ধারাবাহিক উপন্যাস: পর্ব-৪ || ও আমার বন্ধু
ধারাবাহিক উপন্যাস: পর্ব-৪ || ও আমার বন্ধু
সেদিন ছিল সোমবার। ভোর থেকেই আকাশের মুখ ভার। সূর্যের দেখা নেই। সকালবেলা সবাই তাড়াহুড়ো করে সরিষার তেল মাখানো মুড়ি আর গরম চা খেয়ে নিল। পেট ভরে খাওয়ার সুযোগ কারও নেই। তবু কাজ তো থেমে থাকতে পারে না।
পরিমল ইঞ্জিনচালিত নৌকার ইঞ্জিন পরীক্ষা করে নিলেন। নিরুও নিজের নৌকার প্রস্তুতি শেষ করল। রশিদ আর রঞ্জন একটি সাধারণ নৌকা নিয়ে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
খবর এসেছে, পূবপাড়ায় এখনও বহু জন আটকে আছে। কেউ দোতলার ছাদে, কেউ টিনের চালে, কেউ গাছের মোটা ডালে। মসজিদের মিনার, মন্দিরের উঁচু কার্নিশ, স্কুলঘরের ছাদ, যেখানে একটু উঁচু জায়গা মিলেছে, সেখানেই প্রাণ বাঁচাতে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে সবাই।
পরিকল্পনা ঠিক হলো, নিরু আর পরিমল উত্তর দিক ধরে এগোবে। রশিদ আর রঞ্জন যাবে দক্ষিণে। উদ্ধারকাজ শেষ করে সবাই স্কুল আশ্রয়কেন্দ্রের সামনে মিলিত হবে। নৌকাগুলো ছাড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই আকাশ ফেটে পড়ল। মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। এমন বৃষ্টি যে দু-হাত দূরের মানুষও দেখা যায় না। বাতাসের ঝাপটায় ছাতাগুলো উল্টে যাচ্ছে। বৃষ্টির ফোঁটা যেন সূচের মতো গায়ে বিঁধছে।
পরিমল জীবনে এমন বৃষ্টি আর কখনও দেখেননি। ইঞ্জিনচালিত নৌকাটি এগিয়ে চলল উত্তাল পানির ওপর। ভেসে যাচ্ছে বাঁশঝাড়, কলাগাছ, গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, খুঁটি, টিনের চাল, ভাঙা আসবাব, এমনকি মৃত গবাদিপশুও। পানির রং কাদামাটির মতো। তার পচা গন্ধে ভারী চারপাশ।
কোনো বাড়ির চাল, কোনো গাছের ডাল কিংবা ভেসে থাকা ছাদের পাশ দিয়ে গেলেই পরিমল গলা ফাটিয়ে ডাক দিচ্ছিলেন—‘কেউ আছেন? কেউ আছেন?’
নিরুও একইভাবে ডাকছিল। কোথাও কোনো সাড়া নেই। কেউ বলছে না, ‘আমাদের বাঁচান!’
কেউ হাত নাড়ছে না, ‘একটু শুকনো খাবার দিন!’
কেউ বিশুদ্ধ পানির জন্য আকুতি জানাচ্ছে না। শুধু বৃষ্টির অবিরাম শব্দ, ইঞ্জিনের গর্জন আর ফুলে-ফেঁপে ওঠা বন্যার পানি। একসময় একটি বিশাল গাছের নিচ দিয়ে পরিমলের নৌকাটি এগিয়ে গেল। ঠিক তখন তার বাহুতে হিমশীতল কিছুর স্পর্শ লাগল...।
পরিমল ভাবলো, হয়তো গাছের ভেজা কোনো ডাল কিংবা লতা বাহুতে জড়িয়ে গেছে। কিন্তু স্পর্শটা অস্বাভাবিক ঠান্ডা। স্বভাবতই তিনি হাত বাড়িয়ে কী লেগেছে তা সরাতে গেলেন। আগুনের শিখা ফুটে উঠল তার বাহুতে। সুঁচের মতো ধারালো দুটি দংশন একসঙ্গে বিঁধে গেল চামড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে তীব্র জ্বালা হাত বেয়ে বুক, কাঁধ, আর মাথার দিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
পরিমল বুঝলেন, সাপ! তিনি আঁতকে উঠলেন। নিশ্চিত হলেন, গাছের ডালে আশ্রয় নেওয়া বিষধর সাপটি বৃষ্টির তোড়ে নেমে এসে তাকে ছোবল মেরেছে। তিনি দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। ডান হাতে বামবাহু চেপে ধরে চিৎকার করে উঠলেন—‘নিরু...! নিরু...!’
মুষলধারে বৃষ্টি, উত্তাল পানির শব্দ আর ইঞ্জিনের প্রচণ্ড আওয়াজে তার কণ্ঠস্বর নিজের নৌকার সীমানাও পেরোতে পারল না।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার শ্বাস ভারী হয়ে এল। চোখ ঝাপসা হয়ে যেতে লাগল। পা অবশ হয়ে আসছে। হাতের ভেতরটা ফুলে উঠছে। তিনি ইঞ্জিন বন্ধ করারও সুযোগ পেলেন না। দুলতে দুলতে একসময় ভারসাম্য হারিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকা থেকে সোজা বন্যার পানিতে পড়ে গেলেন।
একটি ভারী শব্দ শুনে নিরু চমকে পেছন ফিরে তাকাল। সে দেখল, পরিমলের নৌকাটি মানুষহীন অবস্থায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তার বুক ধক করে উঠল। আর দেরি না করে সে নিজের নৌকার মুখ ঘুরিয়ে সেদিকে ছুটে গেল।
বৃষ্টির ঝাপসা পর্দার মধ্যে কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। তবু অভিজ্ঞ চোখে সে ঢেউ লক্ষ্য করতে লাগল। হঠাৎই পানির নিচে ভেসে ওঠা হাত তার চোখে পড়ল।
—‘দাদা!’
চিৎকার করে উঠল নিরু।
সে ঝুঁকে পড়ে প্রাণপণে পরিমলকে টেনে তুলল। তখন পরিমলের শরীর প্রায় নিস্তেজ। ঠোঁট নীলচে হয়ে এসেছে। বামবাহুর পাশে দুটি ছোট দাগ।
এক ঝলক তাকিয়েই নিরু বুঝে গেল, এটি সাধারণ দুর্ঘটনা নয়। সাপের ছোবল। তার আর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সে তার ভেজা গামছা দিয়ে পরিমলের বাহু শক্ত করে বেঁধে দিল। কতটা বিষ ছড়িয়েছে, কতটা দেরি হয়েছে, এ বাঁধন কাজ দেবে কী না, এসব ভাববার সময় নেই নিরুর হাতে। সে পড়িমরি ইঞ্জিনচালিত নৌকাটির গতি বাড়িয়ে সোজা আশ্রয়কেন্দ্রের ঘাটের দিকে ছুটল।
ঘাটে পৌঁছেই নিরু প্রাণপণে চিৎকার শুরু করল—‘কেউ অছেন? কেউ আছেন? তাড়াতাড়ি আসেন! পরিমলদাকে সাপে কেটেছে!’
চারদিক থেকে ছুটে এল সবাই। কয়েকজন মিলে অচেতন পরিমলকে নৌকা থেকে নামিয়ে শুকনো জায়গায় শুইয়ে দিল। কেউ ছুটলো বিমল ঘোষ ও পরিবারকে খবর দিতে।
খবর পেয়ে বিমল ঘোষ, কাজলরেখা, সান্তানু প্রায় দৌড়ে এসে পৌঁছালো। পরিমলের ফুলে ওঠা হাত আর নিস্তেজ মুখের দিকে একবার তাকিয়েই কাজলরেখার বুক কেঁপে উঠল।
নিরুর চিৎকারে আশ্রয়কেন্দ্রে হুলস্থুল পড়ে গেল। যে যেখানে ছিল, ছুটে এল ঘাটের দিকে। চিকিৎসক ও স্বেচ্ছাসেবকেরা ছুটে এলেন। তাদের ভিড় ঠেলে অরুণিমাও সামনে এগিয়ে গেল। আহত মানুষটির মুখের দিকে একবার তাকিয়েই সে যেন পাথর হয়ে গেল।
—‘মেসো!’
শব্দটা অনিচ্ছায় বেরিয়ে এল তার মুখ থেকে।
কাজলরেখা চমকে মাথা তুলে তাকালেন—‘অরু! তুই এখানে?’
অরুণিমার চোখ ভিজে উঠল। কাঁপা গলায় বলল—‘মাসি...’
এরপরই তার চোখ পড়ল সান্তানুর দিকে। দুজনেই নির্বাক। কতদিন পর দেখা! অথচ এই দেখা হওয়ার জন্য কেউ কখনও প্রার্থনা করেনি। সান্তানুর ঠোঁট কেঁপে উঠল—‘অরুদি...’
এক পা এগোতেই কর্তব্যরত চিকিৎসকের গম্ভীর কণ্ঠ তাদের থামিয়ে দিল—‘আপনারা একটু সরে দাঁড়ান। রোগীর অবস্থা সংকটজনক।’
চিকিৎসক দ্রুত পরিমলের ক্ষত পরীক্ষা করলেন। নাড়ি দেখলেন। চোখের মণি পর্যবেক্ষণ করে গম্ভীর মুখে বললেন—‘সম্ভবত বিষধর সাপের ছোবল। এখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হলো। রোগীকে অবিলম্বে জেলা হাসপাতালে নিতে হবে। দেরি করা যাবে না।’
কথা শেষ হতেই সবাই নড়েচড়ে উঠল। বিমল ঘোষ আর দেরি করলেন না। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন—‘নৌকা প্রস্তুত করো। এখনই শহরের হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। যতক্ষণ শ্বাস আছে, ততক্ষণ আশা আছে।’
বৃষ্টি তখনও থামেনি। আকাশের বুক চিরে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠছিল, আর উত্তাল বন্যার পানি মানুষের সঙ্গে মৃত্যুর এক নির্মম প্রতিযোগিতায় নেমেছে। অরুণিমা দেরি করল না। ওষুধের ব্যাগ, স্যালাইনের বোতল আর জরুরি চিকিৎসার বাক্স হাতে তুলে নিল। চিকিৎসকের দিকে তাকিয়ে বলল—‘স্যার, আমি সঙ্গে যাব। পথে রোগীর যা দরকার হবে, আমি সাহায্য করতে পারব।’
চিকিৎসক সম্মতি জানালেন।
বাঁশ আর দড়ি দিয়ে বানানো অস্থায়ী স্ট্রেচারে সাবধানে পরিমলকে তোলা হলো। কাজলরেখা পরিমলের মাথার পাশে বসে পড়লেন। সান্তানু বাবার ডান হাতটি শক্ত করে নিজের হাতে ধরে রইল। অরুণিমা স্যালাইনের বোতল উঁচু করে পরিমলের পাশে বসে নাড়ি লক্ষ করতে লাগল। নিরু হাল ধরল, আর বিমল ঘোষ নৌকার সামনের দিকে দাঁড়িয়ে পথ দেখাতে লাগলেন। ইঞ্জিন গর্জে উঠল।
প্রবল বৃষ্টি আর উত্তাল স্রোত উপেক্ষা করে নৌকাটি শহরের দিকে ছুটে চলল। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। কোথায় রাস্তা, কোথায় ধানক্ষেত, কোথায় পুকুর, বোঝার উপায় নেই। ভাসতে ভাসতে আসছে গাছের গুঁড়ি, টিনের চাল, বাঁশের বেড়া, ভাঙা আসবাব। নিরুকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নৌকা চালাতে হচ্ছে।
হঠাৎ একটি ভেসে আসা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে ধাক্কা লেগে নৌকাটি প্রচণ্ড দুলে উঠল। কাজলরেখা চিৎকার করে পরিমলের শরীর আঁকড়ে ধরলেন। অরুণিমা দ্রুত এক হাতে স্যালাইন সামলে অন্য হাতে পরিমলের কাঁধ চেপে ধরল, যাতে তিনি স্ট্রেচার থেকে পড়ে না যান।
পরিমলের চোখ তখনও আধখোলা। ঠোঁট কাঁপছে। তিনি যেন কিছু বলতে চাইছেন। সান্তানু বাবার মুখের কাছে ঝুঁকে পড়ল।
—‘বাবা... কথা বলো না। আমরা হাসপাতালে পৌঁছে যাচ্ছি। তুমি ভালো হয়ে যাবে।’
পরিমল কিছু বলতে পারলেন না। শুধু কষ্টভরা ফ্যাকাশে চোখে একবার ছেলের দিকে তাকালেন। সেই দৃষ্টিতে ছিল অসীম স্নেহ, অজস্র না-বলা কথা, আর জীবনের সঙ্গে শেষ লড়াইয়ের ক্লান্তি।
নৌকার ভেতরে আর কোনো কথা হলো না। শুধু ইঞ্জিনের অবিরাম গর্জন, বৃষ্টির শব্দ আর প্রত্যেকের বুকের ভেতর একটাই প্রার্থনা—‘পরিমল যেন বেঁচে থাকেন।’
প্রায় দুই ঘণ্টার প্রাণান্তকর পথ পেরিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকাটি জেলা সদর হাসপাতালের ঘাটে ভিড়ল। ঘাটের সিঁড়ির অর্ধেকই তখন বন্যার পানির নিচে। হাসপাতালের সামনেও উপচে পড়া ভিড়। দুর্ঘটনায় আহত, পানিবন্দি অসুস্থ, সাপের ছোবলে আক্রান্ত, ডায়রিয়া ও জ্বরে কাতর অসংখ্য মানুষ চিকিৎসার অপেক্ষায়।
পরিমলকে দ্রুত স্ট্রেচারে তুলে জরুরি বিভাগের দিকে দৌড়ে গেল হাসপাতালের কর্মীরা। অরুণিমাও তাদের সঙ্গে ছুটল। যাওয়ার আগে সে সান্তানুর দিকে তাকিয়ে শুধু বলল—‘ভয় পাবি না। আমরা আছি।’
জরুরি বিভাগের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। বাইরে করিডোরে দাঁড়িয়ে রইলেন বিমল ঘোষ, কাজলরেখা, সান্তানু আর নিরু। সবার কাপড় ভিজে একাকার। কারও মুখে কোনো কথা নেই।
একজন নার্স বাইরে এসে বললেন—‘রোগীর স্বজন কে?’
বিমল ঘোষ এগিয়ে গেলেন—‘আমি। কিছু কী লাগবে?’
—‘দুই ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করতে হবে। রোগীর রক্তচাপ দ্রুত নেমে যাচ্ছে। আর অ্যান্টি-স্নেক ভেনম দেওয়া হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, শরীর কীভাবে সাড়া দেয়।’
বিমল ঘোষ দেরি করলেন না। নিরুকে সঙ্গে নিয়ে রক্তের ব্যবস্থা করতে ছুটলেন।
কাজলরেখা হাসপাতালের করিডোরের মেঝেতে বসে পড়লেন। দুই হাত জোড় করে বিড়বিড় করে প্রার্থনা করতে লাগলেন—‘হে ভগবান, আমার মানুষটাকে ফিরিয়ে দাও। আমার সিঁথির সিঁদুর অক্ষুন্ন রাখো। আর কিছু চাই না।’
সান্তানু দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখ স্থির দরজার দিকে। ভেতরে কী হচ্ছে, কিছুই জানা যাচ্ছে না। মনে পড়ছে সকালবেলার কথা। বাবা বের হওয়ার আগে বলেছিলেন—‘বিপদের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় কাজ।’
সান্তানুর বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল।
এমন সময় অরুণিমা দরজা ঠেলে বাইরে এল। তার মুখে ক্লান্তির ছাপ, কপালে ঘাম। সান্তানু ছুটে গিয়ে জিজ্ঞেস করল—‘অরুদি... বাবা কেমন আছে?’
অরুণিমা ক্ষণকাল চুপ করে থেকে বলল—‘ডাক্তাররা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। বিষ শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এখনও আশা ছাড়েননি।’
কাজলরেখা উঠে এসে অরুণিমার দুই হাত শক্ত করে ধরলেন।
—‘মা, ও বাঁচাবে তো?’
অরুণিমার গলাও কেঁপে উঠল।
—‘মাসি... এখন সবই ঈশ্বরের হাতে। তবে ডাক্তাররা একটুও থেমে নেই।’
সে সময় জরুরি বিভাগের ভেতর থেকে একজন চিকিৎসক দ্রুত বেরিয়ে এলেন। চারজনই একসঙ্গে তাঁর দিকে তাকাল। চিকিৎসক গম্ভীর মুখে বললেন,
—‘রোগীর অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক। আমরা আইসিইউতে স্থানান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আগামী কয়েক ঘণ্টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
কথাটা শুনে করিডোরজুড়ে নেমে এল স্তব্ধতা। কাঁচের দরজার ওপারে জীবন আর মৃত্যুর লড়াই চলছে। আর দরজার এপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো শুধু অপেক্ষা করতে পারছে। তাদের হাতে আর কিছুই নেই।
আইসিইউর লাল বাতিটি নিভে গেল। দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। তাঁর মুখে ক্লান্তি, চোখে-মুখে ব্যর্থতার ছাপ। করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই একসঙ্গে উঠে দাঁড়াল। কাজলরেখা ছুটে এসে কাঁপা গলায় বললেন—‘ডাক্তারবাবু... আমার মানুষটা কেমন আছে?’
চিকিৎসক নিচু স্বরে বললেন—‘আমরা শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেছি। আমরা তাকে আর ফিরিয়ে আনতে পারিনি। আমি দুঃখিত!’
পৃথিবীটা স্তব্ধ হয়ে গেল। কাজলরেখা কোনো শব্দ করলেন না। শুধু দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে মেঝেতে বসে পড়লেন।
সান্তানু স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে পানি নেই, মুখেও কোনো শব্দ নেই। সে এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না, কয়েক ঘণ্টা আগেও যে তাকে বলেছিলেন, ‘মানুষের পাশে থাকিস,’ তিনি আর নেই।
অরুণিমা এগিয়ে এসে মাসিকে জড়িয়ে ধরল। নিজের চোখের পানিও সে আর ধরে রাখতে পারল না।
বিমল ঘোষ দু'চোখ বন্ধ করে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। পরে বললেন—‘একজনকে বাঁচাতে পারলাম না...!’
সন্ধ্যার দিকে হাসপাতালের মর্গ থেকে পরিমলের মরদেহ বুঝে নিলেন বিমল ঘোষ। নতুন এক অসহায় বাস্তবতা সামনে এসে দাঁড়াল। চারদিকে বন্যার পানি। সড়ক নেই, যানবাহন নেই। তাদের গ্রামের শ্মশান সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। আশে-পাশের গ্রামের শ্মশানও পানির নিচে। কবরস্থান, খোলা মাঠ, উঁচু জমি, কোথাও মৃতদেহ সৎকার করার মতো এক চিলতে শুকনো মাটিও নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও জানাল, দীর্ঘ সময় মরদেহ সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। বিদ্যুত সংকট।
বিমল ঘোষ, নিরু, রশিদ, মেহেরাব, নন্দন, রঞ্জন সবাই মিলে চেষ্টা করলেন। প্রশাসনের সঙ্গেও যোগাযোগ হলো। কোথাও কোনো উপায় মিলল না। মাথা নিচু করে বসে রইলেন সবাই। হঠাৎ কাজলরেখা ভাঙা গলায় বললেন—‘ওকে আর কষ্ট দিও না। যে সারাজীবন অন্যের উপকার করেছে, ভগবান নিশ্চয়ই ওর পথ ঠিক করে রাখবেন।’
কথাটা শুনে কেউ আর আপত্তি করল না। বিমল ঘোষ কাগজ-কলম চাইলেন। কাঁপা হাতে তিনি একটি চিরকুট লিখলেন।
নাম: পরিমল ঘোষ
পিতা: হরিদাস ঘোষ
ঠিকানা: চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার এওঁচিয়া ইউনিয়নের দেওদীঘি বাজার সংলগ্ন পরিমল ঘোষের বাড়ি।
মোবাইল নম্বর: ০১৭২০৮৪১২…
বন্যার কারণে মরদেহের সৎকার করা সম্ভব হলো না। যে সহৃদয় ব্যক্তি এই মরদেহটি পাবেন, অনুগ্রহ করে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সৎকার করবেন। সম্ভব হলে উপরের মোবাইল নম্বরে বা ঠিকানায় যোগাযোগ করার জন্য বিনীত অনুরোধ রইল। আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে তার প্রতি শেষ সম্মান জানালে চির কৃতজ্ঞ থাকবো।
শেষ লাইনটি লিখতে গিয়ে বিমল ঘোষের হাত কেঁপে উঠল। কাগজটি প্লাস্টিকে মুড়ে পরিমলের বুকের কাছে শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হলো।
রাত তখন গভীর। বৃষ্টি থেমে গেছে। নদীর স্রোতের শব্দ এখনও ভয়ংকর। হাসপাতালের ঘাটে একটি ছোট নৌকার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সান্তানু। সে বাবার মুখের ওপর শেষবারের মতো হাত বুলিয়ে দিল। শৈশব থেকে যে হাত তাকে ধরে হাঁটতে শিখিয়েছে, সেই হাত আজ নিশ্চুপ, নিথর।
দাদার হাত শক্ত করে ধরে কান্না ভেজা চোখে তাকিয়ে আছে অপরাজিতা। রশিদ নন্দনদের সঙ্গে সেও এসেছিল বাবাকে দেখবার জন্য। শিশু মনটা অভিমানে ফেটে যাচ্ছে। সাদা কাপড়ে মোড়ানো বাবার দেহটা দেখে সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না, কেন বাবা তাকে আগের মতো কোলে তুলে নিচ্ছেন না। সে তো ভিজে একাকার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটু ভিজলেই তো বাবা এসে বকুনি দিয়ে বলতেন, ‘এভাবে বৃষ্টিতে ভিজতে হয়? চলো, ঘরে চলো।’ আজ বাবা চুপ করে আছেন। অপরাজিতার ছোট্ট মনে সেই নিঃশব্দতার কোনো অর্থ নেই। সে শুধু জানে, তার বাবা আর তাকে ডাকছেন না।
কাজলরেখা আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।
—‘ওগো... আমাকে একা রেখে কোথায় গেলে…’
তার ইনিয়ে-বিনিয়ে কান্নায় উপস্থিত প্রত্যেকের চোখ ভিজে উঠল। বিমল ঘোষ দুই হাত জোড় করে পরিমলের উদ্দেশে প্রণাম করলেন। নিরু, রশিদ, নন্দন, মেহেরাব, রঞ্জনও মাথা নত করল। অত্যন্ত গভীর শ্রদ্ধায়, তারা পরিমলের মরদেহটিকে একটি ভেলার ওপর তুলে দিল। একটি মোটা দড়ি খুলে দেওয়া হলো। স্রোত ভেলাটিকে দূরে নিয়ে যেতে লাগল। সান্তানু স্থির দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল। যতক্ষণ ভেলাটি চোখে দেখা গেল, ততক্ষণ সে একবারও চোখের পলক ফেলল না। অবশেষে অন্ধকার আর বন্যার পানি একসঙ্গে গ্রাস করল ভেলাটিকে। তখনি চিৎকার দিয়ে কাজলরেখা মূর্ছা গেল।
সেদিন সান্তানুর বাবাই ভেসে গেলেন না, ভেসে গেল তার শৈশব, তার নিশ্চিন্ত পৃথিবী, আর জীবনের ওপর শেষ অবলম্বনটুকুও।
চট্টগ্রাম, সাতকানিয়া উপজেলার এওঁচিয়া ইউনিয়নের দেওদীঘি বাজার সংলগ্ন সান্তানুর গ্রামের চারপাশে তখনও বন্যার ক্ষতচিহ্ন রয়ে গেছে। ধানখেত, দেওদীঘি জলাশয় আর কাদামাটিতে ভরা পথের কোথাও কোথাও পানি নেমে গেলেও রেখে গেছে আতঙ্ক। বন্যার পানি কমার পর বিভিন্ন স্থানে ভেসে ওঠে অজ্ঞাতপরিচয়ের অর্ধগলিত মরদেহ। পুলিশ জানায়, স্রোতে ভেসে আসা এসব মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে উপজেলার এওঁচিয়া ইউনিয়নের প্লাবিত এলাকায় উদ্ধার করা হয় এক অটোরিকশাচালকের মরদেহ। পরিমলের দেহ ভেবে ছুটে গেছেন কাজলরেখা। তার তো খোঁজ তখনও শেষ হয়নি। তিনি দিনের পর দিন এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ছুটে বেড়িয়েছেন। কাদামাটি, বন্যার পানি আর অনিশ্চয়তার ভেতর তন্নতন্ন করে খুঁজেছে স্বামীকে। শেষ পর্যন্ত খোঁজ মেলেনি। অপেক্ষা কখনো কখনো মৃত্যুর চেয়েও কঠিন হয়ে ওঠে।
কাজলরেখার শরীর আর চলতে চাইছে না। চোখের পানি শুকিয়ে গেছে, বুকের ভেতরের কান্নাটুকুও পাথর হয়ে গেছে। তবু তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, শুধু দুটি কচি মুখের দিকে তাকিয়ে। তার সন্তান দুটি মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা শুধু বোঝে, তাদের বাবা নেই। আর মায়ের চোখে যে অসীম শূন্যতা, তার কোনো ভাষা নেই।
ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই গ্রামের কয়েকজন বাবার শব দেহ খুঁজতে বের হয়েছিল। সান্তানুও মায়ের হাত ধরে ঘাটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মনে তখনও একটা বিশ্বাস ছিল। বাবার মরদেহ নিয়ে ভেসে যাওয়া ভেলা আবর ফিরে আসবে। মৃত্যু যে এত নিঠুর হতে পারে, এত সহজে একজন মানুষকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে পারে, সে কথা তার মন গ্রহণ করতে পারেনি।
বাবার নীল হয়ে যাওয়া দেহটা চোখে ভাসে। সেদিন সান্তানু দাঁড়িয়ে দেখেছিল। কীভাবে মানুষেরা একজনকে শেষ বিদায় দেয়। অথচ, তার ভেতরে তখনও একটা অবিশ্বাস ছিল। এটা কি সত্যিই বাবা?
এত বছর পরেও সান্তানুর মনে হয়, বাবা হয়তো কোথাও বেঁচে আছেন। হয়তো কোনো অচেনা গ্রামে। হয়তো স্মৃতি হারিয়ে। হয়তো নিজের নাম, নিজের বাড়ি, নিজের সন্তানদের কথা ভুলে। কেন এমন মনে হয়, সে নিজেও জানে না। যুক্তি দিয়ে সে জানে, বাবা আর নেই। সে জানে, ভেতরের বিশ্বাস যুক্তির চেয়েও পুরোনো হয়। কিছু অপেক্ষা মৃত্যুর পরও শেষ হয় না।
সান্তানু চুপচাপ শুয়ে ছিল। আজকের মতো সে রাতেও ঘুম তার চোখে আসেনি। সেই রাতের প্রতিটি শব্দ আজও তার মনে আছে। বৃষ্টির শব্দ। বাতাসের শব্দ। মায়ের দীর্ঘশ্বাস। আর সেই ঘাট... যে ঘাট দিয়ে বাবা ভেসে গেছেন। আর ফিরেননি।
বাবার চলে যাওয়ার পর তাদের সংসার হঠাৎ করেই বড় হয়ে গেল। মা কাজলরেখা কদিনেই বুড়িয়ে গেলেন। যে হাতে শুধু সংসারের কাজ ছিল, সেই হাতে তখন সংসারের ভারও এসে পড়ল। দুই ভাইবোনের পড়াশোনা। খাবারের চিন্তা। অসুখের চিন্তা। সমাজের নানা কথা। সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করতে করতে মা শক্ত হয়ে উঠলেন।
আর সান্তানু?
সে বুঝতেই পারল না কখন তার কৈশোর শেষ হয়ে গেল। যে ছেলে বৃষ্টিতে কাগজের নৌকা ভাসাত, সে একদিন বৃষ্টির আকাশ দেখে সংসারের হিসাব করতে শিখল। যে ছেলে বাবার আঙুল ধরে বাজারে যেত, সে একদিন মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে সবকিছু বুঝতে শুরু করল। ভেতরে কিছু পরিবর্তন শব্দ করে আসে না। কোনো ঘোষণা হয় না। শুধু একদিন হঠাৎ আগের মানুষটি আর নেই। সান্তানুর জীবনেও সেই পরিবর্তনের শুরু হয়েছিল সেই বর্ষার রাতে।
পড়ুন ► প্রথম পর্ব ► দ্বিতীয় পর্ব ► তৃতীয় পর্ব || আসছে ► পঞ্চম পর্ব



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন