ধারাবাহিক উপন্যাস: পর্ব-৫ || ও আমার বন্ধু
ধারাবাহিক উপন্যাস: পর্ব-৫ || ও আমার বন্ধু
রাতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল, সান্তানু নিজেও জানে না। বৃষ্টির শব্দ স্বপ্নের ভেতরেও তাকে অনুসরণ করেছিল। চোখ খুলতেই জানালার পর্দা ভেদ করে ধূসর আলো ঘরে ঢুকছে। বৃষ্টি থেমে গেলেও কার্নিশ থেকে টুপটাপ করে পানি পড়ছে।
বিছানার পাশে রাখা মোবাইল ফোনটা হাতে নিতেই সে চমকে গেল। উনিশটি মিসড কল। ভ্রু কুঁচকে একে একে নামগুলো দেখতে লাগল। বেশির ভাগ কলই অপরাজিতার। তবে তিনটি কল এসেছে পিপলের নম্বর থেকে। সান্তানুর বুকের ভেতর হালকা অস্বস্তি জেগে উঠল। কোনো বিপদ হলো নাকি?
সে প্রথমে অপরাজিতার নম্বরে কল দিল। ফোন রিং হতে হতে কেটে গেল। দুবার চেষ্টা করে পিপলের নম্বরটিতে কল করল। দুইবার রিং হতেই ওপাশ থেকে পিপলের কণ্ঠ ভেসে এল—‘হ্যালো... সান্তানু দাদা?’
সান্তানু সোজা হয়ে বসল।
—‘কী হয়েছে? কেমন আছো তোমরা?’
পিপল বলল—‘আপনাকে রাত থেকেই ফোন করেছি। ধরতে পারেননি।’
সান্তানুর গলায় ব্যাকুলতা নেমে এল—‘কী হয়েছে বল।’
—‘অপরাজিতা গতরাতে সিঁড়ি থেকে পড়ে গেছে। ডান পায়ে গুরুতর চোট লেগেছে। ডাক্তার বলেছেন, হাড় ভেঙেছে। এখন ক্লিনিকে ভর্তি আছে।’
সান্তানুর হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেল।
—‘কোন ক্লিনিকে?’
পিপল ক্লিনিকের নাম বলল—‘রাতে ও ব্যথায় চিৎকার করতে করতে বারবার বলছিল আপনাকে খবর দিতে। আপনি ফোন ধরছিলেন না। পরে ব্যথার ওষুধ দেওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়েছে।’
সান্তানু মনে মনে ভাবলো তার যতই ফোনে রিংটোন দেবার অভ্যাস না থাকুক, এবার থেকে সে ঘুমবার আগে রিংটোন দিয়ে ঘুমাবে। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার বুক থেকে।
—‘ও এখন কেমন আছে?’
—‘ডাক্তার বলছেন, আপাতত বিপদমুক্ত। আজ বিকেলের দিকে একবার পরীক্ষা করবেন।’
—‘আমি আসছি।’
বলে ফোন কেটে দিল সান্তানু।
ঘরটা আগের মতো হয়ে গেল। টেবিলের ওপর পুরোনো ছবিটা এখনও উল্টো করে রাখা। বর্তমান তাকে আরেকটি দায়িত্বের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। অপরাজিতা, ছোটবেলার সেই মেয়েটি, যে একদিন বাবার আঙুল ধরে বাজারে যেত, আজ নিজের জীবনের কঠিন সময় তাকে ডাকছে। সান্তানু বাইরে তাকাল। বাবার চলে যাওয়ার পর যে সম্পর্কগুলোকে আঁকড়ে ধরে সে বড় হয়েছিল, তাদের মধ্যে অপরাজিতা ছিল সবচেয়ে গভীর এক বন্ধন। সে দ্রুত মুখে পানি ছিটিয়ে আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আজকের দিনটি আর সাধারণ থাকবে না, তা সে বুঝতে পারছিল।
ক্লিনিকের করিডোরে হালকা ওষুধের গন্ধ। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ও বেড়েছে। কেউ রিপোর্ট হাতে দৌড়াচ্ছে, কেউ ডাক্তারের অপেক্ষায় বসে আছে। এই ব্যস্ততার মধ্যেও সান্তানুর কাছ থেকে পৃথিবীর সব শব্দ একটু দূরে সরে গেছে।
পিপল তাকে দেখে এগিয়ে এল।
—‘দাদা, এসেছেন?’
সান্তানু মাথা নাড়ল।
—‘কেমন আছে ও?’
—‘ব্যথার ওষুধ দিয়েছেন। এখন ঘুমাচ্ছে।’
পিপল কথাগুলো বললেও তার চোখে উদ্বেগ স্পষ্ট। নার্স এসে জানাল, একজন দেখা করতে পারেন।
সান্তানু পর্দা সরিয়ে কেবিনে ঢুকল। অপরাজিতা বিছানায় শুয়ে আছে। পায়ে ব্যান্ডেজ। মুখে ক্লান্তি, দাদাকে দেখেই তার চোখে ছোটবেলার সেই পরিচিত উজ্জ্বলতা ফিরে এল।
—‘তুই এলি?’
সান্তানু একটু রাগের ভান করে বলল—‘এতগুলো ফোন করলি, ধরতে পারিনি বলে এখন অভিযোগ করবি?’
অপরাজিতা হাসল।
—‘তুই বদলালি না। ছোটবেলায়ও এমন ছিলি। আগে দোষ করতি, পরে রাগ দেখাতি ।’
সান্তানু চেয়ার টেনে পাশে বসল।
—‘ব্যথা করছে?’
—‘করছে। তবে তার চেয়েও বেশি ব্যথা করছে তোর মুখটা দেখে।’
সান্তানু অবাক হয়ে তাকাল।
—‘আমার মুখে কী দেখলি?’
অপরাজিতা চুপ করে রইল।
—‘দেখলাম, তুই এখনও সবকিছু একা বহন করার চেষ্টা করিস।’
কথাটা শুনে সান্তানু কিছু বলল না। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
অপরাজিতা বলল—‘মনে আছে দাদা, বাবা মারা যাওয়ার পর তুই কত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গিয়েছিলি?’
সান্তানু হাসল।
—‘আমি বড় হয়েছিলাম নাকি? তুই তো তখনই সব বুঝে গিয়েছিলি।’
—‘না। আমরা কেউই বুঝিনি। শুধু পরিস্থিতি আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিল।’
অপরাজিতা শূন্য দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইল।
—‘বাবা চলে যাওয়ার পর মা কত রাত না খেয়ে থেকেছে, মনে আছে?’
সান্তানুর চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই দিনগুলো। ছোট্ট ঘর। মায়ের শব্দহীন কান্না।
ভাঙা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজন।
অপরাজিতা বলল—‘তুই নিজের জন্য কখনও কিছু চাইতিস না। স্কুলে যাওয়ার আগে দোকানে বসতি। পরে পড়তি। রাতে কুপির আলোয় লিখতি। আমি ভাবতাম, তুই বুঝি কখনও ক্লান্ত হোস না।’
সান্তানু নিচু গলায় বলল—‘হতাম। শুধু দেখাতাম না।’
অপরাজিতার চোখ ভিজে উঠল।
—‘আমি জানি।’
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল। এই শান্ত থাকা অস্বস্তির ছিল না। এটা এমন ছিল, যেখানে কথা বলার প্রয়োজন হয় না।
অপরাজিতা বলল—‘দাদা, মানুষ ভাবে গরিব হলে শুধু অভাব থাকে। আসলে অভাবের সঙ্গে আরেকটা জিনিস থাকে।’
—‘কী?’
—‘সবসময় নিজেকে ছোট মনে করার একটা চাপ।’
সান্তানু বোনের দিকে তাকাল। অপরাজিতা বলল—‘তুই আমাদের সেটা হতে দিসনি। তুই সবসময় বলতি, মানুষের মূল্য তার পকেটে না, তার ভেতরে।’
সান্তানু হালকা হেসে বলল—‘এখনও বিশ্বাস করি।’
অপরাজিতা তাকিয়ে রইল।
—‘তাহলে নিজের ক্ষেত্রেও বিশ্বাস করিস?’
প্রশ্নটার উত্তর সান্তানু দিল না। কিছু প্রশ্নের উত্তর জানে যদিও, তবু প্রকাশ করতে হয় না।
দরজার বাইরে পিপলের পায়ের শব্দ শোনা গেল। অপরাজিতা চোখ বন্ধ করে বলল,
—‘দাদা, একটা কথা বলব?’
—‘বল।’
—‘যত ব্যস্তই থাকিস, যত দূরেই থাকিস, মাঝে মাঝে ফিরে আসিস আমার কাছে।’
সান্তানু তার হাতের ওপর হাত রাখল।
—‘আসব।’
এই একটি শব্দের মধ্যেই তাদের বহু বছরের দূরত্ব, অভাব, কষ্ট আর ভালোবাসা একসঙ্গে মিশে গেল। দরজার বাইরে পিপলের পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল। ঘরে শুধু ফ্যানের ঘূর্ণন আর দুজনের শ্বাসের শব্দ। অপরাজিতা চোখ খুলল। চোখদুটো ক্লান্ত, তবু ভেতরে বহুবছরের জমে থাকা একটি প্রশ্ন।
—‘দাদা... তুই কি কখনও আমাকে ক্ষমা করতে পারবি?’
সান্তানু চমকে তাকাল।
—‘কেন?’
অপরাজিতার সব কথা ঠোঁট পর্যন্ত এসে থেমে গেছে। বলতে চেয়েছিল, ‘তোর কথা শুনিনি। তোর স্বপ্ন ভেঙে নিজের মতো করে জীবন বেছে নিয়েছিলাম।’ কিছুই বলল না। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল বহুবছরের পুরোনো সেই দুপুর। মা সেদিন প্রথম খেয়াল করেছিলেন। সিঁথির গোড়ায়, চুলের আড়ালে লুকিয়ে থাকা একফোঁটা সিঁদুর। প্রথমে অবিশ্বাস। তারপর প্রশ্ন। তারপর রাগ। ছোট্ট উঠোনটা আদালত হয়ে উঠেছিল।
মা কাঁপা গলায় বলেছিলেন—‘এ কী করেছিস তুই?’
মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল অপরাজিতা। কোনো উত্তর নেই। মা দুই কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে বলেছিলেন—‘বল।’
সময় নিয়ে অপরাজিতা বলেছিল—‘আমি পিপলকে বিয়ে করেছি।’
ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরক্ষণেই বিস্ফোরণ। রাগে, অপমানে, অসহায়তায় মা কেঁপে উঠেছিলেন।
—‘যে ছেলেটার নিজেরই কোনো ঠিকানা নেই, তার হাতে নিজের জীবন তুলে দিলি?’
অপরাজিতা সেদিনও পিছিয়ে যায়নি। তার গলায় ভয় ছিল, সিদ্ধান্তে ছিল না।
—‘আমি ওকে ভালোবাসি।’
মা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন।
—‘ভালোবাসা দিয়ে সংসার চলে?’
অপরাজিতা শান্ত গলায় বলেছিল,
—‘সব সংসার কি শুধু টাকায় চলে?’
মা আর নিজেকে সামলাতে পারেননি। রাগে, কান্নায়, অপমানে কাঁপতে কাঁপতে বলেছিলেন,—‘তোর দাদা নিজের সব শখ-আহ্লাদ ছেড়ে তোকে পড়াচ্ছে। তুই ডাক্তার হবি, এই স্বপ্ন সে নিজের জীবনটাই থামিয়ে দিয়েছে।’
অপরাজিতা প্রথমবার চোখ তুলে তাকিয়েছিল।
—‘দাদার স্বপ্নের চেয়ে কী আমার স্বপ্ন ছোট?’
মা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। অপরাজিতা বলেছিল—‘আমার জন্য স্বপ্ন দেখতে আমি তো কাউকে বলিনি।’
ঠিক সেই সময় দুপুরে খেতে বাড়ি ফিরেছিল সান্তানু। উঠোনের কোণে কাঁঠালগাছের পাশে দাঁড়িয়েই সব শুনেছিল। সে এগোতে পারেনি। কাকে সমর্থন করবে? মাকে? নাকি বোনকে? দুজনেই নিজের জায়গা থেকে সত্যি বলছে। তবু সেই সত্যিগুলো একে অপরের পাশে দাঁড়াতে পারছে না। মা শেষবারের মতো বলেছিলেন—‘পড়াশোনা ছাড়া মুক্তি নেই, মনে রাখিস।’
অপরাজিতা উত্তর দিয়েছিল—‘আমার মুক্তির পথটা হয়তো অন্য।’
সেদিন সান্তানু কিছুই বলেনি। কখনও কথা না বলে সবচেয়ে বড় পরাজয় মেনে নেয় কেউ। কয়েক দিন পর অপরাজিতা পিপলের সঙ্গে চলে গেল। দীর্ঘদিন কোন খোঁজ-খবর নেই। মা প্রকাশ্যে কখনও মেয়ের কথা বলতেন না। সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালানোর সময়, কিংবা দুর্গাপূজার অঞ্জলির সকালে, সান্তানু বহুবার দেখেছে, মা চুপচাপ উঠোনের ফটকের দিকে তাকিয়ে আছেন। যেন মনে মনে ভাবছেন, আজ যদি মেয়েটা একবার ফিরে আসত... স্মৃতি মিলিয়ে গেল।
কেবিনের সাদা দেয়াল, স্যালাইনের ফোঁটা ভেদ করে সময় স্থির। দুপুরের আলো স্পষ্ট হয়ে উঠল। অপরাজিতা বলল—‘সত্যি দাদা, তোর কিছুই মনে নেই?’
সান্তানু হাসল।
—‘সব মনে আছে। কিছু স্মৃতি ভোলা যায় না, শুধু উচ্চারণ করি না আমরা।’
অপরাজিতা চোখ কেঁপে উঠলো। সে বলল—‘তুই সেদিন খুব রাগ করেছিলি, তাই না?’
সান্তানু মাথা নাড়ল।
—‘রাগ করিনি। ভয় পেয়েছিলাম।’
—‘কিসের ভয়?’
—‘যে পথটা তুই বেছে নিয়েছিলি, সেখানে তুই কষ্ট পাবি।’
অপরাজিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—‘কষ্ট তো পেয়েছি। কিন্তু সিদ্ধান্তটা আমারই ছিল।’
অপরাজিতা নিচু গলায় বলল—‘বাবা চলে যাওয়ার পর দেখেছি, তুই নিজের জীবনটা থামিয়ে দিয়েছিলি। নিজের জন্য কিছু ভাবিসনি। সব সময় আমাদের কথাই ভেবেছিস। আমি চাইনি, আমার জন্য তোর কাঁধে আরও একটা বোঝা চাপুক।’
সান্তানু বলল—‘তুই কি নিজেকে বোঝা ভাবতিস?’
অপরাজিতা উত্তর দিল না। চোখের কোণে জমে থাকা পানিই উত্তর হয়ে রইল।
—‘সব মেয়ের জীবন একরকম হয় না, দাদা। কেউ স্বপ্ন বেছে নেয়, কেউ নিরাপত্তা। তখন আমি দ্বিতীয়টাকেই বেছে নিচ্ছি।’
সান্তানু দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থেকে খুব আস্তে বলল—‘একবার যদি বলতিস...’
অপরাজিতা মাথা নাড়ল।
—‘বললে তুই মানতি না।’
—‘হয়তো মানতাম না। তোকে একা যেতে দিতাম না।’
অপরাজিতা এবার দাদার দিকে তাকাল।
—‘আমরা কেউ কাউকে কষ্ট দিতে চাইনি। তাই নিজের সত্যিটাও পুরো বলতে পারিনি।’
কেবিনের বাইরে চলাফেরার শব্দ ভেসে আসছে। জীবন তার নিজের গতিতেই এগিয়ে চলেছে। অপরাজিতা আস্তে বলল—‘দাদা... এখনও আমার ওপর রাগ আছে?’
সান্তানু বোনের হাতটা আলতো করে চেপে ধরল।
—‘রাগ ছিল। এখন শুধু আফসোস আছে।’
—‘কিসের?’
—‘যে আমরা এতগুলো বছর নষ্ট করে ফেললাম।’
অপরাজিতার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। সান্তানু অন্য হাত দিয়ে সেই পানি মুছে দিল। কোনো বড় ক্ষমা চাওয়া হলো না। কোনো নাটকীয় প্রতিশ্রুতিও না। তবু দুজনেই বুঝল, দীর্ঘদিনের অভিমানটা সাদামাটাভাবে গলে যাচ্ছে।
দরজায় হালকা শব্দ হলো। সাদা পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকল অর্ণব, বিষ্ণু আর মুস্তাফিজ। তিনজনের হাতেই ফুল আর ফলের ঝুড়ি। অপরাজিতা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বসল।
সান্তানু হেসে বলল—‘ওরা আমার বন্ধু।’
গল্পগুজব চলল। হাসপাতালের গুমোট পরিবেশটাও একটু হালকা হয়ে উঠল। একসময় সবাই বিদায় নিল।
পড়ুন ► প্রথম পর্ব ► দ্বিতীয় পর্ব ► তৃতীয় পর্ব ► চতুর্থ পর্ব || আসছে ► ষষ্ঠ পর্ব



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন