ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব–৭ || ও আমার বন্ধু

অ+ অ-

 

ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব–৭ || ও আমার বন্ধু

আনন্দের মৃত্যুর পর কয়েক দিন কেটে গেছে। শোকের তীব্রতা নীরবতায় পরিণত হয়েছে। জীবন এমনই, সবচেয়ে বড় আঘাতের মধ্যেও একসময় তাকে দৈনন্দিনতার কাছে ফিরে যেতে হয়।

সেইদিন আনন্দের বাড়িতে পিপলকে দেখে সান্তানুর অন্যরকম লেগেছিল। সময় মানুষকে বদলে দেয়। ছেলেবেলার আবেগী, অস্থির স্বভাবটা তার মধ্যে আর আগের মতো নেই। এখন সে স্থির।

পিপল এখন ছোট একটা ব্যবসা চালায়। পাইপ ফিটিংসের ব্যবসা। নিজের পরিশ্রমে সংসারকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সান্তানু স্বীকার করে, মানুষকে খুব দ্রুত বিচার করতে নেই। দূর থেকে দেখা আর কাছ থেকে জানার মধ্যে পার্থক্য থাকে। সময় যেমন পরিস্থিতি বদলে দেয়, তেমনি সময়ই সত্যিকে নতুন করে চিনতে শেখায়।

সান্তানু খবরের কাগজটা ভাঁজ করে টেবিলের এক পাশে রেখে দিল। ঘরের চারদিকে তাকাল। তার লেখার ঘরটা একসঙ্গে অনেক জগতের বাসস্থান। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে চিকিৎসাবিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান ও জীববিদ্যার নানা বই। মেঝের এক পাশে স্তুপ হয়ে আছে পুরোনো সংবাদপত্র, সাহিত্যপত্রিকা আর নোটবই। একটি ডিভান সোফা রাখা আছে এখানে। ক্লান্ত লাগলে যেন শরীর এলিয়ে দেয়া যায়। তার ওপরও পড়ে আছে কয়েকটি খোলা বই, যেগুলোর পাতায় তার আঙুলের দাগ লেগে আছে।

বইগুলোর মধ্যে রয়েছে হিপোক্রেটিসের চিকিৎসা ভাবনা নিয়ে লেখা গ্রন্থ, চার্লস ডারউইনের ‘অন দ্য অরিজিন অব স্পিসিস’, স্টিফেন হকিংয়ের ‘অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম’, বার্ট্রান্ড রাসেলের ‘দ্য প্রবলেমস অব ফিলসফি’। ইতিহাসের এডওয়ার্ড গিবনের ‘দ্য হিস্ট্রি অব দ্য ডিক্লাইন অ্যান্ড ফল অব দ্য রোমান এম্পায়ার’, ইউভাল নোয়া হারারির ‘স্যাপিয়েন্স’।

সব বই একসঙ্গে পড়ে না সান্তানু। একটি বই পড়তে পড়তে যখন বিষয়টি কিছুটা একঘেয়ে লাগে, তখন অন্য কোনো বই তুলে নেয়। কখনো বিজ্ঞান, কখনো ইতিহাস, কখনো দর্শন, কখনো সাহিত্য।

বাংলা সাহিত্যের তাকে পাশাপাশি রাখা আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বেগম রোকেয়া, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা ভট্টাচার্য, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদারসহ বহু লেখকের বই। পাশেই বিদেশি সাহিত্যের সারিতে রয়েছে শেক্সপিয়র, জুল ভার্ন, হোমার, ম্যাক্সিম গোর্কি, ফিওদর দস্তয়েভস্কি, লিও টলস্টয়, আলবেয়ার কামু, উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ, ওমর খৈয়াম, পাবলো নেরুদা, টি. এস. এলিয়টসহ আরও অনেকের রচনা।

যুক্তিবিদ্যার কয়েকটি বইয়ের পাশে পড়ে আছে মানুষের মন, সমাজ ও সভ্যতা নিয়ে লেখা নানা গ্রন্থ। আছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, সাহিত্যপত্র ও লিটল ম্যাগাজিন। সব মিলিয়ে তার সংগ্রহে বইয়ের যেন শেষ নেই।

তবু সান্তানুর মনে হয়, তার জানা এখনও অসম্পূর্ণ। প্রায়ই অস্থির হয়, আরও পড়া দরকার, আরও জানা দরকার ভেবে। তখন সে শহরের বিভিন্ন লাইব্রেরিতে ছুটে যায়। তার কাছে বই তথ্যের ভাণ্ডার ও চিন্তা, অনুভূতি, অস্তিত্বকে বোঝার একটি পথ। নতুন লেখক হোক বা পুরোনো, ভালো কিছু পেলেই সে মুগ্ধ হয়ে পড়ে।

সে মেঝেতে রাখা বইগুলোর স্তূপের কাছে গেল। একটু খুঁজে পুরোনো মলাটের বইটি তুলে নিল। হোমারের ‘ওডিসি’। বইটির প্রচ্ছদে হাত বুলিয়ে দিল। এই বইটি সে আগেও বহুবার পড়েছে। প্রতিবারের মতোই মনে হয়, পাতাগুলোর ভেতরে নতুন কোনো অর্থ লুকিয়ে আছে। চেয়ারে বসে পাতা খুলল।

ওডিসিউসের দীর্ঘ যাত্রার গল্পে বরাবরের মতো ডুবে যায়। জীবনও যেন একেকটি দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা, যেখানে হারিয়ে যাওয়া, অপেক্ষা, সংগ্রাম আর ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা একে অপরের সঙ্গে মিশে থাকে।

 

কাচ ছুঁয়ে ঘরের ভেতর ঢুকছে রোদ। ওডিসি বন্ধ করে টেবিলের ওপর রাখতেই মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল মুস্তাফিজ।

—‘হ্যালো?’

ওপাশ থেকে পরিচিত হাসির শব্দ।

—‘মহাশয় লেখক, পৃথিবীতে ফিরেছিস নাকি এখনও বইয়ের সঙ্গে?’

সান্তানু বলল—‘ফিরেছি মাত্র। বল, কী খবর?’

—‘কী পড়ছিলি আগে বল?’

—‘এই তো, এখন ওডিসি পড়ছিলাম। কেন বল তো?’

—‘ওডিসিউসের সঙ্গে সমুদ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছিস? শোন জানতে চাওয়ার কারণ হলো, লেখকদের কাছে তার লেখা সন্তান সমতুল্য। ঠিক কিনা বল?’

—‘অবশ্যই ঠিক।’

—‘সন্তান জন্মের আগে একজন মা যেমন নিজের শরীর-মনকে প্রস্তুত রাখে, লেখকেরও তেমনই নিজের ভেতরটা প্রস্তুত করতে হয়। কী পড়ছে, কী দেখছে, কী ভাবছে, সেটাও তো গুরুত্বপূর্ণ।’ 

—‘ওরে বাপরে, তুই পারিসও বটে। কোথা থেকে কী যে মেলাস। তোর খবর বল, কেমন আছিস্? কী করছিস?’

—‘খবর খুব ভালো না। বইমেলা তোর জন্য অপেক্ষা করবে না। নতুন উপন্যাসের পাণ্ডুলিপিটা কবে দিবি?’

—‘আরও একটু সময় লাগবে।’

—‘এই “আরও একটু” বলতে বলতে তিন মাস পার হয়ে গেল। আজ বিকেলে একবার অফিসে আয়। কথা আছে।’

—‘আচ্ছা, আসবো।’

বিকেলে সান্তানু পৌঁছাল মুস্তাফিজের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে। ছোট্ট অফিস। চারদিকে বইয়ের তাক। কোথাও নতুন বইয়ের গন্ধ, কোথাও ছাপাখানার কালির গন্ধ। রুমটা অর্ধেকে কাঁচ দিয়ে পাটিশন। কাঁচের ওপাশে কর্মচারীরা পাণ্ডুলিপি কম্পোজের কাজ করছে। তার এক কর্নারে কার্টনে ভরে রাখা সদ্য ছাপা বই।

মুস্তাফিজ তখন ফোনে ব্যস্ত।

—‘জি স্যার, আগের হিসাবে আর সম্ভব না।’

মুস্তাফিজ কথা বলছে না। ওপাশের কথা মন দিয়ে শুনছে। কথা না বললেও ডান হাতে টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের পেপারওয়েটটা ক্রমাগত ডানে-বামে ঘুরিয়ে চলেছে।

সান্তানু এই অভ্যাসটা খুব ভালো করেই চেনে। বহু বছরের বন্ধুত্বে সে বুঝে গেছে, মুস্তাফিজ যখন কোনো মালদার লেখকের সঙ্গে দর-কষাকষি করে, তখন অজান্তেই পেপার ওয়েটটা ঘোরাতে থাকে। যেন হিসাবটা শুধু কাগজে নয়, মাথার ভেতরেও চলছে।

হঠাৎ পেপারওয়েটের ঘূর্ণন থেমে গেল। মুস্তাফিজ গলা নিচু করে শান্ত অথচ গম্ভীর স্বরে বলল—‘দেখুন, কাগজের দাম আগের জায়গায় নেই। মুদ্রণ খরচ বেড়েছে, বাঁধাই, ল্যামিনেশন, ডিজাইন... সবকিছুরই ব্যয় বেড়েছে। কর্মচারীদের বেতনও বাড়াতে হয়েছে। এই অবস্থায় আগের হিসাব রাখা সত্যিই সম্ভব নয়।’

ওপাশের কথাগুলো মন দিয়ে শুনল। ঠোঁটের কোণে পেশাদার হাসি টেনে বলল—‘না স্যার, আমি আপনাকে অযথা বেশি বলছি না। আপনি চাইলে অন্য প্রকাশনীর সঙ্গেও কথা বলে দেখতে পারেন।’

মুস্তাফিজ একেবারেই চুপ। তারপর বলল—‘না স্যার, এর কমে করলে আমারই লোকসান হবে।’

ফোন রেখে মুস্তাফিজ সান্তানুকে দেখে হাসল।

—‘বস। পাঁচ মিনিট দোস্ত।’

ঠিক তখনই মাঝবয়সি এক ভদ্রলোক ভেতরে ঢুকলেন। হাতে মোটা একটি ফাইল।

—‘ভাই, আমার এই কবিতার বইটা প্রকাশ করতে চাই।’

মুস্তাফিজ ফাইলটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—‘সফটকপি এনেছেন?’

ভদ্রলোক একটু ইতস্তত করে বললেন—‘না, শুধু প্রিন্ট কপি এনেছি। এতে কোনো সমস্যা হবে?’

মুস্তাফিজ ফাইলটা উল্টেপাল্টে দেখে বলল—‘সমস্যা হবে না। তবে পুরোটা আবার কম্পোজ করতে হবে। সেক্ষেত্রে খরচটা বাড়বে।’

ভদ্রলোক চেয়ার টেনে বসলেন।

—‘তা বাড়ুক। বইটা যেন জমকালো হয়। হার্ডকভার চাই। কাগজও ভালো মানের হতে হবে।’

—‘অবশ্যই।’

—‘আর একটা কথা।’

—‘কী কথা?’

লোকটা ইতস্তত করে বলল—‘প্রকাশনা উৎসবটাও একটু বড় করে করতে চাই। কয়েকজন নামী মানুষকে আনবো ভেবেছি। আপনি কি হেল্প করতে পারবেন?’

মুস্তাফিজ আরেকবার খুব ভালো করে লোকটিকে পর্যবেক্ষণ করলো। সে জানে, লেখালেখির দিক থেকে বইটিতে আসলে কিছুই নেই। পোশাকে চকচকে হতে হবে। লেখক হিসেবে পরিচিত হওয়ার ধান্ধা। সাজুক যে যা ইচ্ছে, তাতে তার কী। সে বই ছাপবে, টাকা পাবে। এখানে ব্যবসা করতে এসে ন্যাকামো করলে তো চলবে না।

মুস্তাফিজ কিছু বলছেনা বলে লোকটি তাড়া দিল—‘ভাই, কিছু বলছেন না যে?’

মুস্তাফিজ অভ্যাসের হাসি মুখে রেখে বলল—‘সেটাও ব্যবস্থা করা যাবে।’

কম্পিউটারে হিসাব করে একটা কাগজ এগিয়ে দিল।

ভদ্রলোক অঙ্কটা দেখে ভ্রু কুঁচকালেন।

—‘এত!’

মুস্তাফিজ শান্ত গলায় বলল—‘আপনি তো জানেনই, এখন কাগজ, ছাপা, বাঁধাই, পরিবহন... সবকিছুর খরচ বেড়েছে।’

দরদাম চলল কিছু সময়। শেষ পর্যন্ত ভদ্রলোক বললেন—‘ঠিক আছে। কাজটা সুন্দর হলেই হলো।’ চেক লিখে মুস্তাফিজের হাতে দিয়ে তিনি বিদায় নিলেন।

মুস্তাফিজ ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দিল। বলল—‘তোকে যে কারণে ডেকেছি, বলতেই পারছি না। আমি দেখেছি তোর সাথে ভিড়ের একটা সম্পর্ক আছে। আচ্ছা চা শেষ কর, আরাম করে কথা বলব।’

সান্তানু সামনের তাক থেকে একটা বই নামিয়ে গভীর মনোযোগে পড়ছিল এতক্ষণ। মুস্তাফিজের অফিসে এলে সান্তানুর সময় কাটাতে কোনো অসুবিধা হয় না। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা বইয়ের ভিড়ে সে খুব সহজেই নিজের একটি আলাদা জগৎ খুঁজে নেয়। বই হাতে নিলে তাকে ডেকে কথা বলাও প্রায় বৃথা। সে চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলল—‘চা খেতে খেতেই শুনি বল।’

সে সময় দরজা ঠেলে আরেকজন ভদ্রলোক ভেতরে ঢুকলেন। ঢুকেই বললেন—‘মুস্তাফিজ ভাই, আপনার সঙ্গে একটু জরুরি কথা ছিল...’

মুস্তাফিজ সান্তানুর দিকে একবার তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল—‘বলুন।’

ভদ্রলোক বলল—‘না, মানে আলাদা করে।’

মুস্তাফিজ মৃদু হেসে বলল—‘ওনার সামনেই বলুন। কোনো অসুবিধা নেই।’

ভদ্রলোক একটু ইতস্তত করে চেয়ারে বসলেন।

—‘আমার বইটা বের করবেন করবেন করছেন, দেরি কেন? আমি তো আরেকটি বই লিখে ফেলিছি।’

—‘তাতে কী হয়েছে সাহেব। আমি আছিতো। টেনশন নিচ্ছেন কেন? ছাপিয়ে দেবো।’

ভদ্রলোক আমতা আমতা করে বলল—‘আগেরটাই বেরুলো না।’

—‘আরে, বেরুবে বেরুবে। ওই দেখুন, ওই নীল টি শার্ট পরা ছেলেটা। কতো মনোযোগ দিয়ে আপনার বইটি কারেকশন করছে। আমি গত সপ্তাহে সম্পাদনা শেষে ওকে কাজটা দিয়েছি। ও শেষ করলেই ছাপাখানায়...’

ভদ্রলোক নীল টিশার্ট পরা ছেলেটির দিকে চেয়ে বলল—‘না মানে প্রায় সাত মাস হয়ে গেল তো।’

মুস্তাফিজ চতুর বণিকের মতোই ক্লায়েন্টের মন পড়তে জানে। সে বলল—‘সত্যি কথা হলো, আপনি একটি নির্ভুল বই চেয়েছেন। যা সচরাচর লেখকরা বলে না। আমি আপনার কথায় সন্তুষ্ট হয়েছি। তাই রাতের পর রাত জেগে নিখুঁত ভাবে বারংবার পড়েছি এডিট করেছি। এই জন্যই যা দেরি হয়েছে তার জন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।’

ভদ্রলোক তাৎক্ষণিক বলল—‘ছি! ছি! কী যে বলেন। আমরা টাকা দিয়ে টেনশনে পড়ে যাই। আসলে আপনারা আপনাদের দায়িত্ব ঠিক ভাবেই করছেন। ভুল আমারই।’

মুস্তাফিজ ভেতরে হাসি চেপে রেখে ভাবে, লেখককে মুরগি বানানোর ফন্দিটা ভালোই। তবে এবার আর দেরি করা যাবে না। অখাদ্য এ বইটিকে সূর্যের আলো দেখাতেই হবে। পৃথিবীর সব ভালোর শুশ্রূষা করার দায়িত্ব তো আমার না। মুস্তাফিজের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে ভদ্রলোক বললেন—‘ভাই আমি বলি কী আপনি বইটির প্রচার-প্রচারণার ও দায়িত্ব নিন। টাকা নিয়ে ভাববেন না।’

চিন্তিত মুখে মুস্তাফিজ বলল—‘ওকে আপনি যখন বলছেন।’

—‘আরেকটা কথা, বইমেলায় চোখে পড়ার মতো জায়গায় রাখবেন। আমি আমার বস এবং সহকর্মী, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আসবো। অন্তত তিন চারশো বই বিক্রি করে দেবো। তবে বই চোখে পড়ার মতো জায়গায় না থাকলে আমার সম্মান থাকবে না। আমার সম্মানের দিকটা দেখবেন, প্লিজ।’ 

মুস্তাফিজ আশ্বস্ত করে বলল—‘দেখবো অবশ্যই।’ 

ভদ্রলোক বলল—‘আর…’

মুস্তাফিজ হতাশ গলায় বলল—‘আর?’’ 

—‘যদি একটু ব্যবস্থা করা যায়, প্রথম সংস্করণ শেষ হওয়ার আগেই দ্বিতীয় সংস্করণের খবর বের হলে পাঠকদের আগ্রহও বাড়ে। মানে এটি যদি করেন...’

মুস্তাফিজের মুখে আগের মতোই ভদ্র হাসি।

—‘দেখুন, বইয়ের প্রচারের জন্য আমাদের কিছু পরিকল্পনা আছে। বাকিটা সময় বুঝে দেখা যাবে।’

ভদ্রলোক আশ্বস্ত হওয়ার ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন।

—‘আমি খরচের ব্যাপারে কার্পণ্য করব না। বইটা যেন সবাই চেনে, সেটাই চাই।’

—‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন’, সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল মুস্তাফিজ। কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে স্বাক্ষর করে ভদ্রলোক বিদায় নিলেন।

দেয়ালে ঘড়ির টিকটিক শব্দ আর সান্তানুর হাতে ধরা বইটির পাতাগুলো উল্টানোর আওয়াজ ছাড়া অফিসে আর কোন শব্দ নেই। সান্তানু ভাবছিল একজন প্রকাশককে কত ঝক্কি সামলাতে হয়। মুস্তাফিজ নিজের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইল।

সান্তানু বলল—‘ওদের বইগুলো পড়েছিস?’

মুস্তাফিজ হালকা হেসে উত্তর দিল—‘সব বই পড়লে প্রকাশনী চালানো যেত না।’

খুব নিচু গলায় মুস্তাফিজ বলল—‘জানিস, ওরা বই ছাপাতে আসে না। আসে নিজের নামটা মলাটে দেখতে। কেউ কবি হতে চায়, কেউ গবেষক, কেউ প্রাবন্ধিক। কেউ কেউ বইয়ের চেয়ে ছবিটা বড় করে ছাপাতে বেশি আগ্রহী।’

সান্তানু কোনো উত্তর দিল না। মুস্তাফিজ জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

—‘আমি জানি, এর সবটুকু সাহিত্য নয়। তবু ছাপি। এই টাকাতেই অফিস চলে, কর্মচারীদের বেতন হয়, বিদ্যুতের বিল মেটে।’

সে একটু থামে বলল—‘তবে একটা কাজ করি। প্রতি বছর এই লাভের একটা অংশ আলাদা করে রাখি। সেই টাকা দিয়ে দু-তিনজন সত্যিকারের লেখকের বই ছাপি। যাদের লেখার মূল্য আছে, লেখকের পকেটে টাকা নেই।’

সান্তানু তাকিয়ে রইল বন্ধুর দিকে। মুস্তাফিজ হেসে বলল—‘সেই তালিকার প্রথম নামটা প্রতি বছরই তোর।’

সে একটু থামল। কথাটা বলেই দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। ঠোঁটের কোণের হাসিটা মিলিয়ে গেল। চেয়ারে হেলান দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—‘জানিস, এখন বই ছাপার আগে লেখকের স্বপ্নটাই বেশি বিক্রি করতে হয়। অনেকেই সাহিত্য করতে আসে না; আসে লেখক হিসেবে পরিচিত হতে।’

সান্তানু কোনো উত্তর দিল না। শুধু টেবিলের ওপর রাখা নিজের পাণ্ডুলিপির দিকে তাকিয়ে রইল।

মুস্তাফিজ বলল—‘তোকে ডেকেছিলাম যে জন্য বলাই হলো না।’

—‘এখন বল।’

—‘অনুশ্রীর ব্যপারে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। পেরে উঠছি না। কী করি বলতো?’

মুস্তাফিজের স্বর অসহায়ের মতো লাগলো। সান্তানু একটু অবাক চোখে তাকালো। বলল—‘যখন কোন ভার নিজের ওজনের চেয়ে বেশি হয়, তখন বহন না করাই ভালো।’

—‘সমাজ?’

—‘সমাজ! সে তোকে যা দেবে তা তোর নিজের তৈরি। নিজের কথা ভাবতে হয় বন্ধু।’

—‘কথা আর এগুতে পারছে না মুস্তাফিজ, ফোন আসছে একের পরে এক।’

তারা দুজনেই বুঝতে পারছিল, অবমূল্যায়ন শুধু মুদ্রার হয় না; কখনও বিবেকের, কখনও সাহিত্যের, কখনও বা নিজেরও হয়।

সান্তানু জানে, পৃথিবী বদলে যাচ্ছে। একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে তার চেনা পরিবেশ, চেনা মানুষগুলোও। বদলে যাচ্ছে মুস্তাফিজ, অর্ণব, এমনকি বিষ্ণুও। সান্তানু নিজেও যে বদলাচ্ছে না, তা নয়। সে সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

তবে আগের মুস্তাফিজ আর বর্তমানের মুস্তাফিজের মধ্যে পার্থক্যটা সান্তানুর চোখ এড়ায় না। একসময় যে মানুষটা শুধু বই আর লেখার মান নিয়ে ভাবত। একটা পাণ্ডুলিপি এলে খুঁটিয়ে পড়ত, লেখকের সঙ্গে আলোচনা করত। কোথাও পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে লেখকের সঙ্গে কথা বলে তা সংশোধন করাত। বছর শেষে হাতে গোনা কয়েকটি ভালো বই প্রকাশ করতে পারলেই সে ভীষণ খুশি থাকত। এখন সেই মুস্তাফিজকেই হিসাব করতে হয় বাজার, খরচ, কর্মচারীদের বেতন, প্রকাশনার টিকে থাকা আর বাস্তবতার সঙ্গে।

সান্তানু মাঝে মাঝে ভাবে, জীবন-জীবিকার সঙ্গে মানুষকে কোনো না কোনোভাবে সমঝোতা করতেই হয়। যে একেবারেই তা করতে চায় না, হয়তো সে আদর্শবাদী; অথবা বাস্তবতার কঠিন দিকগুলো এখনো সে পুরোপুরি দেখেনি।

মুস্তাফিজ এরই মধ্যে সান্তানুর কাছে আরেকটি পাণ্ডুলিপি চেয়েছে। সান্তানু কাছে লেখা শুধু সময়ের হিসাব না। তাই সে তাড়াহুড়ো করে দায়সারা কিছু জমা দেওয়ার পক্ষে নয়। একটা লেখা শেষ করার আগে তাকে বারবার ভাবতে হয়, কাটাছেঁড়া করতে হয়, নিজের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। মনে মনে সে ঠিক করল, আর এক সপ্তাহ পর মুস্তাফিজের কোনো তাগাদা ছাড়াই পাণ্ডুলিপি জমা দেবে। বন্ধুকে একটু চমকে দেওয়াই যাক।

পড়ুন ► প্রথম পর্ব ► দ্বিতীয় পর্ব  ► তৃতীয় পর্ব ► চতুর্থ পর্ব ► পঞ্চম পর্ব ► ষষ্ঠ পর্ব

আসছে ► সপ্তম পর্ব