সাহচার্যে ছিলেন। ক’দিন আগে নূরুল আনোয়ারের লেখা পাণ্ডুলিপিটি প্রতিধ্বনির হাতে এসেছে। লেখার গুরুত্ব বিবেচনা করে নূরুল আনোয়ার প্রণীত প্রকাশিতব্য বইয়ের চুম্বক অংশ ধারাবাহিকভাবে প্রতিধ্বনি প্রকাশ করছে। বি.স. ]
চতুর্থ কাণ্ড || আহমদ ছফার গান ও শিল্পী সুলতান
আহমদ ছফার গান
গান শীর্ষক রচনাটিতে আহমদ ছফাকে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করেছেন মহিউদ্দিন আহমদ। তিনি আহমদ ছফার ‘ঘর করলাম নারে আমি সংসার করলাম না’ গানটি তাঁর লেখায় পৃষ্ঠা জুড়ে তুলে দিয়েছেন, যেহেতু ফকির আলমগীরের কণ্ঠে এটি গীত হয়েছে। তারপর গানের শেষে তিনি মন্তব্য করেছেন:
ফকির আলমগীরের গলায় গানটি বাজে অন্য সুরে। সম্ভবত তাঁরই দেওয়া। তবে ছফার সুরটা ভিন্ন। আলমগীরেরটা দ্রুতলয়ে। ছফার লয় বিলম্বিত। আলমগীর গেয়েছেন কণ্ঠ আর মুখের পেশি দিয়ে, ছফা গেয়েছেন হৃদয় দিয়ে।১
কিন্তু মহিউদ্দিন আহমদ যদি বলতেন, ছফার বেসুরে গলার গান আমাকে বিরক্ত ধরিয়ে দিত, এতে আমি একটুও অবাক হতাম না। এ পর্যন্ত আহমদ ছফার গান যাঁরা শুনেছেন তাঁদের কেউ তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হয়েছেন এমন কাউকে অন্তত আমি পাইনি। মহিউদ্দিন আহমদই একমাত্র ব্যক্তি যিনি আহমদ ছফার কণ্ঠ নিয়ে অন্তত দু’লাইন হলেও ইতিবাচক ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। আমি বলব এটা একজন মহৎ লেখকের বড় গুণ। কিন্তু তাঁর এ অনন্য গুণটি আবার অন্য কারণে ঢাকা পড়ে যায়। মহিউদ্দিন সাহেব যখন বলেন:
১৯৯৮ সাল থেকে আমি ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলের ১০৭ নম্বর কামরায় নিয়মিত যাই। কখনো সকালে, কখনো বিকেলে, কিংবা রাতে। যখন বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ার আশেপাশে যাওয়া পড়ে, তখনই এরবার ঢুঁ মেরে আসি। ছফা থাকেন এখানে, বেশিরভাগ সময় তাঁকে তাঁর কামরাতেই পেয়ে যাই। তিনি চা খাওয়ান। সেই কালো কুখ্যাত বিস্বাদ চা।২
অপ্রিয় কথাটিও অনেক সময় সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা যায়। ‘সেই কালো কুখ্যাত বিস্বাদ চা’ বাক্যটি যখন কোনো পাঠক পড়বেন তখন লেখকের নিচু মনের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠবে না? আহমদ ছফা তো ইচ্ছে করে কুখ্যাত চা তাঁকে পান করতে দেননি। তিনি যে রকম চা বানাতে জানেন সে রকম তাঁকে পান করতে দিয়েছেন। আহমদ ছফার নিজের হাতে তৈরি চা, ভাবা যায়! কোন মানুষকে কতটুকু ভালোবাসলে তাকে চা বানিয়ে খাওয়ায়। আমাকে যদি আমার কোনো প্রিয় মানুষ ভালোবেসে বিষ খেতে দিত আমি মানুষের কাছে অমৃত খেয়েছি বলে বেড়াতাম।
এ শিক্ষাটা আমি আমার ছোটবেলাতেই পেয়েছি। আমাদের চট্টগ্রামে ঐতিহ্যগতভাবে মেজবানির একটা চল আছে। মূলত মৃত মানুষের আত্মার সদ্গতির জন্য মেজবানির আয়োজন করে লোকজনকে খাওয়ানো হয়। শয়ে শয়ে, হাজারে হাজারে মানুষের খাবারের আয়োজন করা হয়। মেজবান খেয়ে মানুষ চলে যাবার সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন তাদের কাছে জানতে চায় (যেভাবে কোরবানির সময় গরু কিনে নিয়ে যাওয়ার সময় মানুষ গরুর দাম জিজ্ঞেস করে), কেমন খাওয়াল? তখন আমন্ত্রিত মেজবানি খাওয়া লোকজন খারাপ খেলেও জবাব দিত, শোকর আলহামদুলিল্লাহ, ভালো খাইয়েছে। সব মানুষ তো আবার সমান নয়, কেউ বলত লবণ কম বা বেশি হয়েছে, কেউ বলত মাংস বেশি দেয়নি, কেউ বলত মাংসে ঝোল বেশি ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন প্রশ্নকারী বলত, খারাপ খাইয়েছে বুঝলাম, কিন্তু তোর বাড়িতে দাওয়াত দিয়ে কাউকে কয় বেলা তুই খেতে দিয়েছিস? কথাগুলো মহিউদ্দিন আহমদকে আহত করার জন্য বলেছি তা যেন কেউ মনে না করেন, এটা একটা উদাহরণ মাত্র।
কিন্তু মহিউদ্দিন আহমদ যদি বলতেন, ছফার বেসুরে গলার গান আমাকে বিরক্ত ধরিয়ে দিত, এতে আমি একটুও অবাক হতাম না। এ পর্যন্ত আহমদ ছফার গান যাঁরা শুনেছেন তাঁদের কেউ তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হয়েছেন এমন কাউকে অন্তত আমি পাইনি। মহিউদ্দিন আহমদই একমাত্র ব্যক্তি যিনি আহমদ ছফার কণ্ঠ নিয়ে অন্তত দু’লাইন হলেও ইতিবাচক ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। আমি বলব এটা একজন মহৎ লেখকের বড় গুণ। কিন্তু তাঁর এ অনন্য গুণটি আবার অন্য কারণে ঢাকা পড়ে যায়।

বাঁশি বাজাচ্ছেন আহমদ ছফা
শিল্পী সুলতান
শিল্পী এস এম সুলতানকে আবিষ্কার ছিল আহমদ ছফার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার একটি। তাঁকে দেশের ভেতরে-বাইরে পরিচয় করিয়ে দেওয়া জন্য এমন কোনো কাজ নেই আহমদ ছফা করেননি। সেটি সুলতান যেমন জানতেন দেশের অনেকেই তা স্বীকার করেন। মহিউদ্দিন সাহেবও সেটি ভালোভাবে জানেন। সুলতানকে নিয়ে লেখা এ রচনাটিতে মহিউদ্দিন আহমদ ছফার অনেক গুণগান গেয়েছেন। আহমদ ছফা সুলতানের শিল্পকর্মের প্রদর্শনী করেছেন, মানুষের মাঝে সুলতানকে পরিচিত করেছেন, তাঁকে নিয়ে কালজয়ী লেখা লিখেছেন ইত্যাদি ছাড়াও আহমদ ছফার নানান কীর্তির কথা নানাভাবে বলার চেষ্টা করেছেন। সবচেয়ে বেশি পাঁচকান করেছেন মোরশেদ শফিউল হাসানদের মূলভূমি শীর্ষক লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত অভিনব উদ্ভাবন লেখাটির কথা। হয়তো তাঁর স্ত্রী আয়েশা পারুল-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকাটি একটি বড় কারণ হতে পারে। এ অভিনব উদ্ভাবন নিয়ে মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন:
ছফার ইচ্ছা, অভিনব উদ্ভাবন পুস্তিকা আকারে বের করবেন। এ সময় তিনি বাঙালি মুসলমানের মন নামে একটি প্রবন্ধ সংকলন নিয়ে কাজ করছেন। বইটি ছাপবে বাংলা একাডেমি। তাদের সঙ্গে ছফার কথা হয়েছে। কিন্তু ততদিন সুলতানকে নিয়ে বসে থাকা যায় না। তাঁকে পাদপ্রদীপের জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। এটা ছফার একটা মিশন।
ছফা প্রকাশক খুঁজছেন। এ নিয়ে তাঁর হোস্টেলের কামরায় আলাপ হলো। দুই হাজার টাকা হলেই চলবে। আমার স্ত্রী ছফার দারুণ ভক্ত। বলল, টাকাটা আমি দেব। তখন আমাদের খুব টানাটানির সংসার। কোনো সঞ্চয় নেই। প্রতি মাসেই ধারদেনা করে চলতে হয়। পারুল কোত্থেকে টাকা দেবে?
ছফা পারুলের কাছ থেকে টাকা নেবেন না। কয়েকদিন পর আমি তাঁর হাতে দুই হাজার টাকা তুলে দিলাম। বললাম, পারুল দিয়েছে। না নিলে মনে কষ্ট পাবে। ছফা বললেন, এটা কিন্তু ধার হিসেবে নিলাম।
ছফা সামাজিক বিজ্ঞান পরিষদ নামে একটা সংগঠন তৈরি করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক সাদউদ্দিন তাঁর সভাপতি। ছফা সম্পাদক। আর কে কে আছেন জানি না। তিনি থিঙ্ক-ট্যাংক জাতীয় একটা কিছু বানাতে চাচ্ছেন। তো সামাজিক বিজ্ঞান পরিষদের নামেই বইটি ছাপা হলো ১৯৮০ সালের ডিসেম্বরে। প্রকাশকের জায়গায় নাম দিলেন আয়েশা পারুল। প্রবন্ধের শিরোনাম পাল্টে দিলেন। অভিনব উদ্ভাবন হয়ে গেল বাংলার চিত্রঐতিহ্য: সুলতানের সাধনা। ছোট বই। ৪০ পৃষ্ঠার মতো হবে। পেপারব্যাক। দাম ৫ টাকা।
মাস কয়েক পেরিয়ে গেছে। ছফা টাকার কথা ভুলতে পারেননি। একদিন আমাকে পাকড়াও করে নিয়ে গেলেন মতিঝিলে জনতা ব্যাংকের হেড অফিসে। সাইয়িদ আতীকুল্লাহ সেখানে ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার। তিনি কবি ও গল্পকার। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় জেল খেটেছেন। সজ্জন মানুষ। আমি তাঁকে চিনি। মাঝে মধ্যে প্রেসক্লাবে যাই। সেখানে তাঁকে দেখি, কথা হয়। তাঁর কবিতা প্রায়ই ছাপা হয় বিভিন্ন পত্রিকায়। তাঁর কবিতা দুর্বোধ্য মনে হয়। তখন রবীন্দ্রনাথের শরণ নিই—‘কিছু একটা বুঝাইবার জন্য কেহ তো কবিতা লেখে না হৃদয়ের অনুভূতি কবিতার ভিতর দিয়া আকার ধারণ করিতে চেষ্টা করে। এই জন্য কবিতা শুনিয়া কেহ যখন বলে ‘বুঝিলাম না’ তখন বিষম মুশকিলে পড়িতে হয়।’
সাইয়িদ আতীকুল্লাহ সমাদর করে বসালেন। চা খাওয়ালেন। ছফার হাতে একটি চেক দিলেন। বেরিয়ে আসার সময় ছফা বসলেন আরেকটা টেবিলের সামনে। সেখানে আছেন জনতা ব্যাংকের পাবলিক রিলেশনস অফিসার প্রতাপ শংকর হাজরা। তাঁকে আমি ভালো করেই চিনি। মোহামেডান স্পোটিং ক্লাবের হয়ে ফুটবল খেলতেন। জাতীয় দলেও খেলেছেন। আমার দেখা দেশের সেরা রাইট উইঙ্গার। আমি তো বরবার মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সাপোর্টার ছিলাম, স্কুলজীবন থেকেই। প্রতাপ আমার প্রিয় খেলোয়াড়দের একজন।
আমরা ব্যাংক থেকে বেরিয়ে এলাম। ছফা আমার হাতে একটা চেক দিয়ে বললেন, এটা পারুলের হাতে দেবে। দেখলাম দুই হাজার টাকার বেয়ারার চেক।৩
ওপরে আমি যে মহিউদ্দিন আহমদের লেখা উদ্ধৃত করলাম, পুরো রচনাটির এ পর্যন্ত পড়ে তাঁর প্রতি আমার পূর্বের সব ধ্যান-ধারণা একেবারে পাল্টে গেল। মহিউদ্দিন সাহেব এত উদার, এত মানবিক এর আগের রচনাগুলোতে তাঁকে এভাবে মনে হয়নি। যাঁর সংসার চলে না, অথচ স্ত্রীর সম্মান রক্ষা করার জন্য টাকা এনে আহমদ ছফার হাতে তুলে দিতে পারেন তিনি তো যা তা কোনো মানুষ নন, মহামানব। ছফা টাকা নেবেন না। আর টাকা না নিলে পারুল কষ্ট পাবেন, সেটিও তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিতে হলো। অগত্যা ধার হিসেবে হলেও ছফাকে টাকাটা নিতে হয়।
কিন্তু রচনাটি পুরো পাঠ করার পর আমার মনের মধ্যে জন্ম নেওয়া ধারণাটি অল্প সময়ের মধ্যে একেবারে পাল্টে যায়। কেন জানি হঠাৎ আমি আনমনে গাইতে থাকলাম, ‘হাইলা লোকের লাঙ্গল বাঁকা, জনম বাঁকা চাঁন্দ রে জনম বাঁকা চাঁন্দ, তার চাইতে অধিক বাঁকা যারে দিছি প্রাণরে দুরন্ত পরবাসী।’ মহিউদ্দিন সাহেবের কথাবার্তায় হাসি পায়, আবার কখনও কখনও কাঁদতেও ইচ্ছে করে।
সুলতান নামাঙ্কিত লেখাটির যে পর্যন্ত আয়েশা পারুলের প্রসঙ্গ রয়েছে ওই পর্যন্ত মহিউদ্দিন সাহেবের চিন্তাচেতনা এবং কথাবার্তা বেশ পরিমিত ছিল। যখনই পারুলের প্রসঙ্গ শেষ হয়েছে সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাঁর পুরনো অভ্যাসে চলে গেলেন।
আমি যতদূর জেনেছি এবং শুনেছি আয়েশা পারুল বেশ ভালো মনের একজন মানুষ। আহমদ ছফাকে তিনি খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন এবং তাঁর অনেক ভালো কাজের সহযাত্রীও ছিলেন। আল্লাহতায়ালা কিছু কিছু মানুষকে অন্যের সহায়ক শক্তি হিসেবে নিযুক্ত করে থাকেন, আহমদ ছফার জীবনে আয়েশা পারুলকে যদি আমরা ওভাবে চিন্তা করি, সেটি খুব বেশি বাড়িয়ে বলা হবে মনে হয় না। মহিউদ্দিন আহমদের লেখায়ও তার কিছুটা ইঙ্গিত মেলে।
মূল প্রসঙ্গ এড়িয়ে একটুখানি অন্যদিকে চলে গিয়েছিলাম। আসল জায়গায় আসি। আমি যে বলেছিলাম আয়েশা পারুলের প্রসঙ্গ পর্যন্ত মহিউদ্দিন সাহেব পরিমিত ছিলেন। কেন বলেছিলাম তার জবাব দেয়ার আগে আমরা মহিউদ্দিনের কটি কথা শুনি। তিনি লিখেছেন:
সুলতানের সঙ্গে ছফার নিবিড় সম্পর্ক ছিল। পরে আর এ রকম থাকেনি। ছফা আমাকে বলেছিলেন—আমার সুলতানকে ছিনতাই করে নিয়ে গেছে হাসনাত আবদুল হাই। হাসনাত আবদুল হাই সুলতানকে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখেছেন। বইয়ের নাম সুলতান। পরে একই নামে ইংরেজিতেও লিখেছেন।৪
ওপরে মহিউদ্দিন সাহেবের যে কথাগুলো আমি উদ্ধৃত করলাম, ওই কথাগুলো পড়লে যে কারও মনে হবে সাধারণ হালকা কিছু কথা, কিন্তু বিষয়টা ওই রকম নয়। কেন বলছি দেখুন। তিনি বলেছেন, সুলতানের সঙ্গে আহমদ ছফার সম্পর্ক আগের মতো থাকেনি। এটা তো সত্য নয়। সুলতানের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আহমদ ছফার সম্পর্ক অটুট ছিল—এ সাক্ষ্যটি দেওয়ার মতো মানুষ এখনও অনেক পাওয়া যাবে। সেই সব মানুষের সাক্ষ্য মহিউদ্দিন সাহেবের বিশ্বাস নাও হতে পারে। বিরানব্বই-তিরানব্বই সালে আহমদ ছফা বিজিএসের অর্থায়নের মাধ্যমে সুলতানের নৌকা বানিয়ে দিয়েছিলেন। তার এক বছর পর চুরানব্বইয়ের অক্টোবরে সুলতান সাহেব মারা যান। আহমদ ছফার সঙ্গে সুলতানের নিবিড় সম্পর্ক ছিল কি না, সেটি জানান দিতে আমি শিল্পীর লেখা একখানা চিঠি দালিলিক প্রমাণ হিসেবে মহিউদ্দিন সাহেব সমীপে পেশ করতে চাই:
নড়াইল
৩ মার্চ, ১৯৯২
ছফা ভাই,
আশা করি ভালো আছেন।
আপনি শুনে সুখী হবেন, আগামী ফাল্গুন মাসের ঊনত্রিশ তারিখ আমার নাতনি বাসন্তীর বিয়ে। একেবারে সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় হতে যাচ্ছে, আল্লাহ ভরসা।
ফাদার ক্লাউস বয়েলেকে সঙ্গে নিয়ে ওইদিন এসে যাবেন, অন্যথায় দুঃখ পাব। এলে খুব খুশি হবো। আপনি জানেন তো আমি সেই অবধি শয্যাশায়ী। শরীর খুব দুর্বল, চলতে পারি না।
আমার শুভেচ্ছা রইল।
—এস. এম. সুলতান৫
এবার আসি হাসনাত আবদুল হাই প্রসঙ্গে। হাই সাহেব সুলতান নামের যে উপন্যাসটি লিখেছেন তার প্রত্যক্ষ ইন্ধন ছিল আহমদ ছফার। এ উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলেন আহমদ ছফা স্বয়ং। সুলতানকে নিয়ে আহমদ ছফা অনেক কাজ করেছেন, কিন্তু সেই মূল্যায়ন কেউ তেমন করেনি। এ উপন্যাসটি পড়লে বোঝা যায় সুলতানের সঙ্গে আহমদ ছফার যোগসূত্র কতখানি। খুব সম্ভব মহিউদ্দিন সাহেব এ বইটি পড়েননি, পড়লে আরও কিছু গল্প লিখতে পারতেন।
মহিউদ্দিন আহমদ আবার বলছেন, ‘পরে একই নামে ইংরেজিতেও’ লিখেছেন। মহি চাচা, হাসনাত সাহেব ইংরেজিতে এ উপন্যাস লেখেননি, প্রফেসর কবীর চৌধুরীকে দিয়ে উপন্যাসটি আহমদ ছফা অনুবাদ করিয়েছিলেন, যাতে সুলতান এবং আমাদের সাহিত্যকে বহির্বিশ্বে পরিচিত করা যায়। কবীর চৌধুরীর অনুবাদটি প্রকাশিত হলে তাঁর অনেকগুলো কপি জার্মানিতে পাঠানো হয়েছিল। কবীর চৌধুরী যে আহমদ ছফার মাধ্যমে উপন্যাসটি অনুবাদ করেছিলেন তার নমুনা:
Kabir Chowdhury
Jhoroka House 56. Road 2 Gulshan
Dhaka 1212 Phone: 602673
July 20, 1992
To
Ahmed Sofa
The General Secretary
Bangla-German Sampreeti Banani, Dhaka
Subject: English Translation of "Sultan".
Dear Sir,
In connection with one of your publication projects, I have completed the English translation of "Sultan" by Hasnat Abdul Hye written from Bangla. I dedicated approximately 500 hours to this project. The English manuscript consists of 850 pages totaling roughly 170,000 words. I kindly request you to arrange the following:
The early publication of the English version of Sultan.
A German translation based on my English rendition, to be completed at the earliest convenience.
An appropriate honorarium for my work.
The English manuscript is enclosed with this letter. Please acknowledge receipt of this letter and the manuscript.
Sincerely, Kabir Chowdhury৬
হাই সাহেব সুলতান নামের যে উপন্যাসটি লিখেছেন তার প্রত্যক্ষ ইন্ধন ছিল আহমদ ছফার। এ উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলেন আহমদ ছফা স্বয়ং। সুলতানকে নিয়ে আহমদ ছফা অনেক কাজ করেছেন, কিন্তু সেই মূল্যায়ন কেউ তেমন করেনি। এ উপন্যাসটি পড়লে বোঝা যায় সুলতানের সঙ্গে আহমদ ছফার যোগসূত্র কতখানি। খুব সম্ভব মহিউদ্দিন সাহেব এ বইটি পড়েননি, পড়লে আরও কিছু গল্প লিখতে পারতেন।

আহমদ ছফা ও এস এম সুলতান
মহিউদ্দিন আহমদ যে অতিরঞ্জিত করে কথা বলেন সেটি আমরা সাক্ষ্য পাই আহমদ ছফার সাক্ষাৎকারে। নাসির আলী মামুনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মহিউদ্দিন সম্পর্কে আহমদ ছফা অবাক করা একটি মন্তব্য করেছেন। ছফা-মামুনের কথোপকথন:
মামুন: সুলতানের ছবি আঁকা যখন আপনি প্রথম দেখলেন, ছিয়াত্তর সালেই তো আপনি প্রথম দেখলেন। তার আগে তো আপনি দেখেন নাই?
ছফা: দেখিনি।
মামুন: তার আগে তো আপনি নামও জানেন না।
ছফা: একবার নাম শুনলাম, সুলতান কে। মহিউদ্দিন বলছিল মারা গেছে। আমার বন্ধু। সুলতান তার মায়ের ফোড়া গালতে গিয়া তার মারে মাইরা ফালাইছে।
মামুন: কিভাবে এইটা?
ছফা: ফোড়া রোগ ছাপতে গিয়া মা মারা গেছিল। এ গল্পটা শুনছিলাম। পরে দেখলাম যে সত্যি না।
মামুন: ঘটনাটা সত্যি না।
ছফা: মহিউদ্দিন সব সময় রঙ ছড়াইয়া কথা বলত। এই সুলতানের এইটুকু, পরে একটা পত্রিকাতে একটা দুইটা ছবি দেখেছিলাম।৭
মহিউদ্দিন আহমদ এ অধ্যায়টির নামকরণ করেছেন সুলতান। কিন্তু তিনি সে বিষয়টার মধ্যে থাকতে পারেননি, হঠাৎ অন্যত্র চলে গেলেন, আহমদ ছফা সামাজিক বিজ্ঞান পরিষদ নামক একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছিলেন সে বিষয়ে। তিনি ছিলেন তার সাধারণ সম্পাদক এবং সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক সাদউদ্দিন। প্রতিষ্ঠানটি আহমদ ছফার পক্ষে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তারপরেও তিনি সাদউদ্দিনের পিছু ছাড়েননি। কেন ছাড়েননি? মহিউদ্দিন সাহেবের চোখে অসঙ্গতি:
ছফা সামাজিক বিজ্ঞান পরিষদটি জমাতে পারেননি। তবু সাদউদ্দিনের পিছু ছাড়লেন না। তিনি চেয়েছিলেন সাদউদ্দিনের হাত ধরে সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক হতে। কথাপ্রসঙ্গে একবার বলেছিলেন, এটা তাঁর ন্যায্য পাওনা।
ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক থাকেন। তাঁরা বয়সে তরুণ। একজনকে দেখেছি পরিবার নিয়ে থাকতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি হলে ছফা এই হোস্টেলের স্থায়ী বাসিন্দা হতে পারতেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরির জন্য যে প্রচলিত একাডেমিক শর্ত, তা ছফার ছিল না। তাঁর অনার্স নেই। ম্যাট্রিক থেকে শুরু করে শেষ পরীক্ষা পর্যন্ত একটিতেও ফার্স্ট ডিভিশন বা ফার্স্ট ক্লাস নেই। তাঁকে বলেছিলাম—ছফা ভাই, ঢাকা ইউনিভার্সিটি আপনাকে চাকরি দেবে না। শুধু শুধু সাদউদ্দিনের পিছু পিছু ঘুরছেন।
ছফা হয়তো পরে বুঝতে পেরেছিলেন। একদিন কথা উঠল, তিনি কোন অধিকারে ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলের কামরা দখল করে আছেন। তাঁকে এই হোস্টেল ছাড়তে হলো, যেখানে বসে তিনি লিখছেন অনবদ্য কিছু গান আর কবিতা।৮
মহিউদ্দিন সাহেব প্রতিটি ক্ষেত্রে আহমদ ছফার দোষগুলো খুঁজে বের করেন, তারপর সান্ত্বনাস্বরূপ দুয়েকটা ভালো কথা বলে তাঁর লেখা শেষ করেন। মহিউদ্দিনের কৌশলটার অর্থ করলে দাঁড়ায়, ছফা চোর হলেও মানুষ ভালো ছিল। যেমন উদ্ধৃতাংশের একেবারে শেষে সূক্ষ্ম খোঁচা দিয়ে বলেছেন, ‘তাঁকে এই হোস্টেল ছাড়তে হলো, যেখানে বসে তিনি লিখেছেন অনবদ্য কিছু গান আর কবিতা।’
তথ্যসূত্র
১. আহমদ ছফা: আমার কথা কইবে পাখি: মহিউদ্দিন আহমদ; প্রথমা (ঢাকা:২০২৫) পৃষ্ঠা: ১০০
২. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৯৮
৩. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১১৫
৪. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১১৫
৫. প্রাপক আহমদ ছফা, পৃষ্ঠা: ১৯৫
৬. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২২২
৭. আহমদ ছফা স্মারকগ্রন্থ, পৃষ্ঠা: ১৮৮
৮. আমার কথা কইবে পাখি, পৃষ্ঠা: ১১৬
পড়ুন ► প্রথম কাণ্ড ► দ্বিতীয় কাণ্ড ► তৃতীয় কাণ্ড || আসছে ► পঞ্চম কাণ্ড



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন