ধারাবাহিক উপন্যাস: পর্ব—৬ || ও আমার বন্ধু
ধারাবাহিক উপন্যাস: পর্ব—৬ || ও আমার বন্ধু
এরপর কেটে গেল কয়েক দিন। অপরাজিতার পায়ের আঘাত প্রায় সেরে উঠছিল। সান্তানুও নিজের ব্যস্ত জীবনে ফিরে গিয়েছিল। তবু বোনের মুখে সেদিনের সেই অভিমানী হাসিটা মনে পড়ত। এক সকালে নাস্তা শেষ করতেই মায়ের ফোন এলো... ফোনের ওপাশে সেই চেনা কণ্ঠ, সেই চিরচেনা উদ্বেগ।
—‘কেমন আছিস? সকালে কী খেয়েছিস? সময়মতো খাস তো? রাত জেগে লিখবি না। ভোরে একটু হাঁটাহাঁটি করিস...’
একটার পর একটা কথা বলে যাচ্ছিলেন মা। এবার সেই কথার ফাঁকে নতুন একটি উদ্বেগও বারবার ফিরে আসছিল।
—‘অপরাজিতার খবর নিয়েছিস? ওর পাটা এখন কেমন? ও কি আমার কথা বলে? সুযোগ পেলে ওকে একদিন বাড়িতে নিয়ে আয়।’
সান্তানু শুধু বলল,
—‘আচ্ছা মা, বলব।’
মায়ের ফোন কেটে গেল। ক্লিনিকে গিয়ে দেখে আসার পর আর যাওয়া হয়নি। কাজের চাপে প্রতিদিনই ভেবেছে, ‘আজ যাব’, যাওয়া হয়ে ওঠেনি। ফোন করলে অপরাজিতা অভিমান করেই বলত,
—‘ফোনে দায়িত্ব শেষ? একদিন এসে দেখতেও তো পারিস!’
সান্তানু মনে মনে ঠিক করল, আজ বিকেলের দিকে হঠাৎই যাবে। আগে থেকে কিছু বলবে না। আচমকা গিয়ে বোনটাকে অবাক করে দেবে। মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল বিষ্ণু। ফোন ধরতেই ওপাশে অস্বাভাবিক ভারী কণ্ঠ।
—‘সান্তানু... একটা খুব খারাপ খবর আছে।’
সান্তানুর বুক ধক করে উঠল।
—‘কী হয়েছে?’
বিষ্ণু বলল—‘অর্ণবের ছোট ভাই আনন্দ... আর নেই।’
কথাটা শুনে সান্তানুর হাত থেকে প্রায় ফোনটা পড়ে যাচ্ছিল। সে কোনো কথা বলতে পারল না। কয়েক সেকেন্ড পর খুব আস্তে বলল—‘আমি বের হচ্ছি। তুই মুস্তাফিজকে খবর দে। আমরা একসঙ্গেই যাই।’
ফোন কেটে গেল। যে বিকেলটা বোনকে চমকে দেওয়ার পরিকল্পনায় ভরা ছিল, এক পলকেই তা শোকের এক দীর্ঘ যাত্রায় বদলে গেল।
অর্ণবের পাশে বিমর্ষ দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে আছে সান্তানু, মুস্তাফিজ ও বিষ্ণু। তিনজনেরই মুখে কথা নেই। শোক মানুষকে পাথর বানিয়ে দেয়।
বাড়িতে মানুষে গিজগিজ করছে। আত্মীয়, অনাত্মীয়, প্রতিবেশী, সহপাঠী, পরিচিত, কৌতূহলী... সবাই এসেছে। শোকের বাড়িতেও ছোট ছোট জটলা তৈরি হয়েছে। কোথাও আনন্দের মেধা আর ভদ্রতার গল্প, কোথাও দীর্ঘশ্বাস, কোথাও চাপা স্বরে নানা ব্যাখ্যা, নানা অনুমান।
অর্ণবের ছোট ভাই আনন্দ। প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পিএসআইটির ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে বি-টেক সম্পন্ন করেছে। মাত্র তেইশ বছরের একটি জীবন। অথচ সেই জীবনটাই আজ নিথর হয়ে শুয়ে আছে।
ভিড়ের ভেতর দিয়ে দ্রুত এগিয়ে এলো এক তরুণ। মুখে শোকের ছাপ, চোখ দুটো লাল। সে অর্ণবের সামনে এসে দাঁড়াল। অর্ণব উঠে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরল।
—‘পিপল... তুই এলি?’
পিপল কোনো উত্তর দিতে পারল না। শুধু অর্ণবের পিঠে হাত রেখে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল।
পিপলের পেছনে পায়ে পায়ে এগিয়ে এল অপরাজিতা। কয়েক দিন আগের দুর্ঘটনার কারণে তার হাঁটায় এখনও কষ্ট স্পষ্ট। ডান পায়ে প্লাস্টার, হাতে ভর দিয়ে খুব সাবধানে এগোচ্ছে।
সান্তানুর চোখ হঠাৎ বোনের ওপর গিয়ে স্থির হয়ে গেল। ক্লিনিকে বিদায় নেওয়ার পর এই প্রথম তাকে দেখছে। এমন একটি শোকের দিনে দেখা হবে, তা সে ভাবেনি। সান্তানু বলল—‘পিপল তুমি এখানে?’
অর্ণব চোখ মুছে বলল—‘তোরা একে অপরকে চিনিস নাকি?’
সান্তানু শান্ত গলায় বলল—‘পিপল আমার বোন অপরাজিতার স্বামী।’
অর্ণব বিস্ময়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল।
—‘সত্যি! পিপল তো আমার চাচাতো ভাই!’
সান্তানুও অবাক হয়ে পিপলের দিকে তাকাল।
অর্ণব বলল—‘আমাদের দুই পরিবারের আলাদা সংসার। ছোটবেলা থেকেই আমরা আলাদা বাড়িতে বড় হয়েছি। আমাদের বাসায় তোর যাতায়াত ছিল, অপরাজিতা যে তোর বোন, সেটা কোনো দিনই জানা হয়নি। আজ এমন একটা দিনে এই আত্মীয়তার খবর জানব, ভাবতেও পারিনি।’
অপরাজিতা এগিয়ে এসে দাদার পাশে দাঁড়াল। দুজনের চোখাচোখি হলো। কোনো কথা হলো না। এই বাড়িতে আজ শোকই সবচেয়ে বড় পরিচয়। সবাই তাকিয়ে রইল আনন্দের সাদা কাপড়ে ঢাকা দেহের দিকে। প্রতিবেশী ষাটোর্ধ্ব আকরাম সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—‘শুনেছি ছেলেটা নাকি নিজের বিভাগে প্রথম হয়েছিল? আর পুরো জেলায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেছিল?’
রঞ্জিত সাহেব সবার মুখের দিকে তাকালেন। যেন কথাটির সত্যতা জানতে চাইছেন। কেউ উত্তর দেওয়ার আগেই অর্ণবের মুখটা আরও ফ্যাকাশে হয়ে উঠল। সেদিকে খেয়াল না করেই আকরাম সাহেব বললেন—‘আহারে! সোনার টুকরো ছেলে ছিল। কেন যে এমন পরিণতি হলো!’
পাশ থেকে চন্দন বলল—‘জানেন কাকু, শুধু ভালো ফলই না। অসাধারণ একাডেমিক সাফল্যের জন্য কলেজ থেকে ওকে স্বর্ণপদকও দেওয়া হয়েছিল।’
কথাটা শেষ হতেই চারদিকে চাপা অর্তনাদ। মৃন্ময় ঘোষ এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আনন্দের স্কুলজীবনের শিক্ষক। কঠোর শৃঙ্খলাপরায়ণ হিসেবে সবাই তাকে চেনে। ছাত্রদের কাছে তিনি যেমন সম্মানের, সহকর্মীদের কাছেও তেমনি শ্রদ্ধেয়। আজ তাকে অন্যরকম লাগছে। চোখদুটো লাল হয়ে আছে। মুখে ক্লান্তির ছাপ। তিনি বললেন—‘ছেলেটা খুব নম্র ছিল। ভদ্র ছিল। মেধাবী তো ছিলই। পড়াশোনা শেষ করে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ভেতরে কী ঝড় বয়ে যায়, তা তো বাইরে থেকে বোঝা যায় না।’
কথা বলতে বলতে তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
—‘কখন নিজের ভেতর একা হয়ে যায় যারা, তাদের দেখলে টেরও পায় না…’
চোখের কোণে পানি জমে উঠল তার। জীবনে বহু ছাত্রকে বিদায় দিয়েছেন তিনি। কেউ চাকরিতে গেছে, কেউ বিদেশে, কেউ সংসার করেছে। অথচ এভাবে বিদায়... এমন বিদায় তিনি কখনও কল্পনাও করেননি।
রঞ্জিত সাহেব তাকিয়ে রইলেন তার দিকে। এগিয়ে গিয়ে সান্ত্বনা দিতে চেয়েছিলেন। হাত বাড়িয়েই গুটিয়ে নিলেন। এমন কিছু শোক আছে, যেখানে ভাষা অর্থহীন হয়ে যায়।
ঘরের এক পাশে কয়েকজন নিচু স্বরে বলাবলি করছিলেন, প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ ধারণা করছে, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপে ঘটনাটি ঘটতে পারে। তবে তদন্ত এখনো চলছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি হাতে লেখা চিরকুটও উদ্ধার হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে।
রঞ্জিত সাহেবের ভাবনায় ছেদ পড়ল আকরাম সাহেবের ডাকে।
—‘কী রে, একা দাঁড়িয়ে আছিস কেন?’
এরই মধ্যে প্রীতম ঘোষ বললেন—‘আমরা বুড়োরা রয়ে গেলাম। আর পৃথিবীটাকে ঠিকমতো দেখাই শুরু করতে পারেনি যে ছেলেটা...’
বাকিটা আর বলতে পারলেন না। গলা আটকে গেল।
রঞ্জিত সাহেব মাথা নেড়ে বললেন—‘এখনকার ছেলেমেয়েদের মনটা বুঝি না। কত চাপ, কত আশা, কত হতাশা... কোনটা কতটা সহ্য করছে, বাইরে থেকে বোঝা যায় না।’
আকরাম সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—‘ঘটনার সময় বাড়িতে কেউ ছিল না?’
রঞ্জিত সাহেব উত্তর দিলেন—‘না। আনন্দের পরিবারের সবাই ওর খুড়তুতো ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে রাজশাহী গিয়েছিলেন।’
—‘তাহলে বাড়িতে সে একাই ছিল?’
—‘হ্যাঁ। তবে এমন একা তো মাঝেমধ্যেই থাকত। কেউ কি ভাবতে পেরেছিল এমন কিছু ঘটবে?’
মৃন্ময় ঘোষকে ভীষণ ক্লান্ত আর বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। তিনি চারদিকে একবার তাকিয়ে বললেন—‘এখন আর কে কী অনুমান করল, সেটা নিয়ে আলোচনা করে লাভ নেই। বরং বলো তো, পুলিশকে খবর দিল কে?’
আকরাম সাহেব উত্তর দিলেন—‘সাড়া না পেয়ে বাড়ির গৃহকর্মী প্রথমে প্রতিবেশীদের ডাকেন। পরে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকে। তখন সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় আনন্দের মরদেহ উদ্ধার করে। ঘর থেকেই পাঁচ লাইনের একটি হাতে লেখা চিরকুটও পাওয়া যায়।’
কথাগুলো শেষ করে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মৃন্ময় ঘোষ ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
—‘চিরকুটে কী লেখা ছিল... জানেন?’
রঞ্জিত সাহেব চুপ করে রইলেন। যেন শব্দগুলো উচ্চারণ করতেও কষ্ট হচ্ছে।
—“আমি দেখেছি। তাতে শুধু লেখা ছিল, ‘সরি, বাবা। সরকারি চাকরি পাওয়ার জন্য বহুবার চেষ্টা করেছি, সফল হতে পারিনি। আমাকে ক্ষমা করে দিও।’”
এরপর আর কিছুই ছিল না। কথাগুলো বাতাসে মিলিয়ে যেতে না যেতেই উপস্থিত সবার বুকের ভেতর ভার নেমে এল। আকরাম সাহেব মাথা নেড়ে বললেন—‘ছেলেটাকে দেখে কখনও মনে হয়নি, ভেতরে এত কষ্ট নিয়ে ঘুরছে। এত মেধাবী, এত ভদ্র... কে জানত!’
মৃন্ময় ঘোষ শান্ত কণ্ঠে বললেন—‘ভেতরের যুদ্ধ সব সময় চোখে পড়ে না। অনেকেই নিজের যন্ত্রণাকে হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখে। আমরা শুধু বাইরের মানুষটাকেই দেখি।’
রঞ্জিত সাহেব অর্ণবের বাবা অভিষেকের দিকে তাকালেন। মানুষটা আত্মীয়স্বজনের ভিড়ের মাঝখানে বসে আছেন, তবু কারও সঙ্গেই নেই তিনি। তার দৃষ্টি শূন্যে স্থির।
রঞ্জিত সাহেব ফিসফিস করে বললেন—‘তরতাজা ছেলেকে হারিয়ে মানুষটার কী অবস্থা হয়েছে! এমন শোকের সামনে দাঁড়ালে ভাষা হারিয়ে যায়।’
আকরাম সাহেব সম্মতি জানালেন।
—‘হ্যাঁ। আমরা সবাই যেন নিজেদের কাছ থেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছি।’
তখন রঞ্জিত সাহেব বললেন—‘চলো। আর দেরি করা ঠিক হবে না। শেষকৃত্যের প্রস্তুতি কতটুকু কী হলো দেখতে হবে।’
মৃন্ময় ঘোষ মাথা নাড়লেন।
—‘ঠিক বলেছ। সন্ধ্যার আগে ভৈরব ঘাটে পৌঁছাতে হবে। পথও কম নয়।’
এক এক করে সবাই উঠতে লাগলেন। এই সময় অর্ণবের একেবারে পাশে বসে ছিল সান্তানু। সে একটা কথাও বলেনি। বন্ধুর কাঁপতে থাকা হাতের ওপর নিজের হাত রাখল সে। নরম গলায় বলল,
—‘এখন এমন কোনো কথা নেই, যা তোর কষ্ট কমিয়ে দিতে পারে। শুধু এটুকু জানি, আমরা কেউ তোকে একা ছেড়ে যাব না।’
অর্ণব নিজেকে সামলে রেখেছিল। এবার আর পারল না। ভাঙা গলায় বলল,
—“ও তো আমার ছোট ভাই ছিল, সান্তানু। ছোটবেলা থেকে সবকিছু একসঙ্গে করেছি। আজও মনে হচ্ছে, দরজা খুলে এসে বলবে, ‘দাদা, চা খাবি?’... এটা কীভাবে মেনে নেব?”
সান্তানুর চোখও ভিজে উঠল। সে বলল—‘কিছু শূন্যতা কখনও পূরণ হয় না। মানুষ শুধু সেই শূন্যতাকে বয়ে নিয়ে বাঁচতে শেখে। তোর পাশে আমরা আছি।’
বিষ্ণু এগিয়ে এসে অর্ণবের কাঁধে হাত রাখল।
—‘কাঁদতে ইচ্ছে করলে কেঁদে ফেল। চোখের পানি লুকিয়ে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই।’
মুস্তাফিজ দাঁড়িয়ে; কোনো সান্ত্বনার ভাষা তার জানা নেই। এমন উপস্থিতিই সবচেয়ে বড় সহমর্মিতার, বেদনার।
ঘরের বাইরে তখন শেষযাত্রার প্রস্তুতি চলছে। কেউ কাঠের ব্যবস্থা করছে, কেউ গাড়ির। আত্মীয়দের কান্না আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অর্ণব একবার ভাইয়ের নিথর মুখের দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল।
সামনে দীর্ঘ পথ। সেই পথের শেষ প্রান্তে অপেক্ষা করছে ভৈরব ঘাটের চিতা। আর পেছনে রয়ে যাবে এক তরুণের অপূর্ণ স্বপ্ন, অসংখ্য প্রশ্ন, আর এমন এক শূন্যতা, যার উত্তর হয়তো কোনো দিনই মিলবে না।
উঠোনে হঠাৎ এক ধরনের অস্থিরতা শুরু হলো। কয়েকজন এগিয়ে এসে বললেন—‘সময় হয়ে গেছে... এবার নিয়ে যেতে হবে।’
সাদা কাপড়ে ঢাকা আনন্দের নিথর দেহের পাশে গিয়ে দাঁড়াল অর্ণব। নিজেকে শক্ত রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছিল সে। আর পারল না। ভাইয়ের মুখের ওপর ঝুঁকে তাকিয়ে রইল। যেন আনন্দ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। এই বুঝি চোখ মেলে বলবে—‘দাদা, এত লোক কেন?’
অর্ণব কাঁপতে থাকা হাতে আনন্দের কপালে আলতো করে বুলিয়ে দিল।
—‘তুই তো বলেছিলি, চাকরি পেলে প্রথম বেতনের টাকা দিয়ে বাবার জন্য একটা ভালো চশমা কিনে দিবি। মায়ের জন্য একটা শাড়ি। আমার জন্য একটা ঘড়ি। মনে আছে? এত তাড়াতাড়ি সব কথা ভুলে গেলি?’
কথাগুলো শেষ হতে না হতেই তার গলা ভেঙে গেল। সে হঠাৎ ভাইয়ের নিথর দেহ জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
—“একবার... একবার শুধু চোখ খুলে তাকা, আনন্দ। আমাকে একবার ‘দাদা’ বলে ডাক। আমি তোকে কোথাও যেতে দেব না। শুনছিস? কোথাও না...”
চারদিকে কান্নার রোল উঠল। মা বুক চাপড়ে চিৎকার করে উঠলেন। আত্মীয়স্বজন এগিয়ে এসে অর্ণবকে ধরে রাখার চেষ্টা করলেন। সে কিছুতেই ভাইয়ের দেহ ছাড়তে চাইছিল না।
সান্তানু এগিয়ে এসে অর্ণবের কাঁধে হাত রাখল। তার নিজের চোখও ভিজে গেছে। নরম গলায় বলল—‘ভাই... এবার ওকে বিদায় দেওয়ার সময় হয়েছে। যত কঠিনই হোক, এই শেষ পথটা আমাদেরই ওকে পৌঁছে দিতে হবে।’
বিষ্ণু ও মুস্তাফিজও এগিয়ে এল। তিন বন্ধু মিলে অর্ণবকে সামলে দাঁড় করাল। অর্ণব চোখের পানি মুছল। ভাইয়ের কপালে শেষবারের মতো চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল—‘ভালো থাকিস, ভাই। যেখানে থাকিস, শান্তিতে থাকিস। এই দাদাটা তোকে কোনোদিন ভুলবে না।’
কাঁপা হাতে সে নিজেই খাটিয়ার এক কোণ ধরল। চারজন কাঁধে তুলতেই উঠোন জুড়ে একসঙ্গে ধ্বনিত হলো—‘বল হরি, হরিবোল... হরিবোল...’
সেই ধ্বনি, কান্না আর মৃতবাড়ির নিস্তব্ধতা একাকার হয়ে গেল। শববাহী গাড়িটি বাড়ির উঠোন ছেড়ে বেরিয়ে এলো।
অর্ণব হাঁটছে গাড়ির একেবারে পাশে। তার চোখে শুকনো। যেন কান্নারও একটা সীমা আছে। সেই সীমা পেরিয়ে গেলে ব্যথিত শুধু হাঁটে। যন্ত্রের মতো।
সান্তানু, বিষ্ণু ও মুস্তাফিজও তার সঙ্গে হাঁটছে। তিনজনের কেউই কোনো কথা বলছে না। রাস্তার দুপাশের মানুষ কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে। কেউ থেমে দাঁড়িয়েছে, কেউ মাথা নত করেছে।
ভৈরব ঘাটে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যার আলো ক্রমশ ফিকে হয়ে এলো। পশ্চিম আকাশে সূর্যের শেষ রঙ মিলিয়ে যাচ্ছে। নদীর পানিও আজ অদ্ভুত রকম স্থির। এখানে প্রকৃতিও শোক প্রকাশ করছে নিজের ভাষায়।
শ্মশানের ভেতরে কাঠ সাজানো হচ্ছে। পুরোহিত প্রয়োজনীয় আয়োজন করছেন। একটু দূরে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিল সান্তানু। তার চোখ স্থির পানির দিকে। কত মানুষ এলো, কত মানুষ চলে গেল এই ঘাটে। সবচেয়েও পুরোনো এই নদীটি কতকিছুর সাক্ষী হয়ে আছে।
তার মনে পড়ল নিজের বাবা মারা যাওয়ার দিনের কথা। তখনও সে ঠিক এভাবেই দাঁড়িয়ে ছিল। চারদিকে ভিড়, সান্ত্বনার কথা, ধর্মীয় আচার... অথচ তার কানে কিছুই পৌঁছাচ্ছিল না। পৃথিবীর সব শব্দ হঠাৎ হারিয়ে গিয়েছিল কোথাও। আজ এত বছর পর সেই একই অনুভূতি ফিরে এসেছে। মৃত্যু একজনকে শুধু কেড়ে নেয় না, যারা বেঁচে থাকে তাদেরও ভেতর থেকে একটু একটু করে বদলে দেয়।
এমন সময় বিষ্ণু এসে পাশে দাঁড়াল। দুজনেই নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। বিষ্ণু বলল—‘আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি, যেখানে একজনের পরিচয় শুধু একটা চাকরি, পদ, বেতন। সে কেমন, সে কী স্বপ্ন দেখে, কী সৃষ্টি করতে পারে... সেসব ক্রমেই অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাচ্ছে।’
সান্তানু দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—‘সমস্যা শুধু চাকরি নয়। সমস্যা হলো, আমরা সফলতার সংজ্ঞাটাকেই খুব ছোট করে ফেলেছি। যারা সেই সংজ্ঞার মধ্যে ঢুকতে পারে না, তারা নিজেকেই ব্যর্থ ভাবতে শুরু করে।’
মুস্তাফিজও এসে তাদের পাশে দাঁড়াল। সে বলল—‘প্রকাশনা জগতে কাজ করতে গিয়ে কত তরুণের সঙ্গে দেখা হয়। কারও পাণ্ডুলিপি ফিরিয়ে দিতে হয়, কেউ বছরের পর বছর চেষ্টা করেও সুযোগ পায় না। একটা কথা আমি সব সময় বলি, জীবনের কোনো ব্যর্থতা পুরো অস্তিত্বকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে না।’
বিষ্ণু মাথা নাড়ল।
—‘আমাদের সমাজে মানসিক কষ্ট নিয়ে কথা বলাটাই যেন লজ্জার বিষয়। কেউ সাহায্য চাইতে চায় না, আর আশপাশের যারা থাকে তারা বুঝতে পারে না যে, সে ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছে।’
সান্তানু শান্ত গলায় বলল—“হয়তো এ কারণেই আমাদের একে অপরের খোঁজ নেওয়া আরও জরুরি। শুধু ‘কেমন আছ?’ বলার জন্য নয়, উত্তরটা মন দিয়ে শোনার জন্য।”
তিনজনই চুপ হয়ে গেল। ওপাশে শেষকৃত্যের আচার শুরু হয়েছে। অর্ণব কাঁপা হাতে শেষ বিদায়ের আয়োজন সম্পন্ন করছে। অভিষেকবাবু ছেলের মুখের দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখে পানি নেই। শূন্য দৃষ্টি বলে দিচ্ছে, একজন পিতা তার জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
পঞ্চবটি মহাশ্মশানের চিতা জ্বলে উঠল। আগুনের শিখা ক্রমশ উঁচু হতে লাগল। সান্তানু আগুনের দিকে তাকিয়ে রইল। সে জানে, জীবনের সমস্ত অহংকার, সমস্ত প্রতিযোগিতা, সমস্ত অর্জন, সমস্ত পরাজয় শেষ পর্যন্ত কয়েক মুঠো ছাইয়ের মধ্যেই মিলিয়ে যায়। তবু মানুষ স্বপ্ন দেখে। ভেঙে পড়ে, উঠেও দাঁড়ায়। হয়তো এই উঠতে পারার নামই জীবন।
চিতা নিভে আসছে। সন্ধ্যার আকাশে ধোঁয়ার সরু রেখা ভেসে উঠেছে। নদীর ওপারটা কুয়াশার মতো আবছা। সবাই একে একে ঘাট ছেড়ে ফিরতে শুরু করেছে। সান্তানু নদীর দিকে তাকিয়েই দাঁড়িয়ে ছিল। ঠিক তখন পেছন থেকে পিপলের কণ্ঠ ভেসে এল।
—‘দাদা...’
সান্তানু ফিরে তাকাল।
পিপলের পাশে দাঁড়িয়ে অপরাজিতা। মুখে গভীর ক্লান্তি, চোখে দীর্ঘদিনের না-বলা কথা।
সান্তানু এগিয়ে এল। অপরাজিতা নিচু গলায় বলল—‘কাউকে হারালে আসলে নিজেরও একটা অংশ হারিয়ে ফেলে।’
সান্তানু কোনো উত্তর দিল না। শুধু বোনের দিকে তাকিয়ে রইল। পিপল আস্তে বলল—‘দাদা, এতদিন পর এমন দিনে আপনাদের সঙ্গে দেখা হবে, কখনও ভাবিনি।’
সান্তানু বলল—‘জীবন আত্মার সম্পর্ককে অদ্ভুত সময়ে সামনে এনে দাঁড় করায়।’
নদীর ওপর সন্ধ্যার বাতাস বয়ে যাচ্ছে।অপরাজিতা খুব আস্তে বলল—‘একবার আমাদেরর বাসায় আয় দাদা। কবে সময় পাবি?’
সান্তানু বোনের মাথায় আলতো করে হাত রাখল।
—‘কথা দিতে পারছি না। যেতে চেষ্টা করব।’
পিপল মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইল। তিনজন ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। পেছনে তখনও চিতার আগুন জ্বলছে। সামনে অন্ধকার নামছে।
পড়ুন ► প্রথম পর্ব ► দ্বিতীয় পর্ব ► তৃতীয় পর্ব ► চতুর্থ পর্ব ► পঞ্চম পর্ব || আসছে ► সপ্তম পর্ব



আপনার মন্তব্য প্রদান করুন